দিতে পারো একশ ফানুস এনে...আজন্ম সালজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই...
প্রিয় টেম্পু,
অনেকগুলো সম্বোধন মাথার চারপাশ দিয়ে ঘোরাফিরা করছিলো যার মাঝে প্রিয়তমেষু থেকে শুরু করে কলিজির স্পেশাল টুকরা পর্যন্ত ছিল, কিন্তু ন্যাকামির স্কেলে সবাই ৮ এর উপরে স্কোর করায় কাটছাট করে শেষমেষ প্রিয়তেই থিতু হলাম। খোলা চিঠি লেখা শুরু হয়েছে বহুবছর আগে থেকে, কিন্তু খোলা চিঠির মাজেজা কোনদিনই আমার মাথায় ঢোকেনি। পত্রিকায় জাতি বিবেকসহ সবাইকে পড়ানোর জন্য যদি কিছু লিখতেই হয়, প্রবন্ধ নাম নিলেই হয়; চিঠি নাম নিয়ে প্রাপককে আশাহত করার মানে কি ? চিঠি থাকবে খামে বন্দি যেটা আসার পরে বাতির দিকে ধরে বাইরে থেকে বোঝার চেষ্টা করবো যে ভেতরে কি লেখা থাকতে পারে, ব্যর্থ হয়ে ছোট একটা কাঁচি খুঁজে বাসা তোলপাড় করবো, তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাম খুলবো অতঃপর কাজের জিনিস হলে পড়া শেষ করে মুখ ব্যাজার করে তৎক্ষণাত ডাস্টবিনে ফেলবো (বুঝতেই পারছো বহুদিন অকাজের চিঠি পাইনি যেটা কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখে বারবার পড়া যায়)। যে মানুষের নাকি ৮ বছরে বুদ্ধি হয়না তার ৮০ তেও হয় না – এক্কেবারে ফালতু কথা! তাহলে এখন আমি খোলা চিঠির মাহাত্ম্য বুঝলুম কি করে? সুতরাং বুদ্ধি গজাতে বয়স লাগে না।
খোলা চিঠির দ্বারস্থ হতে হলো তার কারণ দুইটি।
গৌণ কারণ হচ্ছে তোমাকে কিছু কথা বলার অথবা শোনানোর জন্য মন আনচান করে কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করো একেবারে একসাথে আমার ভোকাল কর্ড আর ব্রোকা’স এরিয়া (মস্তিস্কের যে অংশে শব্দ তৈরী হয়) হ্যাং করে যায় এবং “অ্যাঁ অ্যাঁ” জাতীয় শব্দ ছাড়া তেমন কিছু বের হয় না। সেই সুযোগে তোমার ব্রোকা’স এরিয়ার একেবারে সেকেন্ডে ১০২০টি করে তৈরী করা শব্দ তুমি অনর্গল বলে আমাকে ধরাশায়ী করে দাও। এতে আমার মেজাজ অনেকক্ষণ কিরিঞ্চি থাকে যাতে বেশ কিছুক্ষণের জন্য আমাদের সংসারে শান্তি নষ্ট হয়। আমি অত্যন্ত প্রতিশোধ পরায়ণ, সুতরাং পরবর্তিতে তোমাকে ক্লিন বোল্ড না করা পর্যন্ত আমার মাথা কিছুতেই ঠান্ডা হয়না। আর মুখ্য কারনটি হচ্ছে আমি ঠিক চাই না তুমি এই চিঠি পড়ো, আবার না লিখলেও আমার শান্তি হচ্ছে না।
বাঙালিদের স্বভাব অনুযায়ী এই চিঠি তোমার সামনে ফেলে রাখলে তুমি ইহজনমে এটা উঠিয়ে দেখবে না, কিন্তু যদি খামে বন্ধ করে নারিকেল গাছের মাথাতেও ঝুলায় রাখি, তুমি যে মই এর অভাবে গাছ খিমচেই শীতের রাতে গাছের মাথায় উঠে ঘড়ির রেডিয়াম বাত্তি দিয়ে এই চিঠি পড়বে এ নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ। একারনেই এই ব্যবস্থা, সাপ এবং লাঠি দুইই থাকুক স্ব স্ব অবস্থানে।
মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। গত রোববারের সকাল আর দুপুরের মাঝামাঝি সময়ের বাতচিতের কথা কি তোমার মনে আছে? মনে না থাকারই কথা কারন এসব বিষয়ে তুমি গোল্ডফিসের শিষ্যত্ব নেবার চেষ্টায় থাকো। যা হোক, আমি পুরোটাই মনে করিয়ে দিচ্ছি একেবারে ডায়লগ সহ-
তুমিঃ অ্যাঁই, তোমার ভাবভঙ্গি তো সুবিধার না।
তুমি কি আসলে আমাকে পছন্দ করো??
আমিঃ (হতভম্ব স্বরে) এইটা কি কইলা! তোমারে কেমনে পছন্দ করবো? পছন্দ করার মত আছেটা কি?
তুমিঃওওও... নাহ আমারে পছন্দ করবা ক্যান! তোমার পছন্দ তো অমুক তমুক আর সমুকরে! (আমার প্রাক্তন সকল ক্রাশ, বয়ফ্রেন্ড এবং হতে হতে না হওয়া বয়ফ্রেন্ডদের নাম উল্লেখপূর্বক)
আমিঃ (উদাস স্বরে) হু। কি করবো? ওরা তো দেখতে ভালো আছিলো। চুলগুলানও ছিল খাড়া খাড়া।
তুমিঃ এই এক চুলের জন্য আমারে তোমার পছন্দ না?
আমিঃ উমম, ঘটনা কতক ওইরকমই। তবে তোমার চেহারাতেও একটু সমস্যা, কেমন জানি রাস্তার বখাইট্যা পুলাপানের মত।
তুমিঃ (উত্তজিত হয়ে চেয়ারে পা উত্তোলনপূর্বক) আইচ্ছা?? মহারাণী আলকাতরা বানু! নিজের চেহারা দেখসো? দেখবা ক্যামনে? আয়নায় তো আটোই না! আয়না বেচারা দুঃখে ভাইঙ্গা টুকরা টুকরা হইয়া যায়!
আশা করি এতক্ষণে তোমার সব মনে পড়েছে। তবে আমি নিশ্চিত এখন তুমি চিন্তিত যে আসলে কোন রবিবারের কথা এগুলো, প্রতি সপ্তাহেই তো এজাতীয় চিন্তা ভাবনা হয়। যা হোক, কথোপকথনের এ পর্যায়ে আমি উদাস ভঙ্গিতে হাই তুলি। এতে তুমি রেগে গিয়ে ঘোষনা দাও যে আর এরকম করলে আমাকে ঘাড় দেয়া হবে। তখনই সমস্যার শুরু।
এতদিন আমার সাথে থেকে তোমার এটুকু বোঝা উচিত ছিলো যে আমাকে হুমকি দেয়াটা কাজের কথা না। কারন আমি গান্ধী মতবাদে বিশ্বাসী নই যে এক গালে চড় খেলে আরেক গাল এগিয়ে দিবো। আমি কমিউনিটি মেডিসিন পরীক্ষা পাস করেছি স্বয়ং জব্বার স্যারের হাত দিয়ে। সুতরাং আমার প্রিয় বাণী “Prevention is better than cure”। ঘাড় দেয়া তো দূর সেই চিন্তাও যাতে তোমার মাথায় না আসে একারনে আমি Prevention এর ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক দ্রুত আড়মোড়া ভেঙ্গে তোমার সাথে দ্বন্দযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম।
দশবারের মত কুংফু পান্ডা দেখেছি বলে প্যাচ মন্দ জানি না, তাই শক্তি বেশী হওয়া সত্বেও তোমাকে পরাজয় স্বীকার করতে হলো। এরপরেই তুমি করে বসলে সেই ভয়াবহ প্রশ্ন... সেই প্রশ্ন যেটার উত্তর আমার গলা পর্যন্ত উঠেই আটকে যায় এবং শেষমেষ ওখানেই আটকে থাকে। সেই অবসরে কথা দিয়ে ব্যালট বাক্সগুলো পূর্ণ করে তুমি যুদ্ধে জয়ী হয়ে “হু হু” জাতীয় ভাব মারো যেটা দেখে আমার পিত্তি জ্বলে যায়। যেকারনে আমার এই সুদীর্ঘ চিঠি।
তোমার প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক- “তাইলে তুমি আমারে পছন্দ করো বলো ক্যান?” উত্তর সরল অংকের মতই দীর্ঘ এবং জটিল।
তোমার জন্য বিশ্ব সংসার খুঁজে ১০৮ টি নীলপদ্ম আনা আমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না, তবে ১০৮*২= ২১৬টি কারণ আমি এক নিঃশ্বাসে (মাঝে বার দশেক ব্রেক নিয়ে) বলতে পারবো। আলসি জাতীয় ভাব হচ্ছে একারনে আজকে পাঁচটি কারণই না হয় বলি।
প্রথমত, কিছু দুর্ভাগা খরা দিন বাদ দিলেও প্রতিদিন গড়ে বার তিনেক আমাদের মাঝে ক্যাঁচাল বাঁধে। কার দোষ সেটা খুঁজাখুঁজির মাঝে না গিয়ে তুমি প্রতিবারই তালগাছের শিকড়শুদ্ধ আমাকে দিয়ে দাও, একারনে বাড়ীর পিছনের উঠানে এখন আমার একটা তালগাছের বাগান আছে।
দ্বিতীয়ত, শোয়ার সাথে সাথে তুমি নাক ডাকতে শুরু করো এবং ক্যাটক্যাটা মোবাইল-ল্যাপটপের আলোতেও তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না বিধায় আমার বেশীক্ষণ ঘুমের ভান ধরতে হয় না।
মিনিট দশেকের মাঝেই আমি খেলাধূলার জগতে নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে পারি।
তৃতীয়ত, তুমি এই জীবনে আমার একটামাত্র ছোট গল্প ছাড়া আর কোন কিছু পড়ার ধার দিয়েও যাও নাই। শুধুমাত্র এই কারণেই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা একটা নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে কখনোই নামবে বলে মনে হয় না।
চতুর্থত, তুমি অতি চমৎকার গ্রিল চিকেন এবং টুনা মাছের কাবাব বানাও। অন্য মানুষের এনাটমি গ্রে সাহেবের বই অনুযায়ী চললেও আমার এনাটমি ভিন্ন।
আমার পাকস্থলি এবং হৃদপিন্ড ছোট বড় এবং বিশাল বড় আকৃতির প্রায় ১০টি চ্যানেল দ্বারা সংযুক্ত। সুতরাং আমার মন পাইতে হলে সুস্বাদু খাবারের বিকল্প নাই।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হচ্ছে, তোমাকে খুশী করার জন্য আমার বিশ্ব সংসার খুঁজে ১০৮টি লাল নীল বেগুনী কোন পদ্মই খোঁজার দরকার নাই... বাসার সামনের সুপার মার্কেট থেকে এক প্যাকেট চিপস অথবা বাসার লন থেকে জংলা হলুদ ফুলই যথেষ্ট, যদি আমি হাসিমুখে দেই।
আরো দুইশত এগারোটি কারণ বাকি রইলো। শীত গিয়ে বসন্ত আসুক, ততদিনেও যদি এরকম হারেই তালগাছের মালিকানা পেতে থাকি, তখন না হয় আরো পাঁচটা বলা যাবে।
সেপর্যন্ত কোন চিঠি পেলে তা মুখবন্ধ খামেই পাবে।
ইতি... অবশ্যই আমি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।