বেশকিছুদিন ধরে মুখোশ নামক শব্দটা আমাকে বড্ড নাড়াচ্ছে।
নাড়াচ্ছে মানে কি! একদম হামলে পড়ছে। মনে হয় চারিদিকে মানুষ দেখি না। দেখি শুধু মুখোশ। মানুষের ভন্ডামিতে যেনো ছেয়ে গেছে মানুষ।
নিজ অস্তিত্বকে যেনো নিজেই বিপন্ন করে তুলছে তারা। তারা জানেও না যে তারা মানুষ নামক শব্দটি থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দের খেলায় তারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলায় আমরাও অংশ নেই। আমরাও মুখোশের প্ররোচনায় পড়ে নিজেরাও একটি মুখোশ লাগিয়ে বেড়াই।
কিন্তু যখন নিজের কাছে অন্যের মুখোশটা উন্মোচিত হয়ে যায়। যখন বিশ্বাসের সমস্ত দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তখন? তখন নিজের মুখোশ পরে থাকার অপরাধে নিজের গলাটাই চেপে ধরতে উদ্ধোত হই। নিজেকেই আয়নার সামনে এক বিভৎস মানুষ মনে হয়। মনে হয়, কেনো সেই মুখোশের জন্য নিজেকে ভুলতে গিয়েছিলাম।
তখন নিজের সাথে কথা বলতে বলতে শেষ হয়ে যাই। নিজেকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করি। নিজেকেই মুখোশধারীকে চিন্তে না পারার অপরাধে অপরাধী বানাই।
শুরুতেই বলেছি। বেশ কিছুদিন ধরে মুখোশ নামক শব্দটা বড্ড জালাচ্ছে।
ঠিক সে সময়েই একটি কবিতা পেলাম। বলা যায়, নিজের সাথে কথা বলার চেয়ে সেই কবিতা বার বার আবৃত্তি করাতে মনটা হালকা হয়ে উঠেছে। সেই কৃতিত্ব কবি আবুল হাসানকেই দিতে হয়।
"নিজের কাছে" কবিতাটি শুরুটাই হয়েছে এইভাবে,
তুমি কেন দেখালে না চারিদিকে প্রসন্ন মানুষ,
তুমি কেন শেখালে না আমাকে সহিষ্ণু হতে
সুখের পিছনে সুখ চেটে নেয় যে সব লোকেরা
তুমি কেন দেখালে না আমাকে তাদের;
বোঝাই যায় এটি একটি আত্মজিজ্ঞাসা নির্ভর কবিতা। কবি নিজেকেই নিজে বলছেন, কেনো প্রসন্ন মানুষকে বুঝলাম না।
যে সব মানুষ বিশ্বাসের ভান করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়। যে মানুষগুলো পৃথিবীতে বিশ্বাস-আস্থা নামক শব্দগুলোকে প্রশ্নের মুখে নিয়ে যায়। যে মানুষগুলো সমস্ত আবেগ নিয়ে খেলা করতে পারে। সেই মানুষগুলোর প্রতি তীব্র ঘৃণা নিক্ষেপ করে কবি নিজেকে নিজে বলেছেন,
তুমি কেন দেখালে না আমাকে তাদের;
এরপর,
আমি তো গন্তব্যে যেতে দেখেছি পায়ের মাঝখানে
কি কোরে কষ্ট জমে, গোড়ালীতে ফোস্কা পরে ব্যাথা হয়,
শরীরে বিষন্ন স্মৃতি, পা আর চলে না।
অথচ আমাকে তুমি কেন আজো দেখালে না
পথাশ্রম, সেবাসংঘ, মানুষের স্বাধীন শুশ্রুষা?
তুমি বলেছিলে আমাকে একদিন তুমি দেখাবেই বিশ্বস্ত মানুষ,
আমাকে তুমি একদিন শেখাবেই সংসারের সব শীতলতা,
অথচ আমাকে কেন দেখালে না বিশ্বস্ত মানুষ?
অথচ আমাকে কেন শেখালে না সংসারের সব শীতলতা?
কবির আর্তনাদ স্পষ্ট।
বারবার বলে উঠেছেন নিজেকে। নিজেকেই বার বার বলছেন,
অথচ আমাকে কেন দেখালে না বিশ্বস্ত মানুষ?
অথচ আমাকে কেন শেখালে না সংসারের সব শীতলতা?
নিজেকেই বার বার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। বিশ্বস্ত মানুষের খোঁজে কবি যেনো উন্মাদ হয়ে উঠেছেন।
আমরা প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস খুজে বেড়াই। বিশ্বাসেই যে প্রশান্তি।
বিশ্বাসই তো আমাদের বাচিয়ে রাখতে পারে নিশ্চিন্তে।
যে অবিরাম পথ চলা সে পথ চলায় বিশ্বাসের বড্ড দরকার। কিন্তু সেটাই যেনো এখন হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন বিশ্বাস শব্দটাকেও মুখোশ পরিয়ে ফেলছে। হাজারো মিথ্যের আড়ালে সব কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।
মুখোশের পেছনে মানুষগুলোর প্রতি তীব্র ঘিন্না চলে আসে। তাদের উপর হামলে পড়তে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় থুথু ছিটিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু পারি না। পারি না তাদের প্রতি ঘৃণা নিক্ষেপ করতে।
কারণ, তাদের সাথে যে সুখময় স্মৃতিটি জড়িয়ে আছে তা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মধুর স্মৃতিগুলো আলিঙ্গন করে। তখন আর মুখোশধারীকে দোষ দিতে পারি না।
তখন নিজেকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে বলি,
আমাকে কেন দেখালে না বিশ্বস্ত মানুষ?
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।