বন্ধু মোস্তাফিজ আমাকে আহমদ ছফার এই লেখার খোঁজ দিয়েছে। দুর্দান্ত লেখা! ছফা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেকটি দিক নিয়ে মনে হয় আলাদা আলাদা লেখা দেয়া যাবে। এই মুহুর্তে আমার মনে ধরেছে নিচের অংশটুকু।
তিনি বিলক্ষন জানতেন, পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে অবজ্গা করেন।
এই শ্রেণীটির চরিত্রের খাঁজগুলো সম্বন্ধে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। উনিশ শ’ উনসত্তর সালের পূর্ব পর্যন্ত এই শ্রেনীর লোকেরা তাঁকে বাগাড়ম্বর সর্বস্ব অমার্জিত হামবগ ছাড়া কিছু মনে করতেন না, তা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। বিভিন্ন বিবৃতি, বক্তৃতা, ঘরোয়া বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনায় এঁদের প্রতি প্রচ্ছন্ন ঘৃণা এবং বিরক্তি তিনি কুন্ঠাহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন। তা সত্তে্ও উচ্চশিক্ষিত আমলা, লেখক-সাহিত্যিক এবং শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষক এবং সম্ভ্রন্ত সমাজের একাংশ তাঁকে বংগবন্ধু বলে যে সম্বোধন কেন করতেন শেখ মুজিব তা বুঝতেন এবং তা তাঁর ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রাপ্য হিসাবেই গ্রহণ করতেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি বলে কথিত শ্রেণীটির হীনমন্যতাবোধ এবং চারিত্রিক দাসত্ব অনেকটা প্রবাদের সামিল।
যে-কোন নতুন শাসক এলেই সকলে মিলে তাঁর গুণপনা বাখান করা এখানকার বহুদিনের একটা প্রচলিত প্রথা। কচিত কদাচিত ব্যতিক্রমী কন্ঠ শোনা যায়। এর কারণ নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সমাজ শরীরের মধ্যে সংগুপ্ত আছে। শক্তিদর্পী মানুষেরাও যে শেষ পর্যন্ত একেকটা দিকে কাঙাল থেকে যান শেখ মুজিবের মধ্যেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। যে বস্তুটি সহজভাবে পাওয়া যায় না তাকে ভেঙে ফেলার জন্য এঁদের অনেক সময় নিয়মমত খাওয়া-শোয়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে।
তাঁর আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের ঘটনাটিকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়। যদিও তিনি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি তথাপি তাঁর কানের কাছে অনেক উচ্চকন্ঠ চিৎকার করেছে, বাচাল ও অর্বাচীনেরা অনেক বৃথা লিখেছে, কিন্তু পন্ডিতরা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছেন। এই অর্থবোধক নিশ্চয়তা তাঁর বুকে শেলের মত বেজেছে। সেজন্যই তাঁর অত ঘটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। যে লোকেরা সহজভাবে তাঁকে স্বীকার করে নেয়নি, তাঁদেরকে তাঁর মহিমা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যলয়ে আসছেন।
নইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শেখ মুজিব সকাল-সন্ধে ভাঙা কাপে চা খেয়েছেন, সেখানে আাসার জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? বিশষত বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রের পয়সার অভাবে সকাল বেলার টিফিন জোটে না।
শক্তিদর্পী মানুষেরাও যে শেষ পর্যন্ত একেকটা দিকে কাঙাল থেকে যান শেখ মুজিবের মধ্যেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। যে বস্তুটি সহজভাবে পাওয়া যায় না তাকে ভেঙে ফেলার জন্য এঁদের অনেক সময় নিয়মমত খাওয়া-শোয়ার ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তাঁর আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের ঘটনাটিকেও এ পর্যায়ে ফেলা যায়। যদিও তিনি দেশের একচ্ছত্র অধিপতি তথাপি তাঁর কানের কাছে অনেক উচ্চকন্ঠ চিৎকার করেছে, বাচাল ও অর্বাচীনেরা অনেক বৃথা লিখেছে, কিন্তু পন্ডিতরা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছেন।
এই অর্থবোধক নিশ্চয়তা তাঁর বুকে শেলের মত বেজেছে। সেজন্যই তাঁর অত ঘটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। যে লোকেরা সহজভাবে তাঁকে স্বীকার করে নেয়নি, তাঁদেরকে তাঁর মহিমা বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যলয়ে আসছেন। নইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে শেখ মুজিব সকাল-সন্ধে ভাঙা কাপে চা খেয়েছেন, সেখানে আাসার জন্য সাড়ে সাত লক্ষ টাকা ব্যয় করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? বিশষত বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও এক-তৃতীয়াংশ ছাত্রের পয়সার অভাবে সকাল বেলার টিফিন জোটে না।
এই লেখার কিছু কিছু ব্যাপার আমার কাছে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
বঙ্গবন্ধুর সাথে পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষের দূরত্ব বলতে ঠিক কি বুঝানো হচ্ছে? আমরা যারা আশির দশকে জন্মেছি তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে মনে হয় গড়পরতা ধারণা এরকম -
ছাত্রজীবনের রাজনীতি সচেতন মুজিব অবিশ্বাস্য সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে সত্তরে এসে হিমালয়সম বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। তারপর স্বাধীন দেশে দুর্বল একনায়ক প্রশাসক হিসেবে বিদেশীসাহায্যপুষ্ট বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। সোজা কথায়, খুব সম্ভবত: আমাদের বয়সী বেশিরভাগ মানুষের কাছে একাত্তরের আগের বঙ্গবন্ধু হলেন মহানায়ক আর এর পরের বঙ্গবন্ধু অনেকটাই মাটির কাছাকাছি।
তাহলে ছফা কেন বললেন,
তার মানে সত্তরের আগের বঙ্গবন্ধু আমাদের বয়সীদের কাছে মহানায়ক হলেও সব বাঙ্গালীর কাছে ছিলেন না! এই ব্যাপারটি আমার কাছে একদম অপরিচিত না। আমার মামা একজন সিএসপি অফিসার, ষাটের দশকে ঢাবি থেকে প্রথম শ্রেণী নিয়ে অর্থনীতি বিভাগ থেকে পাশ করেছিলেন।
তার মতে, মুজিব লাঠি নিয়ে পোলাপান সহ মারামারি করত। আমি ব্যাপারটিকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ভেবেছিলাম। কারণ, আমি শুনেছিলাম, সেই ষাটের দশকেই রেহমান সোবহান ছয় দফার তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন, ড. কামাল হোসেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আইনজীবি হয়েছিলেন। তারা কেউ আমার মামার তুলনায় কম পণ্ডিত বলে মনে হয় নি।
তাহলে কি পণ্ডিতদের মধ্যে কোন একটি নির্দিষ্ট বয়সীরা বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন অন্য বয়সের যারা তারা তাকে অতটা বিশ্বাস করতেন না কিংবা সিএসপি অফিসার হতে পারেননি বা প্রথম শ্রেণী পাননি বলে নাক সিঁটকাতেন? নাকি পাণ্ডিত্যের ঠেলায় উঁচু তাদের নাকের কারণে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী রাজনৈতিক আন্দোলন - ছয় দফা, এগার দফা, সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণকার্যে দুর্বলতার প্রতিবাদ এসব তাদের চোখে পড়েনি? এদিকে আবার সত্তরের নির্বাচনে তো বঙ্গবন্ধু তো ঠিকই জিতেছিলেন।
তাহলে কি তারা তার ব্যাপারে খুব উছ্ছসিত না হলেও ঠিকই ভোট দিতেন নাকি বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে আগ্রহী হতে তাদের ১৯৭০ এর নির্বাচন পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল? এনাদের গড় বয়স কি বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বেশি ছিল যে তাকে চ্যাংড়া পোলা ভাবতেন? নাকি তারা সমবয়সী ছিলেন যাতে করে সমবয়সী একজনের উচ্চতা হিমালয়সম হচ্ছে এটিতে তারা অভ্যস্ত ছিলেন না।
এসবের বাইরেও কারণ থাকতে পারে। বেশির ভাগ পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষের মাঠ পর্যায়ের রাজনীতির অভিজ্ঞতা থাকার কথা না। এ কারণে কি বঙ্গবন্ধুকে যেসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সেগুলো তারা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না? রাজনীতিতে তো মারপিট, হাঙ্গামা, জেল, হুলিয়া সবকিছুর মধ্য দিয়েই মুজিব বঙ্গবন্ধুু হয়েছিলেন। কেউ যখন রাজনীতি করে তখন সেই এলাকার রাজনীতি যে ভাষায় কথা বলে বেশিরভাগ লোক সে ভাষাতেই কথা বলে।
এই ব্যাপারগুলোর কারণেই কি তারা নাক সিঁটকাতেন? এটি কি কেবল সৎ সাংস্কৃতিক দূরত্ব?
আমি জানিনা এই পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশে আছে কিনা। এখন তো আর বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু আওয়ামী লীগ আছে। বাংলাদেশে কি এমন পান্ডিত্যাভিমানী শিক্ষিত সমাজের মানুষ আছে যারা বিএনপি জামাতের সমর্থক না কিন্তু আওয়ামী লীগকে একই কারণে অবজ্ঞা করেন? কারণ কিন্তু আমি জানি না, তাই উপরে কোটিখানেক প্রশ্ন রেখে এসেছি - তবে আহমদ ছফা মনে হয় আওয়ামী লীগের খারাপ কাজগুলোর কারণে অপছন্দ করার কথা বলেন নি, পান্ডিত্যাভিমানের কারণে অবজ্ঞা করার কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের ভাল দিকগুলো খুব চমৎকার (যেমন: ধর্ম নিরপেক্ষতা) কিন্তু খারাপ দিকগুলো কিন্তু কম ভয়াবহ নয় (দুর্নীতিবাজ সাংসদ, ছাত্রলীগের চাপাতিবাজি ইত্যাদি)। কিন্তু সত্তরের আগের বঙ্গবন্ধুর উপর তাদের অবজ্ঞার কারণ যা, সেই একই কারণে কি কিছু মানুষ এখন আওয়ামী লীগকে নাক সিঁটকান? খারাপ কাজের কারণে অপছন্দ করা নয় কিন্তুু।
খারাপ কাজের কারণে অপছন্দ করার জন্য শিক্ষিত ও পাণ্ডিত্যাভিমানী হওয়া লাগে না।
গত ডিসেম্বরের ২৫ তারিখে আল জাজিরাতে জিয়া হাসানের এই লেখাটি পড়েছিলাম। এরকম অদ্ভুৎ আবর্জনা অনেকদিন পড়িনি। রীতিমত শিরোনামসহ অনুচ্ছেদ ভাগ করে করে লেখা। প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদ আবার পৃথক পৃথকভাবে ছোট ছোট আবর্জনা।
প্রথম অনুচ্ছেদ টি হল শাহবাগের আন্দোলন ছিনতাই হওয়া নিয়ে। লেখক দাবী করেছেন এখন আর শাহবাগে কেউ যায় না। কিন্তু লেখা ছাপার দশ দিন আগেই গণজাগরণ মঞ্চের আহবানে প্রায় তিন লাখ লোক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সংগীত কিসের টানে গেয়ে আসল সেটির কোন ব্যাখ্যা নেই। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে এক জায়গায় তিনি দাবী করেছেন সরকার বুঝে শুনে নির্বাচনের সাথে সময় মিলিয়ে ফাঁসির দিন ফেলেছে। মামলার শুনানি নিয়ে পত্রিকার যত রিপোর্ট হয়েছে তার কোথাও পেলাম না সরকার কোন কারণে শুনানি আটকে রেখেছে।
যারা বলে রায় না লিখে বিচারক বসে আছে তাদের কাউকে বলতে দেখলাম না সাড়ে সাতশ পাতার একটি রায় লিখতে ঠিক কতদিন লাগা উচিৎ। তাদের নিজেদের কোন সাড়ে সাতশ পাতার বই থাকলে সেটি কতদিনে লেখা হয়েছে সেটি দেখতে পারলেও হত। ঠিক কত তারিখে ফাঁসির তারিখ ফেললে সেটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের হত সেটি আজ পর্যন্ত শুনতে পেলাম না। কিন্তু অভিযোগ করার সময় কেউ পিছিয়ে নেই! তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল। কিন্তু গত চার বছর ধরে যারা একই বাদ্য বাজিয়ে যাচ্ছেন তাদের কেউ বলতে পারলেন না ত্রুটি টি কোথায় - আইনে, কার্যবিধিতে, শুনানিতে, রায়ে? কোথায়? কোন রকম তথ্য, যুক্তি বা বিশ্লেষণ ছাড়া এরকম দাবী করা হচ্ছে - মানুষ কিভাবে পারে? কাদের মোল্লার ফাসির আগের দুই দিন যা কাণ্ড হলে এর পরেও আতাঁত তত্ত্ব? আমরা কি এতটাই বোকা? ইংরেজী আরেকটু খারাপ হলে লেখকের নামে শেষের
হাসান কেটে শুরুতে
খালেদা বসিয়ে দিলে কেউ কি ধরতে পারত?
লেখাটি পড়ে আমার এক বন্ধুকে ফোনে নিচের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটি জানিয়েছিলাম,
বাংলাদেশে কিছু শিক্ষিত ইংরেজী জানা মানুষ আছে যাদের নাক উঁচু হতে হতে এতটাই উঁচু হয়েছে যে মাঝে মাঝে সেটি গুঁতা দিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের গতি পাল্টে দিতে চায়।
আমি জানি প্রতিক্রিয়াটি অনেক রুঢ় (তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী), হয়তো তার আরো অনেক চমৎকার লেখা আছে। তবে বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগকে অভিমানী কিছু পন্ডিতের অবজ্ঞা নিয়ে আমার অনেক অনেক প্রশ্ন, সন্দেহ আর দ্বন্ধ থাকলেও কিন্তুু এই নির্দিষ্ট লেখাটি যে আবর্জনা তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কাছাকাছি শিরোনামে এর আগে আরেকটি লেখা লিখেছিলাম: আওয়ামী বিদ্বেষের মনস্তত্ব
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।