বেশ কয়েকদিন পর আজ ঝকঝকে রোদের এক সকাল। ঘুম ভাঙার পর মনটা এত ভাল লাগছিল। রাইয়ান স্কুল ছুটির দিনেও সকালে উঠে পড়ে। অথচ রাশীককে না ডাকলে উঠবেনা। রাইয়ান ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরে খেলতে থাকে বা টিভি দেখে।
ইদানিং বেইবলেড(beyblade) খেলার নেশা হয়েছে। ছোটবেলায় আমরা যে লাট্টু খেলতাম। সেটাই। প্রযুক্তিগত কারনে কত কিছু লাগে যে লাগে এটা খেলতে। এক একটার এক এক রকম নাম।
যাইহোক সেই বেইবলেডের শব্দে বেশিক্ষন ঘুমানো সম্ভব হয়না। ও এসে তাড়া দেয়া শুরু করার আগেই নাস্তা বানাতে যাই। রাইয়ানের প্রিয় রুটি,আলুভাজি আর ডিমভাজি। রাইয়ানের পরপরই ওদের বাবা উঠে পড়ে। একটু পর দেখি রাশীক ও নামছে।
গায়ে হাল্কা কমফোর্টার জড়ানো। আব্বার কথা মনে পড়ে গেলো। একটু শীত পড়লেই আব্বা গায়ে কাঁথা জড়িয়ে সারাবাড়ি ঘুরতেন। আব্বার স্ম্বতি দিয়ে শুরু হলো একটাদিন। একটা সূর্যময় ঝলমলে দিন।
চা খেতে খেতে ওকে বললাম আজ পাতা দেখতে গেলে বেশ হয়।
রাইয়ানকে নিয়ে লাইব্রেরীতে গেলাম বই আনতে। আজ তাকে নতুন একটা বেইবলেড কিনে দিতে হবে। কি যেনো একটা নাম বলছে কয়েকদিন হলো। (বেবলেড এর ও আবার এক একটার এক এক নাম!) লাইব্রেরীতে ঢোকার আগে এক ভাই এর সাথে দেখা।
আগে আমরা একই বিল্ডিং এ থাকতাম। ভাই আমার কবিতা খুব পছন্দ করেন ,আমাকে আমার কবিতার লাইন শুনিয়ে বললেন খুব ভালো লাগে কবিতাটা। আমার প্রথম কবিতার বইএর একটা কবিতা,”এখন জীবন” থেকে বলেন উনি।
“যারা শিকড় ছেড়ে চলে যায়
তাদের জায়গা পূরন হয়ে যায়।
........................
তাই আকাশ দেখে দিন কেটে যায় আমার।
হৃদয়ের কোথায় কে জানে একটা এক পাওয়ালা শালিখ এর মত
দুঃখ বসে থাকে।
উষ্ণতার অপেক্ষায় বসে থাকি।
মায়ের বুকের কাছে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।
বরফ ঝড়া পথে হাটবো বলে পথে নামি।
চোখের পাতায় বরফের কুচি এসে পড়ে,
চোখ নীচু করে পথ হাটি।
নম্রতায় মেখে নতজানু হই প্রতিপালকের প্রতি। "
পরিচিত অনেককেই আমার এই কবিতার কথা বলেন উনি। অবাক হই । ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসি। ঋণী হই এভাবেই মানুষের কাছে।
রাইয়ানের পছন্দের কিছু বই নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি। জেলার্স থেকে ওর পছন্দের বেইবলেড কিনে বাসায় ফিরতেই ওদের বাবা বলে চলো পাতা দেখতে যাই............আমি তো অবাক। ঠিক মনে রেখেছে। রাশীক এর হোমওয়ার্ক আছে আর রাইয়ান এখোন নতুন বেইবলেড নিয়ে খেলবে। ওরা যাবেনা।
কি আর করা!
Gatineau পার্কে গেলে পাহাড়জুড়ে পাতাদের বাহারি রং দেখা যায় এখন। দুপুর শেষ না হতেই বেড়িয়ে পড়ি। সন্ধ্যা খুব তাড়াতাড়ি নেমে পড়ে পাহাড়ি জায়গায়। অটোয়ার পার্লামেন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম যখন ,এত ভালো লাগছিলো। কেউ বেড়াতে এলে এখানে আসা হয়।
এ ছাড়া শুধু সামনে দিয়ে আসা যাওয়াই হয়।
গ্যাতিনো শহরএ ঢুকে প্রথম এ Laurier এ বায়ে যেতে হয় অনেকদুর। একসময় Gatineau পার্কের সাইন দেখায়। ডানে চলতে থাকে গাড়ি। পাতাগুলো দেখে সত্যি খুব ভালো লাগে।
ঝরে যাবার আগে কি অদ্ভুত রং এ সাজে পাতারা। চোখ জুড়িয়ে যায়। কিছু গাছে পাতা ঝরে গেছে গত ক’দিনের বৃষ্টিতে। ভাললাগা কষ্টলাগা বোধগুলো সবসময় পাশাপাশি থাকে। কখন যে কোনটা এসে পড়ে।
পিঙ্কলেক এ যখন পৌছাই গাড়ি পার্কিং পাবো কিনা ভয় হয়। সারাপথে এত গাড়ি। ও খেপাতে থাকে। বলে ”তোমার মতন পাতাকুড়ানি মনেহয় অনেকই আছে”। কাঠের সিঁড়িটা দিয়ে নামছিলাম যখন অনেক মানুষ দেখলাম।
সামারেও এসেছিলাম কিন্তু এত মানুষ দেখিনি। শান্ত লেকটায় ঢেউ বইছে। বেশ ঠান্ডা লাগছিলপ লেকের ধারে গিয়ে। কয়েকটা ছবি তুলতেই দেখি ব্যাটারি সিগন্যাল দিচ্ছে। ভাগ্যিস আসার আগে অন্য একটা ব্যাটারি এনেছি।
কিন্তু সেটা গাড়িতে রেখে এসেছি। ও আনতে চাইলো। বললাম, ভিডিও ক্যামেরায় স্টীল ছবি তোলা যায়। বেশ কিছু ছবি তুলে আবার ফিরে আসি। যদিও সেই ছবিগুলো ভালো আসেনি।
এবার গন্তব্য Meech Lake.
গাড়ি চলছে। সামনের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হচ্ছি। প্রতিবছর এই পাতাদের রং বদলানো দেখি। তবু মনেহয় এত সুন্দর রং এর খেলা আগে মনে হয় দেখিনি। কেমন অপার্থিব এক অনুভূতি হয় ।
মনে ভাবি প্রক্বতির কাছে কত কিছু শেখার যে আছে। পাশ দিয়ে অনেক সাইকেল চালক কে যেতে দেখি। পথের পাশে বেশ কয়েকবার গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলি। রোদ পড়ে গাছের বর্ণালী পাতাগুলো যেনো হাসছিলো।
একপাশে ছোট্ট একটা জলাশয়ের মতন।
দেশে হলে হয়তো ব্যাঙ দেখা যেতো। এখানে কোন কিছু চোখে পড়লো না।
একটা গাছে দেখি কিছু পাতা হলুদ ,কিছু পাতা লাল। এমনকি কিছু পাতা সবুজ হয়ে আছে। এই একটা গাছের পাতাগুলো যেনো একটা মানুষের পুরো জীবনটাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
মানুষ আর প্রক্বতি এভাবেই সম্পর্কিত।
একটা পথ বনের দিকে চলে গেছে। ও বললো যেতে। একটু দূরে যেয়ে মনে হলো ভিতরটা আরো অন্ধকার ,তাই আর গেলাম না। রাইয়ান আসলে এই পাতাগুলোর উপর লুটোপুটি খেতো।
মনে ভাবছিলাম জারাহ টাকে এখানে এনে ছেড়ে দিলে,ফ্রক পড়ে টুকটুক করে হেঁটে যাবে। একদিন সবাই মিলে পাতায় লুটোপুটি। মন্দ না ভাবনাটা............ ভালো যে কোন কিছুতেই প্রিয় মুখগুলো মনে পড়ে যায়।
ওখান থেকে একটু সামনে এগোতেই দেখি হলুদ পাতাদের সোনালি রাজ্য। রোদ পড়ে কি দারুন যে লাগছিলো।
চোখ ভরে দেখছিলাম সব। ছবি তোলা হচ্ছিল মাঝে মাঝে। বিশ্বস্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলাম, দেখবার জন্য চোখ দুটো দিয়েছেন বলে। ও কত কথা বলছিলো। “আগামি সপ্তাহে দিন ভাল থাকলে চলো মন্তত্রম্বল্যেতে যাই পাতা দেখতে"”।
আগামি সপ্তাহে থ্যাংকস গিভিং হলিডের জন্য লং উইকেন্ড। ছেলেদের স্কুল ছুটি থাকবে। সবাই মিলে বেশ যাওয়া যাবে। প্রিয় শহরটার কথা ভাবলেই দারুণ লাগে। একটা শহরের যে কত মায়া থাকতে পারে,ওখানে, কুইবেক সিটিতে আর নায়েগ্রা অন দ্য লেইক এ না গেলে জানা হতোনা।
বারবার আমি এসব জায়গায় ঘুরতে যেতে পারি।
মীচ লেইক এ গিয়েছিলাম বেশ কয়েকবছর আগে, প্রতিবারই পিংক লেইক দেখে ঘুরে চলে যাই। রাশীক এর স্কুলের একটা প্রজেক্টের জন্য পাতা সংগ্রহ করতে এসেছিলাম লিপি আর পল্লব ভাই এর সাথে, লিপিরা এখন আর অটোয়াতে থাকেনা, অষ্ট্রেলিয়াতে চলে গেছে, ওদের সাথে নানান জায়গায় ঘুরাঘুরির অনেক স্ম্বতি রয়ে গেছে। আশাকরি ওরা ভাল আছে। আমার ভাবনার অবসরে ও আবার গাড়ি থামালো পথে।
দূরে তাকিয়ে মনে হলো পাহাড়ে আগুন জ্বলছে। ক্যামেরার ক্লিক চললো। গাড়িতে গান বাজছিলো জোরে। মনে হচ্ছিল বিশ্ব সংসারে আর কিছু নেই। বিশাল পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সময়টাকে ধরে রাখতে মন চাইছিলো খুব।
আমরা দুজন দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষন। দুরে পাহাড়ের গায়ে দারুণ আগুন রং এর ছটা। “সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে“....গুন গুন করলাম।
একসময় আরো কিছু গাড়ি এসে থামতে শুরু করলো। আমরা আবার চলতে শুরু করলাম।
মীচ লেকে পৌছুবার আগে হাতের বায়ে এত সুন্দর সব বাড়ি। রাস্তা খুব সরু।
টু ওয়ে রাস্তা । গাড়ি থামানোর কোন জায়গা নেই। হাতের ডানে মীচ লেক।
গাড়ি পার্কিং এর জায়গায় পৌছুলাম যখন সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে। পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা আসলেই তাড়াতাড়ি নামে। আমি আর ও দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষন, আবার ও মুগ্ধ বিস্ময়ে।
"মহাবিশ্বের মহাকাশে মহাকাল মাঝে। "
আমরা যখন ফিরবো বলে গাড়ির কাছে চলে আসছি।
একটা যুগলকে দেখলাম লেকের দিকে এগিয়ে গেলো। অনেকদুর থেকে ওদের ছবি নিলাম। সময়টার কাছে থেমে থাকলো অজানা দুটি মানুষ। প্রার্থনা করি ওদের মংগল হোক। যাবার সময় হাত নেড়ে চলে গেলো ওরা।
আমাদের ও ফেরার সময় হয়ে এলো......পিছনে তাকাইনি আর। পিছনে তাকালেই তো সদ্য হয়ে যাওয়া সুন্দর একটা অতীত এর জন্য মন কেমন করবে। প্রতিদিনই তো আমরা জীবন থেকে হারিয়ে ফেলছি সুন্দর সময়গুলো। গ্যাতিনো ছেড়ে আসছিলাম যখন , গজল বাজছিল জগজিৎ সিং এর.........”এক পেয়ার কা নাগমা হ্যায়”। আর তখুনি বন্ধু মিনুর ফোন এলো।
ওর সাথে ভাললাগাগুলো শেয়ার করতে করতে বাসায় এলাম, পাশের মানুষটাকে নতুন করে থ্যাংকস বলতে হবে কি! ও তো সারাজীবন আমাকে শুধু অবাকই করছে। যার কাছে আমার খুব বেশি কিছু চাওয়া নেই কখনো। শুধু তার হাট দু’টো ধরে পথ হাঁটার প্রার্থনা ছাড়া! আমার কবিতা যারা পড়তে ভালবাসে। তারা সবাই জানে আমি কবিতা লিখি। আমি নিজে জানিনা সেগুলো কতটুকু কবিতা! আমি কবিতায় জীবন লিখতে চাই! যতদিন বাঁচি ততদিন!
অক্টোবর ৩ এর বিকাল/২০১০
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।