আমরা হেরে যাইনি। এশিয়া কাপ না জিতলেও তোমরা আমাদের হৃদয় জয় করেছ। আমরা গর্বিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিলের পর থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বাবলম্বী হওয়ার স্লোগান নিয়ে মাঠে নেমেছেন। প্রায় প্রতিদিনই মহান মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে তিনি দেশবাসীকে সেতু প্রকল্পে অর্থ সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছেন। দেশে এবং বিদেশে অনুদান নেয়ার জন্য এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে।
সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাঁদা সংগ্রহের জন্য যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজির টাকার ভাগাভাগি নিয়ে গোলাগুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একজন কর্মী নিহতও হয়েছে।
দুঃখের বিষয় হলো—চাঁদার মাত্র ৯০০ টাকা মেরে দেয়া নিয়েই নাকি সংঘর্ষের উত্পত্তি হয়েছিল। এই ঘটনায় বিব্রত এবং মহাবিরক্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পদ্মা সেতুর নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজদের পেটানো উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। চাঁদাবাজিতে উত্সাহদানকারী দলের শীর্ষ নেতাদের কী করা উচিত, সে সম্পর্কে অবশ্য তিনি কিছু বলেননি।
জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের ঘোষণাও দিয়েছেন।
আওয়ামীপন্থী অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জামান ও ড. আবুল বারাকাতের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবীমহল তাদের নেত্রী শেখ হাসিনার থিওরি যে কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং গভীর দেশপ্রেম সঞ্জাত, সেটা প্রমাণের জন্য দল বেঁধে সভা-সেমিনার করছেন। ড. আবুল বারাকাত তার সুপরিচিত আজগুবি হিসাব পদ্ধতি ব্যবহার করে দাবি করেছেন, নিজস্ব অর্থায়নে একটি নয়, চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব!
নিজস্ব অর্থায়নে সেতু বানানোর এই কোরাসে এ পর্যন্ত সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো কথাবার্তা বলার প্রয়োজনীয়তা অবশ্য এসব বুদ্ধিজীবী অনুভব করেননি। আমি অর্থনীতিবিদ না হলেও আইবিএতে লেখাপড়া করেছি এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে অর্থনীতিবিষয়ক বইপত্র নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। সেখান থেকে যে সামান্য জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি, তার ওপর ভর করেই পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী ও তার তোষামোদকারী বুদ্ধিজীবীদের নিজস্ব অর্থায়নের দাবির যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করেছি।
পদ্মা সেতু নির্মাণে যে ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অংশ চার হাজার পাঁচশ’ কোটি টাকা।
প্রকল্পের বাকি ২০ হাজার পাঁচশ’ কোটি টাকা অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাইকার সঙ্গে গত বছর চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল। ধারণা করছি, এই পুরো অর্থই বৈদেশিক মুদ্রায় প্রাপ্তির কথা ছিল। আমার ধারণা সঠিক হয়ে থাকলে সেতু নির্মাণে স্থানীয় মুদ্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করায় বিদেশ থেকে এই অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা অন্তত স্বল্প মেয়াদে শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় এখন ৯ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা দিয়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।
সুতরাং এই সঞ্চয় ভেঙে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন সম্ভব নয়। সহসা সঞ্চয় বৃদ্ধিরও কোনোরকম সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। রফতানি আয়, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান—এই তিনটি খাত থেকেই মূলত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় গড়ে ওঠে।
বিগত ছয় মাস ধরে আমাদের রফতানিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তির সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধ ঘোষণা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। এই বৈরী পরিস্থিতিতে একমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রীর বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্যে রিজার্ভ থেকে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বাগাড়ম্বর করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবে এই আত্মঘাতী কাজের পরিণামে টাকার মান হ্রাস পেয়ে অধিকতর উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা জনগণের কাঁধে চেপে বসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের অর্থ থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের অবাস্তব তত্ত্বও প্রচার করছেন।
বর্তমান অর্থবছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে অর্থায়ন হওয়ার কথা রয়েছে। অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা অন্য কোনো কারণে রাজস্ব ব্যয় বৃদ্ধি পেলে, কিংবা রাজস্ব আয়ে টান ধরলে সেই অর্থ পাওয়াও কঠিন হবে। বাকি ৫২ হাজার কোটি টাকা সংস্থানের জন্য অর্থমন্ত্রীকে যে দেশ ও বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হবে, সেটা বাজেটেই বলে দেয়া হয়েছে। বাজেটে বিদেশ থেকে ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ১৫ হাজার কোটি টাকা। পাঠক সরকারি নীতিনির্ধারকদের চিন্তার অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করুন।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে পদ্মা সেতু নির্মাণে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সবক দিলেও সেই বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়েই এ বছরের বাজেট তৈরি করেছেন।
বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণ প্রদানকারী সংস্থাকে বিদায় জানাতে হলে কেবল পদ্মা সেতু নয়, সব প্রকল্প থেকেই তাদের বিদায় জানাতে হবে। পদ্মা সেতুর বেলায় শাসকদের চুরি ধরা পড়ায় তারা জাতীয়তাবাদের জিগির তুলবেন, অথচ বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য ভিক্ষাপাত্র হাতে ওয়াশিংটন, টোকিও, ব্রাসেলস ছোটাছুটি করবেন! এই দ্বিমুখী আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে কল্কে পাবে না। বিশ্বব্যাংক যদিও এ পর্যন্ত অন্যান্য প্রকল্প থেকে ঋণ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও তার চেলা-চামুণ্ডারা যেভাবে বিশ্বব্যাংকের গুষ্টি উদ্ধার করছেন, তাতে ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন তো দূরের কথা, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
যেসব জ্ঞানপাপী আওয়ামী বুদ্ধিজীবী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পক্ষে জনমত তৈরির লক্ষ্যে সভা-সেমিনারের আয়োজন করছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে এ দেশের জনগণকে নির্বোধ বিবেচনা করেন বলেই দুর্নীতিবাজদের বাঁচানোর জন্য দেশবাসীকে ভাঁওতা দিচ্ছেন। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন, বৈদেশিক মুদ্রা না হোক, জনগণের কাছ থেকে অন্তত প্রয়োজনীয় দেশীয় মুদ্রা জোগাড় করা কঠিন নয়। সেই আশায় সরকার দেশে ও বিদেশে দুটো ব্যাংক হিসাবও খুলেছে। পদ্মা সেতুর নামে ছাত্রলীগ, যুবলীগকে চাঁদাবাজির লাইসেন্সও দেয়া হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অনুদান নেয়া আরম্ভ করলে বাংলাদেশের কিছু চাটুকার ব্যবসায়ী ও মুখচেনা দুর্নীতিবাজকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লাইন ধরে চেক দিতে দেখতে পাওয়াও বিচিত্র নয়।
আমার ধারণা, এসব করে বড়জোর শ’খানেক কোটি টাকা উঠতে পারে। দলীয় কর্মীদের দিয়ে চাঁদাবাজির পরিণতি কী হতে পারে, সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা গেছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা যদি আশা করে থাকেন যে, তারা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলবেন, আর বোকা জনগণ আবেগতাড়িত হয়ে তাদের কষ্টার্জিত আয় পদ্মা সেতুর ব্যাংক হিসাবে দান করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।
জনগণ আগে নিশ্চয়তা চাইবে, তাদের টাকাও বিশ্বব্যাংকের টাকার মতো লুটপাট হবে না। বর্তমান দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের কাছ থেকে এমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়ার প্রত্যাশা দেশবাসী করেন বলে আমার অন্তত মনে হয় না।
স্মরণে রাখা দরকার, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন কোনোদিনই সমস্যা ছিল না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি এবং জাইকার সঙ্গে এ বিষয়ে এক বছর আগে চুক্তি সম্পাদনও হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের বল্গাহীন দুর্নীতির ফলেই আজ এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। দেশের সাধারণ জনগণ যে লুটপাটের ব্যাপারটি পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পেরেছে, এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা নিশ্চিত থাকতে পারেন।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও পদ্মা সেতুর মতো করেই রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মিলিত দুর্নীতির মাশুল জনগণের পকেট কেটে আদায় করা হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরে বিদ্যুতের মূল্য সাদা চোখে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলেও বিলের মারপ্যাঁচে ভোক্তাকে প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। আমার পরিচিত একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে মাসিক ১ হাজার ৮০০ টাকার জায়গায় জুন মাসে দিতে হয়েছে ৫ হাজার ১০০ টাকা। পরিবারটির কর্তা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। জুলাই মাসে বিদ্যুতের মূল্য আর এক দফা বৃদ্ধির পর তার মাসিক বিল কত হবে, সেটি নিয়ে তিনি এখন রীতিমত আতঙ্কে আছেন।
ভদ্রলোক করুণ মুখে আমাকে বলছিলেন, বিদ্যুতের বিল দেয়ার জন্যই এবার সন্ধ্যার পর একটা পার্টটাইম চাকরি জোগাড় করতে হবে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেয়ার পর বিদ্যুত্ সমস্যা সমাধানে বছরখানেক কোনোরকম পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার যখন বিনা টেন্ডারে কুইক রেন্টালের দিকে ঝুঁকে পড়ল, তখনই আমরা এর বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেছিলাম। দুর্নীতি জায়েজ করার জন্য আইন করে সংশ্লিষ্টদের ইনডেমনিটি দেয়া হলে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সংসদে একচেটিয়া সংখ্যাধিক্যের জোরে নীতিনির্ধাকরা কোনো প্রতিবাদেই কর্ণপাত করেননি।
সরকারদলীয় ব্যবসায়ীরা তো বটেই, এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত বিনা টেন্ডারে কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য একের পর এক লাইসেন্স নিয়েছেন। চুক্তির মধ্যে এমন ফাঁক রেখে দেয়া হয়েছে, যার ফলে বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ থাকলে কিংবা বিদ্যুত্ না কিনলেও সরকারকে বিপুল অঙ্কের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিতে হচ্ছে।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে খাম্বা ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির গল্প বহুল প্রচারিত ছিল। কিন্তু সেই সময় ভোক্তার বিদ্যুত্ বিল বর্তমানের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ থাকার পাশাপাশি বিদ্যুত্ খাতে সরকারকে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি।
অথচ কেবল গত অর্থবছরেই এই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। ভর্তুকির বিপুল অর্থপ্রাপ্তি সত্ত্বেও পিডিবি বার্ষিক ক্ষতিতেও রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরের হিসাব এখনও পাওয়া না গেলেও তার আগের বছর এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬২০ কোটি টাকা, অথচ বিএনপি আমলে পিডিবির লস ১২৫ কোটি টাকা অতিক্রম করেনি।
বিদ্যুত্ খাতে দুর্নীতি বর্তমান সরকারের আমলে কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে এভাবে জনগণের পকেট কাটা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বারোটা বাজানো যেতে পারে, সেটা ড. খলীকুজ্জামান ও ড. বারাকাতের মতো চরম দলীয় অর্থনীতিবিদরা বুঝতে না চাইলেও দেশের সাধারণ নাগরিকরা ঠিকই বুঝতে পারছেন।
প্রতিবছর এই খাতে যে পরিমাণ টাকা লুটপাট করা হচ্ছে, তা দিয়ে এতদিনে বাংলাদেশের মোট চাহিদা মেটানোর মতো ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুেকন্দ্র সরকারি মালিকানায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তাতে সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ গুটিকয় পরিবার দুর্নীতির মাধ্যমে এভাবে অগাধ বিত্তের মালিক হতে পারত না। তাই নীতিনির্ধারকরা আজ কুইক রেন্টালের কোনোরকম সমালোচনা শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তো একাধিকবার সমালোচনাকারীদের বাড়ির বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন।
শেয়ারবাজার থেকেও শাসকশ্রেণী একইভাবে জনগণের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে এক লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। এবার ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ১৯৯৬ সালের মতো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি তারা আর ঘটাবে না। এ জাতীয় কথা বলে অর্থমন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, এসইসি চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কর্তাব্যক্তিরা জনগণকে শেয়ারবাজারে টাকা খাটানোর জন্য দ্বিতীয় বার প্রলুব্ধ করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারি এবারের তুলনায় কিছুই ছিল না।
এসব কথা বলে জনগণের লক্ষ-কোটি টাকা লুটে নেয়ার পর তাদের ধোঁকা দেয়ার জন্য আরেকজন অন্ধ আওয়ামী লীগার এবং ছদ্মবেশী সুশীল (?) ইব্রাহিম খালেদকে দিয়ে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হলেও সেই তদন্তের ভিত্তিতেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
স্বয়ং অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব অসীম ক্ষমতাধর ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা এসেছে, তাদের বিচার তো দূরের কথা, নাম প্রকাশের ক্ষমতাও তার নেই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সর্বস্ব লুটে নেয়া শেষ হলে অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজারকে ‘দুষ্ট’ আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি এটাও বলেছেন, শেয়ারবাজার না থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনো কিছু যায়-আসে না। এ দেশের অর্থনীতিবিদরা অধিকাংশই হয় আওয়ামী লীগপন্থী, অথবা সুশীল (?)। সেই কারণেই হয়তো কোনো অর্থনীতিবিদ এ যাবত্ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে প্রশ্ন করেননি যে, জাতীয় অর্থনীতিতে শেয়ারবাজারের কোনো অবদান না থাকলে কেন তিনি ২০০৯ সালে অর্থমন্ত্রী হয়েই শেয়ারবাজার চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? এসইসি, ডিএসটি এবং সিএসটি’র কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ঘন ঘন সভা করে চটকদার সব বক্তব্য দিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করেছিলেন? ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর তার মন্ত্রণালয় কেন অদ্যাবধি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি? সেই প্রতিবেদনে কোনো দুর্বলতা থাকলে কেন অধিকতর দক্ষ ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি? ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে এসব প্রশ্নের জবাব সরকারের কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যই দিতে হবে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল থেকে শুরু হলেও গত সাড়ে তিন বছরের মতো উচ্চতায় কখনও পৌঁছাতে পারেনি। এক-এগারোর সরকার প্রথম কয়েক মাস দুর্নীতিবিরোধী চটকদার সব বক্তব্য দিয়েই জনগণের মধ্যে একপ্রকার সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য সেই সরকারের রাঘব-বোয়ালরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর মোহভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীনরা নিরাপদে প্রস্থানের (Safe Exit) সুযোগ পেতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ডিজিটাল ফলাফলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।
দুই বছরের নানাবিধ অভিজ্ঞতা অর্জনের পর জনগণ আশা করেছিল রাজনীতিবিদরা খানিকটা হলেও শিক্ষা গ্রহণ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অচেনা সব রাজনীতিবিদের সমন্বয়ে একটি নবিশ সরকার গঠন করলে বিশ্লেষকরা চোখ কপালে তুললেও ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো তুলনামূলকভাবে সততার সঙ্গেই এবার রাষ্ট্র পরিচালনা করতে মনস্থির করেছেন। অবশ্য যোগাযোগমন্ত্রী হিসাবে আবুল হোসেন এবং বিদ্যুত্ ও জ্বালানি উপদেষ্টা হিসাবে ড. তৌফিক এলাহী চৌধুরীকে দেখতে পেয়ে তখনই জনমনে খানিকটা সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল।
সরকার তার মেয়াদের প্রায় শেষ বছরে পৌঁছে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই চার বছরে নির্বাচনী ওয়াদার চেয়ে বেশি কাজ করে ফেলার অসত্য দাবি করলেও সর্বব্যাপী দুর্নীতির চাপে দেশের অধিকাংশ নাগরিকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ২০০৮ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনপূর্ব জনসভায় শেখ হাসিনা জোরগলায় ঘোষণা করেছিলেন, পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, পাতাল রেল—সবই তিনি পাঁচ বছরের মধ্যে করে ফেলবেন।
জনগণ শুধু মুখ ফুটে চাইবে আর মহাজোট সরকার ম্যাজিকের মতো একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে! আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকারের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পর সেই একই প্রধানমন্ত্রী আজ অর্থসংগ্রহের জন্য জনগণের দুয়ারেই ধরনা দিচ্ছেন।
তার সাঙ্গোপাঙ্গরা দেশবাসীকে ধমক দিয়ে বলছেন, অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহের কাজে যারা বাধা সৃষ্টি করবে, তাদের দেখে নেয়া হবে। অর্থাত্ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের পাণ্ডাদের চাঁদাবাজিতে কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। লোকসানি সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বারোটা বাজিয়ে সেখানকার যত্সামান্য সঞ্চয় দলবাজ সব কর্মকর্তা কাগজে ঢাউস বিজ্ঞাপন দিয়ে পদ্মা সেতু ফান্ডে দিলেও এ বিষয়ে লেখালেখি করা যাবে না।
শিক্ষক নামের কলঙ্ক সব ভিসি প্রধানমন্ত্রীকে তেলমর্দনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন ফান্ডের টাকা পৈতৃক সম্পত্তি বিবেচনায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে দান করলে ছাত্র-শিক্ষকদের মুখে তালা মেরে রাখতে হবে।
এক উদ্ভট দেশে আমরা বাস করছি। এখানে মুষ্টিমেয় শাসকদের দুর্নীতির দায় ষোলো কোটি নির্বাক জনগোষ্ঠীকে বংশপরম্পরায় মিটিয়ে যেতে হয়। তবে কেন যেন মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা দেনা অনেক বাড়িয়ে ফেলেছেন, ঋণ শোধ করার দিন অবশেষে আগতপ্রায়।
ই-মেইল :
(সূত্র: আমার দেশ,২৫/০৭/১২)
Click This Link
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।