আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আব্বা

সুখীমানুষ আব্বা দিবস কেউ বলছেন না, সবাই বলছেন আজ বাবা দিবস। কিন্তু আমরা ভাইবোনরা তো আব্বা ডাকি! মাকে বলি তুমি করে, আব্বাকে আপনি। সম্বোধন দেখেই আন্দাজ করা যায়, আব্বার সাথে আমাদের দূরত্বটা একটু বেশী, ভয়টাও। আব্বা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। বাড়ী থেকে অনেক দূরে স্কুল।

আমরা ঘুমে থাকতেই আব্বা রওয়ানা দিয়ে দিতেন স্কুলে। সন্ধার পর ফিরতেন ক্লান্ত হয়ে। অন্য মানুষের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে গড়তে গিয়ে আব্বা নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি কোনদিনই নজর দিতে পারেননি। আমরা পড়াশুনা যা শিখেছি সব নিজে নিজে। ১৯৮৫/৮৬ সালের কথা, প‌্যানাসনিক এর ৩ ব্যান্ড রেডিও তখন সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র।

দুইটা সানলাইট ব্যাটারি দিয়ে চলে। বাসায় একটা ৬ ভোল্টের রিচার্জেবল ব্যাটারিও ছিলো, ভাইয়ার ক্যাসেট প্ল্যায়ারেরর। এই ব্যাটারিগুলো দুই ভোল্ট করে করে সেল আকারে থাকে (বর্তমানের আইপিএসএর ১২ ভোল্ট ব্যাটারির মত)। আমার মাথায় বুদ্ধ গেল, এই ব্যাটারি দিয়ে কিভাবে রেডিও চালাতে হয়। তার দিয়ে সরাসরি ৬ ভোল্টের কানেকশান দিলাম রেডিওতে।

তখনও নেগেটিভ পজিটিভ বুঝি না। যা হবার তাই হলো, ধূয়ার কুন্ডলি। মাই ডেডিজ রেডিও ইউ ডেড। হাত পা ফ্রিজ হয়ে গেলো। সারা দিন যত ভয় ও উৎকণ্ঠায় কেটেছে তা লেখায় প্রকাশ করা যাবে না।

আব্বা সন্ধায় এসে বিবিসি শুনতে যাবেন, গিয়ে দেখেন রেডিও চলে না। মা ভয়ে ভয়ে বল্লেন। গল্প লেখার জন্য লেখলে হয়ত বলা যেত, আব্বা তখন হু হু করে হেসে ওঠে বল্লেন, কই আমার ইঞ্জিনিয়ার পুলা কই। কিন্তু গল্পতো লেখছিনা তাই মনে যতদূর আছে অতদূরই বলছি। আব্বা আমাকে ব্যাটারির কাছে গিয়ে নেগেটিভ পজিটিভ দেখিয়ে দিলেন।

আমার নন ইঞ্জিনিয়ার বাবা তার ভিবষ্যৎ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারকে আরো হয়ত অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। আজ আর তা মনে নাই। সম্ভবত এই প্রথম বুঝলাম যে আব্বাকে ভয় পাবার কিছু নাই। আব্বার হাতে মাইর খাওয়া বলতে একবারের স্মৃতিই মনে পড়ছে। ইকোনো ডি.এক্স কলম তখন নতুন নতুন বের হয়েছে।

ইকোনো কলাম ৩ টাকা, ইকোনো ডি.এক্স তিন টাকা পঞ্চাশ পয়সা। আমার খালাতো ভাই সৌরভ ভাই আমাদের বাড়ীতে থেকে ডিগ্রি পড়তেন তখন। তিনি দুইটা কলম নিয়ে আসলেন। নীল কালির ইকোনো ডিক্স। আহারে এত সুন্দর কলাম হয়! ভদ্রভাবে একটা কলাম চাইলাম।

তিনি দিলেন না। এর পর আআআআআ... করে একটা বিখ্যাত চিল্লান দিতে পারতাম তখন, এই চিল্লান দিয়ে চাওয়া শুরু করলাম। আব্বা এসে বল্লেন সন্ধায় বাজারে গেলে নিয়ে আসবেন। কিন্তু আমার তখনই চাই, এবং এইটাই চাই। সৌরভ ভাই দিলেন না।

ফলাফল - কয় এক মন ওজনের কি যেন গাল ছুঁয়ে চলে গেল। দুনিয়া ভূঁ ভূঁ করে ঘুরতে লাগলো। তখন আর একটু বড় হয়েছি। সম্ভবত ক্লাস সিক্স এ পড়ি। ভোর বেলা কি নিয়ে যেন হইচই শুরু করেছি।

আব্বা দূরের ঘর থেকে দিলেন ধমক। আত্মসম্মানে লাগলো, বাড়ী থেকে বের হয়ে গেলাম। ফিরলাম, দূপুরের পর। সম্ভবত এই প্রথম সাংসারিক কাজে আমার আব্বা স্কুলে না গিয়ে সারা দিন তার অভিমানী ছেলেকে পথে পথে খুঁজলেন। বাড়ী ফিরে আব্বাকে কাঁদতে দেখে নিজের কাছেই লজ্জা লাগছিলো, ছিহ্ বড়দর কাঁদতে হয়! এখনকার দিনের কথা।

আমার মা পর পর দুই বার কোমায় ঘুরেও বেঁচে আছেন। অনেক অনেক অসুস্থ। আব্বাকে ফোন দিলেও সবার আগে মা'র কথা জিজ্ঞাসা করি। এখনো আব্বাকে আপনি করেই ডাকি। আজ ফোন দিলাম, যতটা সম্ভব গলাটা নরম করে আব্বা করে ডাক দিলাম।

আব্বাও বল্লেন, আব্বা...। আব্বা সমসময় আমাকেও আব্বা ডাকেন। বল্লাম, আব্বা আজতো বাবা দিবস। আব্বা হাসি দিয়ে বল্লেন, এই দিনে কি করে? আমি হাসি দিয়ে বল্লাম আব্বা আমিতো জানিনা। আজকেও বলতে পারলাম না, বাবা তুমি বটবৃক্ষ, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।