আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কর্নেল জাফর ইমামের স্মৃতিতে ৩ নভেম্বর

থেমে যাবো বলে তো পথ চলা শুরু করিনি।

[ কপি - পেস্ট ] Click This Link ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল জিয়াকে অঘোষিতভাবে নিরাপত্তার অজুহাতে গৃহবন্দী রাখা হয়। বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ক্যাপ্টেন হাফিজ উল্লাহর নেতৃত্বে একদল সেনাসদস্য। অন্যদিকে বঙ্গভবনে তখন জমে ওঠে মূল নাটক। চতুর্থ বেঙ্গল থেকে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগেই আমরা কয়েকজন পেঁৗছে যাই বঙ্গভবনে।

বঙ্গভবনে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে তখন মোশতাক, তার মন্ত্রিপরিষদ ও ওসমানীর মধ্যে খালেদের নানা প্রশ্নে তুমুল বিতর্ক চলছিল। কক্ষের বাইরে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ উল্লাহ পায়চারী করছিলেন ও হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কাঁদছিলেন। আমার সঙ্গের একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনাকে এমন বিষণ্ন, ভীত ও হতাশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে কেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'কী হয়ে গেল, কী হলে গেল!' ইতিমধ্যেই সাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে সন্ধ্যার পর চতুর্থ বেঙ্গল থেকে কর্নেল গাফফার, ক্যাপ্টেন তাজ, হাফিজ, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন, মেজর হাফিজউদ্দিন, মেজর ইকবাল প্রমুখ মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে। প্রায় সবার হাতেই স্টেনগান, পিস্তল। তারা তেড়ে গেলেন মোশতাক ও মন্ত্রীদের দিকে।

অনেক অফিসার চিৎকার করে বললেন, 'ইউ হ্যাভ সিন ডালিম। ইউ হ্যাভ নট সিন ফাদারস অব ডালিম!' আবার কেউ বললেন, 'ইউ ব্লাডি কিলারস। উই শ্যাল নট স্পেয়ার ইউ। ' কয়েকজন বললেন, 'কিসের সমঝোতা, কোনো সমঝোতা চলবে না। জেলহত্যার ব্যাপারে এ মুহূর্তে আমরা জানতে চাই এবং এর দায়দায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতে হবে।

' মোশতাক চেয়ারে বসেছিলেন, তার চারপাশে বসা মন্ত্রীদের অধিকাংশই চেয়ার ছেড়ে সামনের টেবিলের নিচে গিয়ে চিৎকারে করে বলছিলেন, 'আমরা নই, আমরা নই। আমরা কিছু জানি না। জেলহত্যার প্রতিবাদে আমরা পতদ্যাগপত্র দিয়েছি। ওই দেখেন। এগুলো মোশতাক সাহেবের সামনে আছে।

' ওই সময় মোশতাকের সামনের টেবিলের ওপর কিছু দরখাস্ত ছিল। জেনারেল ওসমানী দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছিলেন এবং আগত অফিসারদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ কক্ষজুড়ে হইচই ও উত্তপ্ত বাক্য ছোড়া হচ্ছিল একতরফাভাবে। অনেকে আবার স্টেনগান কক করে গুলি করার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। কক্ষের ভেতর চলছিল অফিসারদের একতরফা হুমকি ও গালিগালাজ।

একপর্যায়ে জেলহত্যা সম্পর্কে মোশতাককে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হলো। তিনি স্বীকার করলেন, দু-দুবার জেল কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি টেলিফোন করেছিলেন এবং পুরো ব্যাপারটি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার ছিলেন ফরিদপুরের আমিনুর রহমান মিন্টু। ওই মিন্টু এখন জেলহত্যা মামলার সাক্ষী। অথচ খুনিচক্র যখন চার নেতাকে হত্যার পর কারাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক ওই সময় তাদের পুনরায় কারাগারে ডেকে নেন এই মিন্টু।

ওই সময় তিনি তাদের বলেন, চারজনের মধ্যে এখনো একজন জীবিত। ওই সময় অর্ধমৃত অবস্থায় ছিলেন ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী। মিন্টুর ডাকে সাড়া দিয়ে খুনিচক্র পুনরায় তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে কারাগার ত্যাগ করে। রাত আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। কয়েকটি সিদ্ধান্ত মোটামুটি চূড়ান্ত হয়।

খালেদকে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হলো। মোশতাককে বঙ্গভবনের ওপর তলার একটি কক্ষে গৃহবন্দী রাখার সিদ্ধান্ত হলো। আমাকে ও ক্যাপ্টেন দীপককে দায়িত্ব দেওয়া হলো মোশতাককে এসকর্টসহ ওই কক্ষে নিয়ে যাওয়ার। আমি ও ক্যাপ্টেন দীপক তা-ই করলাম। মোশতাককে কক্ষে রেখে ক্যাপ্টেন দীপককে দায়িত্ব দিয়ে আমি ওই স্থান ত্যাগ করার আগে মোশতাককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'এখন আপনার চিন্তা ভাবনা কী?' মোশতাক বিচলিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় আমাকে উত্তর দিলেন, 'ওয়েট অ্যান্ড সি।

' তখন বুঝলাম, এই লোকটি কোনো সহজ ব্যক্তি নন। মনে হচ্ছিল, তার ষড়যন্ত্র তখনো শেষ হয়নি। আমি নিচে নেমে এলাম। সভাকক্ষে তখন মোশতাকের মন্ত্রীদের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হলো। আমরা কয়েকজন অফিসার খালেদকে রেডিও বন্ধ না রাখার পরামর্শ দিলাম।

এও বলা হলো, 'ড্রাফট তৈরি আছে। আপনি জাতির উদ্দেশে কিছু বলতে পারেন। কিংবা আপনার পক্ষ থেকে আমাদের একজন রেডিওতে ঘোষণা পাঠ করতে পারে। ' উত্তরে খালেদ মোশাররফ বললেন, 'ইউ ওয়ান্ট টু বি অ্যানাদার ডালিম। ' তিনি আরো বললেন, 'বিচারপতি সায়েমের ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য।

সায়েম অথবা তার জায়গায় নতুন যিনি দায়িত্বে আসবেন, তিনিই দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। অপেক্ষা করো সব ঠিক হয়ে যাবে। ' ওই রাতে বিচারপতি সায়েম দায়িত্ব নিতে সম্মতি জানালেন। প্রায় সারা রাত সবাই বঙ্গভবনে ছিল। অনেক রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ওই রাতে বঙ্গভবনে খালেদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন।

খালেদ খুব ঠান্ডা মাথায় সবকিছু মোকাবিলা করলেন। ৩ নভেম্বরের এই অভ্যুত্থানের পেছনে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন আছে কি না, নাকি নতুন করে সমর্থন প্রয়োজন, নিজের কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপগুলোতে এ ধরনের আভাস যাতে না থাকে সে ব্যাপারে খালেদ খুব সতর্ক ছিলেন এবং অন্যদেরও সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কারণ তা না হলে সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। খালেদ ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের প্রতি তার কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল।

এ জন্য তিনি আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছিলেন। খালেদ যদি টিকে যেতেন এবং দেশে যদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হতো, সে অবস্থায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট ষড়যন্ত্রকারীরা (যারা পরে পর্যায়ক্রমে দল ছেড়ে গেলেন) কোণঠাসা হয়ে পড়তেন এবং শেখ সাহেবের বিশেষ অনুগত নেতা-কর্মীরা আবার নতুনভাবে সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতেন। তখন এদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো জাসদ, ন্যাপ ও বামপন্থীরা। ৪ নভেম্বর বঙ্গভবনে প্রায় শেষরাতে সিদ্ধান্ত হলো মঞ্জু ও তাহের ঠাকুরকে বঙ্গভবন থেকে সরাসরি জেলে পাঠানো হবে। বাকিদের নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো।

তবে শর্ত ছিল, কেউ বাসা ছেড়ে যেতে পারবে না। এ ব্যাপারে সরকারেরও নজর থাকবে। রাত শেষ হয়ে গেল। নতুন দিনের আলো উঁকি দিল। সবাই ফিরে গেল নিজ নিজ অবস্থানে।



এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.