আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিক্ষক

বড়াইগ্রাম(নাটোর) উপজেলার সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে এই ব্লগে আলোচনা করা হবে। বেশী করে নিমগাছ লাগান, আপনার পরিবেশ ভাল থাকবে।

বেসরকারী শিক্ষা নিয়ে লেখাটি শেয়ার করলাম। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার উদ্দেশ্য মনুষ্যত্বের বিকাশ।

লক্ষ্য মানবমুক্তি ও উন্নয়ন। সভ্যতা ও উন্নয়নের চাবিকাঠি শিক্ষা। বৈষয়িক উন্নতি ও মানসিক প্রশান্তির জন্যও শিক্ষার প্রয়োজন । শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এর শক্তি অপরিমেয় ও অসীম।

শিক্ষার কাছে সব শক্তিই অসহায়। তাই বলা হয়ে থাকে 'অসির চেয়ে মসির শক্তি বেশি'। তবে শিক্ষা বলতে বোঝানো হয় সুশিক্ষা। যে শিক্ষা জীবনঘনিষ্ঠ, বিশ্বাস-ঐতিহ্য মণ্ডিত, কল্যাণধমর্ী, উৎপাদনমুখী, যুগোপযোগী, মনুষ্যত্ব বিকাশধমর্ী তাকেই সাধারণত সুশিক্ষা বলা হয়ে থাকে। সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন পাঠ্যবিষয় ও ভালো শিক্ষক।

শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর। ছেলেমেয়েদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চেয়ে শিক্ষকের ভূমিকাই বেশি। তাই ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের সব সমাজেই শিক্ষকদের মর্যাদা অধিক। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষকরা করুণার পাত্র। তাঁরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবহেলিত।

নির্বাহী বা প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় তাদের মযর্াদা ও প্রতিষ্ঠা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রটোকলের দিক দিয়ে তারা সব সময়ই উপেক্ষিত। সাধারণত বাছাই করা সবের্াচ্চ মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু তাদের আর্থিক ও অন্য সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের চেয়ে কম। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য ক্যাডারের চেয়ে নিচে।

এমনিভাবে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মযর্াদাও অন্যান্য পেশার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে অনেক কম। লজ্জাজনক হলেও সত্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্নাতক পাস শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অস্টম শ্রেণী পাস সরকারি কর্মচারীদের সমান এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে আরও কম। ৮/১০ জন শিক্ষক ৫০০/৬০০ ছাত্রছাত্রীর জন্য কোনো পিয়ন বা ঝাড়ুদারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষকদের এসব বঞ্চনার কারণে বিসিএস ক্যাডারের একজন প্রভাষক ক্ষোভে-অভিমানে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে ক্লিনারের চাকরি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসজীবনে ভালো আছেন বলে লিখেছেন পত্রিকাতে। বেসরকারি শিক্ষকদের অবস্থা আরো করুণ! অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি/সদস্য স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।

তাঁদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। অথচ তাঁরাই খবরদারি করেন জাতি গঠনের কারিগর শিক্ষকদের ওপর। তাঁরা বুঝে না বুঝে অনেক সময় শিক্ষকদের হয়রানির মাধ্যমে নিজেদের কতর্ৃত্ব প্রর্দশন করে থাকেন। জাতির বিবেক শিক্ষকদের অনেক সময় মেনে নিতে হয় তাদের অন্যায়-অসৎ দিকনির্দেশনা। কারণ প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার ও বরখাস্ত করার অধিকার রাখে পরিচালনা পর্ষদ।

এ কারণে কোনো কোনো শিক্ষক পাঠদানের চেয়ে পরিচালনা পর্ষদকে সন্তুষ্ট করার জন্য বেশি সময় ব্যয় করেন। আর্থ-সামাজিক দিক দিয়েও বেসরকারি শিক্ষকদের ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। জাতীয় স্কেলে তাদের বেতন নিধর্ারণ করার সরকারি উদ্যোগ অবশ্যই প্রসংশনীয়। কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারী সবার জন্য মাসিক ১০০ টাকার বাড়িভাড়া ও ১৫০ টাকার মেডিক্যালভাতা নিশ্চয়ই অবজ্ঞামূলক। এ ছাড়া মূল বেতনের মাত্র এক চতুর্থাংশ প্রহসনমূলক উৎসবভাতাও তাদের জন্য অসম্মানজনক।

বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা না রাখা, বিভিন্ন অজুহাতে উচ্চতর স্কেল বন্ধ করা, মেধা-যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা না করে শুধু জ্যেষ্ঠতার কারণে পদোন্নতির অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষকদের সৃজনশীলতার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু প্রভাষক সহকারী অধ্যাপকের আনুপাতিক হারের বেড়াজালে অপেক্ষাকৃত মেধাবী প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপকের পদ লাভে বঞ্চিত করা হয়েছে প্রচলিত বিধানে। আর অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের কোনো পদ রাখা হয়নি বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া উচ্চতর গবেষণার মূল্যায়ন না করে শিক্ষকদের গবেষণাকর্মে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির ক্ষেত্রে সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান না থাকায় তাদের চাকরি নির্ভর করে কতর্ৃপক্ষের ইচ্ছার ওপর।

এজন্য পাঠদান ও পরীক্ষাপত্র মূল্যায়নের সময় শিক্ষকদের মাথায় রাখতে হয় কর্তৃপক্ষের লাভ-লোকসানের হিসেব। এসব কারণে পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে না। অর্জিত হয় না শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান। অথচ মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার। দারিদ্র্যবিমোচন-অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

আর মানসম্মত শিক্ষার জন্য দরকার মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকের। এ ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রথমে প্রয়োজন ডিজিটাল মানের শিক্ষকের। বর্তমান বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান উন্নত ও সুসংহত করতে হলে সৃজনশীল মননের শিক্ষকের প্রয়োজন। দরকার এমন শিক্ষকদের যাঁরা হবেন নৈতিকতা ও আদর্শের ক্ষেত্রে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পাঠদানে মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ।

কিন্তু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা কম থাকার কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা নির্বাচনে অনাগ্রহী। মেধাবী ও যোগ্যদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করতে এ পেশার আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির সুযোগ। বাড়াতে হবে সামাজিক মর্যাদা ও গুরুত্ব। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয়করণ অপরিহার্য।

উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থা তাদের দক্ষতা ও মযর্াদা বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে জেলা প্রশাসক/উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা এলাকার সর্বাধিক শিক্ষিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করাও উচিত। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা শিক্ষার মান উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। অভিযোগ আছে_ অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে প্রাইভেট বা কোচিং ব্যবসা করে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকেন। অনেকে পেশা বর্হিভূতভাবে এনজিও, ব্যবসা, ঠিকাদারি ইত্যাদি কাজ করেন।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রভাব-কতর্ৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন অনেক শিক্ষক। আবার প্রাথমিক থেকে বিশ্বিবিদ্যালয় পযনর্্ত সব স্তরেই কিছু কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আছে যা তাদের পেশাগত মর্যাদা ও নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে পেটে যখন ভাত থাকে না, সংসারের খরচ করার মতো পকেটে অর্থ থাকে না, অন্যান্য পেশায় নিয়োজিতদের মতো সামাজিক মর্যাদা পায় না তখন কোনো কোনো শিক্ষকের মহৎ আদর্শ ও নৈতিকতা পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এজন্য শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে পেশা বহির্ভূত ও অনৈতিক কাজের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকা আবশ্যক। কিন্তু শুধু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলেই শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়বে না।

এক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব-কর্তব্যও কম না। তাদের আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানার্জন এবং গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা প্রয়োজন। সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হলে তাদেরকে আরও বেশি দায়িত্বশীল, নৈতিক-আদর্শবান, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। বাড়াতে হবে নিজেদের জ্ঞানের পরিধি। প্রকৃতপক্ষে, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিক্ষকের জন্য সরকার ও শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।

মূল লেখাটি এখানে পাবেন

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.