ঝড়ের গতিতে একটা টয়োটা এসে থামল ওয়াশিংটন ডিসির এক প্রাইভেট হাসপাতালের সামনে। গাড়ি পুরোপুরি থেমে দাঁড়ানোর আগেই প্যাসেঞ্জার ডোর খুলে বেরিয়ে এল দীর্ঘদেহী এক যুবক। পাঁজাকোলা করে ভিতর থেকে নামিয়ে নিয়ে এল রক্তাক্ত এক লোককে। দীর্ঘদেহী লোকটা নিজেও কমবেশি আহত। ড্রাইভারের দরজা খুলে নেমে এল আরেক যুবক।
অচেতন লোকটার সাথে চেহারায় বেশ মিল। পেছনের সিট থেকে অসম্ভব রূপবতী এক তরুণীকে নামিয়ে আনল সে। দুজনকে হাসপাতালের ভেতর নিয়ে আসা হল নার্সদের সাহায্যে। ডাক্তাররা রোগীদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাথে সাথে ওটিতে নিয়ে গেল অচেতন দুজনকে।
সচেতন দুই যুবককেও ডাক্তাররা জোর করে ধরে ট্রিটমেন্ট করে দিলেন। মাথায় সেলাই লাগল অপেক্ষাকৃত কমবয়সী যুবকের। ওদিকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া মানুষটার কোনও খবর ডাক্তাররা এখনও বলছেন না। চিন্তিতমুখে পায়চারী করতে লাগল অন্য দুজন। এক ফাঁকে তাদের একজন কোথায় যেন কল করতেই একহারা গড়নের ফর্মাল পোশাকের ১৫-২০জন লোক হাজির।
হাসপাতালের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পজিশন নিল ওরা। হাসপাতালে নিজেদেরকে ইন্টারনাল সিকিউরিটির লোক বলে পরিচয় দিল। কর্তিপক্ষও আর ওদেরকে ঘাঁটাল না। বোঝাই যাচ্ছে আহত ব্যাক্তিরা সরকারের হোমরাচোমরা কোন লোক। এদের এই অবস্থা কি করে সেটা তাদের জানার কথা না।
জানতে হলে তাদের আরও অনেক পেছনে ফিরে যেতে হবে।
দশদিন আগে,
নিউ ইয়র্কের এক ব্যস্ত পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রায়ান। ডেট আছে ওর রিনিসের সাথে। ওদের দুজনের পছন্দের এক রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার কথা। দশ মিনিট আগেই বেরিয়েছে ও, তাই দেরি হ¬¬¬¬¬বার কোন কারণ নেই।
নিজের পেন্টহাউজের কাছাকছিই রেস্টুরেন্ট হওয়ায় গাড়িটা নেয়নি। হাঁটতেও বেশ ভাল লাগছে। মানুষের ভিড়ে অন্যরকম এক অনুভূতি হঠাৎ স্পর্শ করল ওকে। বহুদিনের পুরনো অনুভূতিটাকে চিনতে ভুল হল না একটুও। কেউ ফলো করছে।
স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলল রায়ান। তারপর হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে চলন্ত বাসে উঠে পড়ল। ব্যাস, ঝামেলা শেষ। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাসে ঢুকল রায়ান। বাসের যাত্রীদের চেহারা দেখে চমকে উঠল।
সবগুলো চেহারায় সামরিক কাঠিন্যের ছাপ স্পষ্ট। ফাঁদে পরেছে রায়ান। পেছন থেকে বাড়ি পড়ল মাথায়।
জ্ঞান ফিরার পর ককিয়ে উঠল রায়ান। মাথার পেছন দিকটা অনুভূতিহীন।
রুমের চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। কোনও ধরনের ইন্টারোগেশন রুম। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে মধ্যযুগীয় টর্চারের বিভিন্ন যন্ত্র, তলোয়ার, ছুরি, মুগুর। পেশিবহুল এক ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে ওর এক পাশে। চেনাচেনা লাগলেও মাথার মাথার আঘাতের কারনে তৎক্ষণাৎ চিনতে পারল না রায়ান।
তবে ছোকরা ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় চেয়ার নিয়ে পেছনে ওর পায়ে পড়ে অ্যাটাকের প্ল্যান সাথে সাথে বাদ দিয়ে দিল। টেবিলের অপর পাশের চেয়ারে বসা মানুষটার দিকে এবার মনোযোগ দিল। দেখতে খারাপ না। কি ধরনের মানুষ সে বুঝে নিতে চেষ্টা করল রায়ান। চাকুরীজীবী, নোংরা কাজে অভ্যস্ত কিন্তু ভীতু, খাঁচার সিংহকে খোঁচাতে পারে কিন্তু মুক্ত সিংহের সামনে পড়লে প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়।
রায়ান বেশ অবাক হল এতো কাঁচা কাজ দেখে, ওর পরিচয় জানা থাকলে এর বাপদাদার জানার কথা রায়ানের জন্য এ লোক শুধুই ছেলেখেলা! মুখ খুলল লোকটা,
-তাহলে, মিঃ রায়ান, কেমন বোধ করছেন?
-সামনের শুঁয়োপোকা আর পাশের নর্দমার কথা বাদ দিলে ভালই আছি।
ধরাম করে এক পাঞ্চ ঝাড়ল বডিবিল্ডার রায়ানের ডান গালে। আবার বলল শুঁয়োপোকা,
-বুঝতেই পেরেছেন আমাদের আপ্যায়নের ধরন। এবার মুখ খুললেই ভাল করবেন।
-যা বুঝতে পারছি নাকটা তোমাদের দুর্গন্ধে ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
আরেকটা পাঞ্চ পড়ল গালে। শুঁয়োপোকা বলল,
-দেখুন এভাবে নিজের স্কাল আর আমার সময় দুটোই বৃথা নষ্ট করছেন আপনি। ইজেরা আপনাকে মেরেই যাবে আপনি লাইনে না আসা পর্যন্ত।
-যত খুশি তাণ্ডব করতে পারে তোমার ঐ নর্দমা। আমার কোন আপত্তি নেই।
আবার পাঞ্চ। ইজেরাকে উদ্দেশ্য করে বলল রায়ান,
-আরেকটু ডানে, ওখানেই বেশী চুলকাচ্ছে।
আবার মারল। সশব্দে দরজা খুলে গেল এই সময়। গটগট করে আলোতে এসে যে দাঁড়াল তাকে দেখে মনে মনে চমকে গেল রায়ান।
সিআইএ এর কারেন্ট ডিরেক্টর।
উঠে দাঁড়াল শুঁয়োপোকা। বেকায়দায় স্যালুট করল। পাত্তা না দিয়ে বলল ডিরেক্টর ল্যানহাম,
-তোমাকে বলা হয়েছিল ওঁর উপর নজর রাখতে, ওঁকে মারতে বলা হয়নি।
চিকন ঘাম দেখা গেল শুঁয়োপোকার মুখে।
চিঁচিঁ করে বলল,
-না মানে স্যার, আসলে ভাবলাম...আমি...
-আসলে ভেবেছিলে এর মুখ থেকে কথা বের করে আমাকে তেল দিয়ে প্রমোশনটা বাগিয়ে নিবে, কিন্তু তোমার মতো মাথামোটার একে চেনা না থাকলেও আমার আছে।
ঘামের ধারা মোটা হল শুঁয়োপোকার। আবার বলল ল্যানহাম,
-আর যদি তোমার এই ছেলেখেলার কারনে ইনি মুখ খুলতে রাজি না হন তাহলে তোমার চোদ্দ গুষ্টিকে আমি গায়েব করে দেব। নাউ গেট লস্ট।
ঝড়ের গতিতে বেড়িয়ে গেল শুঁয়োপোকা।
তার জানা আছে এই লোক যা বলে তার থেকেও বেশী সে করে। ওর চোদ্দ গুষ্টিকে গায়েব করা এনার কাছে হাতের ময়লা পরিষ্কার করার মতই তুচ্ছ কাজ।
খালি চেয়ারটায় বসল ল্যানহাম। রায়ান ভাবল, বিভিন্ন মিটিঙে আগেও ওদের দেখা হয়েছে। লোকটা খুব নিচু মনের অধিকারী।
ল্যানহাম বলল,
-হ্যালো রায়ান! কতদিন পরে দেখা! নাইস টু মিট ইউ।
-তোমাকে দেখে আমি তেমন খুশি হতে পারছিনা ল্যানি।
-হাউ ক্যান আই ব্লেইম ইউ!
-কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি তোমার গিফটগুলো ফেরত চাইবে এখনই।
ঘর কাঁপিয়ে হাসল ল্যানহাম। উঠে এসে রায়ানের হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিল।
সাবধানে হাতটা সামনে এনে কবজি ডলতে ডলতে বলল রায়ান,
-রিয়েলি? তুমি আমার হাতকড়া খুলে কিন্তু তোমার পিস্তল হোলস্টারে রেখে নিরাপদ বোধ করছ?
-নট রিয়েলি। আসলে আমার কাছে কোন পিস্তলই নেই। ওটা তোমার সামনে নিজের হাতে রাখলেও বেঈমানি করতে পারে, আমি জানি। তবে খেলার টেক্কাটা আমার কাছে আছে।
চোখ সরু করে তাকাল রায়ান।
দুবার চুটকি বাজাল ল্যানহাম। ঘরের আবছা অন্ধকার কোনের দরজা খুলে প্রায় বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত এক বন্দিকে নিয়ে ঢুকল একজন গার্ড। লোকটাকে পাহারা দেয়ার চেয়ে বয়ে আনার কাজেই বেশী প্রয়োজন হচ্ছে গার্ডকে। দরজার ভিতর পা রাখতেই ঝট করে পিছনে মাথা ছুঁড়ে দিয়ে গার্ডের নাক ভেঙ্গে দিল বন্দি। এরপর ল্যাং মেরে ফেলে দিল তাকে।
হ্যান্ডকাফ কণ্ঠনালীতে চেপে ধরতেই লাফিয়ে পিস্তল হাতে ঘরে ঢুকল এক এজেন্ট। গুলি করতে উদ্যত হতেই তাকে থামাল ল্যানহাম। বলল,
-ওকে এখনই মারার দরকার নেই। ওর প্রয়োজন আছে। নিয়ে এস।
নাকভাঙ্গা গার্ড উঠে দাঁড়িয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে বন্দিকে, পেছনে পিস্তল হাতে এজেন্ট। আলোতে আসতে বন্দির চেহারা দেখে চমকে উঠল রায়ান।
-জেসন!
মুখ তুলে অসহায় হাসি দিয়ে বলল জেসন,
-সরি স্যার! ওরা অনেকে ছিল। পারলাম না।
উঠে দাঁড়াতে গেল রায়ান।
এজেন্টের পিস্তলের নল ঘুরে গেল ওর দিকে। ল্যানহাম বলল,
-তোমাদের রিইউনিয়ন চ্যাট পরে করতে পারবে রায়ান। তার আগে আমি যা চাইছি তা দিয়ে দাও।
থমথমে মুখে বসে রইল রায়ান। এজেন্টের পিস্তল আবার ঘুরে গেছে জেসনের দিকে।
পাশে দাঁড়ান ইজেরকে একনজর দেখে ল্যানহামকে বলল রায়ান,
-এস’১৩? এস’১৩ কে ব্যবহার করছ তুমি?
মৃদু হেসে বলল ল্যানহাম,
-তোমার স্মৃতিশক্তি বরাবরই আমাকে অবাক করে রায়ান। ঠিকই ধরেছ। ইজরায়েল সরকারের পকেট থেকেও কমবেশি খসিয়েছি তো। তাই ওরা এদের ধার দিতে কার্পণ্য করেনি, তাছাড়া তারাও ব্যাক্তিগতভাবে তোমার পিছে লেগে আছে। আরও কত টীমকে যে তোমার পেছনে লাগানো হয়েছে কল্পনাও করতে পারবে না তুমি।
-একটা কথা বল ল্যানি, তোমার এই গোপন পরিকল্পনার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও জানে প্রেসিডেন্ট? জানলে কি হবে ভেবে দেখেছ?
মুখের চেহারা পাল্টে গেল ল্যানহামের। রায়ান বুঝতে পারল ওর আন্দাজে ছোঁড়া ঢিলটা জায়গামত লেগেছে, এটা সম্পূর্ণ সিআইএ এর আরেকটা গোপন নীল নকশা। ল্যানহাম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
-সেটা জানার অনেক আগেই আমার প্ল্যান সফল হয়ে যাবে রায়ান। তুমি কিছুই করতে পারবে না। পুরো পৃথিবী দখল করে নেব আমি ঐ মিসাইলগুলো দিয়ে।
-তোমার মাথায় সমস্যা আছে জানতাম, তবে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছ সেটা আজ টের পেলাম।
গর্জে উঠে টেবিলে ঘুষি মারল ল্যানহাম। টেবিলের উপরে রাখা কাগজ-কলম লাফিয়ে উঠল। বলল ল্যানহাম,
-এনাফ বুলশিট রায়ান। তুমি এখন বলবে বলবে মিসাইলগুলোর লোকেশন।
নাহলে তোমার প্রিয় সহচর মিঃ স্ট্যালিয়ন মরবে।
ঠাণ্ডা স্বরে ল্যানহামকে বলল রায়ান,
-দেখ ল্যানি, যেটা করছ সেটা পাগলামি। তুমি আশা করতে পারনা যে কোন মানুষ পৃথিবীর দখল নিতে পারবে এতো খুনোখুনি করে।
-আমি দশ পর্যন্ত গুনব। এজেন্ট হবস, এরমধ্যে মিঃ রায়ান মুখ না খুললে মিঃ স্ট্যালিয়নকে আর আমাদের প্রয়োজন হবে না।
মাথা ঝাঁকাল এজেন্ট। গুণতে শুরু করল ল্যানহাম,
-১...২...৩...৪...৫...
জেসন বলল রায়ানকে স্থবির কণ্ঠে,
-স্যার, ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করে দেবেন।
চোখের কোনে পানি দেখা গেল জেসনের, কিন্তু সেটা কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল না। একবার আড়চোখে এজেন্টের দিকে তাকাল। জেসন কি বলছে বুঝতে সময় লাগল না রায়ানের।
বেচারা ওকে বাঁচাতে নিজের জীবনটা দেয়ার কথা বলছে। একবার জেসনের চোখে চোখ রাখল রায়ান। অনেক কথা হয়ে গেল ঐ এক দৃষ্টিতে। গুনে যাচ্ছে ল্যানহাম,
-৬...৭...৮...৯...
অমানুষিক রক্ত জমিয়ে দেয়া দৃষ্টিতে তাকাল রায়ান ল্যানহামের চোখে। ঠাণ্ডা স্বরে ঘরের সবার রক্তে কাঁপুনি তুলে দিয়ে বলল,
-জীবনের সবেচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছ তুমি ল্যানহাম এবং নিশ্চিত থাক এটাই তোমার শেষ ভুল।
-১০।
ট্রিগার চাপল এজেন্ট। বদ্ধঘরে বিকট আওয়াজ তুলল গুলি।
রায়ানের স্বরে এমন কিছু ছিল যে ঘরের সবার চোখ আর মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর দিকে, একমাত্র জেসন ছাড়া। ধীরে ধীরে সে পা দুটো গুটিয়ে টেবিলের কিনারে ঠেকিয়েছে।
ল্যানহাম দশ গুনতেই এজেন্ট ট্রিগার চাপার ঠিক আগ মুহূর্তে ঝাড়া দিয়ে পা দুটো সোজা করে নিয়েছে। উড়ে গিয়ে ঘরের আরেক কোণে পড়ল ও। ভয়ংকর একটা বাজি খেলেছে জেসন। জীবনটা যেতে পারত। মাটিতে পরেই ছুট লাগাল সে।
জেসনের পিছু নিল এজেন্ট। রায়ান এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে কনুই চালাল পাশে দাঁড়ান ইজরায়েলি এস’১৩ এর ইজেরের গলায়। প্রচণ্ড আঘাতে হাড় ভেঙে সাথে সাথে মারা গেল ইজের। লাফিয়ে উঠে পাশের দেয়াল থেকে একটা তলোয়ার নামিয়ে নিল ল্যানহাম। বাতাস কেটে রায়ানের ডানদিক দিয়ে সাঁই করে তলোয়ার চালাল।
সতর্ক ছিল রায়ান। সরে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যেই বুঝতে পারল ওকে আহত করতে চাইছে ল্যানহাম। একের পর এক আঘাত এড়াতে লাগল রায়ান, সেই ফাঁকে খুঁজতে লাগল ল্যানহামের তলোয়ারের বিপরীতে ব্যবহার করা যায় এমন একটা অস্ত্র। কিন্তু কিছুই পাচ্ছে না।
এক সুযোগ পেয়ে দেয়াল থেকে একটা ছুরি তুলে নিল। কিন্তু তলোয়ারের কাছে সেটা ছেলেখেলা। একের পর এক হামলা ঠেকাতে ঠেকাতে পাল্টা আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে না রায়ান। হঠাৎ ঘরের দূরপ্রান্তে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। জেসনকে পেয়ে গেছে এজেন্ট।
ওর দিকে পিস্তল তাক করেছে সে। ছুরিটা ডান হাতে নিয়ে ঝাকি দিয়ে ছুঁড়ে দিল রায়ান। ফলাটা ঘ্যাঁচ করে এজেন্টের মাথায় ঢুকার আগেই একটা গুলির আওয়াজ শোনা গেল। সিআইএ এজেন্ট পরে গেল। স্বস্তির শ্বাস ফেলল রায়ান, কিন্তু পরমুহূর্তে টলে উঠে পড়ে গেল জেসন।
রায়ানের বুকের মধ্যে চিনচিনে একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। জ্বলে উঠল প্রতিশোধের আগুন। রায়ানের চোখে সেই আগুন দেখে ভড়কে গেল ল্যানহামের মতো উন্মাদও। মিসাইলের ঠিকানার আশা বাদ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে একের পর এক মরন আঘাত হানার চেষ্টা করতে লাগল সে। কিন্তু রায়ান যেন ঘূর্ণি বাতাস, টর্নেডোতে পরিনত হয়েছে।
কোন আঘাতই স্পর্শ করতে পারছে না ওকে। হঠাৎ বিদ্যুতের গতিতে শেষ চেষ্টা হিসেবে নিরস্ত্র রায়ানের উপর ঝাপিয়ে পড়ে একের পর এক কোপ বসাতে গেল ল্যানহাম। আঘাতের প্রচণ্ডতায় পেছনে যেতে গিয়ে চেয়ারে পা বেঁধে হাত-পা ছড়িয়ে টেবিলের উপর পড়ল রায়ান। হাতে ঠেকল একটা কলম। ওদিকে রায়ানকে বাগে পেয়ে রায়ানের মাথা লক্ষ করে খোঁচা দেয়ার ভঙ্গিতে তলোয়ার সোজা করে ধরে রেখে লাফিয়ে পড়ল ল্যানহাম।
শেষ মুহূর্তে একটু সরে যাওয়ায় রায়ানের কাঁধে গভীর গর্ত সৃষ্টি করে টেবিলের কাঠে গেঁথে গেল তলোয়ার। রায়ানের উপর পড়ল ল্যানহাম। সময় নষ্ট না করে চোখের পলকে হাতে ধরা কলমটা ল্যানহামের চোখের সামনে তুলল রায়ান। শিরশিরে কণ্ঠে বলল,
-ইগনেম ফেরাম।
পরমুহূর্তে রায়ান আমূল গেঁথে দিল কলমটা ল্যানহামের চোখে।
মারা গেল সিআইএ ডিরেক্টর।
আহত কাঁধ চেপে ধরে নিজের সবচেয়ে পুরনো সহকারীর লাশের কাছে ফিরল রায়ান। হাঁটু ভেঙে বসে মাথাটা কোলে তুলে নিল। চমকে উঠল ও। বেঁচে আছে জেসন! চোখ মেলল জেসন।
বলল,
-ইগনেম ফেরাম মানে কি স্যার?
মৃদু হাসল রায়ান। বলল,
-আই ফর এন আই।
ধীরে ধীরে রায়ানের সাহায্যে উঠে দাঁড়াল জেসন। সিআইএ জেসনের শার্টের ভেতরের স্মার্টস্লিম বুলেটপ্রুফ ভেস্ট এর কথা জানত না। এই ভেস্টের আবিস্কারের পর পরীক্ষা করছিল ব্ল্যাক ফাইটারর্সের টেকনিশিয়ানরা।
রায়ানও জানত না জিনিসটা জেসন ব্যবহার করে। তাই জেসন মারা গেছে ভেবেছে। ল্যানহামের লাশটা দেখল জেসন। বলল,
-আ পেন ইজ অলওয়েজ মাইটিয়ার দ্যান আ সোর্ড।
কিছু না বলে মুচকি হাসল রায়ান।
ল্যানহামের ফোন ব্যবহার করে একটা কল করতেই বেশ কিছু এজেন্ট এসে সিআইএ এর ঐ সেফ হাউজে হামলা করে ওদের উদ্ধার করে নিয়ে গেল।
পরদিন ভোর,
নিজের পেন্টহাউজের বিশাল ব্যালকনির এককোণে ইজি চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে স্নো। হঠাৎ বেজে উঠল ওর ফোন। রিঙের কোন জবাব না পেয়ে ওপাশ থেকে আনসারিং মেশিনে মেসেজ দিল একজন,
-মিঃ স্নো, আপনার জন্য একটা টার্গেট আছে। যতদ্রুত সম্ভব আপনাকে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হল।
ইটস আর্জেন্ট।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্নো। সব কথার শেষে ইটস আর্জেন্ট বলা স্বভাব হয়েছে ওর সেক্রেটারি তারিনের। হাজারবার বারণ করলেও শোনেনা। কফিটা শেষ করে উঠে পড়ল।
অলস সময় কাটানোর পালা শেষ।
পেন্টহাউজ থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় নামল স্নো। ইচ্ছে করেই গাড়ি না নিয়ে পায়ে হেঁটে চলেছে। ভোরের হাওয়া আর প্রথম সূর্যের আলো ওর খুব পছন্দ। পরনের পার্কার হুড তুলে দিয়ে কুয়াশার মাঝে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌঁছে গেল ওর অফিসে। একটা এভিয়েশন কোম্পানির মালিক ও। কোম্পানি দেখাশোনার কাজ ওর লোকেরাই করে। তবে তাদের কেউই জানেনা তাদের বসের আসল কাজ কি, কেন তিনি নিজে কোম্পানির দেখাশোনা করেন না। লিফটে উঠে সোজা নিজের অফিসে চলে এল স্নো।
ওর অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিল তারিন। একটা ব্রিফকেস তুলে দিল স্নোর হাতে। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লক করে দিল। ব্রিফকেসের কাগজগুলোয় নজর বুলাল। এরপর পিছনের বড় ভিডিও স্ক্রিন ওপেন করতেই ফুটে উঠল ভয়ানক প্রভাবশালী এক লোকের চেহারা।
সংক্ষেপে কথা সারল সে,
-মিস্টার স্নো, আপনার কাজে প্রতিবার মুগ্ধ হয়েছি আমরা। তাই আবারও আরেকটি কাজে আপনার সাহায্য চাই। আপনার একাউন্টে পেমেন্ট আমরা করে দিয়েছি। টার্গেটের বিস্তারিত আপনার সেক্রেটারিকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এই টার্গেট খুবই ধূর্ত, বিপদজনক।
আশা করব আপনি আমাদের ব্যর্থ করবেন না।
-আমার কাছে সব টার্গেটই সমান মিঃ হার্ড, গুডবাই।
মনিটর থেকে অদৃশ্য হল সিআইএ এর পূর্বের ভাইস ডিরেক্টর এবং বর্তমান ডিরেক্টর লরেন্স হার্ড। নিজের ব্যক্তিগত কম্পিউটার ওপেন করে টার্গেটের ডিটেইলে মনোযোগ দিল স্নো। আনমনেই বলল,
-নামটা ভালই।
রায়ান, এজেন্ট সৌরভ রায়ান।
ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্রুর হাসি। হঠাৎ স্ক্রিনে আবার উদয় হল লরেন্স হার্ড। স্নো জিগ্যেস করল,
-কিছু বলতে ভুলে গিয়েছিলেন মিঃ হার্ড?
খুক খুক করে কেশে নিয়ে বলল হার্ড,
-একটা শর্ত আছে এবার আমাদের।
ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল স্নো,
-সেটা কি?
ফিনিক্স সিকিউরিটিজ এর হেড অফিস, সিটি সেন্টার, মতিঝিল, ঢাকা।
কনফারেন্স রুমে উপস্থিত রয়েছে ফেলিক্স হুয়েরা, আনিস আহমেদ, শায়খ রায়ান, জেসন স্ট্যালিয়ন এবং এজেন্ট সৌরভ রায়ান। ফেলিক্সই প্রথমে মুখ খুলল,
-যেটা ঘটেছে সেটা আবারও ঘটতে পারে কর্নেল, এরপরের বার যে প্রানে বেঁচে আসবে দুজনে সেটা নাও ঘটতে পারে।
শায়খ বলল,
-আমাদের ভাল একটা প্ল্যান এবং মুক্ত বাতাস দরকার। লেজে এস ১৩ নিয়ে ঘোরা তোমাদের কাছে কমফোর্টেবল লাগলেও আমার লাগছে না।
আনিস বলল,
-ওরা অনবরত আমাদের আন্ডারে থাকা বিভিন্ন ফ্যাসিলিটিতে হানা দিচ্ছে।
এভাবে একটার পর একটা অ্যাটাক আমরা হজম করতে পারব না।
জেসন বলল,
-হয় আমাদের অল আউট অ্যাসল্ট এ যেতে হবে, নয়ত জাতিসংঘের হাতে তুলে দিতে হবে মিসাইলগুলো। তবে আমার মনে হয় না ইউএন কিংবা আমেরিকার হাতে মিসাইল তুলে দেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে।
সবাই যার যার দৃষ্টিতে একের পর এক সমস্যা ও সমাধানের কথা বলছে, তবে সবার সমাধানই এসে আটকে যাচ্ছে যুদ্ধ অথবা মধ্যস্থতায়। রায়ান কিছুই বলছে না।
ব্যাপারটা লক্ষ করে কিছুটা ঝাঁজের স্বরেই বলল শায়খ,
-ভাইয়া, কিছু বল। এভাবে স্ট্যাচু হয়ে বসে আছিস কেন?
-হুম?
এমনভাবে বলল রায়ান যেন মাত্র আকাশ থেকে পড়েছে। সবাই ওর ভাব দেখে রেগে যাচ্ছে দেখে হাসল। বলল,
-আমি আসলে অন্য একটা পথে ভাবছিলাম। প্রথম থেকে পরিস্থিতিটা দেখা যাক,
ইজরায়েল থেকে আমরা সিআইএ-র যে নিউক্লিয়ার মিসাইলগুলো দখল করেছি সেটা সিআইএ খুব ভালভাবে নেয়নি।
ইজরায়েলি ইন্টেলিজেন্সও আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে ওদের সিক্রেট অপস টীম এস১৩। এখন তারা না পারছে আমাদের সরাসরি আক্রমন করতে না পারছে আমাদের খুঁজে বের করতে। পিছনে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দুটো টীম নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় না, কথাটা ঠিক।
একটু থেমে আবার বলল রায়ান,
-পুরনো সিআইএ ডিরেক্টর ল্যানহামকে খালাস করে দেয়ার পর নতুন যেই চেয়ারে বসুক না কেন তার প্রথম কাজ আমাদের মাথাগুলো তার দেয়ালে ট্রফি হিসেবে ঝোলানো। তার আগে অবশ্য মিসাইলগুলোর ঠিকানা বের করে নেবে যেভাবেই হোক।
এখন আমার প্ল্যান শুনো। তারপর কোন সমস্যা থাকলে বল। ইজরায়েলে সিআইএ একটা ভুল করেছিল। ওরা সব মিসাইল এক জায়গায় রেখেছিল। তাই আমাদের একবারে আক্রমন করে দখল করা সমস্যা হয়নি।
আমরা মিসাইলগুলো দুভাগ করে নিয়েছি। এর থেকে আমরা একটা প্লাস পয়েন্ট পাচ্ছি। আমরা আমাদের দু জায়গার লোকেশন ওদের হাতে তুলে দেব।
সবার চেহারা দেখে মনে হল ওরা রায়ানের মানসিক স্থিরতা নিয়ে চিন্তিত। আবার বলল রায়ান,
-আমরা ওদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে নামতে পারব না।
ব্যাপারটা প্রেসিডেন্টের কাছে গোপন রাখার স্বার্থে ওরাও তা করতে পারছে না। তাই আমরা আমাদের মিসাইল ফ্যাসিলিটি দুটোর লোকেশন ওদের হাতে তুলে দেব। কারণ আমাদের সময় দরকার। আমি এর সমাধান ভেবে রেখেছি কিন্তু তার জন্য দরকার সময়। ওরা হামলা করতে আসতে বাধ্য, আর আমরাও প্রস্তুত থাকব।
প্রয়োজনে এস১৩ এর নাম নিশান মুছে দেব পৃথিবী থেকে। প্ল্যান ঠিক আছে? এর বিকল্প কারও জানা থাকলে বল।
ফেলিক্স বলল,
-শুনতে তো ভালই লাগল, এর থেকে ভাল কিছু হতে পারে না বোধহয়। তোমার মেইন প্ল্যান সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছ না সেটাও বুঝলাম। কিন্তু ওরা কেন আমাদের কথা বিশ্বাস করবে? আমরা যদি গিয়ে ওদের হেডকে বলি, “হ্যালো স্যার, আমি পিংপং, কর্নেল রায়ানের অন্যতম সহচর।
আমাদের মিসাইল ঘাঁটি এই এই জায়গায় আছে। কেউ নাই সেখানে, আপনি এসে চা খেয়ে যাবেন, কেমন?” ওরা বিশ্বাস করবে?
হাসল রায়ান। বলল,
-বিশ্বাস করবে যদি তুমি না বলে কথাটা ওদের ইনফরমার বলে।
-ওদের চর পাচ্ছ কোথায় তুমি?
ইন্টারকম তুলে কাকে যেন নিচু গলায় নির্দেশ দিল রায়ান। পাঁচ মিনিটের মাথায় দুজন এজেন্ট এজেন্সির এক ডেস্ক অফিসারকে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
বেচারা বেশ অবাক হয়েছে। এজেন্ট দুজন রায়ানের ইংগিতে বেড়িয়ে গেল। হোলস্টার থেকে নিজের এফএন৫৭ বের করে সেফটি ক্যাচ অফ করল রায়ান। ডেস্ক অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-এটার বেশ গ্লোরিয়াস একটা অতীত আছে শেলডন। বেঈমানদের আমার মতো এটাও দেখতে পারেনা।
ঘামতে শুরু করেছে অফিসার। আবার বলল রায়ান,
-একটা ভাল কারণ দেখাও যারজন্য আমি তোমাকে এখনই গুলি করব না।
-ইয়ে মানে...স্য-স্যার আ-অ্যাম-আমি...
তোতলাতে থাকল শেলডন। পিস্তলের বোল্ট টানল রায়ান। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে।
রায়ান বলল,
-তুমি ইজরায়েলি ইন্টেলিজেন্সের চর জেনেও আমি তোমার পরিবারের কথা ভেবে তোমাকে এখন একটা সুযোগ দিচ্ছি। তোমাকে আমার একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে। তোমাকে আমাদের মিসাইল ফ্যাসিলিটির ঠিকানা দেব আমি। তুমি সেসব তুলে দেবে তোমার বসদের হাতে। এরপর লম্বা একটা ছুটিতে বউবাচ্চা নিয়ে চলে যাবে।
তবে সেই ছুটি থেকে যেন আর কোনদিন তোমাকে ফিরতে দেখা না যায়।
-কিন্তু স্যার...
-কোন কিন্তু না। তোমাকে যা বলা হয়েছে তাই করবে। তোমাকে সঠিক ঠিকানাই দেয়া হচ্ছে সুতরাং তোমার বসদের তোমার বিশ্বাস করাতে সমস্যা হবে না। এই কাজ করার পর তোমার যেখানে খুশি যেতে পার।
তবে এই রুমে এখন যে কথা হল তার বিন্দুমাত্রও যদি তাদের কানে যায় তাহলে জেনে রাখ, আমার হাত থেকে কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারে। তোমার ডেস্কে কি করতে হবে তা লিখিতভাবে এবং প্রমাণসহ একটা ফাইল রাখা আছে। নাউ গেট লস্ট...
ছুটে বেড়িয়ে গেল শেলডন। ফেলিক্সকে বলল রায়ান,
-খেলা শুরু। তোমার প্রশ্নের জবাব আশা করি পেয়েছ।
আজ রাতের মধ্যেই আমাদের রায়ট টিমের সবাইকে নিয়ে তুমি আর শায়খ আমাদের এক নাম্বার মিসাইল ফ্যাসিলিটিতে চলে যাও। দু নম্বরে আমি আর জেসন যাব।
-তোমাদের টীম?
-ওটা আমার উপরই ছেড়ে দাও। পুরনো এক বন্ধুর সাহায্য নেয়া যাবে।
রহস্যময় হাসি হাসল রায়ান।
সবাই বেড়িয়ে গেলেও আনিসকে থামাল রায়ান। বলল,
-তোমারও কিন্তু কাজ আছে আনিস। সত্যি বলতে তোমার কাজটাই প্রধান। বাকিরা, মানে আমরা কেবলই দাবার বোর্ডের সৈন্য।
অবাক স্বরে বলল আনিস,
-আমার কি কাজ সৌরভ ভাই? আমি তো আর এজেন্ট নই, সেরকম ট্রেনিংও আমার নেই।
-তা নেই, তবে লড়াইয়ের সবচেয়ে প্রাচীন জিনিসটা তোমার আছে, বুদ্ধি। আরও আছে আধুনিক যুগের অন্যতম হাতিয়ার, সাইন্স।
-কি করতে হবে আমাকে?
-তোমাকে একজন হাই সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের অধিকারী যুবতীকে জন্ম দিতে হবে সাতদিনের মধ্যে।
আনিসকে আঁতকে উঠতে দেখে হেসে বলল রায়ান,
-মানে একটা নতুন প্রোফাইল তৈরি করতে হবে, কার জন্য সেটা সেই তোমাকে জানাবে। তবে মাথায় রেখ তাকে এই যুগের সর্বচ্চ সিকিউরিটি সিস্টেম পাস করতে হবে প্রতিদিনে, কয়েকবার এই প্রোফাইলের সাহায্যে।
কাজটা এতো সহজ হবে না, কিন্তু তোমার উপর আমার ভরসা আছে।
-আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আই নো মাই ওয়ার্ক।
-ওকে। তুমি তাহলে এই ঠিকানায় গিয়ে দেখা করো তার সাথে। আমি যাই।
শীঘ্রই দেখা হবে আশা করি।
মিশরের মরুভূমির পরিত্যাক্ত এক এয়ারফিল্ড। ফিনিক্সের সেকেন্ড নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি। বন্ধুরাষ্ট্র মিশরে অনেক আগে থেকেই এ জায়গাটা ইমারজেন্সির জন্য রেডি করে রেখেছিল রায়ান। এখানে কেউ হামলা করলে প্রয়োজনে ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করে নিকটস্থ মিশরীয় সেনাবাহিনির সাহায্য পাওয়া যাবে।
দুইদিন আগে রায়ট টীম নিয়ে ফ্যাসিলিটির মিশরীয় কমান্ডারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে ফেলিক্স আর শায়খ। দুইদিন বিপদের টিকিটিও দেখা যায়নি। কিন্তু বিপদ যে আসছে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে সবাই। সবাই পোড় খাওয়া যোদ্ধা। এই অনুভূতি এদের চিরচেনা।
এয়ারফিল্ডের গ্রাউন্ড লেভেলের অনেক নিচে নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি বানানো হয়েছে। অনেকটা এরিয়া ৫১ এর মতো করে। তাই সারফেসের ভয়াবহ যুদ্ধেও নিচে মিসাইলের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নগণ্য। সাধারণ সতর্কতা আরও বাড়িয়ে রুটিনমাফিক কাজ করে গেছে ওরা। রায়ানের দেয়া চিঠি নিয়ে শহরের আর্মি চিফের সাথে কথা বলেছে ফেলিক্স।
তিনি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। রায়ানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই বৃদ্ধের। ফ্যাসিলিটিতে নিজেদের চারটা স্পেশাল টীম গঠন করা হয়েছে। নেহাদ-রিয়াদ ব্যকআপ টীম, রেমার-এন্ডারসন অ্যাসল্ট টীম, এনায়েদ-রিচার্ড ট্র্যাপ টীম, ফেলিক্স-শায়খ ফরওয়ার্ড টীম। পালা করে নিজেদের জায়গায় পাহারা দিচ্ছে ওরা।
যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। অবশেষে তৃতীয়দিন সন্ধায় হাজির হল এস১৩। এক সাথে ৭টা সিগন্যাল বিপবিপ করতে লাগল রেইডারে। কিছু বোঝার আগেই কেঁপে উঠল এয়ারফিল্ড ভয়াবহ বিস্ফোরণে। প্রায় একই সাথে মিসাইলগুলো আঘাত করায় আলাদা করে বোঝা গেল না শব্দ শুনে।
দশটা মেশিনগান পোস্টের মধ্যে সাতটাই উড়ে গেছে বিস্ফোরণে। গ্রাউন্ড টু গ্রাউন্ড মিসাইল ছিল। সেকেন্ড মিসাইল বৃষ্টি এয়ারফিল্ড ঘিরে রাখা দেয়ালের অনেকটাই উধাও করে দিল। নিজেদের পজিশনে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে ফরওয়ার্ড টীম। দেয়ালের ভাঙা ফোঁকর দিয়ে হাজির হল এস১৩ এর কমান্ডো টীম।
একসাথে গর্জে উঠল দুই পক্ষের বন্দুক। খোলা জায়গায় থাকায় এস১৩ এর কমান্ডোদের অনেকেই গুলি খেয়ে পরে গেল। বাকিরা সুবিধেমত পজিশন নিয়ে ফেলেছে। তাদের কাভারিং ফায়ারে মাথা তোলাই কঠিন হয়ে গেল ওদের জন্য। সেই সুযোগে আরও ইজরায়েলি ঢুকে পড়ল ভেতরে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল ফরোয়ার্ড টীমের দিকে। ওদের গুলির তোড়ে মাথা নামিয়ে আড়াল নিয়েছে ফরোয়ার্ড টীম। ইতিমধ্যে বাকি তিনটে মেশিনগান পোস্টের দখল নিয়ে নিয়েছে এস১৩। শায়খের দিকে চাইল ফেলিক্স। শায়খ একবার মাথা উঠিয়ে পরিস্থিতি দেখে নিয়েই মাথা ঝাঁকাল।
ওয়াকিটকি-তে চেঁচাল ফেলিক্স,
-অল টীম মুভ ইন, নাউ।
এয়ারফিল্ডের ফার্স্ট রানওয়ের অপর পাশের হ্যাঙ্গারগুলোর আড়ালে লুকিয়েছে ফরোয়ার্ড টীম। রানওয়ের মাঝামাঝি ওরা আসতেই লুকিয়ে থাকা বাকি তিন টীম তিনদিক থেকে আক্রমন করল ওদের। ফরোয়ার্ড টীমও আবার গুলি শুরু করল। পরিস্থিতি সামলাতে স্মোক গ্রেনেড ফাটাল ইজরায়েলি কমান্ডোরা।
মরুভূমির উদ্যম হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেল ধোঁয়া। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এল ইজরায়েলি টীম। বিপদ কেটে গেছে মনে করে বেড়িয়ে আসতে গেল গেল ওরা কিন্তু ওদের কানে ধরা পড়ল আরেক শব্দ। রোটরের আওয়াজ। দূরে দেখা গেল তিনটে ইজরায়েলি গানশিপ।
সেখান থেকে সবার নজর সরাল ভয়াবহ শব্দ। বিকট শব্দ করে এয়ারফিল্ডের দেয়াল ভেঙে ঢুকল ট্যাঙ্ক। জিনিসটা যে ইজরায়েলি সেটা তাদের পিছুপিছু পিঁপড়ের পালের মতো ঢোকা আরও এস১৩ কমান্ডোদের দেখলেই বোঝা যায়। সবাই আবার দ্রুত কাভার নিল। তবে নতুন আক্রমনের বিরুদ্ধে যে নিজেদের চেষ্টায় টিকতে পারবে না সেটা ভাল করেই জানে সবাই।
ফেলিক্স মোটামুটি ঘাবড়ে গেল। রেডিওম্যানের দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বলল,
-আর্মি বেসের সাথে কন্টাক্ট করো, এখনই।
কিছুক্ষণ রেডিও নিয়ে বিফল চেষ্টা করে বলল রেডিওম্যান,
-যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। সম্ভবত ইজ্রায়েলিরা নেটওয়ার্ক জ্যামার ইউজ করছে।
-শিট!
গাল দিয়ে উঠল ফেলিক্স।
সামান্য দূরে দাঁড়ানো শায়খও ওদের কথা শুনতে পেল। বিরতিহীন গুলি ছুটে আসছে অপর পক্ষ থেকে। হঠাৎ এই গুলিবৃষ্টির মাঝে দিয়ে কভার ফেলে ছুট লাগাল ফ্যাসিলিটির মিশরীয় কমান্ডার আহসান। ওর পাগলামির কোন কারণ বুঝতে পারল না কেউ। বুলেট বৃষ্টি এড়িয়ে প্রায় ওদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল সে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা বুলেট ঘ্যাঁচ করে বিঁধল ওর বাম কাঁধে।
পরে গেল সে খোলা জায়গায়। দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে তাকে টেনে দেয়ালের আড়ালে নিয়ে এল শায়খ। জখম পরিক্ষা করে দেখা গেল একটুর জন্য হার্টে লাগেনি। বিড়বিড় করে কি যেন বলল সে। শোনার জন্য তার মুখের কাছে কান নিয়ে গেল শায়খ।
আহসান বলছে,
-মিশরীয় পাইলট......পরশুদিন......ল্যান্ড করেছে...প্লেন রেখে গেছে...তেলের লাইনে সমস্যা...আজ ইঞ্জিনিয়ার এসে ঠিক করেছে...পাইলট কাল আসবে...এফ ৩৬...লোডেড...হ্যাঙ্গার ৫।
মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল শায়খের। রায়ান বারবার করে ওকে পাইলট কোর্স করতে বললেও আমলে নেয়নি শায়খ, কোন না কোন ছুতোয় ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিজ্ঞা করল এবার বেঁচে ফিরলেই কোর্স করবে আগে। তবে তার আগে বাঁচতে হবে।
ফেলিক্স জানতে চাইল কি হয়েছে। শায়খ বলল,
-একটা মিশরীয় এয়ার ফোর্সের এফ৩৬ আছে হ্যাঙ্গার ৫ এ। কিন্তু আমি চালাতে জানিনা!
দপ করে আশার আলো জ্বলে উঠল ফেলিক্সের চোখে। বলল,
-মাই ডিয়ার রায়ান দ্যা জুনিয়র, ও জিনিস আমার দ্বারা চালানো সম্ভব।
-সিরিয়াসলি?
-অফকোর্স।
-আমরা কাভার দিচ্ছি। দৌড়াও।
সঙ্গীদের চেঁচিয়ে নির্দেশ দিল শায়খ। সাথে সাথে কাভারিং ফায়ার শুরু করল ওরা। এঁকেবেঁকে দৌড়াল এবার ফেলিক্স।
রানওয়ে পেরিয়ে এক সময় সেঁধিয়ে গেল হ্যাঙ্গার ফাইভের ভেতর। ফাইটার প্লেনটা দেখে শীষ দিল মনের অজান্তেই। বিমানটা এফ ৩৬ নয়, এটা এফ ৩৫। দুটোর অনেক তফাৎ আছে। বহু বছর এই জিনিসের ককপিটে বসা হয় না।
আরেকটা ব্যাপারে অবাক হল ফেলিক্স, এফ ৩৫ ইউএস এখনও টেস্ট আর ট্রেনিং-এ ইউজ করছে। মিশর কিভাবে পেল এই জিনিস! তবে সেসব ভেবে এখন নষ্ট করার মতো সময় নেই। দ্রুত কিছু চেক সেরে উঠে পড়ল ককপিটে। একেএকে বিভিন্ন বাটন, লিভার টেনে পাঁচ মিনিটের মাথায় প্রস্তুত করে নিল বিমানটাকে। ভারটিক্যাল টেকঅফ করা যায় এ বিমানে।
বাহিরে বের হয়ে সরাসরি মাথার উপর দুটো গানশিপ দেখে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে রানওয়ে ধরে ছুটল। মাটির মায়া ত্যাগ করতে না করতেই ওয়ার্নিং বাজতে শুরু করল। গানশিপ থেকে মিসাইল ফায়ার করা হয়েছে দুটো। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বিমান নিয়ে ফেলিক্স। দেখতে দেখতে দুরের পাহাড়সারি পার হল।
পেছনে লেগেই আছে মিসাইলদুটো। ক্রমেই দূরত্ব কমছে। হিটসিকার মিসাইল। ফ্লেয়ারস ছুঁড়ল ফেলিক্স বাটনটা খুঁজে পেতেই। মিসাইল আরও কাছিয়ে এসেছে।
মিসাইল দুটোকে লেজে নিয়ে প্লেনটাকে পাহারসারির ওপাশে অদৃশ্য হতে দেখল সবাই। তার কিছুক্ষণ পর দুটো বিস্ফোরনের শব্দ শুনতে পেল। ইজ্রায়েলিরা বিজয়ের হুল্লোড় করে উঠল।
আঁধারে তাকিয়ে বিড়বিড় করল শায়খ,
-রেস্ট ইন পিস কমরেড!
হঠাত্ আঁধারে আবার মাজল ফ্ল্যাশ দেখা গেল। প্লেনের উত্তেজনা যেতেই আবার আক্রমন শুরু করেছে ইজ্রায়েলিরা।
তাদের গুলির পাল্টা জবাব দিতে দিতে ভাবল শায়খ, হাতে আর বড়জোর পাঁচ মিনিট সময় আছে। শত্রুপক্ষে কমপক্ষে আছে ৩০ জন। নিজের সোলজার বেঁচে আছে প্রায় ১৫ জন। এরমধ্যে আহত ৩ জন। এমুনিশনও প্রায় শেষ।
আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়তি সাহায্য না পেলে শায়খ রায়ান সহযোদ্ধাদের সাথে মারা যাবে আর এই নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি ইজ্রায়েলিদের হাতে চলে যাবে। অথবা তারচেয়েও ভয়ংকর পরিনতির স্বীকার হবে। সেটা কি হবে ভাবতে গিয়ে ইসরায়েলি আর্মি ইন্টেলিজেন্সের টর্চার ডানজনটার ছবিই ভেসে উঠল শায়খের চোখে।
হঠাৎ দূর থেকে সুপারসনিক কোন প্লেনের শব্দ ভেসে এল। পরমুহুরতে প্লেনটাকেও দেখতে পেল শায়খ।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে সময় লাগল ওর। মিশর এয়ারফোর্সের পাইলটের রেখে যাওয়া সেই প্লেনটাই, ফেলিক্স! একদম নিচে দিয়ে উড়ে এল। এয়ার টু সারফেস মিসাইল লঞ্চ হল ওটার। এস১৩ এর ট্যাঙ্ক আগুনের গোলকে পরিনত হল। ট্যাঙ্কটা ধ্বংস হতে না হতেই আবার এক চক্কর দিয়ে ফিরে এল ফাইটার প্লেন।
ককপিটে মাস্কের আড়ালে ফেলিক্সকে চেনা গেল না। নির্দিষ্ট লাইনে এসে ২০এমএম ক্যাননের ট্রিগারে চেপে বসল আঙুল। লাইন ধরে তিনটে ইজরায়েলি হেভি মেশিনগান পোস্টের সৈন্যদের ঝাঁজরা করে দিল। দূর থেকে গানশিপ কপটার হিট সিকার মিসাইল ছুঁড়ল প্লেন লক্ষ করে। ইচ্ছে করলেই মিসাইলকে ফাঁকি দিতে প।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।