আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এশিয়ার ৬৯টি বন্দরের মধ্যে দক্ষতায় চট্টগ্রাম শীর্ষে

পুরোনো যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর ঘাটতি নিয়েও চট্টগ্রাম বন্দর যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এশিয়ার ১৭টি দেশের ৬৯টি বন্দরের মধ্যে দক্ষতায় শীর্ষস্থানে নাম এসেছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের। ‘বেঞ্চমার্কিং দ্য এফিশিয়েন্সি অব এশিয়ান কনটেইনার পোর্টস’ শীর্ষক এক গবেষণাকর্মে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতার এই চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের কর্মসূচি পরিচালক গুরচরণ সিং ও মালয়েশিয়ার মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুশিলা মুনিস্বামী যৌথভাবে এই গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আফ্রিকান জার্নাল অব বিজনেস ম্যানেজমেন্ট-এর পাঁচ নম্বর ভলিউমের চার নম্বর সংখ্যায় গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরে যে পরিমাণ নতুন-পুরোনো যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো রয়েছে তার সর্বোত্তম ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বিচারে অত্যাধুনিক সিঙ্গাপুর বন্দরের অবস্থান চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে আট ধাপ নিচে। ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলে গুরচরণ সিং প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাঁচ বছরের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ২০১০ সালে এই গবেষণা করা হয়েছে। এশিয়ার বন্দরগুলোর দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার তুলনা করাই এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল। ’ গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দক্ষতার বিচারে প্রথম অবস্থানে আছে ১২টি বন্দর।

এই ১২টি বন্দরের মধ্যে আবার অতি দক্ষতার (সুপার-এফিশিয়েন্সি) ফলাফলে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান প্রথম। এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ফিলিপাইনের জাম্বুঙ্গা ও জেনারেল সান্তোস বন্দর। প্রতিবেশী বন্দর সিঙ্গাপুরের অবস্থান নবম। ভারতের মুম্বাই বন্দর ১১তম অবস্থানে। সেরা ১২টি বন্দরের মধ্যে চীনের পাঁচটি বন্দরের নাম রয়েছে।

গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর এম আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বন্দরে অনেক কম পরিমাণ রিসোর্স’ ব্যবহার করে বেশি পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামা করা হচ্ছে—এই গবেষণা তারই প্রমাণ। ’ জানা গেছে, গবেষণায় এশিয়ার ৬৯টি বন্দরের পরিচালন-দক্ষতা মূল্যায়ন করতে ‘ডাটা এনভেলাপমেন্ট এনালাইসিস বা ডিইএ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এই মডেলে এসব বন্দরের জেটি ও ইয়ার্ডে যন্ত্রপাতির সংখ্যা, বার্থ ও টার্মিনালের দৈর্ঘ্য এবং রিফার পয়েন্ট (হিমায়িত কনটেইনার রাখার স্থান)—এই পাঁচটি অবকাঠামো ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানামার পরিমাণ তুলনা করা হয়েছে। এভাবে ৬৯টি বন্দরের তুলনামূলক দক্ষতার বিচার করা হয়। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, ‘কনটেইনার বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে দক্ষ।

ভারত ও চীন এই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান। ’ এখানে উল্লেখ করা যায়, এই বন্দরে কনটেইনারের পাশাপাশি সাধারণ পণ্য ও তেল খালাস করা হয়। তবে গবেষণায় শুধু কনটেইনার ওঠানামার তুলনামূলক দক্ষতা বিচার করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বন্দর গবেষক সুলতান মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে খুব বেশি পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামার কারণে এ গবেষণায় দক্ষতার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে এই বন্দর। তবে দক্ষতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে হলেও এই গবেষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান বিচার করা যাবে না।

’ এর পরও বন্দরের দক্ষতা নিয়ে কথায় কথায় যাঁরা নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন তাঁদের জন্য এই গবেষণা একটা ভালো জবাব হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে এক হাজার ৮৭৮ মিটার দীর্ঘ ১০টি জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটিতে অত্যাধুনিক চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। বাকি আটটি জেটিতেই জাহাজের ক্রেনের সাহায্যে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। অর্থাৎ এই বন্দরের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে সনাতন পদ্ধতির ব্যবহার সর্বাধিক।

গত চার বছরে বন্দরে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জেটির সংখ্যা বাড়েনি। জেটিতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কোনো যন্ত্রপাতিও সংযোজন হয়নি। বিদ্যমান অবকাঠামোয় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১০ লাখ ৩৪ হাজার কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। একই অবকাঠামোয় চার বছর পর চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে কনটেইনার ওঠানো-নামানো করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ইউনিট। ২০০৯ সালে প্রণয়ন করা গভীর সমুদ্রবন্দরের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ক্ষমতা ১৩ লাখ ইউনিট।

সে হিসেবে বন্দরের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার তুলনায় কনটেইনার ওঠানো-নামানোর হার বেশি। এ প্রসঙ্গে সুলতান মাহমুদ বলেন, বন্দরের ৪০ শতাংশ ক্ষমতা অব্যবহূত পড়ে আছে বলে যে প্রচারণা চলছে, সেটি ঠিক নয়। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, ক্ষমতার চেয়ে বেশি কনটেইনার ওঠানামা হচ্ছে এই বন্দরে। তাই এখন বন্দরের অবকাঠামো দ্রুত বাড়ানো দরকার। না হলে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর হার বাড়ছে, তাতে একসময় এই দক্ষতা বিফলে যাবে।

গত অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী ৯৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। মাত্র ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ হয় মংলা বন্দর দিয়ে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতার ওপর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতাও নির্ভর করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আকতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তুলনামূলক দক্ষতার বিচার করতে ডিইএ মডেলের ব্যবহার বেশি। সাধারণত বন্দর ও বিমানবন্দরের তুলনামূলক দক্ষতা বিচার করতে এই মডেল ব্যবহূত হয়।

গবেষণায় অনুযায়ী, এশিয়ার ৬৯টি বন্দরের মধ্যে ৩৩টি বন্দরে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি যে হারে সংযোজন করা হবে তার চেয়ে বেশি হারে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এর বাইরে ২৪টি বন্দরে অবকাঠামো সংযোজনের তুলনায় উৎপাদনশীলতা কম হবে। আর চট্টগ্রামসহ ১২টি বন্দরের অবকাঠামো সংযোজনের ফলে সমান হারে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। সোর্সঃ প্রথম আলো ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.