স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার -শ্লোগান কিংবা আন্দোলন সংগ্রামের জন্য খুব সুন্দর তিনটি শব্দ। এই শব্দগুলোকে পুজি করে কত সাধারণ মানুষ ইতিহাসে মহানায়ক হয়েছেন। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে আবার অনেক রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে এই শব্দগুলো বাস্তবায়নের জন্য। অথচ বাস্তবে শব্দগুলোকে খুজে পাওয়া খুবই মুশকিল। পৃথিবীতে বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা প্রায়-১৯৬টি।
এর মধ্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি। এইসব দেশে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০০ কোটি। একটা দেশ স্বাধীন মানে এই দেশের প্রতিটি মানুষ স্বাধীন। গণতন্ত্র আসলে একটা সংস্কৃতি যা স্বাধীনতার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। পরাধীনতার মধ্যে গণতন্ত্র থাকতে পারে না, অন্য কথায় গণতন্ত্র থাকলে কোন দেশ পরাধীন থাকে না।
কোন দেশ স্বাধীন হলে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকলে ভিন্নমত ও ভিন্নপথের মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে এই দেশে মানবাধিকার বাস্তাবয়নের জন্য আলাদা আন্দোলন সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না বলে ধরে নেয়া যায়।
অথচ বাস্তব বড় নির্মম। বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষের মধ্যে শতকরা কতজন প্রকৃত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বাদ আস্বাদন করছেন, ইউরোপ-আমেরিকার কিছু ধনী দেশের বেশীর ভাগ মানুষ এই সব অধিকার ভোগ করলেও সেখানেও অনেক মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত অবস্থায় আছে। ইরাক, ফিলিস্তিন কিংবা মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগন তাদের অধিকার দূরে থাক শুধুমাত্র বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাই চাচ্ছেন। তাদের কথা বাদ দিয়ে আপাত দৃষ্টিতে যেসব জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন মনে হয় তাদের কথা বিবেচনা করলেও আমরা হতাশাজনক চিত্র দেখতে পাব।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের অধীনে রাজতন্ত্র বিরোধীরা, কমিউনিজমের অধীনে কমিউনিজম বিরোধীরা, পুঁজিবাদী দেশগুলোর পুঁজিবাদ বিরোধীরা কিংবা ইরানের মত ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী শাসন বিরোধীরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই মাত্রাগত পার্থক্যকে বিবেচনায় না নিলে একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, বিশ্বের সকল স্বাধীন দেশের মধ্যে ও পরাধীন মানুষের সংখ্যা অনেক। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পরাধীনতার এই মাত্রা প্রকট এবং বহুমাত্রিক।
আমরা বাংলাদেশের মানুষ এই পরম আকাংখিত শব্দগুলিকে বাস্তবে পাওয়ার জন্য দুই দুই বার স্বাধীন হয়েছি। প্রথমে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত থেকে ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীন হলাম পাকিস্তান নাম নিয়ে।
কিন্তু পেলাম অশ্বডিম্ব। তাই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ১৯৭১ সালে আবার স্বাধীন হলাম। জন্ম হল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের। যেখানে সকলের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রায় অভিন্ন। স্বাধীনতার উষালগ্নে সবার স্বপ্ন ছিল আমাদের প্রিয় দেশটিতে সকল মানুষ স্বাধীনততা ও গণতন্ত্রের স্বাদ পাবে।
স্বাধীনতা মানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, মত প্রকাশের ও চিন্তার স্বাধীনতাসহ সার্বিকভাবে প্রত্যেকটি মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করবে। প্রতিটি মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে পারবে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সবাই সমান আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী হবে। প্রতিটি মানুষের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকবে।
সর্বোপরি একটি মুক্ত স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে প্রতিটি জাতি, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সমান বিকাশের সুযোগ থাকবে।
স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আজ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এই বিষয়ে কোন গবেষণা বা জরিপের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। গ্রামের কুলি, মজুর, কৃষক থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিজীবি সবার এক কথা- আমাদের অর্জন নিয়ে আমরা হতাশ। বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে শুধু মাত্র সরকারী দল। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উপর সরকার তার পুলিশ বাহিনী দিয়ে তাদের কর্মসূচী পালন করতে বাধা প্রদান করে।
এ প্রসঙ্গে আমার বাস্তব একটি অভিজ্ঞতা আছে, যদিও কোনরাজনৈতিক দলের সাথে আমার সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। ২০১২ সালের মার্চ মাসে রাজধানী ঢাকায় বিরোধী দলের একটি মহাসমাবেশ ডাকা হয়েছিল। সরকার ঐ কর্মসূচীর তিন দিন আগে থেকে ঢাকাগামী সকল যানবাহনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল। এমনকি ঢাকায় আবাসিক হোটেলগুলো বন্ধ করে দিল যাতে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য কেউ ঢাকা গিয়ে কোন হোটেলে উঠতে না পারে। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার অফিসের কাজে ঐ সময় ঢাকা যেতে হয়েছিল।
কমলাপুর রেল ষ্টেশনের পাশে হোটেল আল ফারুকে যথারীতি আমার রুম বুকিং দেয়া ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে গিয়ে দেখি হোটেল বন্ধ। আমি অনেক বুঝিয়ে ম্যানেজার সাহেবকে আমার পরিচয় দেয়ার পরও সে আমাকে রুম দিতে তার অপারগতার কথা বলল। অবশেষে আমার এক পুলিশ অফিসার বন্ধুকে ফোন দিলাম যাতে তার কথা শুনে ম্যানেজার আমাকে রুম দেয়। কিন্তু ম্যানেজার ফোন রিসিভ করতে অস্বীকার করে বলল আপনি তাড়াতাড়ি বের হন নতুবা পুলিশ আপনার সাথে আমাকেও গ্রেফতার করবে।
সে আরও জানাল সকালে এখান থেকে নিরীহ কয়েকজনকে র্যাব ধরে নিয়ে গেছে। অবশেষে অনিচ্ছা স্বত্বেও এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে থাকতে হল। নারী, শিশু ও অসুস্থ যেসব সাধারন মানুষকে ঐ সময় ঢাকা যেতে হয়েছিল এবং যাদের হোটেল ছাড়া থাকার কোন বিকল্প ব্যবস্থা ছিলনা- তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট আর যন্ত্রণার আহাজারির খবর গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে অবহিত করেছিল কিনা জানিনা। তবে বিরোধীদলের কর্মসূচীতে পুলিশ কার্যকর ভাবে বাধা দিতে পেরেছে- এই খবর সরকারকে দিয়ে হয়তো বাহবা নিয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল সাধরন মানুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরার এবং বিরোধীদলের রাজনৈতিক অধিকার হরনের একটি র্নিলজ্জ উদাহারণ।
এই হল আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবস্থা।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি শেয়ার বাজার কেলেংকারী, হলমার্ক কেলেংকারী, ডেস্টিনি-ইউনিপে কেলেংকারী আর পদ্মাসেতুর দুর্নীতির বিষয়গুলো আমলে নিলেই সহজে অনুমেয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও হুমকির মুখে। টেলিভিশন টকশো গুলোকে নিয়ে অনেক অসহিষ্ণু কথাবার্তা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে যেখানে বাস্তব সম্মত কারণে সরকারের সমালোচনা হয় বেশী।
মজার ব্যাপার হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ মামলায় মাওলানা সাঈদীর বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ডঃ আসিফ নজরুল।
টকশোর পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কক্ষে হামলা করা হল। যদিও তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাওলানা সাঈদীর ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। এই শঙ্কা আরও প্রকট হয়েছে আদালতের সামনে থেকে সাঈদীর সাফাই স্বাক্ষী সুখ রঞ্জন বালীকে তুলে নেয়ার মাধ্যমে।
অন্যদিকে জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আজর আর কারও নেই।
ইলিয়াস আলীকে গুমের মাধ্যমে সবাইকে এই বার্তাই দেয়া হয়েছে- তুমি যে মানের ব্যক্তিই হও না কেন সাবধান! তাই ডঃ কামাল হোসেনের মত আইনজীবি ও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে আশংকা প্রকাশ করেন।
এই হতাশজনক চিত্র একদিনে তৈরী হয়নি কিংবা এর জন্য কোন দল এককভাবে দায়ী নয়। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের দেখা অতীতের সকল মাত্র ছাড়িয়ে গেছে। জনগণ এখন বর্তমান সরকারের দুঃশাসন থেকে মুক্তি চাচ্ছে। সঙ্গত কারনে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
বেগম জিয়া কি পারবেন জনগণের কাংখিত স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করতে? রাজনৈতিক হানাহানি আর অবিশ্বাসের সংস্কৃতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী ছাড়া বিরোধীদলের পক্ষ থেকে এই সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কর্মসূচী বা কর্ম পরিকল্পনা প্রকাশ করা হচ্ছে না- যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে বেগম খালেদা জিয়া বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান করে সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বাদ জনগণকে দেবেন। জনগণের শংকা মূলত এখানেই। অন্যদিকে তৃতীয় কোন রাজনৈতিক শক্তি এই মুহুর্তে নেই যারা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ উপহার দেবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, হে রাজাধিরাজ তুমি ভাগ্যবিড়ম্বিত, বার বার স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট নিয়ে আশায় বুক বেধে বেঁচে থাকা বাংলাদেশের ১৬কোটি মানুষের দিকে দয়ার দৃষ্টি নিয়ে তাঁকাও যাতে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সুমতি হয়। সরকারী ও বিরোধীদল মিলে এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করেন- যাতে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া আর জকিগঞ্জ থেকে সুন্দরবন এর প্রত্যেকটি মানুষ নিজেকে নির্ভয়, নিরাপদ এবং স্বাধীন মুক্ত মানুষ মনে করে।
আর সারাবিশ্বের মুক্তিপাগল মানুষগুলোর কাছে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা জড়ষব গড়ফবষ
হিসাবে উপস্থাপিত হয়।
আমার মত সাধারন মানুষের এই সব স্বপ্ন কি কোন দিন বাস্তব হবে?
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।