আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমার খাদক জীবন ৩ - রাতের খাবার পর্ব (ভোজনরসিকদের জন্য ছবি ব্লগ)

সবুজের বুকে লাল, সেতো উড়বেই চিরকাল যারা নাস্তা খাননি, তাদের জন্য আমার খাদক জীবন ১ নাস্তা পর্ব যারা দুপুরের খাবার খাননি তাদের জন্য আমার খাদক জীবন -২ দুপুরের খাবার পর্ব দুপুর থেকে রাতের খাবারের সময়টা বড় দীর্ঘ। তাই এর ফাকে বিকালের নাস্তা না হলে চলে? আগের লেখার মতই বর্ষাকালকে স্মরণ করছি। দুপুরে সেই খিচুড়ি আর গরুর মাংসের ঝোল খেয়ে যে বেশ লম্বা দিবা নিদ্রা, তাতে ছেদ পড়তো পিয়াজু ভাজার ঘ্রাণে। সেটা অবশ্য সন্ধ্যার পরই। আমার মা হাল্কা গরম মশলা মিশিয়ে পিয়াজু ভাজতেন।

খেতে কাবাবের মত মনে হতো। সাথে পিয়াজ কাচামরিচ আর সরিষার তেল মাখানো মচমচে মুড়ি। এই বস্তু নাস্তায় পেলে ঘুমও পালাতো। পেটও হাল্কা হয়ে যেতো। শীতের সন্ধ্যায় আরেকটি নাস্তার কথা না বললেই না।

তার নাম চাপড়ি। অনেকেই জানেন হয়তো। আতপ চাল বেটে পেস্ট করে তার মধ্যে পিয়াজ কাচামরিচ আর বড় ধৈনাপাতা কেটে তাওয়ার উপর খুব হাল্কা করে শুকনো করে ভাজা হতো। সাথে খাকতো গরু বা খাসির উইন্ড পাইপ মানে গলা, কলিজা আর ফ্যাপরার তেল ছড়ানো আবার কাঠালের দিনে কাঠালের বিচি ভেজেও নাস্তা চলতো। বর্ষাকাল দুর অস্ত।

তাই অন্যান্য দিন গুলির দিকে তাকাই। মিস্টির মধ্যে কেক পেস্ট্রি। আর ঝালের মধ্যে আলুপুরি/ডালপুরি, কিমা পুরি্‌ শিক কাবাব, প্যাটিস। সবই মহল্লার দোকানের কেনা। তবে খেয়ে দারুণ তৃপ্তি হতো।

তবে সাইন্স ল্যাবরেটরের মোড়ে একটা কাবাবের দোকান ছিল। সেখানে মুরগির কাবাব আর খাস্তা পরাটা পেলে আর কিচ্ছু চাওয়ার ছিল না। তবে চকবাজারে খাওয়া দাওয়া নামের একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। ওখানে একবারই নান পরাটা আর মুরগির রেজালা খেয়েছিলাম। এখনও চোখ বুজে তার স্বাদ নিতে পারি।

আজকাল তো দামি দামি কত উন্নত স্বাদের কে বিস্কুট পাওয়া যায়। । অথচ চকবাজারের কামাল বেকারির সেই ফ্রট কেকের সেই স্বাদ আর গন্ধের কথা কোনদিন ভুলবার নয়। কেকের প্রতিটা পিসেই -৩টা কিসমিস পাওয়ায় যেতো। মাঝে মাঝে চালকুমড়ার মোরব্বা ।

সাথে হয় কমলার চোলকার গুড়া বা অরেঞ্জ এসেন্স দেয়া থাকতো। ওই রকম কেক আর খাওয়া সৌভাগ্য্য হয়নি। প্যাটিসের ব্যাপারে একই কত্থা। গরুর নাড়িভুড়ি কিমার মত করে রান্না করে, সে দিয়েই তিন কোণা আকৃতির যে গরম গরম প্যাটিস খেতাম, বড় বেকারির দামি প্যাটিস খেয়েও সেই তৃপ্তি পাইনি। (ছবিতে চিকেন লেখা থাকলেও যেটা খেতাম, সেটা দেখতে এই রকমই, ভিতরে সেই কিমা দেয়া) কোনদিন যদি বিকেল আর সন্ধ্যাটা স্টেডিয়ামের কাটতো, তাহলে তো কথাই নেই।

"তলপেট ভাসাকে লেম্বু" অর্থাৎ কাচা মরিইচ পেয়াজ আর লুবুর রুসদেয়া সেদ্ধ ডাবলি। সিগারেটের প্যাকেট কেটে বানানো চামচে করে অনায়াসেই কত বাটি সাবাড় করেছি তার হিসাব নেই। তাছাড়া কাসুন্দি দেয়া নারিকেলের টুকরা না খেয়ে স্টেডিয়াম ছাড়তাম না । সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতকে আসতেই হতো। আর রাত এলেই রাতের খাবার।

মাছ মাংস নিয়ে বাবা মায়ের মন্তস্তাত্তিক দন্দে দিনে মাছ জয়ি হলেও রাতে মাংসই জয়ি হতো। তবে ইলিশ, শিং মাছ বা চিংড়ির দোপেয়াজাকে বাবা খুব আনন্দের সাথে গ্রহন করতেন। তবে রাতে করোল্লা বা শাক বা ভাজি দেয়া হতো না। এব্যাপারে বাবা মায়ের মধ্যে শক্ত ঐক্যমত ছিল। কেন দেয়া হতো না, কোনদিন জিজ্ঞেস করিনি।

আমার খান্দান ভয়াবহ রকমের গরু খাদক। তবে মুরগির ভুনা, খাসির কলিজা বা খাসির মাথার ভুনা, এইসব খুব শখের সাথেই ঘন করতাম আমরা সবাই। খান্দানের অভ্যাস তো। খাসির নয়, গরুর মাংসের চাপই ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের। সেই মাংস ভাজা তেল ভাতের দিয়ে লেবু চিপরে কাচা মরিচ দিয়ে খেতে অমৃত মনে হতো।

অবশ্য পুদিনা পাতা মাংস বা মাংস দিয়ে বাধাকপি শুধু চলতোই না বাসন থেকে ভাতের পরিমান খুব দ্রুত কমে যেতো। বছরে ২-৩বার যে জিনিসটা খাওয়া পড়তো, সে হল বকের মাংস। অনেক রকম মশলা দিয়ে মা যে রান্নাটা করতেন, তার তুলনা আজও পাইনি। কোন কোনদিন অবশ্য উদরপুর্তিতে অতৃপ্তি থাকলে, শেষপাতে দুধ কলা চিনি বা দুধ গুড় বা দুধ আম দিয়ে খানিকটা সান্তনা পেতাম। এত এত্ত ঝালের কথা শুনে মনে করতে পারেন, এই খাদক ব্যাটার খাদ্য তৃষ্ণা অপুর্ণ।

কেননা মিস্টির কথা নেই তার খাদ্য তালিকায়। মিস্টির পাগল বলতে যা বোঝায়, তার শতভাগ গুণ এই অধমের আছে। শুকনা মিস্টি আমারর পরম অপছন্দের। তাই দোকানের শুকনা মিস্টি যতই ফ্যাশনের রঙ চঙ মাখুক না কেন, ওদিকে আমি ফিরেও তাকাই না। শুধু ব্যাতিক্রম তিনটা।

এক হল মাওয়ার লাড্ডু। দুই মন্সুর (যা বেকারিতে পাওয়া যায়) তিন লাল হালুয়া (নাম লাল হালুয়া হলেও এর রঙ নীল, কমলা বা সবুজ হতে পারে) অনেকে লাল হালুয়ার কথা নাও জানতে পারেন। ময়দা আর ঘি দিয়ে বানানো এই হালুয়াটা দেখতে জেলোর মত। আর এতে প্রচুর পেস্তা বাদাম কাজু ইত্যাদি ব্যাবহার করা হয়। সহজ লভ্য কিনা বলতে পারবো না।

আহ... এখন রসের মিস্টির হাড়ি খুলে বসি। কালোজাম বা লালমোহন খুব বেশি পছন্দ না আমার। তবে খেতে দিলে কমও খাই না। রসগোল্লা। খুব কমন প্রথম পছন্দ সবারই।

জ্বি ! যেই সেই দোকানের রসগোল্লায় আমার আগ্রহ নেই। ভাবছেন দামি দোকানের মিস্টি ছাড়া খাই না? এক্কদম উল্টাটা। হিন্দু ময়রার ছোট টঙ্গের মত দোকানে হাল্কা এলাচ দানা দেয়া যে রসগোল্লা আমি খেয়েছি, অধুনা রস বা প্রিমিয়াম অথবা বনফুলের মিস্টি কোন ছাড়? রসগোল্লার সাথে রোমিও জুলিয়েটের মত জড়িয়ে আছে বলে রসমালাইও আমার মিস্টি ভোগের আরেকটি প্রিয় পদ। তবে মরণচাদের যে রসমালাই আমি খেয়েছি, অতটা মজাদার রসমালাই আমি কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাইয়ের মধ্যেও পাইনি। সবচেয়ে বেশি পছন্দ পোড়াবাড়ির চমচম।

মিস্টির রাজা মানেই পোড়াবাড়ির চমচম। তবে ঢাকায় সাইনবোর্ড টাঙ্গানো চমচমের দোকান থেকে নয়। টাঙ্গাইল থেকেই আদি পোড়াবাড়ির চমচম আমার প্রথম পছন্দ। তবে আম্বালা সুইটসের কাটা চমচম, বিকল্প হিসাবে উৎরে যেতে পারে। আর মিস্টির সাথে যদি দৈ থাকে, তাহলে কয়েকটা অতিরিক্ত মিস্টি আরো বেশি উপভোগ করে খাওয়া যায়।

ঘরে একান্তই যদি মিস্টি না থাকে, তাহলে একমাত্র পছন্দ পুডিং। তবে বছরের বেশ অনেকগুলি দিনই জন্মদিনের দাওয়াত থাকে। তো সেই জন্মদিনের কেকের প্রতি লোভাতুর দৃস্টি কোন ভয়ানক কামাতুরের চেয়ে কম নয়। সফট ক্রিমের না, খানিকটা শক্ত চিনির ক্রিম দেয়া জন্মদিনের কেক সাধ্য থাকলে আমি একলাই সাবাড় করে দেবার ক্ষমতা রাখি। চকলেট কেক অবশ্য আমি এড়িয়ে যাই বা অনুরোধে এঁক পিস চেখে দেখি।

ভাবছেন রাতের খাবারে পোস্টে মিস্টি কেন? কেননা মধ্য সকাল বা অপরাহ্নে মিস্টি অনিয়মিত খাওয়া হলেও, খোদার ৩৬৫ দিন (কয়েকদিন ব্যাতিক্রম হতেই পারে) রাতের খাবারের পর মিস্টি আমার খাওয়া চাই ই চাই। চোয়াল নাড়ানোর জন্য যে সব জিনিস খাওয়া আমার পছন্দের তার এক নং তালিকায় আছে পনির। কত বিদেশি দামি দামি পনির খাওয়া হয়েছে। কিন্ত নিউমার্কেটে বেতের টুকরিতে নিয়ে বসা মহিষের দুধের তৈরি সেই পনিরের স্বাস কোন কিছু দিয়েই তুলনা করা যায় না। খেতে পারেন ইচ্ছামত।

যতটুকু প্রয়োজন বা তৃপ্তি মিটিয়ে। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হল অনেকেই প্রচুর খাবার খেতে জানেন বটে, তবে সেটা শরীর থেকে ঝরিয়ে ফেলতে জানেন না, বা ঝরিয়ে ফেলতে গা করেন না। পরবর্তিতে সেটাই সমস্যা হয়ে রোগ ব ইয়াধির আকারে দেখা দিতে পারে। তাই ইচ্ছামত খান বটে, তবে খেয়াল রাখবেন শরীরচর্চা বা শারিরিক পরিশ্রম হয় এমন কাজ বা খেলাধুলা করে সেটাকে হজম করে ফেলুন।

তখন দেখবেন, ইচ্ছা মত খেলেও সেটা শরীরে কোন ক্ষতির কারণ ঘটাবে না। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.