আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুঠোফোনে ভালবাসা !!!!

shamseerbd@yahoo.com
মেয়ের বায়নার কাছে হারতে হল জহীর কে। এই ছুটির দিনে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাবে গতকাল থেকেই এই ভাবনা মনের মাঝে গেঁথে আছে, তাই রাত জেগে সিনেমা দেখে বেশ আয়েশ করেই সে ঘুমাতে গিয়েছিল। সকাল নয়টা না বাজতেই মেয়ের আল্লাদিপনায় তাকে ঘুম থেকে উঠতে হল। মেয়ের স্কুল থেকে আজ ওদেরকে নিয়ে যাবে এক আবৃত্তি প্রতিযোগীতায়, এখন নাকি মেয়ের সাথে তাকেও যেতে হবে, মেয়ের মা গেলে হবেনা। কি আর করা, হার মেনে এখন সে চলেছে মেয়েকে নিয়ে।

পথে জানতে চাইল, মামনি আমাকে কেন নিয়ে যাচ্ছ বলত, সবসময়ত তোমার মামনিই যাই তোমার সাথে। মেয়ে মিস্টি করে একটা হাসি দিল। এই হাসির জন্য একদিন কেন প্রতিদিনের ঘুমই বিসর্জন দিতে পারবে জহীর । হাসতে হাসতে বলল আসার পথে কি কিনে দিতে হবে বলত মামনি । মেয়ে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল একটা বড় পুতুল কিনব !!! জহীর হাসতে হাসতে বলল, মামনি কি কিনে দিতনা।

মেয়ে হাসি থামিয়ে বলল, মামনি কে বললে বলত বাসায়ত একটা আছেই আর লাগবেনা !!! হা হা করে হেসে উঠল জহীর। ঠিক আছে মামনি, সবচেয়ে বড় পুতুলটাই কিনে দেব আজকে তোমাকে । মেয়ে হাসতে হাসতে বলে মামনি কিছু বললে তুমি বলবে তুমি কিনে দিয়েছ, আমি চাইনি । এবার আর জহীরের হাসি যেন থামছেই না , মেয়েও সে হাসিতে যোগ দিল। অনুষ্ঠান স্হলের কাছাকাছি একটা বাঁধানো গাছের নিচে সে বসে আছে মেয়েকে নিয়ে, স্কুলের টীচাররা এখন ও এসে পৌছাননি ।

মেয়ে কোন কবিতাটা আবৃত্তি করবে সেটা একবার শুনে নিল জহীর। আবৃত্তি শুনতে শুনতে পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ায় নিজের মনেই সে একবার হেসে নিল। কিছুক্ষন পরেই তাদের পাশেই এক মা এসে বসল তার ছেলেকে নিয়ে। মায়ের চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা। ছেলেকে বারবার বলছে কবিতাটা বলত বাবা, ছেলেও বারবার বলে চলেছে।

মা যে সন্তুস্ট হচ্ছেনা তা তার চোখে মুখেই স্পস্ট । এক পর্যায়ে ছেলে বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলে আমি আর পারবনা এবার তুমিই বল। একবার জহীরের দিকে তাকিয়ে কিছুটা উপেক্ষার ভাব নিয়ে মা নিজেই আবৃত্তি শুরু করে দিল। ছোটদের কবিতা, কিন্তু গলাটা শুনে জহীরের কেমন যেন চেনা চেনা লাগল । চমৎকার আবৃত্তি করত মৌ , জয়গোস্বামী বড় প্রিয় ছিল তার ।

শেষ বার যখন তার সাথে কথা হয় শেষ যে কবিতাটি তাকে শোনায় তা যেন আবার শুনতে পেল জহীর..... " বেশ তো , আবার কালকে দেখা হবে । কালকেই না হোক পরের শুক্কুরবার। নয় তো আগামী মাসে । বা ছ'মাস বাদ, তোমার বিদেশ থেকে ফেরবার পর, নইলে আবার বিদেশ গিয়ে ফেরবার আগে, আমার মৃত্যুর পর........." মৌ কে কখনো দেখেনি জহীর। বৃস্টি ঝড়া এক বিকেলে মৌ এসে হাজির হয়েছিল তার নিস্তরঙ্গ জীবনে, মুঠোফোনে ভর করে।

হ্যালো বলার সাথে সাথেই বলে উঠেছিল, শুনুন আপনাকে আসলে আমি চিনিনা, জানালায় বসে বৃস্টি দেখছিলাম, মনটা কেমন যেন একটু খারাপ লাগছিল , তাই একটা আননোন নাম্বারে ডায়াল করে বসলাম । গলাটা এত সুন্দর যে জহীর তন্ময় হয়ে গিয়েছিল সে কথায়, এমনতর ফোনে মাঝে মাঝে বকা দিলেও আজ সে শুনেই গেল। সে থেকে প্রায়ই কথা হত তাদের, কবিতা আবৃত্তি করতে পছন্দ করত মৌ । যে জহীর এর আগে জীবনে কখনো কবিতা আবৃত্তি শুনেনি, সে জহীর তন্ময় হয়ে শুনত, মৌ যাই পড়ত তাই তার ভাল লাগত । এমন শ্রোতা পেয়ে মৌ ও যেন সবটুকু উজাড় করে আবৃত্তি করে চলত।

দুজন দুজনকে কতটুকু চিনতে পেরেছিল, সে ব্যাপারে তারা কেউই নিঃসন্দেহ ছিলনা। দুজনেই জানত ফোনে কি আর সবাই সব সত্য কথা বলে নাকি । তবুও চলে যাচ্ছিল তাদের কথোপকথন। জহীর কথা চালিয়ে যাচ্ছিল, এ নিয়ে অত ভাবার প্রয়োজন ও বোধ করেনি সে, নিজের বিদেশ যাবার প্রস্তুতি নিয়েই সে বেশী চিন্তিত ছিল। অফিস থেকে ফিরে টিভি দেখতে দেখতে অথবা ঘুমাতে যাবার আগে গল্প হত তাদের।

জহীরের নির্মোহ ভাবই হউক আর উদাসীনতাই হউক কোন কিছুই মৌ এর ভাবনার পথে বাঁধা হতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। শখের বশে করা আবৃত্তি চর্চা জহীরকে শোনাতে পেরে তার বেশ ভাল লাগত, আর এমন শ্রোতার প্রতি তার একটা ভাল লাগাও যে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল তা সে বেশ ভাল ভাবেই বুঝতে পারছিল। অপরদিকে জহীর ঠিক ততটাই উদাসীন। মৌ যখন জানাল তার ভাল লাগার কথা জহীরতো আকাশ থেকে পড়ল। বলে কি এই মেয়ে ।

কেউ কাউকে দেখেনি কোনদিন, ভাল করে জানেওনা একে অন্যকে, এমনকি যা বলেছে তার সব সত্য কিনা সেটা নিয়েও কারও কোন ধারনাই নেই, কি করে সম্ভব । তার প্রতি জহীরের কোন দুর্বলতা না থাকলেও একটা ভাল লাগা ছিলই, তাই মৌ কে কস্ট দিতে চায়নি সে, জানাল আগামী মাসে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে সে, এ মুহুর্তে আসলে তার পক্ষে এ ধরনের কোন ডিসিশান নেয়া সম্ভবনা । মৌ কি কেঁদেছিল সেদিন ! জহীর মনে করতে পারেনা, পরে যে কয়দিন তাদের কথা হয়েছিল মৌ কোন কবিতা আবৃত্তি করেনি এটা মনে আছে জহীরের। তার বাইরে চলে যাবার আগেরদিন শেষ বারের মত কথা হয় তাদের। সেদিন কথা শেষ করার আগে মৌ জয় গোস্বামীর ঐ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিল ।

ভুলেই গিয়েছিল সে সব কথা জহীর। কর্মব্যস্ত প্রবাস জীবনে প্রথম প্রথম মনে পড়লেও পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল মৌ এর স্মৃতি। আজ এই ভদ্রমহিলার আবৃত্তি শুনে মৌ এর স্মৃতি ফিরে এল । ভাবতে ভাবতে জহীর ঐ মহিলাকে জিজ্ঞেস করে বসল আচ্ছা আপনি কি মৌ !! লুবনা কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল , আপনি কে । আমি জহীর, বলে বেশ আগ্রহ নিয়ে সে তাকিয়ে রইল ।

একটা হাসি দিয়ে লুবনা বলল আপনি ভুল করছেন আমি লুবনা । নিরাস হল জহীর, ও শব্দটি বেড়িয়ে এল মুখ দিয়ে, পরক্ষনেই সামলে নিয়ে বলল সরি। এরপর আর কথা আগায়নি তাদের ,স্কুলের শিক্ষকরা এসে পড়ায় জহীর ও মেয়েকে নিয়ে উঠে পড়ল। ছেলেকে নিয়ে রিক্সা করে ফেরার পথে লুবনাও যেন হারিয়ে গেল সেই সব দিনে। জহীরের উপর তার একটা ক্ষোভ থাকলেও সেটা আজ আর নেই।

ভদ্রলোক আমি জহীর বলার সাথে সাথেই তার ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। পরক্ষনেই নিজেকে সে সামলে নিয়েছিল । জহীরকে সে নিজের আসল নাম বলেনি, বলেছিল মৌ । একবার খুব ইচ্ছা করছিল বলে দেয় আমিই মৌ, সাথে সাথেই সে চিন্তা বাদ দিয়েছিল সে। কোথায় যেন পড়েছিল, সত্য দিয়ে হউক মিথ্যা দিয়ে হউক জীবন থেকে ঝুট ঝামেলাকে যত বেশী দূরে রাখা যায় ততই মঙ্গল, লুবনার তখন এই কথাটায় মনে হয়েছিল।

স্বামী সন্তান নিয়ে সত্যিকার অর্থেই সুখী সে। হঠাৎ একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দেখে রিক্সা থামাতে বলল সে। ছেলেকে কথা দিয়েছিল ভালভাবে আবৃত্তি করতে পারলে একটা খেলনা কিনে দেবে। ছেলের জন্য একটা ব্যাটারি চালিত বিমান নিল ছেলে পছন্দ করার পর। কাউন্টারে এসে একটা দু লিটারের স্প্রাইট দিতে বলল।

ডাইনিং টেবিলে স্প্রাইট দেখলে নাকি শাহেদের খাওয়াটা খুব ভাল হয় । ।
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।