আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তথ্যের জন্য কাঙালপনার অবসান?

সঙ্গে সাহিত্যের সুবাস ...

বেশ কিছু রদবদল ঘটিয়ে বহুল আলোচিত তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ সরকার অনুমোদন করেছে গতকাল। মিডিয়ার পক্ষ থেকে এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ততোধিক, তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ চালু করার জোর দাবি উঠেছিল বিগত কয়েক বছরে। সরকার দেরীতে হলেও তাতে সাড়া দেয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্লভদৃষ্ট ঘটনা, সুশীল সমাজের কাছ থেকে মতামতও চাওয়া হয়। তবে শেষপর্যন্ত যা পাওয়া গেছে তাতে দাবিকারীদের অনেক দাবিই বাদ পড়েছে। এর মধ্যে আমার দৃষ্টিতে অধ্যাদেশটি খর্বিত হয়ে পড়েছে একটি জায়গায়, উপজেলার নিচের পর্যায়ের প্রশাসনিক, অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ের তথ্য আপনাকেও চাইলেই দেয়া হবেনা।

(চেয়ারম্যানের গম চুরি অব্যাহত থাকিবে) আর কী কী বিষয় বাদ পড়েছে বিস্তারিত আজকের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ অনুমোদন হবার প্রাক্কালে ব্লগারদের জন্য একটি গ্রন্থসমালোচনা তুলে দিচ্ছি। এটি প্রথম আলো পত্রিকায় ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ... তথ্যের শতকে তথ্যের অধিকার নিয়ে হৈ চৈ হবে, গবেষণা হবে, পুস্তক প্রকাশিত হবে, সরকার তথ্যের অধিকার দিচ্ছি-দিচ্ছি করে বিষয়টি যথাসম্ভব ঝুলিয়ে রাখবে -- এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা হচ্ছে, সরকার দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের আওতায় মাঝে মধ্যে তথ্য দিতে চায়না, আর সাংবাদিক-লেখক-গবেষক-সিভিল সোসাইটি আওয়াজ তুলছে তথ্যের অধিকার দিতে হবে, দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন বাতিল করতে হবে, আইন করে তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে এনিয়ে ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে, মনে হয় আরও কিছুকাল তা চলবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এবছর প্রকাশিত ভবেশ দাশ ও রোবায়েত ফেরদৌস সম্পাদিত তথ্যের অধিকার গ্রন্থটি তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের পক্ষে ওকালতি করছে। সুবিশাল আয়তনের গ্রন্থটি ভারত ও বাংলাদেশ এই দুই দেশের তথ্য-অধিকার পরিস্থিতিকে তুলে ধরে। ভবেশ দাশ সম্পাদিত ভারতীয় অংশটি ২০০৫ সালে 'গাঙচিল' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই অংশটুকুর সঙ্গে রোবায়েত ফেরদৌস সম্পাদিত বাংলাদেশ অংশটি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে একত্রে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে 'চারদিক'।

সেসূত্রে বইটি প্রায় একটি আকর-গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে। বইটির গুরুত্ব এইখানে যে ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের তথ্য-অধিকার-সংক্রান্ত আলোচনার 'অ" থেকে 'চন্দ্রবিন্দু' -- সবকিছুই এতে মিলবে। তথ্যের অধিকার পরিস্থিতি দুই দেশে দুইরকম। ২০০৫ সালে ভারত সরকার আটটি রাজ্যে 'রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট, ২০০৫' চালু করেছে। আর বাংলাদেশে তা এখনও চালু হয়নি -- 'তথ্য অধিকার আইন, ২০০২' প্রস্তাবিত আকারে এখনও রয়েছে -- চূড়ান্ত আইন আকারে চালু হবার অপেক্ষা করছে।

ফলে বাংলাদেশের লেখাগুলোয় বার বার ফিরে এসেছে 'তথ্যপ্রাপ্তি গণতান্ত্রিক দেশে মানবাধিকার, তাই শিগগীরই তথ্য অধিকার আইন চালু করা হোক' -- এই দাবিটি। আর ভারতের লেখাগুলোয় তথ্যের বন্দনা যেমন করা হয়েছে, তেমনি তথ্যভারের আশঙ্কার দিকটির পাশাপাশি এইসব অধিকার দিয়ে করবোটা কী -- এমন সমালোচনাত্মক প্রশ্নও তোলা হয়েছে। সে-হিসেবে বাংলাদেশ-অংশের লেখাগুলো একরৈখিক, খানিকটা একঘেঁয়েও। আর ভারতীয় লেখাগুলো বিচিত্র স্বাদের। দুই দেশের নিবন্ধগুলোর সম্মিলিত আয়তনেও রয়েছে বিস্তর ফারাক।

ভারতীয় অংশে নিবন্ধ রয়েছে ৪৮টি, ১৩ থেকে ৪২৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তা বিস্তৃত (মোট ৪১১ পৃষ্ঠা)। আর বাংলাদেশ-অংশে নিবন্ধ রয়েছে ১৩টি, ৪২৫ থেকে ৫৫৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তা বিস্তৃত (মোট ১৩২ পৃষ্ঠা)। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত তথ্য অধিকার আইন ২০০২। সম্পাদকীয় পড়ে আন্দাজ হয়, ভারতীয় অংশের সম্পাদক গ্রন্থটির পরিকল্পনা করেছিলেন, লেখকদের এসাইন করেছিলেন এবং তারপর প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ অংশটি সংকলিত হয়েছে 'ইতোমধ্যে-প্রকাশিত' নিবন্ধসমূহ নিয়ে -- নতুন লেখা এখানে নেই বললেই চলে।

ফলত আয়তনে, বিষয়বৈচিত্র্যে বাংলাদেশ-অংশটি খানিকটা নিষ্প্রভ মনে হয়েছে। ভারত-অংশে লিখেছেন পবিত্র সরকার, শঙ্খ ঘোষ, কেতকী কুশারী ডাইসন, নিত্যপ্রিয় ঘোষ, সুধীর চক্রবর্তী, স্বপ্নময় চক্রবর্তীর মতো বিখ্যাত লেখকেরা। বাংলাদেশ-অংশে লিখেছেন রোবায়েত ফেরদৌস, গীতি আরা নাসরীন, মালেকা বেগম, মশিউল আলম, কামরুল হাসান মঞ্জু, ড. গোলাম রহমানের মতো স্বনামখ্যাত লেখক-গবেষকরা। রোবায়েত ফেরদৌস তার সম্পাদকীয় শুরু করছেন এভাবে: "'তথ্য' কী? 'তথ্য' হলো তা, যা মানুষের 'এনট্রোপি' বা 'অনিশ্চয়তা' দূর করে; তথ্য প্রাণ -- আধুনিক রাষ্ট্রের; তথ্য অক্সিজেন -- গণতন্ত্রের; তথ্যহীন থাকা মানে সন্দেহে থাকা; বসবাস অনিশ্চয়তায়। " আর ভবেশ দাশ তার অংশের সম্পাদকীয় শুরু করছেন এভাবে: "তথ্যের মহাসড়ক ধরে চলেছি।

দু-পাশে তথ্যের প্লাবন যেন। ওসব তথ্য মেঘ না চাইতে জলের মতো, ভাসিয়ে নিতে চাইছে কেবল দিগ্বিদিক। প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারে এ যেন এক আশ্চর্য বিধিলিপি। তথ্যের এই বিপুল বিস্ফোরণ, তবু আমরা তথ্যেরই কাঙাল। তাহলে মহাসড়ক ধরে চলেছি কোথায়? তবে কি আগ্রাসী তথ্যের অযাচিত বৈভব আমাদের কোনো খাঁচায় বন্দি করছে, যার বাইরে পড়ে আছে আরও অফুরান তথ্যের ভাণ্ডার? ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের কাছে তো এর উত্তর আছেই।

কিন্তু আমরা যারা মানুষের মতো বাঁচার জন্য প্রতিদিন জরুরি তথ্যের প্রত্যাশী -- তারাও তো তথ্যবঞ্চিত, এখানেই তথ্যের হাহাকার। " দুই সম্পাদকের তথ্য নিয়ে দুই এপ্রোচ লক্ষণীয়। একজন তথ্যের নিঃশর্ত ভজনা করছেন, অন্যজন তথ্যের কাঙাল হয়েও তথ্যের বিস্ফোরণ নিয়ে খানিক সতর্ক। এর কারণ কী? একজন তথ্যের অধিকার পেয়ে গেছেন, আর আরেকজন পাননি, এজন্য? সম্পাদকের মতো লেখকদের মধ্যেও এই এপ্রোচের পার্থক্য লক্ষণীয়। বাংলাদেশী লেখক কামরুল হাসান মঞ্জু লিখছেন, "সরকারী পর্যায় থেকে জনসাধারণকে তথ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে, যে-কারণে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি কর্মকর্তারা চাইলেও ওইসব আইনের ভেদ ভেঙে তথ্য সরবরাহ করতে পারে না।

... আইনগত এইসব বিধিনিষেধ অতিক্রম করার জন্য দেশে প্রয়োজন তথ্য অধিকার আইন। " (পৃষ্ঠা ৫১৪) অন্যদিকে ভারতীয় লেখক দীপেন্দু চক্রবর্তী লিখছেন, "চারিদিকে চিৎকার, তথ্য চাই, আরও তথ্য চাই, এবং এই দাবিটি মেনে নিয়েই কেন্দ্রীয় সরকার এমন একটা আইন পাশ করেছে যাতে যেকোনো ব্যক্তি কিছু টাকার বিনিময়ে যেকোনো সরকরি দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এই তথ্যচাহিদার পরিণাম হল, ধরুন আপনি আপনার প্রিয়জনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কি না তা জানতে চাইলেন। একের পর এক হাসপাতাল বলল, এসব নেই, কিংবা আছে অথচ এসব অচল। তখন আপনি নিশ্চিন্তে স্বগৃহে আপনার প্রিয়জনের প্রাণত্যাগের জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন।

প্লিজ ঘ্যান ঘ্যান করবেন না, যতই প্রিয়জনের বিয়োগব্যথায় আপনি কাঁদুন-না, তথ্য জানার অধিকারটা তো আপনার থাকল। " (পৃষ্ঠা ৫৮) তিনি অন্যত্র লিখছেন, "তথ্য যদি আমাদের বাঁচতে সাহায্য না করে, যদি তথ্য জমতে জমতে পাহাড় হয়, আর আমরা তাতে চাপা পড়ি, তবে সেই তথ্যের অধিকার আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? আমাদের মতো দেশে এই প্রশ্নটা জরুরি। যাঁরা গবেষণা করেন, সেমিনারে ভাষণ দেন সেইসব বিশ্বভ্রমণকারী অ্যাকাডেমিকদের জন্য তথ্য অবশ্যই একটা মস্ত হাতিয়ার। কিন্তু নিরক্ষর বুভুক্ষু গ্রামবাসীর কাছে তথ্যের বার্তা কোন কাজে লাগবে তা আমরা ভালোই জানি। " (পৃষ্ঠা ৫৮-৫৯) দীপেন্দু চক্রবর্তীর এই মন্তব্য আমাদের তথ্য বস্তুটার সীমাবদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

তবে ভারতীয় আইনটির একটি বিষয় খটকা লাগার মতো, তথ্য পেতে ফি দেয়া লাগবে। তথ্য যে পণ্য, ভারতীয় সরকার তা বুঝে তাকে যে বিক্রি করতে চাচ্ছে, তা আমাদের আশ্চর্য করে। বাংলাদেশের সরকার এরকম ভাবছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। আফগানিস্তানে, ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের প্রাক্কালে মার্কিন মাধ্যম-সমালোচক ও সাইবারস্পেসের বিকল্প-মাধ্যম 'মিডিয়া চ্যানেল'-এর প্রধান ড্যানি শেক্টার বহু বহু টিভি-চ্যানেলের উপস্থিতি সত্ত্বেও যুদ্ধের প্রকৃত খবর না-পাবার বিষয়টিকে তার প্রকাশিত গ্রন্থের শিরোনামে বর্ণনা করেছিলেন -- দি মোর ইউ সি, দি লেস ইউ নো। তথ্য পাবার অধিকারই প্রকৃত ও জনস্বার্থমূলক তথ্য পাবার বিষয়টি নিশ্চিত করেনা, তথ্য অধিকারের আলোচনায় এবিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না, যদিও তথ্য পাবার অধিকার একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার বলেই সবাইকে স্বীকার করতে হবে।

ভবেশ দাশ ও রোবায়েত ফেরদৌস সম্পাদিত তথ্যের অধিকার গ্রন্থটিতে এই তথ্যপ্রাপ্তির দুই দিকই আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। তথ্যের অধিকার। ভবেশ দাশ ও রোবায়েত ফেরদৌস (সম্পাদিত)। প্রচ্ছদ: দেবব্রত ঘোষ। প্রকাশক: চারদিক।

ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০০৭। মূল্য ৫২০ টাকা।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.