আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জোছনার ঘ্রান

(সারাদিন খাটনির পর হিমির এক ঝলক হাসি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। হিমি হলো আমার হাতের পাঁচ। অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ কোন বইতে যেনো লিখেছিলেন, নিজের বউ হলো আসল টাকা, আর শালিকারা হলো সুদ। ) ভোর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। একটি নিষ্ঠুর দুঃস্বপ্ন দেখেছি।

ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন, দেখি- আমাদের গ্রামের বাড়ির পেছনে ছোট একটা পুকুর আছে। মধ্যরাত্রে সেই পুকুরের ঘাটলায় নীল শাড়ী পরা একটা মেয়ে বসে আছে। কে সে? আমাদের বাড়ির কেউ নয়। আশের-পাশের বাড়ির কেউ এসে এতো রাতে এখানে বসার কথা নয়। এই গভীর রাতে মেয়েটি একা বসে থাকবে কেন?আমি দূর থেকে চিৎকার করে বললাম- কে ওখানে? তুমি কাদের বাড়ির মেয়ে? কোনও উত্তর পেলাম না।

আমার অনেক ডাকাডাকিতেও মেয়েটি কোনও সাড়া দিল না, অথচ ঘোমটা টেনে চুপ করে বসে ছিল। শেষ পর্যন্ত আমার ডাকাডাকি শুনে অনেকের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তারা বারান্দায় আসতে আসতে হঠাৎ করে মেয়েটি যেন কোথায় মিলিয়ে গেল!আমি ভেবেছিলাম মেয়েটি হয়তো দূরে কোথাও চলে গেছে। আমি ভুল ভেবেছিলাম আসলে মেয়েটি পুকুরে নেমে গিয়েছিল। সকালে মেয়েটির লাশ পুকুরে ভেসে উঠে।

আমি পুকুরের সামনে গিয়ে দেখি, এই মেয়েটি অন্য কেউ নয়, আমার হিমি ! আকাশ ফরসা হতে শুরু করতেই আমি চলে যাই হিমির বাসায়। এর আগে এতো ভোরে কখনও হিমির বাসায় যাইনি। এতো সকালে কেউ কারো বাসায় যায় না। অবশ্য আমার জন্য কোনও বিধি-নিষেধ নেই। বাসায় গিয়ে দেখি হিমি নীল একটা শাড়ী পরে বেলকনিতে বসে আছে।

হিমি এখনও শাড়ী পরাটা আয়ত্ত করতে পারেনি,কেমন আলুথালু হয়ে আছে। তারপরও হিমির শাড়ীর আঁচল টা আমার কাছে মনে হয় সমুদ্রের ঢেউ-এর মতন। হিমি আমাকে দেখে একটুও অবাক না হয়ে বলল- কী ব্যাপার? তুমি হঠাৎ!আমি চুপ করে রইলাম, উত্তেজনার বসে চলে এসেছি। এখন দুর্বল বোধ করছি। কিছুক্ষন পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি এসেছি বলে তুমি কি রাগ করেছো?হিমি মিষ্টি করে একটু হেসে বললো,আমি বুঝি তোমার খুব অযন্ত করি।

হিমি অনেক দিন পর আমাকে একটা চুমু দিল। হিমির আঁচলে সকালের রোদ খেলা করছে। মানুষের মন তো কোনো অনড় পাথর নয়, তা বাষ্পময় বস্তুর মতন। বন্ধুর চেয়ে প্রেমিকা রুপটিই যেন হিমিকে বেশি মানায়। পুরুষের চোখে কোনো কোনো নারী চিরন্তন প্রেমিকা হয়েই থাকে।

যেমন মহা ভারতের দ্রৌপদী। আমি আর হিমি একসাথে সকালের নাস্তা খেয়ে,পথের পাঁচালি ছবি দেখতে দেখতে আমি হিমির কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি! ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি কবিতা আবৃত্তি শুরু করলাম- "আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের পর/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে/ প্রভাত-পাখির গান/ না জানি কেন রে এতোদিন পরে/ জাগিয়ে উঠিল প্রাণ...." হিমি মুগ্ধ হয়ে শুনলো কবিতা। তারপর আমি হিমিকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভিজিয়ে দিলাম গাল। সকাল ১১ টায় হিমির বাসা থেকে বের হয়ে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট কিনলাম। তারপর সিগারেটে কয়েকটা টান দেবার পর আমার মস্তিস্ক সচল হলো।

কেন হিমিকে দেখার জন্য আমার এতো ব্যাকুলতা?শরীর কত গুলো আরামে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, আবার মনের বিকার হলে সেই সব অভ্যেসও পরাস্ত হয়ে যায়। হিমির মতো কোনও নারীকে আমি আগে দেখিনি। হিমি খুব যত্ন নিয়ে চুল বাঁধে। তার শাড়ী গুলো কি সুন্দর। হিমির ঠোঁট কি সুন্দর !আমি ছাড়া হিমির আর একজন বন্ধু আছে, তার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

হিমি প্রায়ই বলে- রবীন্দ্রনাথ আমাদের সারা জীবনের জন্য ভাষা দিয়ে দিয়েছেন। হিমির একটুখানি হাসি, একবার পাশ ফিরে তাকানো,হঠাৎ কথা বলতে বলতে থেমে যাওয়া, এই সবই আমার কাছে দারুন দুর্লভ কিছু পাওয়ার মতন। পর পর দুইটা সিগারেট শেষ করে গুল্লু আবার হিমির কাছে যায়। - হিমি, আমি একটা কথা বলবো?বলো! কিন্তু গুল্লু আর কিছু বললো না। হিমি চেয়ে রইলো আকাশের দিকে।

একটুক্ষন অপেক্ষা করে হিমি জিজ্ঞেস করলো, কী বলবে, বলো!হিমি বড় বড় চোখ করে গুল্লুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার দু'চোখের কোনে সামান্য জল চিকচিক করছে। গুল্লো বললো, আমি তোমাকে কী বলতে চাই, তুমি তা জানো না? তুমি বুঝতে পারো না!হিমি মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে বলল, হ্যাঁ, পারি। কী বলো তো!তা কি মুখে বলার দরকার আছে? হিমি, আমার কী হয়েছে জানি না। আমি আজকাল সারাক্ষণ তোমার কথা ভাবি।

তোমাকে দুই একদিন না দেখলেই আমার মন ছটফট করে। আমি কাছে আছি, অথচ তুমি যদি অন্যদের সাথে কথা বলো, তা হলে খুব কষ্ট হয় আমার। কেন এরকম হচ্ছে। আমি নিজেকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি....। হিমি চুপ করে রইল।

তুমি আমাকে খারাপ ছেলে মনে করো, তাই না? আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটা অন্যায় জানি...। হিমি গুল্লুর একটা হাত তুলে নিয়ে নিজের মুঠোয় রাখলো, তারপর নরম ভাবে বললো,না, ভালোবাসা অন্যায় নয়। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু একজন নারী একজন পুরুষকে কিংবা একজন পুরুষ একজন নারীকে যে-ভাবে ভালোবাসে, এ ভালোবাসা সেরকম নয়।

গুল্লু বললো, তুমি.... তুমি অন্য কোনো ছেলেকে ভালোবাসো?আচ্ছা, ঠিক আছে- আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। হিমি বলল, কী বললে, কিসের অপেক্ষা? গুল্লু বলল- আমি তোমার কাছে এখন কিচ্ছু চাইব না। আমি তোমাকে একটুও জ্বালাতন করবো না। তুমি যতদিন বলবে, আমি ততদিন অপেক্ষা করবো। কিন্তু তুমি শুধু আমার থাকবে, তুমি অন্য কারোর কাছে চলে যাবে না।

তুমি কথা দাও! তারপর ওরা দু'জন চুপ করে রইল। হিমি কয়েক ফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়ল নীল শাড়িতে। গুল্লু একটা সিগারেট ধরালো। বাতাসে খসে পড়ল হয়তো কয়েকটি শুঁকনো পাতা। ওই দিন রাতেই গুল্লু স্বপ্ন দেখলো- গভীর রাত।

গুল্লু লেখালেখি করছে। হিমি গুল্লুকে বলল, এই তোমাকে চা করে দেবো? গুল্লু বলল, না। তারপর গুল্লু একেবারে হিমির মুখোমুখি দাঁড়ালো। ডান হাতের একটা আঙুল দিয়ে হিমির থুতনিটা উঁচু করে তুলে বলল, মানুষের জীবনে সবচেয়ে শক্ত জিনিস কী জানো? অন্য মানুষদের ঠিক মতন চেনা। দেখো না, তুমি আর আমি কত কাছাকাছি অথচ দু'জনে দু'জনকে চিনি না।

গুল্লু এবার হিমির গালে নরম করে হাত বুলিয়ে বললো, তুমি কত সুন্দর, হিমি! তোমার মতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি। তোমাকে আমার ভীষন প্রয়োজন। হিমি বলল, মানে? গুল্লু বলল- তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, তুমি ঠিক বুঝবে। তারপর গুল্লু হিমির হাত ধরে বলল,তুমি আমার পাশে এসে বসো। মনে করো এখন পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

আমিও না। পৃথিবীর একমাত্র নারী তুমি। পাহাড়, আকাশ, সমুদ্রের মতো করে আজ আমি তোমাকে দেখব। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত... হিমি পড়েছে একটা লাল রঙের ব্লাউজ,তার শাড়িটাও লাল-ডুরে। খোলা চুলে একটা রিবন বাঁধা।

ঠোঁটে কোনও প্রকার প্রসাধন নেই। গুল্লু হিমির শাড়ীর আঁচল ধরে বুক থেকে নামিয়ে দিতে যেতেই হিমি মাঝপথে সেটা ধরে ফেলে বললো, এ কী! হিমির গলায় এক আকাশ বিস্ময় !তারপর হিমি ঠাস করে একটা কঠিন চড় দেয় গুল্লুর গালে। প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রে হিমির মতো মেয়েরা যেরকম সিরিয়াস হয় তা বিচার করলে কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এদের তুলনায় ছেলেদের অধিকাংশ অনেক বাস্তব। ফলে সামান্য কারণে মেয়েরা যে আঘাত পায় তা তাদের অনেককেই চিরদিনের জন্যে নড়বড়ে করে দেয়।

আসলে সব দোষ ঐ ঈশ্বরের। ঈশ্বর নামক শক্তিমানের খামখেয়ালিপনার শেষ নেই। ঈশ্বর মানূষকে এমন মূর্খ করে রেখে দেন যে সে একটু খানি ভুলের জন্য কি হারাচ্ছে বুঝতেই পারে না। জন্মাবার পর থেকেই ঈশ্বর নামক ব্যক্তিটি আমাকে নিয়ে অদ্ভুত খেলা খেলছেন। প্রতিটি স্তরে আমাকে আঘাত দিয়েও সেই ভদ্রলোকের উৎসাহ কমছে না।

দেখা যাক আর কি অপেক্ষা করে আছে বাকি জীবনে। (উৎসর্গ, তোমাকে....) ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।