অতি দক্ষ মিথ্যুক না হলে সত্যবাদিতা উৎকৃষ্ট পন্থা
একুশে টেলিভিশনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের জানাতে চাই আমাদের সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে উন্নয়নের কারণে। এইসব কে কার পিঠে লাথি মারলো ভুলে যান, আসুন দেশ গড়ি সবাই মিলে, দেশের উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি।
আমি চেহারা চিনে রাখি। চেহারা চিনেই বা হবে কি? আমরা ভুলে যাই, ভুলতে বাধ্য করে আমাদের।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুক্তিযোদ্ধারা ধারণ করতো কি না এই নিয়ে উত্থাপিত বিতর্ক দিয়ে এটার শুরু হয়েছিলো।
যখন এটা গণমাধ্যমে ছড়িয়ে গেলো মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় নারীর লোভে যুদ্ধ করেছিলো, সেই কাদের মোল্লাকে রাষ্ট্র নিজেই হেফাজত করেছে।
ধন্য কাদের মোল্লা, মুক্তিযোদ্ধার মনঃস্তত্ব নিয়ে বিস্তর গবেষণা শেষে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। সেই সময়ের আগে পরেই আসলে জামায়াতের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন গড়ে উঠবার বীজটা রোপিত হয়।
জামায়াত মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন গড়ে তুলেছে। তবে জামায়াতের ব্যানারে না।
তাদের কার্যালয় জামায়াতের ভাড়া করা বাড়ীর একটা ঘরে, তাদের প্রধান উদ্যোক্তাও জামায়াতের নেতা।
তারাই একটা সভার আয়োজন করেছে, সেখানে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার হুংকার শোনা গেলো। একই হুংকার শুনে জবাই হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা।
আল্লাহর ক্ষমতায় বলীয়ান সর্বশক্তিমান জামায়াতের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, যিনি এ ধরণের একটা অনুষ্ঠানে আসতে পেরে গর্বিত বোধ করেন।
আমরা লজ্জিত হই না।
প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের মুখোমুখী থাকবার সময়ই কিছু বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তারা যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি নমনীয় ব্যবহার করছেন।
আমাদের রাজাকারের কর্মী আর নেতাদের আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে। রাজাকার কমান্ডার আর রাজাকার টহলদাতা একই শ্রেণীভুক্ত মানুষের প্রতিনিধি নয়। ক্ষমতাচক্রের আশেপাশে থাকা রাজাকার কমান্ডার আর ইসলামী ছাত্র মজলিসের নেতা ও কর্মীদের অধিকাংশদের দিয়ে গঠিত আল বদর আল শামস সংগঠন, মুসলীম লীগ নেজামে ইসলামীর নেতাদের দিয়ে গঠিত শান্তিবাহিনী।
আর রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে বিস্তর ফারাক।
এই সময়েও কিছু মানুষ যুদ্ধে যায় নি। মে মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিবাহিনী কার্যক্রম শুরু করলো, এরপরে নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও গঠিত হলো। রেজাকার সংস্থা গঠিত হলো।
রেজাকার বাহিনীর নেতারা ছাড়া সবাই মূলত অল্প শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত মজুর শ্রেণীর মানুষ, যে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বেতন ৫০০ টাকা সে সময়ে শুধুমাত্র রাইফেল ঘাড়ে নিয়ে হাঁটাহাঁটির জন্য যদি মাসে ১২০ টাকা পাওয়া যায় যুদ্ধের আক্রা বাজারে সেটাই বা কম কি।
এই মানুষদের অপরাধ দারিদ্র, তবে এদের যারা নেতৃত্বে ছিলো কিংবা যারা সত্যিকার অর্থে আদর্শিক কারণে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিলো তারা আল বদর আল শামস, যুদ্ধাপরাধী মূলত এরাই। এরাই লুণ্ঠনের কাজ করেছে, এরাই পাকিস্তান ক্যাম্পে নারী ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের কাজ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের পরে অবশ্য এইসব নেতাদের কোনো ক্ষতি হয় নি। আমাদের ক্ষমতাচক্রের আশেপাশে থাকা মানুষেরা এদের আশ্রয় দিয়েছেন। নিজের শরণে নিয়ে তাদের লালন পালন করেছেন।
বৈবাহিক সম্পর্কের দায়ে, এক সাথে রাজনীতি করবার দায়বদ্ধতায়, একই রাজনৈতিক মতাদর্শে একদা বিশ্বাসী ছিলাম, গত ৯ মাসের অপরাধ ভুলে গিয়ে তাকে কাছে টেনে নেওয়া এইসব ক্ষমতাবানদের সহযোগিতায় যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই বেঁচে যায়।
সেইসব বিচারক যারা কোনো না কোনো অদ্ভুত কারণে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ন্যুনতম শাস্তিও মাঝে মাঝে দিতে চান নি, অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগও নাকচ করে দিয়েছেন নিজস্ব ক্ষমতাবলে। এইসব বিচারপতিরাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনানিতে বিব্রত বোধ করেছেন। স্বীয় ক্ষমতায় তিনি বিচারের আর্জি অস্বীকার করেছেন।
তবে রেজাকার বাহিনীর সদস্যদের অনেকেরই কয়েক বছরের জেল হয়েছে, অনেকেই লঘুপাপে গুরুদন্ড পেয়েছেন।
ক্ষমতা ক্ষমতাহীনদের পিষ্ট করে নিয়মিতই। . কাউকে না কাউকে বলি হতে হয়। রাষ্ট্র এবং নিয়মতান্ত্রিকতা এমনটাই দাবি করে।
এদের প্রশ্রয়েই লালিত পালিত হচ্ছে আল শামস আর আল বদর বাহিনীর পরিবারের সদস্যরা। তাদের সন্তানেরা সামাজিক বয়কটের শিকার হয়েছে কোনো কোনো সময়, কোনো কোনো সময় তাদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক রাখবার ভদ্রতাটুকুও অনেকে করে নি।
বিকলাঙ্গ মনঃস্তত্ব নিয়ে বেড়ে উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান-সন্ততি। মেকি মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ পারিবারিক সম্পর্কের কারণেই তাদের ফেলে যেতে পারেন নি। বৈবাহিক সম্পর্কে যুক্ত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার সাথে যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গমে আপোষকামী একদল মানুষ জন্মায় যারা স্বীয় জন্মকে ভুলে যেতে চায়।
আসুন মিলে মিশে দেশ গড়ি।
আসুন আমাদের সামনে অনেক কাজ, এইসময় বিরোধিতা নয় সময় এখন দেশ গড়ার- দেশ প্রেমিক মন্ত্র আমরা শুনতে থাকি।
আমি চেহারা চিনে রাখি, যে মানুষটা ফাঁসীর দাবি জানানো মুক্তিযোদ্ধার পিঠে লাথি মারলো তার চেহারা চিনে রাখি, চেহারা চিনে রাখি তার সহযোগীদের।
এই যুবকদের সবারই বয়েস ৩০এর কম। তারা বাংলাদেশে জন্মেছে। তাদের জন্ম সাল আর তাদের মনঃস্তাত্বিক বিকার দেখে নিশ্চিত হই, এরা সেইসব বাবাদের ঔরসে জন্মেছে যারা জিয়া আঙ্কেলের বদানত্যায় যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখী হওয়ার আগেই মুক্তি পেয়েছেন।
আমাদের বিস্মরিত বিশ্রামের সময়ে আমাদের উঠোনজুড়ে শ্বাপদের সদর্প পদচারণা। আমরা ভুলে যেতে চাই না তবুও আমাদের ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মরিয়া রাষ্ট্র।
একজন বিচারপতি গর্বিত বোধ করেন যুদ্ধাপরাধীদের সম্মেলনে সংযুক্ত হতে পেরে। তিনি আহ্লাদিত হন। তিনি স্পষ্ট বলতে পারেন না আসুন ৩৭ বছর পর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগী হই।
তিনি বলতে না পারলেও সম্প্রতি বিব্রত একজন প্রধান বিচারপতি আমাদের এই আহ্বান জানিয়েছেন, পারস্পরিক শত্রুতা আর হানাহানি ভুলে আমাদের দেশ গড়তে হবে।
বড় বড় মানুষের নিজেদের মহত্বে সব কিছু ভুলে যেতে পারেন। তারা ভুলে যেতে পারেন বলেই তারা মহান হয়ে উঠেন। আমাদের মতো ক্ষীণ এবং দুর্বল মানুষেরা কিছুই ভুলতে পারে না।
ভুলতে পারেন না সবকিছু হারানো যুদ্ধবিক্ষত পরিবারের সদস্যরা।
তারা নেহায়েত নাছোরবান্দা বলেই এই সম্প্রীতির সময়ে সম্প্রীতি ভুলে বিভেদের রাজনীতি করেন। তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইতে থাকেন।
আমরাও অপরাধী, কাদের মোল্লা যখন বলেছেন মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় নারীর লোভে যুদ্ধ করেছে, সেটাকে অস্বীকার করে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি আর যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই।
আমরা অপেক্ষা করি আরও একটা লাথির জন্য। আমাদের উপরে অনবরত লাথি পরতে থাক।
পড়তেই থাকে। রাষ্ট্র আমাদের পাপোষ বানিয়ে স্মৃতির ধুলো মুছে ফেলে। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে যায় গর্বিত যুদ্ধাপরাধী আর তাদের মানসিক বিকলাঙ্গ সন্তানেরা।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।