. আমার নাইবা হলো পারে যাওয়া...
এক নাগাড়ে সাতদিন ধরে বৃষ্টি, কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে, পৃথিবী ধংস হয়ে যাবে। প্রবল বর্ষনের পর প্রভাতে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে আমি নাকি এ পৃথিবীতে এসেছিলাম। মেয়ে হয়েছে বলে কেউ জানান দেয়নি। সবাই আমার নাম ধরেই বলেছিলো “...” হয়েছে। আব্বার যখন ১০ বছর বয়স, তখন আমার দাদী একটা উপন্যাস পড়েছিলেন।
সে উপন্যাসে তিন-বোনের মাঝে সাহসী, প্রতিবাদী বড় বোনকে দাদীর এতোই পছন্দ হয়েছিলো যে সাথে সাথে দেয়াল আলমারীর পাল্লার ভেতরের দিকে চক দিয়ে নামটা লিখে রেখেছিলেন। আর সবাইকে বলেছিলেন, উনার ছেলে বড় হবে, বিয়ে করবে, তার মেয়ে হলে উনি এই “নামটি’ রাখবেন। তাই উত্তরাধিকার সুত্রে নামটি আমার গলায় ঝুলেছিলো।
জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব আমি করিনা। জানি, সেটা করা বোকামি।
তবুও মাঝে মাঝে অনেক অপ্রাপ্তি বুকের মাঝে চিনচিন করে ব্যাথা দেয়। তবে তা সাময়িক। ছোটবেলা থেকে সামান্য জিনিসের মাঝে মগ্ন থাকার অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো। তা সেটা আকাশ, ফুল, লতা-পাতা, পাখিই হোকনা কেনো। কত অলস দুপুরে আকাশে মেঘের মাঝে কত চেহারা, কত রুপ সৃষ্টি করেছি।
কোন গাছ-পালা দেখে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিয়েছি। ছোট্ট নীল ঘাস-ফুলের সৌন্দর্যে বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়েছি। একটি বই হাতে করে আমি কাটিয়ে দিতে পারি এ জীবন। কখনোই নিজেকে একেলা মনে হয়না। বইএর প্রতি ভালবাসা গড়ে উঠেছে সেই শিশুকাল থেকেই।
স্বপ্ন দেখতাম, আমার একটা লাইব্রেরী হবে। বিশাল ঘর জুড়ে শুধু বই-আর বই। বই অনেক হয়েছে, তবে সে ঘরের স্বপ্ন পুরন হয়নি। শিলং পাহাড়ে নিঃসংগ পাইনের বনে একা একা ঘুরে ঝরনার গান শোনার সাধ ছিলো। শিলং পাহাড়ে গিয়েছি, কিন্তু সেই একেলা গান শোনা হয়নি।
মনে মনে একতারা হাতে অনেক দু-র দুরান্তে চলে গিয়েছি। অচেনা অজানা দেশে। ক্লান্ত শিথিল পা-দুখানি বিশ্রাম নিয়েছে ঝাকড়া কোন অশ্বথের ছায়ায়। খড়-কুটো জ্বেলে ফুটিয়েছি মাধুকরি অন্ন। সেটাও আমার কল্প-রাজ্যে।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গলের মত বাতি হাতে অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে চেয়েছি। দাড়িয়েছি অনেকের পাশে। বাড়িয়ে দিয়েছি আমার দুর্বল হাত। তবে সে বাতির আলোয় অন্ধকারকে জয় করতে পারিনি। হতে পারিনি সেবিকা।
হতে পারিনি অনেক কিছুই, চেয়েছি যা। সাংবাদিক হতে চেয়েছিলাম, হতে চেয়েছিলাম একজন আইনজীবি। সমাজের বঞ্চিত, নিপিড়িত মানুষের পাশে দাড়াতে চেয়েছিলাম। হতে পারিনি। কেনো হতে পারিনি তা ব্যাখ্যা করা এখন অপ্রয়োজন।
ভালবাসার অপর পিঠেই নাকি ঘৃনার বাস। কিন্তু আমার মনে ঘৃনার কোন অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাইনি। একবুক ভালবাসা। সাগরের চেয়েও বিশাল সে ভালবাসার ঢেউএ ঘৃনার সামান্য ছিটেফোটাও টিকে থাকতে পারেনা। আঘাত পেয়েছি অনেক।
কিন্তু স্বজ্ঞানে কাউকে আঘাত দিয়েছি বলে স্মরন করতে পারিনে। যারা আমায় আঘাত করেছে তাদের প্রতি আমার বিন্দু মাত্র ঘৃনা নেই, আছে করুনা। আহা! তারা যদি ভালবাসার মহিমা বুঝতে পারতো, তবে কাউকে আঘাত করতো না। ভালবাসার আলো দিয়ে এ পৃথিবী আলোকিত করে তুলতো।
“এ জীবনে যতটুকু চেয়েছি মন বলে তারও বেশী পেয়েছি” গানের এই কথাগুলো জীবনের ধ্রুব সত্য বলেই মনে করি।
অর্থ প্রাচুর্য্য কোনদিনও বড় করে দেখিনি বা ভাবিনি। জীবনে চলার পথে যখন দেখি অর্থের কাছে মানবতা, সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে, তখনও অর্থ প্রাচুর্য্যকে বড় ভাবতে পারছিনা। এ আমার ভাবনার সীমাবদ্ধতা। এভাবেই ভাবতে শিখেছিলাম, তাই আজও সে ভাবনার উর্ধে উঠতে পারছিনা। যখন দেখি আমার ভালবাসা মিশ্রিত সরলতাকে আড় চোখে দেখা হচ্ছে, বা তার বাঁকা অর্থ ভেদ করার চেষ্টায় অনেকেই ব্যাস্ত হয়ে পড়ছে, তখনও আমার বিন্দুমাত্র হেলদোল হয়না।
আমার সরলতাকে বোকামি আখ্যায় আখ্যায়িত করলেও আমার কিছু যায় আসেনা। হয়তো আমি সত্যি বোকা বলেই কিছু যায় আসেনা।
শৈশবের বীজ আজ মহীরুহ হয়ে এ কথাই বলে যাচ্ছে – যগতের সকল প্রানী সুখী হোক, জগতের সবার মঙ্গল হোক, ভালবাসার আলোকে আলোকিত হক সবার অন্তর।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।