আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মন্থন, ১৯৭৬


ভারতের গুজরাট রাজ্যের খেরা জেলার কোন এক গ্রামের স্টেশনে কেবল পা রাখলেন পশু চিকিৎসক ডক্টর মনোহর রাও। একটি হাড় জিরজিরে ঘোড়া গাড়িতে তাঁকে তাঁর বাংলোয় নিয়ে যাবার ব্যাবস্থা হয়েছে। স্টেশন থেকে বাংলো যাবার এই একমাত্র ব্যাবস্থা। হঠাৎ এমন দুর্বল ঘোড়া দেখে ডক্টর রাও মনে কষ্ট পান। পশু চিকিৎসক পশু অত্যাচার মানবেন কেন? সঙ্গীদের অবাক করে দিয়ে তিনি হেঁটেই বাংলো যাবার জন্য মনস্থির করেন।


পেশায় ডক্টর রাও একজন পশু চিকিৎসক হলেও তিনি এই এলাকায় এসেছেন একটি বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে। গুজরাটের এইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বহু মানুষের একমাত্র পেশা হচ্ছে দুধ বিক্রি। আর এই দুধের ক্রেতা হচ্ছে এতদঞ্চলের উঁচু জাতের শোষক শ্রেণী আর এই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে আছেন জনাব মিশ্র সাহেব। যুগ যুগ ধরে এইসব মিশ্র সাহেবদের শোষণের ক্ষেত্র হচ্ছে গ্রামের অসহায় নিম্ন জাতের হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। মিশ্র সাহেব তাঁদেরকে উচ্চসুদের ঋণ দেন মহিষ কেনার জন্য।

আবার সেই মহিষের দুধ তিনি অতি স্বল্প মূল্যে কিনে নেন তাঁদের কাছ থেকে। আর এমনতর শোষণের এই ধারা উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
ডক্টর রাও এবং তাঁর সংগঠন শোষকদের খপ্পর থেকে এই অসহায় দুগ্ধ উৎপাদনকারীদের মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এসেছেন এই জেলায়, এই গ্রামে। তিনি একজন দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন আধুনিক এবং আদর্শবাদী মানুষ। এইসব পেশাজীবী মানুষদের নিয়ে তিনি একটি সমিতি নির্মাণ করতে চান।

সমবায় সমিতি। দুধের পরিমান নয় বরং দুধের মান অনুযায়ী দুধের দাম নির্ধারণ করতে চান তিনি সমবায় সমিতি নির্মাণের মধ্য দিয়ে। আধুনিক পদ্ধতিতে দুধের মান নিরূপণ করে তিনি দেখেছেন, এই এলাকার মহিষ থেকে যে দুধ হয়, তাঁর ফ্যাটের পরিমান খুব ভাল। কিন্তু শুধু দুধের উচ্চমুল্য নয়, তিনি কিংবা তাঁর সংগঠন চান এই দুগ্ধ সমিতির মালিক হন এই দুগ্ধ সম্প্রদায়। আর হয়ত এভাবেই তারা নিজেদের জীবন নিজেদের মতন করে সাজাতে সক্ষম হবেন, দূর হবে তাঁদের আজন্ম পিড়ীত দারিদ্র আর একইসাথে তারা মুক্ত হবেন মিশ্র সাহেবদের কবল থেকে।


প্রথমে তাঁর এবং তাঁর সহযোগীদের কাজ হয় গ্রামে ব্যাপক আকারে গণসংযোগ। তবে খুব সহজ হয়না তাঁদের এই কাজ। তাঁরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শহুরে তরুণ। তাদের পোশাক ভিন্ন, কথা বলার ঢং আলাদা। গ্রামবাসীরা ডক্টর রাও এবং তাঁর সহযোগীদের কথা শুনতে পছন্দ করলেও তাঁদের আস্থার জায়গায় নিতে চান না।

এমন অবিশ্বাসীদের তালিকায় প্রথমে আছেন বাউন্ডুলে স্বভাবের এক তরুণ ভোলা। ভোলা বাউন্ডুলে হলে কি হবে, সে তাঁর সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় ষোলো আনা সচেতন। সে এইসব শহুরে মানুষদের কথাকে মিষ্টি মিষ্টি গালগল্প বলে মনে করে। কিন্তু ডক্টর রাও জানেন, সমিতি করতে হলে ভোলাকে দলে না ভেড়ালে তাঁদের কাজ হবেনা। তাঁর মাঝে রাও দেখেন এক সহজাত নেতৃত্বের গুন আর অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা।

তাছাড়া হরিজন সম্প্রদায়কে কাছে না টানলে তাঁদের উদ্দেশ্যই তো সফল হবেনা।
ভোলা ছাড়াও আছে বিন্দু নামক এক স্বামী খেদানো এক বাচ্চার মা। বেশ মেজাজি মহিলা সে। স্বামী তাঁর ছয় মাস পর পর কোথা থেকে উদয় হয় আবার কোথায় হারিয়ে যায় ঠিক নেই। বিন্দু প্রথম প্রথম রাও সাহেবের কথা বিশ্বাস না করলেও মিশ্র সাহেবের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পরে একটু একটু করে তাঁর দলে ভিড়তে থাকে।


ভোলা আর বিন্দু ছাড়াও রয়েছেন এই এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান। তিনি উঁচু জাতের প্রতিনিধি, এই এলাকার নির্বাচিত গোত্র প্রধান। তবে গোত্রের সুবিধা অসুবিধা দেখার চাইতে পাওয়ার পলিটিক্সের প্রতি ঝোঁক বেশী তাঁর। ডক্টর রাওয়ের দিকে শুরুতে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এই ভরসায়, যে কোনমতে তিনি যদি একবার এই সমিতির প্রধান হতে পারেন তাহলে এই গোত্রের প্রতি আরও বেশী করে কর্তৃত্ব করার সুযোগ পাবেন। ডক্টর রাও অবশ্য বুঝতে পারেন তাঁর এই রাজনীতি।

এইজন্যই তিনি ভোলাকে এই সমিতিতে চান আরও বেশী করে।
ডক্টর রাও একা নন, তাঁর একটি টিম রয়েছে তাঁর সংগঠনের কাজ সফল করার জন্য। এই টিমে আছে জনাব দেশমুখ, তাঁর ডান হাত। আর আছেন চন্দ্রভারকার। চন্দ্রভারকার তরুণ সমাজ সেবী, কিন্তু প্রেমে পড়ে যায় এই এলাকার এক নিম্নবর্ণের নারীর সাথে।

মেয়েটির সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার এক ফাঁকে জানাজানি হয়ে গেলে ডক্টর রায়দের পুরো কাজে ব্যাপক বিপদ নেমে আসে। উপায়ন্তর না দেখে রাও চন্দ্রভারকারকে তাৎক্ষনিকভাবে ভাগিয়ে দেন এলাকা থেকে। ডক্টর রাওয়ের এই কাজে খুশী হয়ে ভোলা ভিড়ে যায় সমিতি নির্মাণের সাথে।
সময়ের সাথে সাথে মিশ্র সাহেবের দুধের ব্যাবসা লাটে উঠতে থাকে, আর সমিতির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এদিকে পশু চিকিৎসক হলেও বাধ্য হয়ে ডক্টর রায়কে কিছু রুগীও দেখতে হয় বলে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তিনি এই গ্রামে।

এদিকে ডক্টর রাও আর বিন্দুর মাঝে এক অব্যাক্ত অনুরাগের জন্ম নেয়। এরই মাঝে হঠাৎ বিন্দুর স্বামীর আচমকা আগমন ঘটে। শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসেন রাও সাহেবের পত্নীও। এদিকে সমিতি প্রধানের নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসে। নির্বাচনে দাঁড়ান পঞ্চায়েত প্রধান আর হরিজন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ভোলার বন্ধু।

আর এই নির্বাচনে জিতে যান ভোলারা।
কি হয় তারপর? মিশ্র সাহেবরা কি ছেড়ে দেবেন তাঁদের শোষণের ক্ষেত্র এত সহজে? পঞ্চায়েত প্রধান কি মেনে নেবেন তাঁর এই পরাজয়? না, এসবের কিছুই হয়না। উভয় পক্ষের ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকার হন বিন্দু, ভোলা, ডক্টর রাও এবং তাঁদের সমবায় সমিতি নির্মাণের আকাংখা। বাক্স পেঁটরা এবং স্ত্রী সহ ডক্টর রাও রওনা দেন স্টেশনের দিকে। খবর শুনে দিশেহারা হয়ে ভোলা ছুটে আসে স্টেশনের দিকে।

শেষরক্ষা হয়না। কালো ধোঁয়া উড়তে উড়তে ট্রেন স্টেশন ছাড়া হয়। চলে যান ডক্টর রাও।
তবে ডক্টর রাও চলে গেলেও তিনি তাঁর আদর্শের বীজ ঠিকই বুনে যান ভোলা, বিন্দুদের অন্তরে। ভোলারা তাঁর রচিত সমবায় সমিতিকে পুনঃ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন তাঁদের গ্রামে।


আর এইরকম আখ্যান নিয়েই নির্মিত হয়েছে ভারতের এক কালজয়ী চলচ্চিত্র মন্থন। এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন শ্যাম বেনেগাল। আর চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র হিসেবে যে ডক্টর রাওকে আমরা দেখি, তিনি আর কেউ নন, "মিল্কম্যান অফ ইন্ডিয়া" স্বয়ং ডক্টর ভের্গেজ কুরিয়েন, এই চলচ্চিত্রের যৌথ কাহিনীকারের একজন।
গত শতকের সত্তরের দশকে ভারত সরকার 'অপারেশন ফ্লাড' নামক একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এটি ছিল তখন বিশ্বের সবচাইতে বড় কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প।

আর এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হয় ডক্টর ভের্গেজ কুরিয়েন কে। ভারত সরকার ১৯৪৬ সালে দুগ্ধ সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও এই কর্মক্ষেত্রে কুরিয়েনের পদার্পণের আগে তেমন সাফল্য রচিত হয়নি। কুরিয়েন গুজরাটের আমুল নামক সমবায় সমিতির পরিচালনার দায়িত্ব হাতে পাবার পর এক অসাধারণ কাজ করে ফেলেন। তার নেতৃত্বে বিশ্বে সর্বপ্রথম মহিষের দুধ থেকে দুধ পাউডার প্রস্তুত করা হয়। এর আগে পুরো জগতে কেবল গরুর দুধ দিয়েই দুধ পাউডার তৈয়ার হত।

আর এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে ভারতের দুগ্ধ শিল্পে বিপুল পরিবর্তন আসে। তাঁর এই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তাকে ১৯৬৫ সালে ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তি দেন। তাঁর প্রথম কাজ হয় আমুলের আদলে এরকম সমবায় সমিতি পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেয়া। কুরিয়েনের সঠিক দিক নির্দেশনা এবং উদ্যমী প্রেরণায় যেন জেগে ওঠে এই প্রকল্প। ঋণের দায়ে জর্জরিত এই শতাব্দী প্রাচীন ব্যাবসা যখন অস্তিত্বের হুমকির সম্মুখীন তখন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং শক্ত মনোবলের এই মানুষটি দুগ্ধ শিল্পে নতুন দিগন্তের সুচনা করেন।

তিনি এইসব সমিতির মাঝে যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি আনলেন আধুনিক পেশাদারিত্ব। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় আমুল এর দেখেদেখি গোটা ভারতে এমন সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠা করা গেলো। আর এভাবেই ভারত দুগ্ধ আমদানিকারক দেশ থেকে দুগ্ধ রপ্তানিকারক দেশে পরিনত হল। মন্থন চলচ্চিত্রটি ঠিক এমনই একটি প্রেক্ষাপট থেকে নির্মিত হয়েছে।


কুরিয়েন সাহেব এবং তাঁর সমমনা মানুষগুলি চেয়েছিলেন দুধ যারা উৎপাদন করে তাঁদের নিয়ন্ত্রণেই ব্যাবসাটি পরিচালিত হোক আর এর মালিকানা এবং কর্তৃত্ব তারা ভোগ করুক। সমবায় সমিতির এই মূল আদর্শের জায়গাটি ঠিক রেখে তারা এই ব্যাবসার যোগান এবং বণ্টনে আনতে চেয়েছিলেন আধুনিক পেশাদারিত্ব। সাধারন প্রযুক্তি এবং উন্নততর বণ্টন ব্যাবস্থা- এই দুটিকে সঙ্গী করে তারা সমবায় সমিতিকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। তাঁদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা হলেন সমিতির মালিক; ব্যাবস্থাপক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী। তবে দুগ্ধ উৎপাদনের পর তা থেকে ভোগ্যপণ্য নির্মানের পূর্ব পর্যন্ত সব কাজের দায়িত্ব নিলেন পেশাজীবীরা আর লাভের অংশ গেলো দুগ্ধ উৎপাদনকারীদের ঘরে।

কুরিয়েনের দক্ষ নেতৃত্বে, দূরদর্শী চিন্তায় যুগান্তকারী সাফল্য এল সমবায় সমিতির ধারণায়। আর এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পরিচিতি পান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমবায় সমিতি চিন্তাবিদ এবং প্রয়োগকারী হিসেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার রচিত সমবায় সমিতির মডেল কার্যকরী হতে শুরু করে। আর তিনিও ভারতে পরিচিত হয়ে উঠলেন 'মিল্কম্যান অফ ইন্ডিয়া' হিসেবে।
শ্যাম বেনেগাল সত্তরের দশকে ভারতীয় নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণকারীদের ভেতর অগ্রগন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

নিম্নবর্গীয় মানুষ, গ্রাম্য রাজনীতি, বর্ণ প্রথা এবং তাঁর নির্মম শিকার গ্রামের দরিদ্র জনসাধারন এইসব নিয়ে ইতিমধ্যেই তাঁর দুটি চলচ্চিত্র অংকুর এবং নিশান্ত ইতিমধ্যে সাড়া জাগিয়েছে সিনেমাপ্রেমীদের মনে। মূলত বিজ্ঞাপন জগত থেকেই চলচ্চিত্র নিমানে অগ্রণী হয়েছিলেন এইতরুণ। এর আগে আমুল পন্যের বিজ্ঞাপন বানিয়েছেন এবং অপারেশন ফ্লাড নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। কুরিয়েন সাহেবের জীবন এবং কর্ম তাঁর অজানা নয়। কিন্ত শুধু নিছক একটি আত্মজীবনী তিনি পর্দায় উপস্থাপন করতে চান নি।

তিনি চেয়েছেন তৎকালীন গুজরাটের দুগ্ধ উৎপাদনকারীদের সমাজ এবং জীবনের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি আর তাঁদের সংগ্রামকে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে ধরতে। সেই সাথে সমবায় সমিতির ভাবনাকে সিনেমার কেন্দ্র নয়, পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত করতে। তাই তিনি শরনাপন্ন হন খোদ কুরিয়েন সাহেবের কাছেই। যৌথভাবে তাঁরা মন্থন চলচ্চিত্রের গল্পটি লিখে ফেলেন।
গল্প লেখা তো হয়ে গেলো কিন্তু এই চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নি করবে কে? কুরিয়েন সাহেব বেনেগাল কে জানিয়ে দিলেন এই চলচ্চিত্রে অর্থের যোগান দেবেন সেইসব দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা যারা এই চলচ্চিত্রের প্রধান পাত্র-পাত্রী।

কুরিয়েন তাঁর এই প্রস্তাব সমিতির কাছে পেশ করতেই ৫ লক্ষ দুগ্ধ উৎপাদনকারী রাজী হয়ে গেলেন। তাঁরা সবাই দুই রুপী করে জমা দিলেন। এভাবেই ১০ লক্ষ রুপীর সংস্থান হয়ে গেলো অল্প সময়ে আর শুরু হল চলচ্চিত্রের শুটিং। একে একে শ্যাম বেনেগাল আনলেন ভারতের শ্রেষ্ঠ কলা কুশলীদের। সংলাপ রচনা করলেন কাইফি আজমি, চিত্রনাট্য লিখলেন বিজয় টেন্ডুলকার, সিনেমাটোগ্রাফি করলেন গোবিন্দ নিহালনি, সঙ্গীতে বানরাজ ভাটিয়া।

আর অভিনয় কারা করেছিলেন একটু দেখা যাক।
গিরিশ করনাড- ডক্টর রাও স্মিতা পাতিল- বিন্দু নাসিরুদ্দিন শাহ্‌- ভোলা মোহন আগাসে- দেশমুখ অনন্ত নাগ- অভয়ঙ্কর কুলভূষণ খরবান্দা- পঞ্চায়েত প্রধান অমরিশ পুরি- মিশ্র সাহেব
বানিজ্যিক ছবির ছায়া বহির্ভূত শিল্পীদের অভিনয় সমৃদ্ধ এই মন্থন চলচ্চিত্রটি। আজ এই কলা-কুশলীদের প্রত্যেকেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেরা অভিনয় শিল্পী হিসেবে কম বেশী স্বীকৃত। শুধু চলচ্চিত্র নয়, মঞ্চে দাপটের সাথে অভিনয় করেছেন এদের অনেকেই। কিন্তু তাঁরা যখন এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তখন দর্শকদের কাছে তাঁরা তেমন পরিচিত ছিলেন না।

তবে কি অভিনয়টাই না করেছেন এরা সবাই! বিশেষ করে নাসিরুদ্দিন শাহ্‌ এবং স্মিতা পাতিলের অভিনয় দেখে এই চলচ্চিত্র থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল হয়ে যায়! স্বামী পরিত্যাক্তা মেজাজি নারীর চরিত্রে স্মিতা প্রায় অবিশ্বাস্য অভিনয় করেছেন। তাঁর নানান এক্সপ্রেশন দ্যুতি ছড়িয়েছে পুরো চলচ্চিত্রে। আর বাউন্ডুলে ভোলা চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ্‌ যেন বাকি সবাইকে ম্লান করে দিয়েছেন।
মন্থন চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। মুক্তির পরপরই ব্যাপক সাফল্য পায় ছবিটি।

গুজরাটের গ্রামের দুগ্ধ উৎপাদকারীরা দলে দলে পেক্ষাগৃহে দেখতে আসেন 'তাঁদের' এই সিনেমা। সিনেমাটি পরে ভারতে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরষ্কার জয় করে। যে ছবি নির্মাণ করে ৫ লক্ষ দুগ্ধ উৎপাদনকারী তাঁর গায়ে এক ফোঁটা জল মেশাননি শ্যাম বেনেগাল এবং কুরিয়েন। তাঁরা গোটা ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে এই চলচ্চিত্র দেখার ব্যাবস্থা করেছেন। একটি খাঁটি সিনেমা হিসেবে শুধু স্বীকৃতিই পায়নি মন্থন, চলচ্চিত্র মুক্তির ৩৭ বছর পরেও এই সিনেমার গায়ে যেন সময়ের দাগ পরেনি।

আজও ভোলা, বিন্দু কিংবা ডক্টর রাওকে দেখে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। আর বারবার কানে বাজতে থাকে প্রীতি সাগর গীত এই সিনেমার একটি মাত্র অসামান্য ফোক গান, মেরো গাম কাথা পারে...............
এই চলচ্চিত্র গ্রামাঞ্চলের শোষণ বঞ্চনার একটি বিশ্বস্ত দলিল হয়ে রয়েছে আজ অব্ধি। ইচ্ছাপূরণের গল্প এটি নয়। সাফল্য গাঁথাও দেখানো হয়নি এই চলচ্চিত্রে। এটি মানুষের সংগ্রামের চিত্র, স্বপ্নের চিত্র আর সর্বোপরি মানুষের ঐক্যের চিত্র।

ডক্টর রাওয়ের মতন আদর্শবাদী মানুষ এই চলচ্চিত্রে ব্যার্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেছেন কিন্তু তাঁরা স্বপ্নের যে বীজ বপন করেছেন সেই গ্রামে ,তাঁর সুফল ভোগ করছে সেই গ্রামের মানুষ। তাঁরা নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন পরিবর্তনের ভার। আর এটাই তো ডক্টর রাও ওরফে ডক্টর ভের্গেজ কুরিয়েন চেয়েছিলেন!
মন্থন চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ডক্টর রাও চরিত্রে রূপ দানকারী গিরিশ করনাড

সোর্স: http://www.sachalayatan.com/

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।