আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সোনার বাংলার বর্জ্যও অপার সম্ভাবনাময়

মুক্তি চাই। পাপের ভেলায় ভাসতে চাইনা। পৃথিবীটাকে নিজের মতো করে সাজাতে চাই। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমুল্য রতন... ‘খুঁজলে ছাইয়ের মধ্যেও অমূল্য রতন পাওয়া যেতে পারে’- এ মর্মে কবিতার চরণ অনেকেরই জানা। আর এ এখন বাস্তব সত্যও।

রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য হিসেবে যা ফেলে দেয়া হচ্ছে সেখান থেকে কথিত টোকাইরা যা কুড়ায়; তার বার্ষিক মূল্যমান দেড়শ কোটি টাকা এবং হাজার হাজার টোকাই ও মহিলার জীবিকা চলছে এ বর্জ্য কুড়ানোর দ্বারাই। বর্জ্য সংরক্ষণ, নিষ্কাশন ও পুনঃব্যবহার উপযোগী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য যেমন সম্পদ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে তেমনি পরিবেশ দূষণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের সম্পদের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকল্প সম্পদ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এমনকি পচনশীল বর্জ্য থেকে দেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জৈব সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব। জানা গেছে, সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩ হাজার ৩৩২ দশমিক ৮৯ টন বর্জ্য জমা হয়।

উৎপন্ন মোট বর্জ্যের মধ্যে ঢাকার ৪২ শতাংশ, খুলনার ৪৭ শতাংশ, বরিশালের ৫৬ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৭০ শতাংশ, সিলেটের ৭৬ শতাংশ, অন্যান্য নগরসমূহের ৫২ শতাংশ ও পৌরসভাগুলোর ৫৪ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা শহরের মাত্র ১৫ শতাংশ অজৈব পদার্থ পুনঃব্যবহার উপযোগী করা হয়। চট্টগ্রামে এ হার ১২ শতাংশ ও অন্যান্য নগরে এর মাত্রা আরো কম। সংগৃহীত মিশ্র বর্জ্যের মধ্যে যা পুনঃব্যবহার উপযোগী করা হয় না তা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ও নদীর ধারে কোনো উন্মুক্ত স্থানে স্তূপাকারে রাখা হয়। সেগুলো মিশে যাচ্ছে ছোট নীরাশয়ে এবং নদীতে।

আবার কিছু বর্জ্য দীর্ঘদিন বৃষ্টির পানিতে পচে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে মাটি চুইয়ে ভূ-অভ্যন্তরে পৌঁছে অণুজীব ধ্বংসসহ অভ্যন্তরে পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে মাটি ও পানি বিষাক্ত করছে। জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে গড়ে প্রতি ব্যক্তি দশমিক ৫ কেজি বর্জ্য তৈরি করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তর করাই সামপ্রতিককালের ভাবনা। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনে আবর্জনা থেকে সার উৎপাদনের প্রক্রিয়া বেশ জনপ্রিয়। রাজধানীর প্রতিদিনের আবর্জনা থেকে ২৪০ টন জৈব সার উৎপাদন সম্ভব।

বছরে এতে লাভ হবে ৩৫ কোটি টাকা। আর ৬ হাজার লোকের মতো কর্মসংস্থান হবে। উল্লেখ্য, খাদ্য বর্জ্যের সঙ্গে হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও গরুর গোবর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে সহজেই বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যায়। বর্জ্য ব্যবহার করে প্রায় ১৫ কোটি ঘনলিটার বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। কারণ বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি কেজি আবর্জনা থেকে দৈনিক ০.০৬ ঘনমিটার গ্যাস এবং ০.২ কেজি উন্নতমানের জৈবসার পাওয়া যায়।

এতে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা শহরের বর্জ্য থেকে বছরে ৫ লাখ টন জৈব সার উৎপাদনের সুযোগও থাকছে। উৎপন্ন গ্যাস রান্না করার কাজে ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব। তেমনি উৎপাদিত জৈব সার দিয়ে ফসলের উৎপাদন করা যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে পোলট্রি একটি বিকাশমান শিল্প। খামার এবং অন্যান্য মিলিয়ে সারদেশে মোরগ-মুরগীর সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি।

এ সব মোরগ-মুরগি থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ পোলট্রি বর্জ্য পাওয়া যায় তার পরিমাণ প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ টন। বিশাল এই পোলট্রি বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে মাটি ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। প্রায় ১১ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমিতে বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থের চাহিদা থাকার পরও আমরা জৈব সার উৎপাদন ও জমিতে ব্যবহারে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছি। জানা গেছে, আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণকাজ আগামী মার্চের মধ্যে শুরু হবে। ঢাকা শহরের মাতুয়াইল ও আমিনবাজারে দুটি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে।

প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ জন্য প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার টন আবর্জনা প্রয়োজন হবে। বিদ্যুতের পাশাপাশি আবর্জনা থেকে জৈব সারও উৎপাদিত হবে। জৈব সার হবে বছরে ৯ লাখ টন। শাক-সবজি, ধানসহ কৃষি উৎপাদনে এই জৈব সার ব্যবহৃত হবে।

ইতালির একটি কোম্পানির সঙ্গে ডিসেম্বরেই চুক্তি স্বাক্ষর হবে। পৃথক চুক্তি হবে ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং ডিপিডিসি, ডেসকো’র সঙ্গে। এই সংস্থা দুটো বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ইতালির কোম্পানির কাছ থেকে ইউনিট প্রতি ৮ টাকা করে বিদ্যুৎ কিনে নেবে। এই বিদ্যুৎ তারা সিটি করপোরেশনের কাছে বিক্রি করবে। সিটি করপোরেশন এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে রাজধানীর সড়কগুলোতে আলোকবাতি জ্বালাতে।

দু’টি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনে ব্যয় হবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চারশ’ কোটি টাকা ব্যয় হবে আবর্জনা ফেলার স্থান প্ল্যান্ট স্থাপন উপযোগী করতে। মাটির নিচে একশ’ ফুট গভীর থেকে প্ল্যান্টের গাঁথুনি দেয়া হবে। নির্মাণ ব্যয়ের পুরোটাই তারা ব্যবহার করবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করে তারা বিশ বছরে মুনাফাসহ বিনিয়োজিত অর্থ তুলে নেবে।

এ কাজ শুরু করা হলে বিদ্যুৎ প্রাপ্তির পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বহুল প্রত্যাশিত একটি কাজ করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে পরিবেশ দুষণের ভয়ংকর ছোবল থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করা যাবে। মূলত আমাদের সামরিক সরকার বা তত্ত্ববধায়ক সরকার থেকে রাজনৈতিক সরকার পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রেই একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত যে, সব সরকারকেই টিকে থাকার প্রশ্নেই বেশি ব্যস্ত ও তটস্থ থাকতে হয়। যার ফলে নাগরিক সমস্যা সমাধানে তারা কাঙ্খিত ও বাঞ্ছিত ভূমিকা আদৌ পালন করতে পারে না বা করে না। সে কারণে দেশের অপার সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে ব্যবহার করে কাঙ্খিত ও বাঞ্ছিত সমৃদ্ধি অর্জন করতে এবং নাগরিকদেরকে তার সুফল দিতে তারা কেবলি ব্যর্থ হন।

 ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১১ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.