ঢাকা শহরে অধিকাংশ চলাচল পায়ে হেঁটে। বিশ্বব্যাপী নগরকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্তায় হেঁটে চলাচলকে অগ্রাধিকার প্রধান করা হয়। কারণ হেঁটে চলাচলে সবচেয়ে কম জায়গা লাগে, জ্বালানী লাগে না, দূষণ করে না, খরচ নেই সর্বোপরি স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অথচ আমাদের দেশের হেঁটে চলাচলের সুবিধাকে উপক্ষো করে প্রাধান্য দেওয়া হয় সামান্য কিছু সংখ্যক বিত্তবান মানুষের যানবাহন চলাচলকে। গুটি কয়েক মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করে গিয়ে এক দিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, অপর দিক অধিকাংশ মানুষ স্বীকার হচ্ছে দূর্ভোগের।
এইচডিআরসি এর গবেষনায় দেখা যায় ঢাকা শহরের ৭৬ শতাংশ যাতায়াত ৫ কিমি এর নীচে যার মধ্যে আবার অর্ধেক ২ কিলোমিটারের মধ্যে চলাচল করে। এই দূরত্বে মানুষ অনায়াসে হেঁটে যাতায়াত করা সম্ভব। কিন্তু ঢাকা হাঁটার জন্য বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সকলেরই জানা। ঢাকা শহরে পরিবহণ সঙক্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে “পথচারী প্রধান নীতি” বলা হলেও তা কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পথচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নীতি বিশ্লেষন করে দেখা যায় নামকাওয়াস্তে কিছু বরাদ্দ যদিও রয়েছে।
কিন্ত হাঁটার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে তা কিভাবে এবং কবে ব্যয় হবে তার সঠিক দিক নির্দেশনা নেই।
ইতিপূর্বে শত শত কোটি টাকা খরচের পরও যানজট অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন নতুন প্রকল্প আসছে, সমস্যার সমাধান না হলেও ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠীর ব্যবসা ও তাদের কিছু দোসরদের ব্যবসা হবে তা সুনিশ্চিত। ঢাকা শহরে পথচারী পারাপারের জন্য প্রায় ৫৩ টি ফুটওভার ব্রিজ এবং ৩ টি আন্ডারপাস রয়েছে। ভবিষ্যতে আরো ফুটওভার ব্রিজ এবং আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মূলত পথচারীদের নিরাপত্তার কথা বলে এই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলো পথচারীদের নিরাপত্তা না গাড়ির চলাচল নির্বিঘœ করা হয়েছে। এটি পরিস্কার হয়ে যাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়েব সাইট দেখলে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে পথচারীরা সড়ক পারাপারের সময় যানজট সৃষ্টি করে। তাই তাদের উপর দিয়ে পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
অথচ পথচারী রাস্তায় সবচেয়ে কম জায়গা নেয়।
একটি প্রাইভেট কারের ১৬০ বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন, যাত্রী পরিবহণ করে ২ থেকে ৩ জন। একই পরিমাণ জায়গায় ৫০ জন পথচারী যেতে পারে। সুতরাং যানজটের কারণগুলি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পথচারীদের উপর দোষ চাপিয়ে তাদের উপর অবিচার করাটা অন্যায়।
উন্নত শহরগুলিতে কেই যেন হাঁটা ছেড়ে অন্য কোন বাহনে চড়তে বাধ্য না হয় এর জন্য মানুষ হেঁটে পার না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। তবে হাঁটার ক্ষেত্রে ফুটওভার ব্রিজের ভূমিকা কতটুকু তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
ঢাকা শহরের পথচারীদের জন্য উন্নত ব্যবস্থার নামে ফুটওভার ব্রিজ করা হচ্ছে। ঋণ প্রদানকারীসংস্থাগুলোর নিকট থেকে ঋণ নিয়ে ঢাকা শহরে অনেক ফুটওভার ব্রিজ তৈরি হয়েছে। নীতি নির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলের অভিযোগ রয়েছে, পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে না।
এটা বোঝা উচিৎ ফুটওভার ব্রিজ কতটা পথচারীবান্ধব অবকাঠামো। বিস্ময়ের সঙ্গে পরিলক্ষিত হচ্ছে মানুষ ব্যবহার না করলেও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। এগুলো কেন পথচারীরা ব্যবহার করে না তা একবারও ভেবে দেখা হয় না।
কখনও কখনও পুলিশের মাধ্যমে মানুষকে ফুটওভার ব্রিজে উঠানো হচ্ছে, তারপরও মানুষ সুযোগ পেলেই সমতলে সড়ক পারাপার করে থাকে। কর্তৃপক্ষ থেকে অব্যাহতভাবে অভিযোগ মানুষ ফুটওভার ব্রিজে উঠে না? এটি সকলেরই প্রশ্ন কেন উঠবে? যারা পরিকল্পনা করেন তা কি এগুলো নিয়মিত ব্যবহার করেছেন? পরীক্ষা করে দেখেছেন এগুলো ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা কি? ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার কতটা কষ্টের? আমি হলফ করে বলতে পারি তারা দেখেনি।
তাই তারা এ ধরনের একটি অমানবিক বিষয়কে চাপিয়ে দিতে চান। অপর দিকে যেহেতু ফুটওভার ব্রিজ পারাপার মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই মানুষ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে করে না। একবার কি ভেবে দেখেছেন একজন প্রতিবন্ধি, বৃদ্ধ মানুষ, হৃদরোগী, শিশু, গর্ভবতী মহিলার পক্ষে কি সম্ভব এ পর্বত সমান উচ্চতার ফুটওভার ব্রিজ অতিক্রম করা? একজন অসুস্থ মানুষ কি পারবে এই পর্বত অতিক্রম করতে? হুইল চেয়ারে বাস একজন ব্যক্তি কিভাবে এই পর্বত অতিক্রম করবে? মালামাল নিয়ে একজন সুস্থ মানুষের পক্ষেই কি এটি সহজসাধ্য?
যখন ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পথচারীদের পারাপারের পরিকল্পনা করা হয়, তখন নিশ্চিতই এই বিষয়গুলো চিন্তা করা হয় না। যদি চিন্তা করা হতো, তবে “পথচারী প্রধান নীতি” এর নামে মানুষকে পর্বত অতিক্রমের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতো না। দেখা যায় প্রায়ই সড়কের মাঝখান দিয়ে গ্রিল দেওয়া হয়েছে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে।
যেখানে দুই মিনিটে একজন মানুষ সড়ক পার হতে পারতো এখন সড়কের অনেকখানি ঘুরে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হতে যেমন অধিক পরিশ্রম হচ্ছে আবার সময়ও বেশি লাগছে। যারা ফুটওভার ব্রিজ তৈরির পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাদের জন্য একটি অনুরোধ, ঘরে বা গাড়ীতে বসে পরিকল্পনা না করে, নূন্যতম ১৫ দিন এই রাস্তায় একজন সাধারণ মানুষের মতো হেঁটে পরীক্ষা করে দেখুন, আপনি নিজে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে পারেন কি না? যদি এই পরীক্ষায় পাস করতে পারেন তাহলেই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের সুপারিশ করুন। তবে যদি অধিকাংশ মানুষের পরিকল্পনা না হয়ে আপনারা ধনীদের জন্য প্রাইভেট কারে যাতায়াত নিশ্চিত করতে চান, তবে একথা প্রাসঙ্গিক নয়।
বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ আর্থারাইটিস এ ভোগে। অনেকেই হৃদরোগে ভোগেন।
শারিরীক প্রতিবন্ধীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। যাদের মধ্যে অনেকেই হেঁটে যাতায়াত করেন। তারা কিভাবে এই পর্বত অতিক্রম করবে। আসলে যারা এই ফুটওভার ব্রিজের পরিকল্পনা করেন তারা হয়তো শৌখিন পথচারী। ঘরে বসে ও গাড়ীতে চড়ে পরিকল্পনা করতে করতে তারা সাধারণ মানুষের হাঁটতে কি কষ্ট হয় তা ভুলে গেছেন।
সাধারণ মানুষের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করা করা তাদের মাথাব্যাথা নয়। নিশ্চিত করতে হবে গাড়ীর চলাচল। কারণ হয়তো তাদের চিন্তা হচ্ছে মানুষ হচ্ছে গাড়ীর সেবা দাস।
“পথচারী প্রধান নীতি” অনুসারে পথচারীরা অগ্রাধিকার পাবে। সে ক্ষেত্রে মানুষের হাঁটার সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা আলোকে বলা যায়, সড়কে সমতলে পারাপারের ব্যবস্থা থাকবে, ফুটপাত চওড়া ও সমতল হবে। ফুটপাতে গাছের ছায়া এবং রাতে আলোর ব্যবস্থা থাকবে, পথাচরীদের আকর্ষণ ও নিরাপত্তা দিতে হকারদের নিয়ন্ত্রিতভাবে বসার ব্যবস্থা থাকবে, পথচারীদের বসার জন্য একটু ব্যবস্থা থাকবে ইত্যাদি। যে ব্যবস্থার কথা বলছি তা কোন অলৌকিক কিছু নয়, এগুলো বাস্তব। আমাদের ঢাকা শহরেরও অনেকগুলি জেব্রা ক্রসিং ছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে যেগুলো হারিয়ে গেছে।
পথচারীদের এখন খাচায় বন্দি পশুর মতো চলাচল করতে হয়। যে সকল দেশের উদাহরণ ও উপদেশ নিয়ে আমাদের দেশের পরিকল্পনা আর মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়, যে সকল দেশের পথচারীদের অবস্থা অনেক উন্নত। এশিয়ার অন্যতম গাড়ী উৎপাদনকারী দেশ জাপানেও পথচারীদের হাঁটতে নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়।
হৃদরোগ, ডায়বেটিস, ওবেসিটিসহ বিভিন্ন অসংক্রাম রোগ প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষকে হাঁটতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অথচ আমাদের দেশে মানুষকে হাঁটতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
২ শতাংশ মানুষের মালিকানা প্রাইভেট গাড়ীর, যে মাধ্যমটির পার্কিং এবং যাতায়াতের জন্য ফ্লাইওভার ব্রিজ তৈরি করতে কর্তৃপক্ষ যেরকম চিন্তিত ও সচেতন, তার ন্যুনতম দৃষ্টি ৬০ শতাংশ পথচারীদের জন্য নেই। কারণ হয়তো পথচারীদের জন্য, সুবিধা তৈরি করতে যে ব্যয় হবে তা খুব বেশি নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী। প্রতিনিয়ত ব্যবসায়িক ও বিভিন্ন সুবিধা না থাকায় এ ধরনের উন্নযন ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির পরিকল্পনাকারীদের পক্ষে বর্জন করাই স্বাভাবিক। তবে আরো একটি কথা বলা যায়, হয়তো কর্তৃপক্ষ এবং পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের চলাচলে সুবিধা সৃষ্টি ও দুর্ভোগ লাঘবের জন্য বাস্তবিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়।
সংবিধান অনুসারে অনগ্রসর জনগোষ্টীকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
কিন্তু সরকারী সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের হাঁটার অধিকারকে খর্ব করে সংবিধান লঙ্গন করছে। গুটি কয়েক মানুষের সুবিধার জন্য রাস্তাকে ব্যবহার করা অসাংবিধানিক ও অন্যায়। মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে ব্যহত করে কোন পদক্ষেপ সফল করা সম্ভব নয়। নূন্যতম হাঁটার পর স্বাভাবিক ভাবেই কোন মানুষ এই পর্বত সমান ফুটওভার ব্রিজ অতিক্রম করতে পারে না। মানুষের শরীর ও মন এই পর্বত অতিক্রম করতে সায় দেয় না।
আর এ পর্বত অতিক্রম করার পর অন্য কোন কাজ করা কঠিন। বৃদ্ধ, শিশু, গর্ভবর্তী মহিলা, অর্থোপেডিক্স রোগী, হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী, মলামাল বহনকারী এব হৃদরোগীর পক্ষে এই পর্বত সমান ফুটওভার ব্রিজগুলি অতিক্রম শুধু কঠিনই নয় ঝুকিপূর্নও।
মানুষকে হেঁটে চলাচলে উৎসাহী করার জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরী। তাহলে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং যানজট হ্রাস করা সম্ভব। তাই দাতা সংস্থা নামধারী তথা ঋণপ্রদানকারীদের পরামর্শে এধরনের জনস্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ড বন্ধ করে প্রকৃতার্থে হেঁটে চলাচলের উন্নয়নে কাজ করা প্রয়োজন।
অন্যথায় পরিবহণ খাতের জন্য গৃহিত ঋণের অর্থ দিয়ে বিগত দিনের মতোই যানজট বৃদ্ধিকারী প্রকল্প এগিয়ে যাবে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।