সকাল আর আসেনা গোলাপ হয়ে ফোটেনা কিশোরীর হাতে
বাড়ির চারদিকে থৈ থৈ জল। দূরের নদীতে পাল তোলা নাও ভেসে যাচ্ছে। বৌ ঝিয়েরা নাও দেখে উদাস হয়। কেউ কেউ উঠানে পিড়ি বিছিয়ে চুলে বিলি কাটে আর গল্প করে। নানা রকম খোসগল্পে এক এক সময় সমস্বরে হুহু করে হেসে উঠে।
একজন আরজনকে চিমটি কাটে। বলে 'মাগি যা ছাই এইখান থাইক্কা..........
দু'জন বালক বালিকা বাড়ির ঘাটের জলে কলার মোচার নাও ভাসিয়ে দিয়ে ছড়া কাটছে 'পালের নাও পালের নাও পান খাইয়া যা,ঘরে আছে ছোট বোন তারে লইয়া যা'। পারুল আর মেয়েলি সাজে তারই ছোট ভাই আব্দুল। ছোট ভাইটিকে পারুল সবসময় মেয়েলি সাজে সাজায়। আদর করে কপালে টিপ দিয়ে দেয়।
তারা পুতুল বিয়ে খেলা খেলে।
তারও কিছুদিন পর। বালক বালিকা ক্রমশ বড় হয়। ভাই বোন ঝগড়া করে। চুলাচুলি করে।
আবার গলায় গলায় ভাব করে স্কুলে যায়।
আরো কিছুদিন পর।
বালিকার চোখে রঙ লাগে। রঙ্গিন হতে থাকে তার পৃথিবী। আব্দুল আর পারুলের মাঝে তৈরী হয় একটা অদৃশ্য দেয়াল।
দুজনের পৃথিবী আলাদা। কেউ কারো সাথে আগের মত শেয়ার করেনা। একে অপরের পেছনে লেগে থাকে। বাবা মায়ের কাছে তারা পরষ্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।
'ঐ পারুলী আইজ তোরে স্কুলে বাদইল্লা ডাইকা কি কইছে?ক্ষোভ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে আব্দুল।
পারুল এটা সেটা বলে তাকে বুঝায়। আব্দুল ফুঁসতে থাকে। 'খাড়া আইজ বাপজানের কাছে যদি না কইছি'। আব্দুল ভয় দেখায়।
পারুল রাত জেগে পড়ে।
বইয়ের ভেতরে তার একটি চিঠি লুকানো। তাই তার শরীর জুড়ে ভয় মিশ্রিত উত্তেজনা। সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি পড়বে। চিঠিতে কি লেখা তা জানতে তার তর সইছে না। ইস !এখনো আব্দুলটা ক্যান যে ঘুমায় না?পারুল ভাবে।
আব্দুল ঘুমিয়ে গেলে সে আস্তে আস্তে চিঠি বের করে। তার হাত কাঁপে। পড়ে আর আনন্দে শরীর নেচে উঠে। একসময় একটা মিষ্টি হাসি হাসি ভাব নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে পারুল। ঠোঁটের কিনারে তার হাসি লেগে থাকে।
এভাবে সময় চলে। রাত গভীর হলে পারুল লুকিয়ে চিঠি পড়ে। একটা আনন্দে ভেসে বেড়ায়। চারপাশ জুড়ে তার ভালোলাগা। আপাদমস্তক লজ্জা আর লজ্জা ।
একটা পাখি ডেকে উঠলেও সে লজ্জায় মরে যেতে থাকে। বুকের ওড়নাটা আচমকা বাতাসে সরে গেলে সে তাড়াহুড়ো করে ওড়না টেনে বুকে চাপায় আর চারদিকে তাকায়।
একদিন বইয়ের ভেতর থেকে একটা চিঠি বেরিয়ে যায়। একেবারে আব্দুলের সামনে পড়ে চিঠিটা। চিঠিটা আব্দুল চট করে হাতের মুঠোয় নিয়ে দৌড় দেয়।
এক দৌড়ে বাবার হাতে দিয়ে আসে। পারুলের আকাশটা ভেঙ্গে পড়ে। সবকিছু উলট পালট হয়ে যায়। স্কুলে যাওয়া বন্ধ।
একটা নৌকা এসে একদিন ভিড়ে পারুলদের ঘাটে।
লাল নীল নিশান লাগানো নৌকা। হাতে পারুলের মেহেদীর রঙ। মা বাবা চোখের জলে পারুলকে বিদায় দেয়। নৌকাটা পারুলকে নিয়ে দূরে আরো দূরে চলে যেতে থাকে। ক্রমশ দৃষ্টির আড়াল হয়ে যায।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আব্দুল। নৌকাটি দেখতে না পেয়ে তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে।
ঘরে আব্দুলের একদম মন টেকে না। একেবারে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। রাতে ঘুমাতে গেলে চোখের কিনার বেয়ে বেয়ে বালিশ ভিঁজতে থাকে জলে।
তারও দশ বছর পর ।
পারুল ফিরে আসে। ফুলের পাপড়ির মত নেতিয়ে পড়েছে। চোখে কোন উচ্ছাস নেই। মুখের লাবণ্য মিইয়ে গেছে।
হাতে তার একটা ফটোগ্রাফ। সে এখন সেটার দিকে চেয়ে কাঁদছে। ফটোগ্রাফে একটি শিশু তার দিকে চেয়ে ফুটফুটে আঙ্গুল দিয়ে খামচে ধরে আছে পারুলের শরীর। শিশুটির মাথাটা বড়। জন্মের সময় শ্বশুর বাড়ির লোকজন মেরে ফেলতে চেয়েছিল শিশুটিকে।
কিন্ত্ত পারেনি। বেঁচে গেলেও শিশুটির মাথায় আঘাতের কারণে মাথাটি বড় হয়ে উঠে। পারুলের স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছে। তার বাবা মা সেখান থেকে তাকে ছাড়ান এনেছে। বাচ্ছাটিকে দিয়ে এসেছে ওখানে।
পারুল অনেক চেষ্টা করেছে বাচ্ছাটিকে আনতে। কিন্ত্ত বাবা মা আনতে দেয়নি। বাচ্চাটিকে আনলে ঝামেলা হবে । আবার যখন বিয়ে দেবে পারুলের তখন?পারুল যেদিন একেবারে চলে আসবে স্বামীর বাড়ির সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে সেদিন তড়িঘড়ি করে একটি স্টুডিওতে ডুকে মা এবং ছেলের শেষ স্মৃতি চিহ্ণটি তুলে এনেছে ফটোগ্রাফে। পারুল পাগলের মত চিৎকার করে,বুক চাপড়িয়ে বলছে,আমার মানিককে আইন্না দেও।
পারুলের মুখে কোন রা নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই ফটোগ্রাফের দিকে। সে এখন কি করছে!তাকে কে খাওয়াচ্ছে?হাজারো ভাবনায় সে দিশেহারা। ফটোগ্রাফের শিশুটি বারবার যেন বলছে' মা আমার অনেক কষ্ট হইতাছে মা আমারে লইয়া যাও'।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।