আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শোনা যাক লাশকাটা ঘরের গল্প

বাঁচতে হলে জানতে হবে! শোনা যাক লাশকাটা ঘরের গল্প তাঁদের পেশা লাশ কাটা। লাশ কাটতে কাটতে নিজেদের জীবনই যেন হয়ে গেছে লাশ। সামাজিক সম্মান নেই, পাশাপাশি চাকরিও স্থায়ী নয়। অবহেলিত এসব মানুষের জীবনকাব্য তুলে ধরেছেন নিয়ামুল কবীর সজল ও রফিকুল ইসলাম "প্রথম প্রথম যখন বাবার সঙ্গে লাশ কাটার ঘরে আসতাম, খুব ভয় লাগত। বাবা লাশ কাটতেন, আমি বসে বসে দেখতাম।

একদিন আমার হাতে সার্জিক্যাল ব্লেড, ছেনি ও হাতুড়ি ধরিয়ে দিয়ে 'লাশটি কাট' বলে বাইরে চলে গেলেন বাবা। প্রায় ৩৫ বছর বয়সের পুরুষ মানুষের লাশটি কাটতে গিয়ে ভয়ে হাত কাঁপছিল। একটু পরই চিrকার দিয়ে বাবাকে ডাকতে শুরু করলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। বললেন, 'ভয় কী?' তোর সাহস বাড়ানোর জন্য আমি দরজা লাগিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

' এ কথা শোনার পর সাহস বেড়ে গেল। বাবা আবার বাইরে চলে গেলে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি কাটা শুরু করলাম। " রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের ডোম রনির লাশ কাটার শুরু এভাবেই হয়েছিল। তাঁর মতোই শুরুতে লাশ কাটতে গিয়ে ভয় পেয়েছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ডোম রতন দাস ও ইব্রাহীম তবে এখন এই তিনজনেরই লাশ কাটতে কাটতে আলাদা কোনো অনুভূতি কাজ করে না। ইব্রাহীম জানালেন, 'প্রতিদিন এই কাজ করতে করতে এখন খারাপও লাগে না, কষ্টও লাগে না, এমনকি মনের মধ্যে ভয়ডরের অনুভূতিও কাজ করে না।

' রনিও বললেন, 'এখন বড় হয়েছি। অভিজ্ঞতাও বেড়েছে। দূর হয়েছে মনের ভয়ও। ' তাঁহাদের কথা লাশ কাটার জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের সাধারণ মানুষ 'ডোম' নামে চিনলেও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে লাশ কাটার দায়িত্বে নিযুক্তরা আসলে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। ঝাড়ুদার পদে চাকরি করেন রতন।

ইব্রাহীম এমএলএসএস। রতন থাকেন মর্গের পাশেই কোয়ার্টারে। ইব্রাহীমের বসবাস নিজের বাড়িতে। রতন ডোমের কাজ করছেন তিন কী চার বছর ধরে। ইব্রাহীম এই পেশায় রয়েছেন ছয় বছর ধরে।

রতনের বাবা এই পেশাজীবী হলেও ইব্রাহীমের পূর্বপূরুষ কাজটি করত না। কিভাবে এ কাজে যুক্ত হলেন_এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন, অফিস থেকেই স্যাররা তাঁকে কাজ করতে বলেন। মর্গে এসে প্রথম প্রথম কয়েক দিন দাঁড়িয়ে দেখেছেন কিভাবে কাজটি করা হয়। একসময় আত্মবিশ্বাস তৈরি হলে কাজে লেগে যান। তবে রনিরা শত বছরের বেশি সময় ধরে জড়িত লাশ কাটা পেশায়।

দাদা নিশিপদের বাবা তারাপদ প্রথমে এ পেশায় যুক্ত হন। এরপর দাদা, দাদার পর বাবা অবিনাশ এবং শেষে তাঁর হাতেই পড়েছে ডোম পেশাটি। তিনি ১১ বছর ধরে ডোমের কাজ করছেন। মাত্র ৯ বছর বয়সেই ডোম হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর সহপাঠীদের অত্যাচারে ২০০০ সালে পড়ালেখার পাট চুকাতে হয়। রাজশাহী পুলিশ লাইনস স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে তিনি ইতি টেনেছেন লেখাপড়ার।

ভেতরের খবর লাশ কাটার জন্য ডোমদের হাতিয়ার হাতুড়ি, ছুরি, বাটাল, ব্লেড ও কাঁচি। একটি লাশ কাটতে সময় লাগে বড়জোর ১৫ থেকে ২০ মিনিট। লাশ কাটার জন্য তাদের আলাদা কোনো সম্মানী দেওয়া হয় না। তবে লাশের মালিক পক্ষ প্রায়ই তাদের বকশিশ দেয়। আর লাশ কাটতে হয় সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই।

লাশ কাটার সময় তাঁরা মুখ ভরে পান খান। পান খেলে লাশের গন্ধটা নাকে কম লাগে। প্রতিদিন হাসপাতালে কত লাশ আসে এর নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। কোনো দিন লাশ আসে, কোনো দিন আসে না। তখন ডোমদের বসে থেকেই সময় কাটাতে হয়।

অভাব-অভিযোগ সাধারণ মানুষের কাছে এখনো সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি ডোম পেশাটি। ফলে নিজেদের ছেলেমেয়েকে এই পেশায় আনতে রাজি নন রতন ও ইব্রাহীম। পেশাটি নিয়ে অভাব-অভিযোগ রয়েছে রনিরও_১১ বছর পরও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) ডোম হিসেবে চাকরি হয়নি তাঁর। লাশ কাটার পর মানুষের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর চলে সংসার। দাদার পিতার আমল থেকে তাঁর পরিবার ডোম নামের অলিখিত পেশার সঙ্গে যুক্ত কিন্তু বাপ-দাদার কেউই ডোম পদে চাকরি লাভ করতে পারেননি।

লাশের অভিভাবকদের কাছ থেকে উপরি হিসেবে পাওয়া টাকা নিয়েই সংসার চালাতে হয়েছে। তিন বছর আগে বাবা অবিনাশের মৃত্যুর পর এখন রনিকেও একইভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে। তিনি বললেন, 'লাশ কাটার পর এভাবে লাশের অভিভাবকদের কাছ থেকে হাত পেতে টাকা নিতে খুব খারাপ লাগে। অনেক সময় কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে চলার চেয়ে ডোম হিসেবে একটি চাকরি পেলেই ভালো হতো, তখন আর লাশের অভিভাবকদের কাছে হাত পাততে হতো না।

' এ প্রসঙ্গে রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডাক্তার মুনসুর রহমান জানান, ডোম পদ থাকলেও রামেক হাসপাতালে এই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কাজের বিনিময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ডোম হিসেবে মাসে মাত্র ২০ টাকা বেতন দেওয়া হয়। তবে রামেক হাসপাতালের আওতায় ডোম পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটা প্রক্রিয়া তিনি হাতে নিয়েছেন বলে জানান। খুব দ্রুতই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।