আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কি বলা হয়েছে ?

আমরা এমন একটা পরিবেশ চাই, যেখানে শিশুরা তাদের পছন্দ-অপছন্দের ধাপগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে বড় হবে।

===ফয়সল সাইফ=== বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আস্তিক বা ধর্ম বিশ্বাসীদের ব্যাপারটা হলো এমন যে, তারা যেমন এক বা বহু সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তেমনি তারা বিশ্বাস করেন এক বা একাধিক ধর্মগ্রন্থ। সেক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাস এই ধর্মগ্রন্থ সমূহ তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে তাদের জীবনের বিধান রূপে এসেছে। এই ধর্মগ্রন্থের অনুশাসন তারা মেনে চলেন অথবা না চলেন সেটা বড় কথা নয়।

তবে, তারা সেটা শতভাগ বিশ্বাস করেন, এটাই সত্যি। এখন দেখা যাক প্রধান ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলো সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কি বলে? এখানে আমি ধর্মের অনুসারীদের আবেগের বশে মনমতো বিশ্বাসের কথা বাদ দিয়ে সোজা সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থগুলোর মৌলিক অবস্থান তুলে ধরব। ইসলাম ধর্ম: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ধর্মটির নাম হলো ইসলাম। এর অনুসারী বৃদ্ধির সংখ্যাও বিশ্বের অন্যান্য ধর্মগুলোর তুলনায় বেশি। এই ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম ‘আল-কোরআন’।

মুসলমানদের মতে এটি নাযিল হয়েছিল শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ওপর। এই ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র আল-কোরআনে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে সুন্দরভাবে তার উল্লেখ আছে: সুরা ইখলাস, আয়াত ১-৪: “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার সমতুল্য কেউ নেই”।

এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে ইসলাম ধর্মে সৃষ্টিকর্তা একজনই। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তার কোন সন্তান নেই। তার কোন পিতা-মাতাও নেই। এমনকি তার সমতুল্যও কেউ নেই।

এটাই হলো সংক্ষিপ্তভাবে ইসলাম ধর্মে মহান সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ধারণা। ইহুদী ধর্ম: ইহুদীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হলো বাইবেলের ওল্ড টেষ্টামেন্ট। এটাকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাদের সৃষ্টিকর্তার বাণী বলে বিশ্বাস করে। মুসমান সম্প্রদায়ের লোকেরাও বিশ্বাস করে এটা আদিতে তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছিল। যদিও তারা এখন এটার অনেকাংশই বিকৃত করে ফেলা হয়েছে বলে বিশ্বাস করে।

তার মানে এখন এটাতে সৃষ্টিকর্তার বাণী থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে। যাইহোক, দেখা যাক পবিত্র বাইবেলের ওল্ড টেষ্টমেন্ট সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কি বলে: এটার উল্লেখ আছে বুক অফ ডিটরনমি, অধ্যায় ৬ অনুচ্ছেদ ৪: “(মুসা বলছেন) হে ইস্রায়েল বাসী, আমাদের প্রভু মাত্র একজন”। তারপর আরও উল্লেখ আছে, বুক অফ ডিটরনমি, অধ্যায় ৫ অনুচ্ছেদ ৭-৮: “(ইশ্বর বলছেন) আমার পাশাপাশি তোমরা আর কারও ইবাদত করবে না। তোমরা মহান ইশ্বরের কোন প্রতিমূর্তি বানাবে না। যাকে তুলনা করা যায় আকাশের ওপরে কিছুর সাথে, নিচের পৃথিবীর কিছুর সাথে অথবা পানির নিচের কিছুর সাথে।

তোমরা তাদের সামনে নতজানু হবে না। তাদের সেবা করবে না। কারণ তোমাদের প্রভু খুবই প্রতিহিংসা পরায়ন”। ওপরের অনুচ্ছেদগুলো থেকে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের ওল্ড টেষ্টামেন্ট অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা একজনই। এ নিয়ে দ্বিমত পোষণের কিছু নেই।

খ্রিষ্টান ধর্ম: বর্তমান বিশ্বে ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্ট্যান্ট মিলিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক। এবং এই ধর্মের অনুসারী বৃদ্ধির সংখ্যা ইসলাম ধর্মের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। যদিও পার্থক্যটা বিশাল। এই ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পবিত্র বাইবেলের ওল্ড এবং নিউ উভয় টেষ্টামেন্টকেই মানা হয়। তবে, ওল্ড টেষ্টামেন্টের অনুসারী ইহুদীরা খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্টকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।

ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলমানরাও মানে বাইবেলের ওল্ড টেষ্টমেন্টের মতই বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্টও সৃষ্টিকর্তার বাণী ছিল। তবে, সময়ের সাথে সাথে এটারও অনেকাংশই বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। এখন এটাতে সৃষ্টিকর্তার বাণী থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে। দেখা যাক, পবিত্র বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্ট সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কি ধারণা দেয়। এটার উল্লেখ আছে গসপেল অফ ম্যাথিও: অধ্যায় ৪ অনুচ্ছেদ ১০: “তখন যীশু তাকে (শয়তানকে) বললেন, দূর হও, শয়তান।

পাক কিতাবে লেখা আছে-প্রভু যিনি তোমার ইশ্বর, তাকে তুমি সেজদা করবে। তারই কেবল সেবা করবে”। খুবই সাধারণ ভাবে আমরা এই অনুচ্ছেদ থেকে বুঝতে পারি যে যীশু প্রভুকে মানে সৃষ্টিকর্তাকে একজনই বলে উল্লেখ করেছেন। এবং শুধু তারই উপাসনা করতে বলেছেন। তবে, এখানে খ্রিষ্টানরা ভিন্নমত পোষণ করবে।

যদিও আমি মনে করি তাদের চার্চের কথা নয়, বিচারের জন্য আমার কাছে বাইবেলই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা যদি বাইবেল দিয়ে সৃষ্টিকর্তার সংখ্যা প্রমাণ করতে আসে তাহলে আমি এ নিয়ে আর একটা নোট লিখতে রাজি। হিন্দু ধর্ম: পৃথিবীর মানচিত্রে হিন্দু ধর্মের অনুসারীর সংখ্যাও বিশাল। এটাকে বলা হয় সনাতন ধর্ম। এর ইতিহাসও প্রাচীন।

এই ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের সংখ্যাও অনেক। তবে, এগুলোর মধ্যে বেদগুলো এবং উপনিষাধগুলোকে মানা হয় সবচেয়ে বিশুদ্ধ বলে। সাধারণ হিন্দুরা বেশি মানে শ্রীমাদ ভগবত গীতাকে। এটাও হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে একটি। তবে, এর বিষয়বস্তু বেদ বা উপনিষাদগুলোর মতো এতো ব্যাপক নয়।

এবার দেখা যাক হিন্দু ধর্মে মহান সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কি ধারণা দেওয়া হয়েছে। এর উল্লেখ পাওয়া যায় বহু জায়গায়। শ্বেতাশ্বত্বর উপনিষাধে উল্লেখ আছে, অধ্যায় ৪ অনুচ্ছেদ ১৯: “সর্বশক্তিমান ইশ্বরের কোন প্রতিমূর্তি নেই”। অধ্যায় ৪ অনুচ্ছেদ ২০: “সর্বশক্তিমান ইশ্বরকে কেউ দেখতে পায় না”। তারপর অধ্যায় ৬ অনুচ্ছেদ ৯ এ উল্লেখ করা হয়েছে “সর্বশক্তিমান ইশ্বরের কোন মা-বাবা নেই।

তার কোন প্রভু বা সৃষ্টিকর্তা নেই”। এ সম্পর্কে জুজুর্বেদেও উল্লেখ আছে। অধ্যায় ৩২ অনুচ্ছেদ ৩: “সর্বশক্তিমান ইশ্বরের কোনো মূর্তি নেই”। অধ্যায় ৪০ অনুচ্ছেদ ৮: “সর্বশক্তিমান ইশ্বর নিরাকার ও পবিত্র”। অধ্যায় ৪০ অনুচ্ছেদ ৯: “যারা প্রাকৃতিক বস্তুর পূজা করে তারা অন্ধকারে প্রবেশ করে।

যারা মানুষের তৈরী বস্তুর পূজা করে তারা আরও অন্ধকারে প্রবেশ করে”। হিন্দু ধর্মের বিশুদ্ধ দুই ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী এটাই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সর্বশক্তিমান ইশ্বর মাত্র একজনই। আর এক ইশ্বরেরই পূজা করা উচিত। তবে, বেশির ভাগ হিন্দুরা যদি এটা মানতে না চায়, তারা যদি বলে তারা শ্রীমাদ ভগবত গীতাকে অনুসরণ করে চলে তাহলেও তাদের এক ইশ্বরেরই পূজা করা উচিত। এটার উল্লেখ আছে শ্রীমাদ ভগবত গীতা: অধ্যায় ৭ স্লোক ২০-২৩: “জাগতিক কামনা-বাসনা যাদের অন্তরকে গ্রাস করেছে সেই সব অল্পবু্দ্ধি সম্পন্ন লোকেরা আমার (শ্রীকৃষ্ণ) উপাসনা না করে বিভিন্ন অপদেবতার উপাসনা করে।

তারা তাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী নিজস্ব নিয়মে উপাসনার পদ্ধতি অনুসরণ করে। মূলত তারা তাদের উপাসকদের কাছে যা চায় তা আমিই দান করি। ফলে যারা অপদেবতাদের কাছে চায় তারা শুধু তা-ই পায়। আর যারা আমার কাছে চায় তারা আমাকে পায়”। এখানে উপরোক্ত স্লোকগুলো থেকে বুঝা যায় যে, যদি শ্রীকৃষ্ণকেই সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা মানা হয় তবে, হিন্দুদের উচিত সব দেবতাদের বাদ দিয়ে কেবল তারই উপাসনা করা।

যদিও হিন্দু ধর্মের দলিল অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা হতে পারেন কি-না তা অন্য বিতর্কের বিষয়। তা নিয়ে আর একটা লেখা হতে পারে। তবে, এটা এখানেই শেষ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ৩৩ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.