কবিতা ও যোগাযোগ
রবিবারের গল্প
তপন বাগচী
এক গ্রামে বাস করে এক গরিব কাঠুরিয়া। প্রতিদিন সে বনে যায় কাঠ কাটতে এবং ঘাস কাটতে। একদিন দেখা হয় এক বনবিবির সঙ্গে। বনবিবি বলে, ‘এই যে কাঠুরিয়া, তুমি তো রোজ বনে আস, আর কাঠ কাট, আর ঘাস কাট- তাতে কি তোমার খুব কষ্ট হয় না?’
কাঠুরিয়া বলে, ‘কষ্ট তো হয়! কিন্তু কী আর করি! ঘরে বউ আর দুটি ছোট মেয়ে আছে। তাদের জন্য খাবার যোগাতে হয়।
তাই কাজ না করে আর উপায় কী?’
‘আমি তোমার এই কষ্ট কমানোর পথ বলে দিতে পারি। ’
‘কীভাবে? আমাকে খুলে বলুন। ’
‘তুমি কি সূর্যদেবের ব্রত পালন করো?’
‘সারা দিন যায় কাঠ কাটতে আর ঘাস কাটতে। আর রাত যায় সেই কাঠ বেচে ঘরে ফিরে ঘুমাতে। কোনও ব্রত পালনের সময়ই তো পাই না।
তাছাড়া সূর্যদেবের ব্রত পালনের নিয়ম-কানুনও আমার জানা নেই। ’
‘আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব। ’
‘সূর্যদেবের ব্রত পালন করলে কী হবে?’
‘তুমি যদি আমাদের কথামতো সূর্যদেবের ব্রত পালন কর, আর তাতে যদি তিনি সন্তুষ্ট হন, তাহলে তোমার কল্যাণ হবে। তোমার অভাব দূর হবে। কিন্তু তুমি কি তা পারবে?’
‘কেন নয়? তোমরা শিখিয়ে দিলেই আমি ঠিকমতো তা করতে পারব।
’
‘তাহলে শোন, আগামী বৈশাখ মাসের যে কোনো ভালো দিন দেখে তুমি সূর্যদেবের ব্রত করবে। মাটির ওপর রক্তচন্দন দিয়ে সূর্যের ছবি এঁকে তাতে ফুল ও ফল দিয়ে প্রার্থনা জানাবে। এভাবে সাত দিন পর একই দিনে আবার একইভাবে সূর্যের ব্রত পালন করবে। আগামী ছয় মাস ধরে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এই ব্রত পালন করলে সূর্যদেব সন্তুষ্ট হয়ে তোমার ইচ্ছা পূরণ করবেন। ’
বাড়ি গিয়ে কাঠুরিয়া বৈশাখ মাসের শুভদিনের জন্য অপেক্ষা করে।
বনবিবির কথামতো একদিন সূর্যের ব্রতের আয়োজন করে। ব্রতের সময় সূর্যদেবের কাছে জোড় হাত করে মনে মনে প্রার্থনা করে,
‘আমার ঘরের দুইটি মেয়ে
যাবে পরের ঘরে
থাকে যেন রানীর মতোন
সূর্যদেবের বরে। ’
এভাবে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কাঠুরিয়া সূর্যব্রতের আয়োজন করে আর ওই বর চায়। যখন ছয় মাস পূর্ণ হয়, তখন সূর্যদেব কাঠুরিয়াকে দেখা দেয়। বলে, ‘তোমার ব্রতে আমি খুশি হয়েছি।
তুমি যে বর চাইবে, সেই বরই আমি তোমাকে দিতে চাই। ’ কাঠুরিয়া তখন জানায় তার প্রাণের প্রার্থনা-
‘আমার ঘরের দুইটি মেয়ে
যাবে পরের ঘরে
থাকে যেন রানীর মতোন
সূর্যদেবের বরে। ’
সূর্যদেব বলে, ‘তথাস্তু। তবে তোমার দুই মেয়েকে রাজরানী করতে পারব না। এক মেয়ে যাবে রাজার ঘরে আর এক মেয়ে যাবে মন্ত্রীর ঘরে।
তবে একটা কথা আছে, বিয়ের বার বছর পার হওয়ার আগে তুমি তোমার মেয়েদের কাছে এই বরের কথা জানাবে না। ’
কাঠুরিয়া তাই মেনে নেয়। সূর্যব্রত পালন করার পুণ্য হিসেবে তার ঘরে অনেক ধনসম্পদ হয়। তার আর বনে যেতে হয় না, কষ্ট করে কাঠ কাটতে হয় না। এদিকে, মেয়ে দুটিও আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে।
কাঠুরিয়া তাঁর সূর্যব্রত চালিয়ে যান। সপ্তাহের যে দিনটিতে তিনি এই ব্রত করতেন, সূর্যের নাম অনুসারে সেই দিনের নাম রাখেন রবিবার। রবি অর্থ সূর্য। আর সূর্যকে ইংরেজিতে বলা হয় সান। তাই রবিবারকে ইংরেজিতে বলা হয় সানডে।
কাঠুরিয়া প্রতি রবিবার রবিদেবের ব্রত পালন করে।
এক রবিবার সকালে এক রানী এলো কাঠুরিয়ার বাড়িতে। কাঠুরিয়া তাকে খুব খাতির যতœ করে। ফিরে যাওয়ার সময় রানী বলে,
‘ভাই কাঠুরিয়া, তোমার মেয়ে দুটি ভারি সুন্দর! আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ওদেরকে আমি চাই।
’
‘ওদের নিয়ে তুমি কী করবে?’
‘আমি ওদের বড়টিকে আমার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেব, আর ছোটটিকে মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়। কদিন বাদে আমার ছেলে রাজা হবে, আর মন্ত্রীর ছেলেও মন্ত্রী হবে। ’
কাঠুরিয়া বুঝতে পারে যে, এটি সেই সূর্যদেবের বর। তাই মহাধুমধামের মধ্য দিয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দেন। দুই মেয়ে চলে যায় স্বামীর বাড়ি।
বার বছর পরে এক রবিবার তার বড় জামাই রাজা হয় আর ছোট জামাই মন্ত্রী হয়। এক রবিবার কাঠুরিয়া দুই মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যায়। সূর্যদেবের ব্রতের মাহাত্ম্যে যে তাদের এই ভালো বিয়ে, এই সুন্দর জীবন, সেই কথা জানাতে চায়। সূর্যদেব বলেছিল এ কথা তাদের জানাতে। প্রথম যায়, বড় মেয়ের বাড়িতে।
রাজবাড়িতে রাজার শ্বশুর কাঠুরিয়ার কী আদর! মেয়েও অনেকদিন পরে বাবাকে দেখে সে কী খুশি! মেয়ে বাবাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। যতœ করে সোনার ঘাটে বসতে দেয়। আদর ঘরে রূপার থালায় খেতে দেয়। তারপর তিনটি ছেলেকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাঠুরিয়া নাতিদের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে, গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে।
তারপর মেয়েকে বলে, ‘মাগো, তুমি সুখে আছ দেখে আমি খুব খুশি। এত খাবার তো আমি খেতে পারব না। আর আমি খাওয়ার আগে একটা কথা আছে?
‘কী কথা, বাবা?’
‘তোমাকে একটা গল্প শোনাতে চাই। ’
‘গল্প পরেও শোনা যাবে। আগে খেয়ে নাও, বাবা।
’
‘খাবার-দাবার পরে হবে
নাই ভাবনা কোনো
আগে আমার কথা আছে
মন দিয়ে তাই শোনো। ’
কাঠুরিয়ার মেয়ে এখন রাজরানী। রানীর কি আর বুড়ো বাবার গল্প শোনার সময় আছে? ওদিকে, রাজা যাবে শিকার করতে। তার জন্য খাবার তৈরি করতে হবে। আরো কত কাজ! তাই সে বাবাকে বলে, ‘বাবা আমি খুব ব্যস্ত।
তোমার কথা আরেকদিন শুনব। এখন তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। ’
কাঠুরিয়া এতে বিরক্ত হয়। মনে খুব কষ্ট পায়। বার বছর পরে মেয়ের সঙ্গে দেখা।
বাবার কাছ থেকে একটা গল্প শোনার সময় তার নেই। কাঠুরিয়া না খেয়েই রাজবাড়ি থেকে চলে আসে।
কাঠুরিয়া এরপর যায় ছোটমেয়ের বাড়ি। সেখানেও সেই আদর-আপ্যায়ন। ছোটমেয়ের তিনটি মেয়ে।
তারা দাদুকে পেয়ে খুশি হয়। ছোটমেয়ে বাবার জন্য খাবার সাজিয়ে আনলে কাঠুরিয়া বলে,
‘খাবার-দাবার পরে হবে
নাই ভাবনা কোনো
আগে আমার কথা আছে
মন দিয়ে তাই শোনো। ’
ছোট মেয়ে বলে, ‘ঠিক আছে বাবা। আগে তোমার কথা শুনব। যত ইচ্ছা, যতক্ষণ ইচ্ছা তুমি বল।
আমি কতদিন তোমার মুখের কথা শুনিনি। আজ তোমার মুখে তোমার গল্প শুনব। তারপর অন্য কিছু হবে। ’
নিজের মেয়েদের কাছে বসিয়ে কাঠুরিয়ার ছোটমেয়ে বাবার মুখে গল্প শুনতে বসে। কাঠুরিয়া খুব খুশি হয়।
সে তখন ছোটমেয়েকে সূর্যদেবের কাছ থেকে বর পাওয়ার গল্প বলে। কীভাবে বনবিবি এসে তাকে ব্রত পালনের কথা বলে, সেই ঘটনা গুছিয়ে বলে। আর কীভাবে তার ব্রতে সন্তুষ্ট হয়ে সূর্যদেব তাকে বর দেয়- এ কথা সে মনখুলে ছোটমেয়েকে বলে। ছোটমেয়ে এই গল্প শুনে খুশি হয়। তখন সে বাবাকে নিজ হাতে খাবার এনে সামনে দেয়।
বাবা ছোটমেয়ের বাড়িতে খেয়েদেয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ফেরার আগে ছোটমেয়ের তিনটি মেয়েকে আদর করে।
বাড়িতে আসার পরে কাঠুরিয়ার বউ জানতে চায় দুই মেয়ে কেমন আছে সেই খবর। কাঠুরিয়া সকল বৃত্তান্ত খুলে বলে। বড়মেয়ে যে তার কথা শোনার সময় পায়নি, সে কথাও বলে।
কাঠুরিয়া যে বড়মেয়ের আচরণে কষ্ট পেয়েছে, তা তার বউ বুঝতে পারে। বউ কাঠুরিয়াকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু কাঠুরিয়া বলে, ‘সূর্যদেবের কথা আমি রাখতে পারিনি। তিনি যদি রুষ্ট হন, তাহলে তো বড় মেয়ের অমঙ্গল হবে। ’
কিছুদিন পরে শুনতে পায়, রাজা এক প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে বন্দি হয়েছে।
আর ফিরে আসে নি। রানীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। অবশেষে রানী তিন ছেলের হাত ধরে পথে নামে। তারা খেতে পায় না, পরতে পায় না। রানীর বাবা না খেয়ে রাগ করে চলে গিয়েছিল।
তাই বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে রানী লজ্জা পায়। একসময় ভাবে, ছোটবোনের কাছে তো কোনো অপরাধ করেনি। তার কাছে গেলে নিশ্চয়ই খালি হাতে ফেরাবে না। হাজার হোক, এক মায়ের পেটের বোন তো! তবু নিজে যেতে কেমন যেন লজ্জা পায়। তাই বড়ছেলেকে পাঠায় মন্ত্রীবউ অর্থাৎ রানীর ছোটবোনের কাছে সাহায্য চাইতে।
বড়ছেলে এক রবিবার মন্ত্রীর বাড়ি যায়। পরনে ছেঁড়া জামা। চেহারাও মলিন। এই সাজে বাড়ির ভেতরে যেতে লজ্জা পায়। বাড়ির কাছে গিয়ে দেখে শানবাঁধানে দিঘির পাড়ে বসে কয়েকজন দাসী গল্প করছে।
তাদের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেয়Ñ
‘তোমরা হলে মন্ত্রীবউয়ের
চাকরানি আর দাসী
আমি যে তার বোনের ছেলে
তিনি আমার মাসি।
আমার মায়ের খবর নিয়ে
যাব মাসির কাছে-
একটুখানি দেখা দিতে
সময় কি তার আছে?’
দাসীরা বলে, ‘কী যে বল, আমাদের গিন্নিমা খুবই ভালো। আমরা তাঁর কাছে গিয়ে তোমার কথা বলছি। তুমি এখানে দাঁড়াও। তিনি যদি ডাকেন, তবে তোমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাব।
’
‘ঠিক আছে? আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। তোমরা গিয়ে আমার কথা বল। আমি তার বড়বোনের বড় ছেলে। তার কাছে কিছু সাহায্য চাইতে এসেছি। আমার মা আমাকে পাঠিয়েছে।
’
দাসীরা ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পরে একজন এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল। কিন্তু ছেঁড়া জামা-কাপড় পরে বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতে লজ্জা পায় বলে দাসী তাকে পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। মন্ত্রীবউ তার বোনের ছেলেকে কাছে পেয়ে কী যে খুশি! কাছে বসিয়ে খাওয়ায়। নতুন জামা-কাপড় পরায়।
মেয়েদের কাছে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর তার দিদির জন্য একটি কুমড়োর ভেতরে কিছু সোনার মোহর ভরে ছেলেটির হাতে দেয়। বোনের ছেলেকে বিদায় দেয়ার সময় বলে-
‘কুমড়ো ভরে মোহর দিলাম
যত্তœ করে রেখো
পথের বিপদ আসতে পারে
সাবধানে তাই থেকো
বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতে
কুমড়ো দিও তুলে
এর যে অনেক মূল্য আছে
তাই যেও না ভুলে। ’
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। মাসির হাত থেকে মোহর-ভরা কুমড়ো নিয়ে মায়ের দিকে রওয়ানা হয়।
কিন্তু সূর্যদেব বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই মালির ছদ্মবেশে পথের মাঝে এসে ছেলেটির সাথে পরিচিত হয়। মালিও এক বাগান থেকে একটা কুমড়ো নিয়ে আসে। তারপর একসময় ছেলেটির হাত থেকে কুমড়োটি নিয়ে নিজের আনা কুমড়োটি তার হাতে ফেরত দেয়। ছেলেটি কুমড়ো নিয়ে মায়ের কাছে ফেরে।
মা জানতে চায়Ñ
‘বাবা, তোর মাাসির সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ হয়েছে। ’
‘কী বলল? আমাদের জন্য কিছু কি পাঠিয়েছে?’
ছেলেটি মাসির আদর-আপ্যায়নের কথা জানায়। মাসির দেয়া নতুন জামা-কাপড় দেখায়। তারপর মায়ের হাতে কুমড়োটি দিয়ে বলে,
‘এর ভেতরে সোনার মোহর আছে। আমাদের আর অভাব থাকবে না, মা।
’
‘কই দেখি দেখি?’
মা তখন বটি এনে কুমড়োটি কেটে দুই ভাগ করে। কিন্তু ভেতরে কিছুই নেই। দুজনেই বিস্ময়ে হতবাক! ছেলেটির মনে পড়ে পথে এক মালির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার হাতে কুমড়ো ছিল। সেই মালিই হয়তো কুমড়োটি বদলে নিয়েছে।
ছেলেটি বুক চাপড়ে হায় হায় করতে থাকে। মা তাকে সান্ত্বনা দেয়। একটু শান্ত হওয়ার পরে ছেলেটি বলেÑ
‘ভাগ্য আমায় দিয়েছিল
সোনার মোহর দুহাত ভরে
কিন্তু তোমার কর্মদোষে
তা নিল কেউ চুরি করে। ’
পরের রবিবার মেঝছেলে যায় তার মাসির কাছে। তার পরনেও ছেঁড়া কাপড়, চেহারা মলিন।
বাড়িরে ভেতরে যেতে লজ্জা পায়। তখন কয়েকজন দাসিকে কাছ দিয়ে যেতে দেখে সে বলেÑ
‘মন্ত্রীবউয়ের বোনপো আমি
ছিলাম রাজার ছেলে
মাসি অনেক খুশি হবে
আমায় কাছে পেলে!
ভরদুপুরে এলাম হেঁটে
অনেক দূরে বাড়ি
আজ কি আমি মাসির সাথে
দেখা করতে পারি?’
একজন দাসি তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ভেতরে যায়। মন্ত্রীবউয়ের অনুমতি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে। মেঝছেলেও পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। মন্ত্রীবউ অর্থাৎ তার মাসি এসে তাকে আদর করে বসায়।
নতুন জামা-কাপড় পরায়। ভাল-মন্দ খাওয়ায়। তিন মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার মুখ দেখেই বুঝে ফেলে যে বড়বোন তাঁকে সাহায্যের জন্যই পাঠিয়েছে। তাই বিদায় দেওয়ার সময় হাতে একটি লাঠি দিয়ে বলেÑ
‘যতœ করে রেখো তুমি
বাঁশের চিকন লাঠি
এই লাঠিটাই এখন তোমার
সোনার জাদুর কাঠি।
কাঠির মধ্যে দিলাম আমি
সোনার মোহর ভরে
মায়ের হাতে দিও তুমি
পৌঁছে নিজের ঘরে। ’
সোনার মোহর ভরা লঠি নিয়ে মেঝছেলে আনন্দে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। মাসির দয়ায় তাদের অভাব ঘুচবে ভেবে মাসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু পথে যেতে যেতে এক রাখালের সঙ্গে দেখা। সেই রাখাল হলো সূর্যদেবেরে ছদ্মবেশ।
রাখালবেশী সূর্যদেব লাঠিটা বদল করে ফেলে। ছেলেটি একেবারেই টের পায় না। সে নকল লাঠি নিয়ে বাড়ি ফেরে। মায়ের কাছে গিয়ে বলে,
‘এই দেখো মা, তোমার জন্য
আনছি লাঠি সোনার
এখন থেকে আবার শুরু
নতুন স্বপ্ন বোনার।
তোমার কথায় গিয়েছিলাম
আমার মাসির কাছে
তারই দেয়া সোনার মোহর
লাঠির ভেতর আছে।
’
এবার মা একটা দা এনে লাঠিটাকে চিড়ে ফেলে। কিন্তু হায়? এবারেও ভেতরে কিছু নাই। মা তার মেঝছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঝছেলের মনে পড়ে যায়, পথিমধ্যে সেই রাখালের কথা। একটু ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময় সে-ই তো কাছে এসে ভাব জমিয়েছিল।
তাহলে সে ছাড়া আর কে এই লাঠি বদলাবে। হায় হায়!Ñ
‘ভাগ্য আমার ভালোই ছিল
কর্ম ছিল মন্দ
মনের মাঝে কেবল ঘোরে
দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব।
হাতে পেয়েও হারিয়ে ফেলি
এ কোন পাপের দোষ
দিনে দিনে বাড়ছে কেবল
মনের অসন্তোষ। ’
মা তবু ভেঙে পড়ে না। এবার ছোটছেলেকে পাঠায় ছোটবোনের কাছে।
এবার ছোটছেলের হাতে একটি মাটির পাত্র দিয়ে মাসি বলেÑ
‘অনেক দূরের পথে তুমি
একলা যখন যাবে
পথের মাঝে অনেক বাঁধা
হয়তো তুমি পাবে।
পথের মাঝে ঘটতে পারে
আগের মতো কাণ্ড
সাবধানে বাপ্ রেখো তুমি
আমার মাটির ভাণ্ড’।
সাবধানে চলছিল ছোটছেলে। পথের ক্লান্তি সত্ত্বেও সে বিশ্রাম নেয়া থেকে বিরত থাকে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস আসে।
সেই বাতাসে উড়ে আসে একটা কাগুজে ঘুড়ি। সেই ঘুড়ি ওই মাটির পাত্রটিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ছেলেটি নির্বাক চেয়ে থাকে উড়ন্ত ঘুড়ি আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাটির পাত্রের দিকে। বাড়ি গিয়ে মাকে গিয়ে সে এই দুর্ভাগ্যের কথা জানাায়।
মা এবার নিজেই রওয়ানা দেয় ছোটবোনের বাড়িতে।
বড়বোনকে কাছে পেয়ে ছোটবোন বেশ খুশি হয়। দুইবোন একসঙ্গে অনেক সময় কাটায়। বাবা-মায়ের গল্প করে। বাবার সূর্যব্রতের গল্প না শোনার কারণেই বড়বোনের এই দুরবস্থা হয়েছে বলে ছোটবোনের ধারণা। ছোটবোন তখন বাবার কাছ থেকে শোনা সেই গল্পটি বলে।
তখন বড়বোন সূর্যব্রত করার ইচ্ছে করে। আর তার জন্য অপেক্ষা করে পরের বৈশাখ মাসের।
বৈশাখ মাসের প্রথম রবিবার কাঠুরিয়ার বড়মেয়ে সূর্যব্রতের আয়োজন করে আর সূর্যদেবকে প্রাণ ভরে ডাকে। রানী প্রতি রবিবার সূর্যব্রত পালন করে। এক রবিবার রাজা ফিরে আসে।
এক রবিবার রাজ্য ফিরে পায়। রাজা যখন প্রাসাদের দিকে আসতে থাকে। অর্ভ্যথনা জানাতে গেছে বিশাল বহরÑ সৈন্য-সামন্ত, লোক-লস্কর, পাইক-পেয়াদা। বিরাট আয়োজন! এই বিশাল বহর নিয়ে রাজা চলছেন রাজধানীর দিকে। পথে মন্ত্রীর গ্রামের বাড়ি।
রাজধানী থেকে অনেক দূরে এই বাড়ির কাছে এসে জানতে পারে যে তার মন্ত্রীবউ এখন গ্রামের বাড়িতে আছে এবং তার বড়বোন অর্থাৎ রানী এই বাড়িতে আছে। রাজা তখন রানীকে আনার জন্য লোক পাঠায়। অনেক দিন পরে রাজা-রানীর দেখা হলো। সে এক চমৎকার দৃশ্য! এরপর রাজা-রানী দলবলসহ রাজধানীর দিকে রওয়ানা হলো।
রাজধানী সেখান থেকে অনেক দূরে।
যাওয়ার পথে একাধিকবার বিশ্রাম নিতে হয়। কিছুদূর গিয়ে রাজা-রানী বিশ্রামের জন্য তাঁবু ফেলে। সেখানে ধূমধামের সঙ্গে রান্নাবান্না হয়। রানী রাজাকে তার সূর্যব্রতের গল্প বলে। এবং রাজাকে ফিরে পাওয়ার পেছরে যে সূর্যব্রতের মাহাত্ম্য রয়েছে, তা-ও জানায় রাজাকে।
রাজা খুব খুশি হয়। রান্না শেষে রানী ও রাজা খেতে বসে। এসময় রানীর মনে পড়ে তার ছোটবোনের বলা গল্পটির কথা। সে গল্প শোনার পরে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে বলে তার ধারণা হয়। রানী এই গল্প আরো অনেককে ডেকে-ডেকে শোনাতে চায়।
তাই একজন চাকরকে ডেকে বলেÑ
‘ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদে কি কেউ
আশেপাশের গ্রামে
কাউকে তাদের আনতে পারো
ডেকে আমার নামে?’
রানীর কথা শুনে এক পেয়াদা ছুটল পাশের গ্রামে। সামনে পড়ে এক কাঠুরিয়া। তার সঙ্গে কথা বলে পেয়াদা জানতে পারে তার কষ্টের কথা। কাঠ কেটে তার সংসার চালাতে কষ্ট হয়। রানীমার কাছে ওই কাঠুরিয়াকে ডেকে নিয়ে আসে পেয়াদা।
রানী তার কষ্টের কথা শোনে। তারপর নিজের কাছে রাখা তিনটি মোহর তাকে দেয়। তারপর ছোটবোনের কাছ থেকে শোনা গল্প তাকে শোনায়। তার বাবা কীভাবে সূর্যব্রত পালন করতেন, তা সে শোনায়। কাঠুরিয়া বেশ মন দিয়ে এই কাহিনী শোনে।
সূর্যব্রতের প্রতি তার বিশ্বাস আসে। বাড়ি গিয়ে সে এই ব্রত পালনের কথা ভাবে। হঠাৎ ধরে-থাকা কুঠারের দিকে তাকিয়ে দেখে যে কুঠারের হাতলটি সোনার হাতল হয়ে গেছে। কাঠুরিয়া তখন আনন্দে আত্মহারা। বাড়ি ফিরে সে চারিদিকে সূর্যব্রতের মাহাত্ম্য প্রচারের কাজে লেগে পড়ে।
এরপর রাজা-রানী আবার দলবদলসহ যাত্রা শুরু করে। দ্বিতীয় যাত্রাবিরতিতে রানী আবার পেয়াদা পাঠায় কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের খোঁজে। পেয়াদা ছোটে পাশের গ্রামে। সামনে এক গরিব কৃষককে ক্ষেতে কাজ করতে দেখে ডেকে নিয়ে আসে। রানী তাকে পাশে বসিয়ে খাওয়ায় এবং তিনটি মোহর দেয়।
তারপর ছোটবোনের কাছ থেকে শোনা সূর্যব্রতের গল্প বলে। কৃষক শুনে মুগ্ধ হয়। মনে-মনে সংকল্প করে বাড়ি ফিরে এই ব্রত পালন করার। বাড়ি ফেরার পথে দেখে তার নিষ্ফলা জমিতে ফসলের ব্যাপক সমারোহ! কৃষক এরপর থেকে নিয়মিত সূর্যব্রত পালন করে আর এই ব্রতের মাহাত্ম্য প্রচার করে।
তৃতীয় যাত্রাবিরতিতে পেয়াদা পাশের গ্রাম থেকে এক বুড়িকে ধরে নিয়ে আসে।
ওই বুড়ির বড়ছেলে জঙ্গলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তার মেঝেছেলে পুকুরে নাইতে গিয়ে আর পাড়ে ওঠেনি। ছোটছেলে সাপের কামড়ে মারা গেছে। তিন ছেলে হারিয়ে বুড়ি পাগল হয়ে গেছে। রানী তার হাতে তিনটি মোহর দেয়।
তারপর সূর্যব্রতের গল্প বলতে থাকে। বুড়ি খুব মন দিয়ে শোনে। বাড়ি ফিরে দেখে দিন ছেলেই ফিরে এসেছে। বুড়ির পাগলামিও আর নেই। একেবারে সুস্থ হয়ে গেছে।
এরপর থেকে বুড়ি নিয়মিত সূর্যব্রত পালন করতে থাকে এবং গ্রামে-গ্রামে ঘরে মানুষের এই ব্রতের মাহাত্ম্য প্রচার করে।
সূর্যদেবের মাহাত্ম্য প্রচার করতে-করতে রাজা-রানী প্রসাদে ফেরে। আবার প্রাসাদে পতাকা ওড়ে, রাজ্যে আবার সুখশান্তি বিরাজ করে। রানী তার কাঠুরিয়া বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চায়। এবং সূর্যব্রত পালন এবং এর মাহাত্ম্য প্রচারের ঘোষণা দেয়।
যে দিনটাতে কাঠুরিয়া প্রথম সূর্যব্রত পালন শুরু করে, সেই দিনটাকে এরপর থেকে রবিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এইভাবে সপ্তাহের প্রথম দিন হিসেবে রবিবারকে সকলেই মেনে নেয়। এইভাবে রবিবার আমাদের কাছে রবিবার হয়ে ওঠে।
রবিদেবের ব্রত থেকেই
রবিবারের নাম
পরনকথার গল্প শুনেই
এই কথা জানলাম।
ও বাঙালি ভাইবোনেরা
যেথায় আছ যত
আজকে থেকে পালন করো
রবিদেবের ব্রত
রবিবারের রবি হলো
সূর্যদেবের নাম
ব্রত পালন করলে সবার
পূরবে মনষ্কাম।
................................................
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।