একট হাসি, অলস দুপুর, এক ফোঁটায় জলের পুকুর।
কিছু কিছু ভুল সিদ্ধান্ত মানুষকে উল্টেপাল্টে দেয়। সেরকম একটা যুদ্ধে পরাজিত আমি যখন বেঁচে থাকার কারণ গুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলাম, এবং কোনটাকেই যথেষ্ট মেনে হচ্ছিলোনা, তখনই পরীটা আমার জীবনে আসে। আজ সেই ভুলের এক বছর, বর্ষপূর্তিতে আসো তোমাকে পরীটার গল্প শোনাই।
পরীটাকে আমি চিনি ৪ বছর, আমার ক্লাসেই পড়ত।
নানান সময় একসাথে কাজও করেছি। সে আলাদা ছিলো, সবসময়। চাপা। সিরিয়াস টাইপ। ঠিক (তখনকার) আমার মত না।
সুতরাং অধিকার জন্মানোর মত বন্ধুত্ব গড়ে উঠে নাই।
ঝামেলার মাঝে যখন গ্রুপ ঠিক করতে হলো, আমিই অনুরোধ করলাম আমাকে নিতে। পরীটা কেন আমাকে নিলো, কেন আমাকে নিয়ে অ্যাতো বড় জুয়াটা খেললো জানি না, কিন্তু নিয়েছিলো আমাকে তার গ্রুপে।
আমাদের তিন বালিকার গ্রুপ। কাজ শুরু হলো।
আমি ততদিনে পালানোর পুরা প্ল্যান শেষ করে ফেলেছি। ২৬ মার্চের কনসার্টে যাবে সবাই, আমি তখনই ভাগবো না ফেরার ট্রেন ধরতে। হঠাৎ পরীটা টেক্সটে পরেরদিন কাজের শিডিউল দিল।
আমি ভেগে গেলে মেয়ে দুটা ভালো ঝামেলায় পড়বে, বিশেষ করে এই মেয়েটা। ট্রেনের টিকেট পিছায় জমার পরে করে দিলাম।
কাজটা জটিল ছিলো হালকার উপরে পাতলা, আর আমিও অকারণ বসে না থেকে কাজে মন দিলাম। কঠিন কাজের প্রতি আমার ফ্যাসিনেশনটা পুরাতন। পরীটারও। দুজনের ভালোলাগা একসাথে হয়ে যা হলো তা এককথায় দুজনেরই সবচে' ভালো কাজ সে পর্যন্ত।
কাজের মাঝে একমাস কই দিয়ে গেল জানি না।
টের পাইনি। জীবনের শেষ কাজ মনে কোরে সেইরকম কাজ করছিলাম। দিনে ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করলে কি আর হবে?
আরোও একটা জিনিস হলো। আর্কিটেকচারে আমি ভর্তি হয়েছিলাম একটা ভালোলাগা থেকে। একমাসে ভালোলাগাটা ভালোবাসা হয়ে গেল।
পরীটা আমাকে মনে করায় দিলো আমার পুরোনো ভালোলাগার তীব্রতা।
একটা ভালো কাজ নামানোর তৃপ্তির সাথে কোনো কিছুরই আসলে তুলনা চলে না।
গল্পটা এখানে শেষ হলেই কিন্তু হতো, তাহলেও কিন্তু হতো তাই না? কিন্তু, গল্পটা এখানেই শেষ না।
এবার ক্লাশ যেদিন শুরু হলে, তার দুদিন আগে আমি জ্বর নিয়ে ফিরলাম ঠাকুরগাঁও থেকে, টাইফয়েড। প্রজেক্ট তো আর থেমে থাকবে না আমার জন্য, সুতরাং কাজ শুরু হলো।
আমি আর পরীটা। তিনজনের প্রজেক্ট, একে তো দুজন, তার উপর একজন অসুস্হ। ক্লাসে সবাই কে বোঝালো যে আলাদা হয়ে দু'জুন দু'গ্রুপে যাওয়াটাই বুধিমানের কাজ হবে। কিন্তু আবারো পরীটা বাজি ধরলো (আমাকে নিয়ে বাজি ধরার একটা বাজে স্বভাব আছে এই মেয়েটার। )।
রিপোর্টে আমাদের সাথে যে মেয়েটা ছিলো, আমরা কাজ করিনা বলে অন্য গ্রুপে চলে গেছে। আমিও সব শুনে ভাবলাম এইবার এসপার অথবা ওসপার। ফলাফল, গত বাইশ দিনের কখন রাত আর কখন দিন আমি জানি না, টাইফয়েডে জন্য বিছানা ছেড়ে উঠতে পারতাম না, সুতরাং ল্যাপটপের ঠিকানাই হয়ে গেছিল বিছানা।
তারপরও। আমি ডিজাইন করে ছেড়ে দিতাম মডেল বানানো, সেকশন নামানোর মতো ফিনিশিং এর পুরা দায়িত্ব পরীটার ছিলো অর্ধেক সময়।
কাজের অফিশিয়াল ফল এখনও পাইনি, জুরি শনিবার। কিন্তু যে কাজ নামানো হইসে, সেইটা মনে থাকবে। জীবনে একটা স্বপ্ন থাকে না, এই রকম ড্রয়িং হবে, সেই রকম মডেল হবে, সেটা হইছে। এখন একটা সেইরকম জুরি হইলেই হবে।
কিন্তু তা পরীর জন্য।
আমার জন্য? আমি আজ মন খারাপ করে থাকার বদলে সুন্দর একটা মন নিয়ে পরীর গল্প বলছি, যে ধাক্কা সারা জীবনে সামলাতে পারব কিনা বুঝিনি আমি এখন অনেক অনেক ভালো। আমি এখন সুস্হই বলা যায়।
আমার পুরো ঝামেলায় আমার পরিবার আর বন্ধুরা আমার পাশেই ছিলো। কিন্তু পরীটার মত করে আমাকে পাল্টে দিতে পারেনি কেউই।
পরীটার নাম মিশতু।
এই পরীটার জন্যই আজ আমি শুধুই পরে যাইনি বলে বেঁচে নেই, কিছু স্বপ্ন সত্যি করতে হবে বলে, গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে বলে বেঁচে আছি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।