আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ভ্রমন 02

অতি দক্ষ মিথ্যুক না হলে সত্যবাদিতা উৎকৃষ্ট পন্থা

রূট নির্দিষ্ট হলো, প্রথমেই কোলকাতা যাওয়া হবে, সেখান থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে আগ্রা, সবাই জীবনে একবার তাজমহল দেখতে চায়, আমাদের ব্যাচ সবচেয়ে প্রেমময় ব্যাচ, প্রথম 2 বছরেই প্রায় গোটা 10 জুটি তৈরি হয়েছে, তারা সবাই বিবাহপূর্ব হানিমূনের স্বাদ নিবে, এক সাথে তাজমহলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে, কোনো ভাবেই তাজমহলের আবেদন কমানো গেলো না, সেখান থেকে কাশ্মির, তবে কাশ্মির বর্তমানে বিদেশী নাগরিকদের জন্য অপ্রবেশ্য তাই এর কাছেই রোটাংপাস, ভারত- চীন বর্ডারে যাওয়া হবে, সেখানে কুলু মানালি আছে, ওখান থেকে ফেরার পথে রাজস্থান হয়ে আবার কোলকাতা, এবং যেহেতু শিক্ষা ভ্রমন তাই সত্যেন বোস রিসার্চ ইন্সটিটিউট আর একটা আই আই টি ছিলো ভ্রমন তালিকায়। সেখানের গবেষকপ্রধানের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, দেশভ্রমন এবং শিক্ষা হাত ধরাধরি করে চলবে, আমরা সেখানে গবেষণা বিষয়ে জানবো। আমাদেরও গবেষণা করতে হবে, এটা একটা ভালো সুযোগ বিদেশী গবেষকদের সাথে সরাসরি কথা বলার। ভারত বিশাল দেশ, মরুভূমি, সাগর, পর্বত, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, আদতে সম্পুর্ন একটা মহাদেশই বলা যায় এটাকে। জনসংখ্যার বিচারে এটা কেয়কটা মহাদেশের তুলনায় বৃহৎ, উত্তর আমেরিকার মোট জনসংখ্যা, ইউরোপের মোট জনসংখ্যা, দক্ষিন আমেরিকার মোট জনসংখ্যা ভারতের তুলনায় কম।

আমরা যারা এশিয়ায় থাকি তাদের প্রজনন ক্ষমতা অসাধারন। পৃথিবীতে 600 কোটি মানুষ তার নিদেন পক্ষে 4/7 অংশ এখানে থাকে, ভারতের 115 কোটি, চীনের 140 কোটি, পাকিস্তানের 12 কোটি, ইন্দোনেশিয়ার 20 কোটি, বাংলাদেশের 14 কোটির হিসাব, এবং এরা রতিঃক্রিয়ার ক্লান্তিহীন। কোথাও একটা রিপোর্টে দেখেছিলাম সঙ্গমকালীন সময়ের হিসাবে এই এশিয়ার জনগন অনেক পিছিয়ে তবে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্গম কখনই উর্বরতার নিশান না, আমাদের সংগ্রামী ভাইদের দিকে তাকালেই বুঝা যায় তারা প্রাণপন প্রচেষ্টায় একে অন্যকে হারানোর প্রতিযোগীতায় ব্যাস্ত। রূট নির্ধারিত হওয়ার পর কয়েকজন ভ্রমনবিচিত্রার পাতা সংগ্রহ করে সেখানের দর্শনীয় এলাকা নির্ধারন করছে, কোথায় যাওয়া যায় সাইট সিয়িংএর জন্য, কেউ প্রাকৃতিক সৈন্দর্য্যের ভক্ত, কেউ স্থাপত্য কলায় আগ্রহী, এর মধ্যেই সাময়িকির জন্য লেখা আহবান করা হলো। লেখার যাচাই বাছাই-সম্পাদনাপর্ষদের অংশ আমি ছিলাম না, সবাই কিছু না কিছু লিখলো, মূলত স্মৃতিকথা ধাঁচের লেখাই বেশী , এসব বার্ষিকির লেখা পড়লে মাঝে মাঝেই শবানুগমনের ভাব মাথায় আসে, আমার জীবনকে পূর্ণতায় ভরে দিলো, জীবন যেমন কার্জন হলে, আমাদের ডিপার্টমেন্ট, কেনো তুমি সকাল বেলা ফিচকি দিয়ে গেলে, এর মাঝে ইংরেজিতেও 2-3টা লেখা দেওয়া হলো, কয়েকজন প্রফেসর তাদের গবেষনার বিষয়বস্তু নিয়েও লিখলেন, মনোমালিন্য হতে পারতো , তবে কারো দিলে রহম নাই, প্রফেসর সাহেব বিশাল একটা গবেষনা পরিচিতি লিখিছেন যার সম্পাদনার ক্ষমতা নেই, এমনিতে 64 পাতার সাময়িকি, এর উপরে শেষ 4 পাতায় ছাত্রদের ছবি, বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গাও অক্ষুন্ন রাখতে হবে, 2টা না 3টা ফুল পেজ বিজ্ঞাপন এসেছিলো, ওগুলোর জন্যও খালি জায়গা রাখতে হবে।

এসব কিছুই 64 পাতায় আঁটানোর কাজটা সহজ না, লবিং-গ্রুপিংএর ঝামেলা আছে, নিয়মিত লেখা ছাপা না হলেও হলবাসীদের লেখা ছাপতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। বেশ পরিকল্পনা, অনেক শ্রমঘন্টার অপচয় শেষে একদিন আসলো হাতে সেই সাময়িকি, ওটা বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে কিছু লেখা নাম হলেও খারাপ হতো না। প্রচুর বিজ্ঞাপন, অনেকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সময় শর্তসহ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, কিভাবে সাজানো হবে কিভাবে সাজালো তাদের মানরক্ষা হবে এসব স্পষ্ট নির্দেশনার ফলে সম্পাদকের স্বাধীনতাও ছিলো কম। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব ভ্রমন ভাতার অংশ হিসেবে কিছু দিয়েছিলেন, কিছু দিয়েছিলেন আরও একজন প্রাক্তন ছাত্র, এই অনুদান গুলো সবাইকে সমান ভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হলো। দিনক্ষন নির্দিষ্ট হলো, 15 দিনের সফর, তখন রোজার মাস, তাই ঈদের আগেই ফিরে আসতে হবে, অনেকের হিসাব তখন চাঁদের সাথে যুক্ত।

চাঁদ উঠার সময়সূচি দেখে ফেরার দিন নির্ধারিত হবে। যাত্রা শুরু হবে 24শে ডিসেম্বর। লিস্টে কারা কারা আছে নির্দিষ্ট হয় নি তখনও, অনেকেই আগ্রহী, তবে আমার মতো অনেক অভাগাই আছে যাদের সাথে অনেক দুরের কোনো শিল্পোদক্তার সম্পর্ক নেই, তাদের কারুরই মামা চাচা খালা ফুপু সম্পর্কিত কেউ নেই যাদের কাছে বিজ্ঞাপনের আব্দার করা যায়। তাদের গাঁটের পয়সা খরচ করে যেতে হবে, আর 9000 টাকা তখন অনেক অনেক টাকা। আমি বাসায় বলে রেখেছি, সেই টাকা আসবে কবে ঠিক নেই।

পাসপোর্টের খবর নিতে গিয়ে দেখা গেলো অনেকেরই পাসপোর্ট নেই, বিশাল আয়োজন করে গনপাসপোর্ট তৈরির অনুরোধ করা হলো, সবাইকে হাতে হাতে পাসপোর্টের ফর্ম দেওয়া হলো, সাথে 4 কপি ছবি আর 750 টাকা ফিস, সেইসব করার পথে জানা গেলো 750 টাকার পাসপোর্ট পাইতে কত সময় লাগে তার ঠিক নেই, একজনের পরিচিত ছিলো পাসপোর্ট অফিসের উঁচু কর্মকর্তা, তার দোহাই দিয়ে ব্যাবস্থা হলো। পুলিশ এনকোয়ারির সবটুকু দায় তিনি নিবেন, ফলে পাসপোর্টের ঝামেলা মিটলো। সবাই পাসপোর্ট হাতেও পেয়ে গেলো। এর পর যেই ভ্রমনসংস্থা টু্যরপ্লানিংয়ের দায়িত্বে ছিলো তাদের কাছে পাসপোর্ট সঁপে দেওয়া হলো, পাসপোর্টে 150 ডলার এনডোর্স করা হয়েছে,ভিসাও লাগানো হয়েছে, অথচ আমার টাকা আসার কোনো নামগন্ধ নেই, বিমর্ষ চিত্তে সবার সাথে ঘুরি। অবশেষে 23 তারিখে হাতে টাকা আসলো, সাথে বোনের দেওয়া কিছু টাকা, তার জন্য বই কিনতে হবে, এইসব এসেছে 23 তারিখ রাতে, তখন ডলার করার অবস্থা নেই।

সেই টাকা জমা দিয়ে ভ্রমন নিশ্চিত করে বাসা গিয়ে নিশ্চিত ঘুম দিয়েছি। পরদিন ইফতারির পরে বাস আসবে সেখান থেকে বেনাপোল, বেনাপোল থেকে কোলকাতা, বাস ভাড়া করা হয়েছে, সেই বাস থাকবে কার্জন হে, শার্প 9টায় বাস ছেড়ে যাবে। 24শে ডিসেম্বর সকাল থেকেই ব্যাস্ততা। আমার কোনো কালেই জুতা পড়ার অভ্যাস নেই, খেলা উপলক্ষে একটা কেডস ছিলো, সেটাও অতিব্যাবহারে জীর্ন, ভদ্্রসমাজে পড়ে বাইরে বের হওয়া যায় না। সম্বল চটি স্যান্ডেল।

আমার প্রিয় পুরোনো চটি, পায়ের সুখ, শীতের জায়গায় যাবো, সাথে গরম কাপড় নেই, মোটা জ্যাকেট কিনবো ভাবলাম কিন্তু তাও সম্ভব হলো না, তবে একটা জ্যাকেট কেনা হলো সেদিন, সেটার সাইজ আমার চেয়ে বড়, কিন্তু ওটা ছাড়া অন্য কোনো জ্যাকেট পছন্দ হয় নি, তাই বেখাপ্পা জ্যাকেটই সই, আমি তো ভারতে মডেলিং করতে যাচ্ছি না যে ফিটফাট বাবু সেজে থাকতে হবে। 15 দিনের অনুপাতে 3 জোড়া প্যান্ট আর টি শার্ট নেওয়া হলো, কিছু বই, একটা ব্যাগে সব ভড়ে আমি নিশ্চিত বাহির হইলাম। হলে গিয়ে ব্যাগ রেখেই আড্ডা, ইফতারির পর গেলাম তানভীরের বাসায়। আমাদের অনন্য তানভীর, আমি প্রায়শই তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টারত থাকি এবং সে আমাকে ঠিকই খুঁঝে বের করে, এই ইঁদুর বিড়াল খেলায় আমার ভুমিকা সম্ভবত ইঁদুরের। তাদের বাসায় যাওয়ার পর তানভীরের মায়ের অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হলো, তানভীরকে ভ্রমনকালীন সময়ে দেখে রাখার পবিত্র দায়িত্ব স্কন্ধে নিয়ে সেই বাসা ছাড়লাম।

( নেভার মাইন্ড, আমারে মাঝে মাঝে লোকজন দায়িত্ব দিয়ে থাকে। ) আমার ভ্রমন প্রস্তুতির মূল অংশ হলো কয়েক প্যাকেট সিগারেট কিনে নেওয়া। সেগুলোকে ব্যাগে ভরে, আবার সবাইকে বিদায় জানিয়ে 8.30এ কার্জন হলে উপস্থিত হলাম। তখন চুড়ান্ত সংখ্যা জানলাম, আমাদের সাথে মোট 52 জন যাচ্ছে, এদের ভেতরে 3 জন শিক্ষক এবং 2 জনের বৌ যাচ্ছে, আর বাকী সবাই আমরা আমরাই। 47 জন ছাত্রছাত্রি, 3 জন শিক্ষক এবং তাদের 2 জনের বৌ যাচ্ছে সাথে।

একজনের ইটালিয়ান বধু, অন্য জনের দেশি বধ তবে তার মা বিদেশীনি, আর সর্বশেষ অবিবাহিত স্যাম্পল আমাদের প্রিয় লিটু ভাই, সে বছরই জয়েন করেছে লেকচারার হিসেবে। আমাদের অনেকের সাথেই তার দহরম মহরম সম্পর্ক। বাসটাও বিশাল। আমরা বসার পরও প্রায় 10টার মতো সিট অবশিষ্ট থাকলো। সবার ব্যাগ উঠিয়ে, সবার ভ্রমন পরিকল্পনা জেনে, অনেক আশায় বুক বেঁধে আমরা রওনা হলাম 24শে ডিসেম্বর রাত 9 টা 15 তে।

শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের অটুট চিরদিন, আমরা ধুমপায়ীরা বাসের পেছনের দিকে বসে মুখাগি্ন করছি নিয়মিত, স্যারেরা গম্ভির মুখে সামনে তাকিয়ে। এবং এখানে ঢাকাবাসীর সংখ্যা খুব কম। আশফাকের প্রেমিকা আসবে না, তার অনুভীতি জিজ্ঞাসা করলাম, বললো ওর ইচ্ছা হয় নি ও আসে নাই, এই জন্য বিষন্ন হওয়ার কিছু নাই, আমি যাচ্ছি, উপভোগ করবো এর পর চলে আসবো। সেই যাত্রায় একটা বিষয় বুঝলাম মানুষের সাথে না মিশে মানুষকে বিচার করতে নেই। আশফাকের সাথে আমাদের বিশাল একটা দুরত্ব ছিলো, কারনটা আমি জানি না, শুধু জানি সে আমাদের আড্ডায় আসতো না ,ক্লাশের সময় ক্লাশের দেখা হতো কিন্তু এর পর ও ওর মতো থাকতো আমরা আমাদের মতো।

একটা বিরূপ ভাব ছিলো মনের ভেতরে। এই কয়দিনে দেখলাম ছেলেটা চমৎকার, শুধু চমৎকার বললে ভুল হবে আমার অনেক কটা প্রিয় বন্ধুর একজন এখন ও। তবে এই বন্ধুত্বের জন্য আর এই ভুলবুঝাবুঝির নিরসনের জন্য এই ভারতভ্রমনটা উল্লেখযোগ্য একটা বিষয়।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১৪ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।