কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন কি নিরপেক্ষ হয় ?
আমাদের দেশে একটা সাধারন ধারনা প্রচলিত আছে যে কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় । সত্যই কি তাই ? নীচে আমরা উদাহরন দিয়ে দেখাতে চাই যে, এই ধারনা সত্য না হবার সম্ভাবনা প্রচুর।
আমাদের দেশে এ পর্য্যন্ত চারটি নির্বাচন, (১) ১৯৯১, (২) ১৯৯৬, (৩) ২০০১ ও (৪) ২০০৮ হয়েছে ‘কেয়ার টেকার’ সরকারের অধীনে । আমাদের দেশে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবার অর্থ সবচেয়ে উপযুক্ত লোকটির নির্বাচিত হওয়া নয় । কারন প্রার্থীর যোগ্যতা বিচারে উপযুক্ত যোগ্যতা থাকার কথা বলা হয় না ।
বরং সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকটির নির্বাচিত হওয়ার কথা হয় । আমরা দেখবো, কেয়ার টেকার সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনে সেটাই বা কতটুকু নিশ্চিত হয় । এই উদ্দেশ্যে আমরা উপরের নির্বাচনগুলির ফলাফলের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষন করবো । যে ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেশন সেগুলি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে নেয়া হয়েছে ।
এইসব নির্বাচনে অংশ গ্রহন করা দলগুলিকে আমরা ৫ টি গ্রুপে ভাগ করেছি ।
এগুলি হলো (১) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, (২) বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি, (৩) বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, (৪) ছোট ছোট দলগুলি এবং (৫) স্বতন্ত্র প্রার্থীগন । এখন আমরা বিবেচনা করবো, এই পাচটি গ্রুপ এই নির্বাচনগুলিতে কি শতকরা (%) হারে ভোট পেয়েছিল, এই হারে ভোট পেলে আনুপাতিক হারে তাদের কয়টি সিট পাওয়া উচিত ছিল, বাস্তবে তারা কয়টি সিট পেয়েছিল এবং এই সংখ্যা আনুপাতিক হারে প্রাপ্তব্য সিটের সংখ্যার চাইতে কত কম বা বেশী ।
আমরা জানি বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটার সংখ্যা ভিন্ন রকম, প্রার্থীর সংখ্যাও বিভিন্ন । তাই কোন দল সর্বমোট যত ভোট পায়, ঠিক সেই হারে সিট পায় না । এই পরিবর্তনকে আমরা বলতে পারি ডেভিয়েশন ।
তবে একই দেশে এই ডেভিয়েশনের ট্রেন্ড একই সময়ে মোটামুটি একই রকম বা কাছাকাছি থাকবে । যদি তা না থাকে তবে অবশ্যই ধরে নিতে হবে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বা ইলেকশন ইঞ্জীনিয়ারিং করা হয়েছে ।
কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৪টি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষন :
(এখানে দেয়া টেবিলটি ভেঙ্গে যাচ্ছে বলে আমি আলাদা ফাইল করে দিলাম)
১৯৯১ এর কেয়ার টেকার সরকার নির্বাচন:
(ক) দল ঃ আ লীগ, (১) কত% ভোট পেয়েছিলঃ ৩০,১। (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৮৮। (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৯০ ।
(৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -২,২।
(খ) দল ঃ বিএনপি । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৩০,৮ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ১৪০। (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৯২ ।
(৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৫২ ।
(গ) দল ঃ জে পি । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ১১,৯ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৩৫ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৩৬ ।
(৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৩ ।
(ঘ) দল ঃ ছোট দল । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ২২,৮ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৩৪ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৬৮ ।
(৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৫০ ।
(ঙ) দল ঃ স্বতন্ত্র । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৪,৪ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ০৩ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১৩ ।
(৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৭৭ ।
১৯৯৬ এর কেয়ার টেকার সরকার নির্বাচন:
(ক) দল ঃ আ লীগ, (১) কত% ভোট পেয়েছিলঃ ৩৭,৪। (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ১৫১। (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১১২ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৩৫।
(খ) দল ঃ বিএনপি । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৩৩,৬ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ১১৬। (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১০১ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +১৩ ।
(গ) দল ঃ জে পি । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ১৬,৪ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৩২ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৪৯ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৩৫।
(ঘ) দল ঃ ছোট দল । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ১১,৫ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৫ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ৩৪ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৮৫ ।
(ঙ) দল ঃ স্বতন্ত্র । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ১,১ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ১ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ০ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ - ।
২০০১ এর কেয়ার টেকার সরকার (নির্বাচন):
(ক) দল ঃ আ লীগ, (১) কত% ভোট পেয়েছিলঃ ৪০। (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৬২। (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১২০ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৪৮।
(খ) দল ঃ বিএনপি ।
(১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৪১,৪ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ১৯৩ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১২৪ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৫৬ ।
(গ) দল ঃ জে পি ।
(১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৭,২২ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ১৪ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ২২ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৯ ।
(ঘ) দল ঃ ছোট দল ।
(১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৭,৩ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ২৬ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ২২ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৯।
(ঙ) দল ঃ স্বতন্ত্র ।
(১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৪,০৬ । (২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৬ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১২ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৫০ ।
২০০৬/৮ এর কেয়ার টেকার সরকার (নির্বাচন):
(ক) দল ঃ আ লীগ ও জাতীয় পার্টি, (১) কত% ভোট পেয়েছিলঃ ৫৭,১।
(২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ২৬৩ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১৭১ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ +৫৪%।
(খ) দল ঃ বিএনপি ও অন্যান্য। (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৪২,৮ ।
(২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৩৩ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১২৮ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৭৯% ।
(গ) দল ঃ স্বতন্ত্র । (১) কত% ভোট পেয়েছিল ঃ ৪,৯ ।
(২) ৩০০এর কতটি সিট পেয়েছিল ঃ ৪ । (৩) আনুপাতিক হারে কত সিট প্রাপ্য ছিল ঃ ১৫ । (৪) পার্থক্য বা ডেভিয়েশন ঃ -৬০ ।
উপরের ফলাফলে দুইটি দলের (ক) ভোটের হার ও সিট সংখ্যার অস্বাভাবিকতা দেখুন ঃ
(ক-১) ১৯৯১ সনে আওয়ামী লীগ ৩০,১% ভোট = ৮৮ সিট, বি এন পি ৩০,৮% ভোট = ১৪০ সিট ।
(ক-২) ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগ ৩৭,৪% ভোট = ১৫১ সিট, বি এন পি ৩৩,৬% ভোট = ১১৬ সিট ।
(ক-৩) ২০০১ সনে আওয়ামী লীগ ৪০,০২% ভোট = ৬২ সিট, বি এন পি ৪১,৪% ভোট = ১৯৩ সিট ।
(ক-৪) ২০০৮ সনে আওয়ামী লীগ ৫৭,১% ভোট = ২৬৩ টি সিট, বি এন পি ৪২,৮% ভোট = ৩৩ টি সিট ।
(খ) আনুপাতিক হারের সঙ্গে ডেভিয়েশনের অস্বাভাবিকতা দেখুন ঃ
(খ-১) ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিজয়ী বি এন পি ৫২% ধনাত্মক (এবং আ লীগ ২,২% ঋনাত্মক) ডেভিয়েশন পেয়েছে ।
(খ-২) ১৯৯৬ এর নির্বাচনে বিজয়ী আ লীগ ৩৫% ধনাত্মক (এবং বিএনপি ১৩ % ঋনাত্মক) ডেভিয়েশন পেয়েছে ।
(খ-৩) ২০০১ এর নির্বাচনে বিজয়ী বি এন পি ৫৬% ধনাত্মক (এবং আ লীগ ৪৮% ঋনাত্মক) ডেভিয়েশন পেয়েছে ।
(খ-৪) ২০০৮ এর নির্বাচনে বিজয়ী আ লীগ ৫৪% ধনাত্মক (এবং বিএনপি ৭৪% ঋনাত্মক) ডেভিয়েশন পেয়েছে ।
(গ) উপরের ফলাফল দেখে মনে হয়, একজন কেউ গোপন স্থানে বসে একবার বি এন পির সিট কেটে আওয়ামী লীগের সীট বাড়িয়েছে, আবার পরের বার উল্টোটা করেছে । যতই দিন যাচ্ছে, তার সাহসও তত বাড়ছে, কারন ডেভিয়েশনের পরিমান ক্রমেই বাড়ছে।
(গ-১) ১৯৯১ সালে সে জাতীয় পার্টির সিট তেমন কাটার (৩%) সাহস পায় নি (এর আগেই জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় ছিল), আওয়ামী লীগেরও না, সে সিট কেটেছে ছোট ছোট দলের ৫০%, আর স্বতন্ত্রদের ৭৭% । ৫২% ডেভিয়েশন নিয়ে জিতেছে বি এন পি ।
(গ-২) ১৯৯৬ সালে সে বি এনপির সিট কিছুটা কেটেছে (১৩%), (এর আগেই বিএনপি ক্ষমতায় ছিল) । , সে সিট কেটেছে জাতীয় পার্টির ৩৫%, আর ছোট ছোট দলের ৮৫%। ৩৫% ডেভিয়েশন নিয়ে জিতেছে আওয়ামী লীগ ।
(গ-৩) ২০০১ সালে সে দুঃসাহসিক কাজ করেছে । আওয়ামী লীগের সিট কেটেছে ৪৮%, জাতীয় পার্টির ৩৬%, আর স্বতন্ত্রদের ৫০%।
৫৬% ডেভিয়েশন নিয়ে জিতেছে বি এন পি ।
(গ-৪) ২০০৮ সালে আবার সে একই রকম, কিন্তু বিপরীতধর্মী দুঃসাহসিক কাজ করেছে । আওয়ামী লীগের সিট কেটেছে ৫৪%, স্বতন্ত্রদের ৬০%। ৭৪% ডেভিয়েশন নিয়ে জিতেছে আওয়ামী লীগ ।
নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে আনুপাতিক হার আর প্রাপ্ত সিটের সংখ্যার মধ্যে আমরা যে ডেভিয়েশনের কথা বলছি তার ট্রেন্ড একই থাকবে, কোন দল এবার একটু বেশী পাবে, কোন দল পরের বার একটু বেশী বা কম পাবে ।
উপরের ফলাফলে দেখুন, যে সব দলের ক্ষমতা দখলের তেমন কোন আশা নেই, অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী যাদের তেমন চোট পাট করার ক্ষমতা নেই তাদের ডেভিয়েশন সব সময় ঋনাত্মক।
ভোট কারচুপি কাকে বলে আমরা জানি । ভোট কারচুপি তো অনেক রকম হতে পারে - যেমন জাল ভোট, আগেই বাক্স ভরে রাখা, বাক্স ছিন্তাই করে আবার ফেরত দেয়া, ভোটারকে ভোট কেন্দ্রে যেতে না দেয়া বা ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করা ইত্যাদি। সিট কারচুপি অন্য ধরনের জিনিস । এটি করা হয় নির্বাচনী অফিসে ।
সেখানে নানা স্থান থেকে ফলাফল আসছে । শেষের দিকে দেখা গেল একজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দীর কাছাকাছি । এ অবস্থায় তাকে কিছু ভোট বাড়িয়ে দিলেই সে জিতে যাবে । সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে যা খবরই আসুক, তাকে কিছু ভোট দিয়ে তা ঘোষনা করা হলো । পরে ভোট সংখ্যা ঠিক রাখার জন্য চোট পাট করবে না এমন প্রার্থীর ভোট কমিয়ে দেয়া হলো ।
উপরের ফল দেখে কিন্তু এটাই মনে হয় । তা না হলে ডেভিয়েশনের একই ট্রেন্ড বজায় থাকত । সেক্ষেত্রে ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ধনাত্মক ডেভিয়েশন পেতো । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মনে হয় কেয়ার টেকার সরকারের সময়েও নির্বাচন কমিশনের উপর দুটি প্রধান দলের একেক সময় একেকটি দলের প্রভাব থাকে । যাই হোক, এভাবে কিছু সিট হের ফের করা হলেই ফলাফল আনুপাতিক হারের থেকে দূরে চলে যাবে এবং তাতে এ ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দেবে ।
এই কাজ কারা কি ভাবে করে আমাদের জানা নেই । কিন্তু নির্বাচন কমিশনের দেয়া ফলাফল থেকে এটা স্পস্ট যে এই কাজ গত চারটি নির্বাচনে কম বেশী অবশ্যই চলেছে ।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।