আজ রাতে আমার তেমন কোন কাজ নেই । এই কয়েকদিনে মালসব এসে পৌছে গেছে। মাল মানে ককটেল! সবগুলা খয়েরি রঙের বাক্সে বাক্সে সাজিয়ে সার দিয়ে রাখা আমার সামনে । পুরো ফ্ল্যাটটাতে আমি একা । আমার সাথে আজকে ইব্রাহিমের থাকার কথা ছিল।
কিন্তু হঠাত করে স্ত্রীর পেটে ব্যাথা উঠেছে । বাচ্চা হবে । আমাকে কাকুতি মিনটি করে বলল, ভাই রাহেলা খুব করে চায় যেন স্বাধীন জন্মের সময় আমি ওর হাত শক্ত করে ধরে রাখি। ওর নাকি খুব ভয় লাগে!
আমি বললাম, স্বাধীন কি তোমার ছেলের নাম?
সে লাজুক খানিকটা হেসে নিয়ে বলল, জ্বি ভাই! আমি রাখছি । স্বাধীন দেশে আমার ছেলেটা স্বাধীন ভাবে বড় হবে, আমার মত ককটেল ফুটিয়ে বেড়াবে না ।
তাই ওর নাম স্বাধীন ! তারপর আবার নিজেই কথা থামিয়ে বলল, ধুত্তুরি এই চুদুর বুদুর স্বাধীনতার আমি খেতা পুড়ি! এর নাম যদি স্বাধীনতা হয় তাইলে আমার ছেলের নাম্ম আমি রাখবো রাজাকার! তাতে কার বাপের কি?!
-কথায় লজিক আছে ইব্রাহিম! স্বাধিনতার জনক যদি তার সন্তানের নাম ‘রাজাকার’ রাখে তাতে কার বাপের কি?!
আচ্ছা, শিখন ভাই, আমার ছেলের একটা নাম রেখে দিবেন?!
-হুম, দিব। নাম রাখা আমার পছন্দের বিষয়। তোমার ছেলের নাম রাখো ‘মানচিত্র’
ইব্রাহিম একগাল হেসে বলল, অবশ্যি ভাই! আমার ছেলের নাম আখন থেইক্যা মানচিত্রই হইব । তাইলে ভাই অনুমতি আমি এখন যাই। মন কেমুন করতাছে।
রাহেলাটা আবার বড্ড ভীতু!
-আচ্ছা যাও!
তারপর থেকে আমি বসে বসে একটা মানচিত্র আকার চেষ্টা করছি । মানুষের মানচিত্র! একের পর এক ককটেল সাজিয়ে সাজিয়ে অদ্ভুত ভাবে আঁকাআঁকির চেষ্টা ঠিকযেভাবে সাগরতীরে প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালবাসার চিহ্ন আঁকে সেভাবে! মানবিক ব্যাপারগুলো আমি অত ভালো বুঝি না । মানচিত্র মানেই আমার কাছে বাংলাদেশর মানচিত্র। তাই যতবার ই আমি ককটেল গুলো উলট পালট করে পাশাপাশি সাজাচ্ছি ততবারি মানচিত্রটা ঘুরে ফিরে বাংলাদেশের হয়ে যাচ্ছে! ককটেল দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র!! হায় খোদা!!
*** **** **** **** ****
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মৃন্ময়ী হিসেব মিলেতে পারছে না। চিবুকের একটা বিশেষ জায়গায় সে ক্রমাগত হাত বুলিয়ে চলেছে ।
গতবিশ বছর সে যতবার নিজেকে দেখেছে ততবার এখানে একটা ছোট্ট তিল ছিল । আজ হঠাত করে সে তিলটা নেই!! এটা কি করে হতে পারে বিশ বছরের একটা তিল হঠাত করে গায়েব?!
*** **** **** **** ****
কপালের ডানপাশটায় সেই কবে ছেলেবেলায় মা কাজল দিয়ে একটা একটা চাঁদ এঁকে দিতেন যাতে কারো নজর না লাগে তা এখন আর ঠিকঠাক মনে পড়ে না। অনেক দিনের অনভ্যাসে অনেক বড় হয়ে গেছি । কিন্তু সকালবেলা এসে ইব্রাহিম ভ্রু কুঞ্চিত হেসে বলল, ভাই আপনার কপালে নজর না লাগার চাঁদ আবার কেডায় আইক্কা দিল?! তারপর থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমিও হিসেব মেলাতে পারছি না!
*** **** **** **** ****
মোড়ের মাথাটা ধোঁয়ায় অন্ধকার । পরপর ৪-৫ টা ককটেল ফুটেছে ।
কবে আমিও রাস্তার মোড়ে মরে পড়ে থাকবো ঠিক নেই। আশ্চর্যজনকভাবে সব মানুষের রক্তই আশ্চর্যজনকভাবে বড্ড মাটি অভিমুখী । পিচ ঢালা কালো পথ লাল হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। আচ্ছা আমি কি একটা হৃদয় চাইতে পারি শেষ দুফোটা রক্ত মাটিতে না পড়তে দিয়ে কারো হৃদয়ে ফেলার জন্য?
*** **** **** **** ****
এই রাতে আমার অনেক কাজ!ইব্রাহিম পাথর হয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। হাসপাতালের রিলিজ ডেট এ রাহেলা বেগম মানচিত্রকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় কে বা কারা ককটেল মেরেছিল।
মানচিত্র মারা গেছে! আমাকে একটা কবর খুঁড়তে হবে। দাফনের কাপড় কিনতে হবে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের দাফনের কাপড় কই পাওয়া যায় আমি কিছুতেই ভেবে বের করতে পারছি না । আচ্ছা, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের দাফনের কাপড় কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।