আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

প্রযোজনা সংস্থা 'রাষ্ট্রযন্ত্র' কর্তৃক নির্মিত ছবি 'আলুসমগ্র'

munirshamim@gmail.com

আমাদের রাজনীতিতে আলুর প্রভাব বোধহয় ঐতিহাসিক। দুর্জনরা অথবা রাজনৈতিক সচেতন রসিক ব্যক্তিবর্গের মাঝে আমাদের দেশের প্রধান তিনজন রাজনৈতিক নেতা সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত আছে অনেক দিন ধরে। কথাটা হয়তো অনেকেরই ভাল লাগবে না। ভাল লাগারও কথা নয়। তুব পাঠক ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টি দেখানোর উদারতা প্রদর্শন করবেন এ আশা রেখে কথাটি বলছি শুধু আলুর ভূমিকা ও প্রভাব বোঝাবার জন্য।

সে বহুল প্রচলিত কথাটি হচ্ছে আমাদের তিনজন রাজনৈতিক নেতার একজন নাকি শেষ হয়েছেন 'আলু'র দোষে, অপরজন 'ফালু'র দোষে। আর একজন 'স্বপ্ন' দোষে। নয় বছর একটানা শাসন করেও প্রথম জন নাকি ক্ষমতায় শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেন নি 'আলু'র দোষে। সে একই 'আলু'র দোষে বাংলাদেশে অনেক বড় বড় সংস্থা ভেঙ্গে যাওয়ার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে জনগণকে। এ ভাবে আলু যেন আমাদের সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে একটি প্রভাব বলয় তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি।

তা বজায় রাখতেও সক্ষম হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। নতুন নতুন মাত্রায়। আমাদের শৈশবে একটি শ্লোগান গেলানের চেষ্টা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। 'বেশি করে আলু খান-ভাতের ওপর চাপ কমান' এ শ্লোগানটি কিছু দিন মুখে মুখে ফিরেছে। কিন্তু আমরা ভেতে বাঙ্গালি।

ভাতের ওপর চাপ কমাতে পারিনি। কারণ ভাত ছাড়া আমাদের চলে না। আলু আমাদের কাছে শব্জি হিসেবেই থেকে গেছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সব্জি হিসেবে। আমাদের ব্যঙ্গাত্বক ভাষ-ভান্ডারে আলু শব্দটির একটি ব্যবহারিক উপযোগিতা রয়েছে।

মানুষের চেহারা বা স্বাস্থের বর্ণনা দেয়ার জন্য আলু উপমা হিসেবে বহুদিন ব্যবহৃত। লোকটির চেহার দেখতে গোলআলুর মতো। এ বর্ণণায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যতই স্বাচ্ছন্দবোধ না করুক না কেন হরহামেশাই এ উপমার ব্যবহার হতে দেখি। কারও কারও চরিত্র বর্ণনা করবার জন্যও আলুর ব্যবহার হতে দেখি। বলা হয় লোকটি গোলআলু।

অর্থাৎ জাত-বিচার নেই তার। তার শ্রেণী চেতনা নেই। গোষ্ঠী চেতনা নেই। কথা বলার মানুষে পেলেই হলো। অমনি ঝাপিয়ে পড়া।

আর আলুর দোষ থাকার অর্থ না বলাই ভাল। পিতৃতান্ত্রিক ভাষারাজনীতিতে এ একটি শব্দ ছেলেদের উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হয়। তবে যেভাবে হাস্য রসাত্বক ভাবে শব্দটি ব্যবহার হয় তা শেষ পর্যন্ত ছেলেদের পক্ষেই যায়। তার মানে ছেলে হিসেবে জন্ম নিলে একটু আধটু আলুর দোষ থাকতে পারে। এটি প্রবল সামাজিক প্রথা দ্বারা সমর্থিত।

তবে আলু এবার আমাদের সামাজিক-আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক জীবনে নতুন দ্যোতনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ দ্যোতনাটি সম্ভবত সুখকর নয়। সুখকর হওয়ার কথা নয়। যে ভেতে বাঙ্গালী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আলুক নিরেট শব্জি হিসেবে ব্যবহার করেছে তাকে যদি বলা হয় আলুই তোমার প্রধান খাদ্য তাতে তার শুধু ক্ষধা নিবারণের আকাঙ্খাকে অবদমিত করা হয় না। একই সাথে তার হাজার বছরের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিকেও আঘাত করা হয়।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের বংশ পরষ্পরায় ব্যর্থতা ঢাকতে রাষ্ট্র পক্ষ আলু খাওয়ার প্রেসক্রিপশন নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু আলুর দাম আমাদের ক্রয় ক্ষমতার সাথে সংগতিপূর্ণ কি না তা বিচার করা হয় নি। তাছাড়া ক্ষুদা শুধু শরীর বৃত্তিয় একটি বিষয় নয়। এর একটি মনোজাগতিক কাঠামোও রয়েছে। যে কারণে গ্রামের মানুষ অনেক পিঠা-পায়েশ খেয়েও ভাত না খেলে খায়নি মনে করে।

সুতরাং আলুর নানা রেসিপি কি সত্যি আমাদের ক্ষুদা নিবারণ করবে নাকি আমাদের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতিকে আর প্রকটভাবে প্রকাশিত করবে। যারা আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাদের অন্দরমহলের খবর আমাদের মতো আমজনতার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাদের প্রতিদিনের মেনূতে আলুর পরিমাণ কতো এটা নিয়ে একটি গবেষণা হতে পারে। ইতোমধ্যে সামরিক বাহিনীর রেশনিং সিস্টেমে চালের পরিবর্তে আলু দেওয়ার দাবি তুলেছে কেউ কেউ। সব্জি হিসেবে আলু নিয়ে আমাদের আপত্তি থাকবার কথা নয়।

আলুর পুষ্টিগুণ নিয়েও আমাদের কোন সন্দেহ নেই। তবে আমাদের ভয় হচ্ছে আলু দিয়ে সম্ভাব্য অথবা চলমান নিরব দুর্ভিক্ষ ঠেকানের স্বপ্ন বিলাস নিয়ে। কেননা আলু খাওয়ার দাবিই প্রমাণ করে আমরা তথা কথিত গরিবি ঠেকানো আন্দোলনে পিছিয়ে পড়েছি। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। বর্তমান মূল্যস্ফিতি বজায় থাকলে সরকারের পক্ষে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

পিআরএসপির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। বিআইডিএস ইতোমধ্যে যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায় মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ভেঙ্গে পড়ছে। মানুষ নতুন করে মহাজনি ঋণে আবদ্ধ হচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত ঋণের মাত্রা বাড়ছে। মূলধনী পন্য যেমন হালের গরু ইত্যাদি বিক্রি করে দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় খাবারের পরিমাণ কমছে। তার মানে পুষ্টিও কমছে। একটি পুষ্টিহীন প্রজন্ম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কম পুষ্টি গ্রহণের কারণে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যু উভয় বাড়বে। তবু পাঁচতারা হোটেলে আল উৎসব জমতে থাকবে আমাদের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে, রাষ্ট্যীয় ও সামাজিক প্রক্রিয়ায় দরিদ্র হয়ে বেড়ে উঠাকে পরিহাস করবার জন্য।

এ পরিহাস আর কতদিন চলতে থাকবে!। বিধাতার কাছে প্রত্যাশা করি তিনি যেন আমাদের জীবনকে আলুময় করে না তোলে। আমরা আলোকময় হতে চাই। আর তার জন্য দরকার নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতা।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.