আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মৃত্যুপূরী থেকে ফিরেঃ-১

সব কিছুর মধ্যেই সুন্দর খুঁজে পেতে চেষ্টা করি............ মৃত্যুপূরী থেকে ফিরেঃ-১ রাস্ট্র হিসেবে পাকিস্তান, হিন্দুস্তান, তুর্কীস্তান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তান, কিরঘিস্তান-পৃথিবীতে এমন অনেকগুলো স্বাধীন 'স্থান'” থাকলেও আমার দেখার, জানার সুযোগ হয়েছে-পাকিস্তান, হিন্দুস্তান, উজবেকিস্তান, তূর্কিস্তান(তুরস্ক)। দেশের ‘স্থান’ গুলোরমধ্যে গুলিস্তান এবং কবরস্তান অজস্রবার যাওয়া হয়েছে। হিন্দুস্তান-মানেই হিন্দুদের স্থান, পাকিস্তান মানেই পবিত্র স্থান-এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। ভাবনায় যা স্বাভাবিক-বাস্তবে কিন্তু তার অনেককিছুই অস্বাভাবিক। যেমনটি পাকিস্তান-মানেই পবিত্র স্থান নয়।

এখন পাকিস্তান মানেই বন্দুক যুদ্ধ, আত্মঘাতী বোমা হামলা, মার্কিন ড্রোন হামলা-বারুদের গন্ধ! কিম্বা "জীবন্ত মানুষের গোরস্তান" বললেও ভুল বলা হবেনা। একজন বাংলাদেশী হিসেবে পাকিস্তান সম্পর্কে আমার ধারণা সকল বাংলাদেশী বাংগালীদেরমত হলেও পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও আলাদা। ১৯৭১এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের জন্ম। দুটি দেশের মৌলিক পার্থক্য বিষয়ে এক কথায় গর্ব করে বলা যায়- আমরা ভালো আছি। ভালো নেই পাকিস্তান।

বর্তমানে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের জন্য পৃথিবীব্যাপী আতংকের দেশ এই পাকিস্তান। কোনো মানুষ নিরাপদ নয় ওখানে। তাবত মানুষের কাছে যখন পাকিস্তান এড়িয়ে চলার স্থান-তখন সেই পাকিস্তানে’ যখন আমার যাওয়া হলো-তখন আমি ‘বাধ্যতামূলক উপভোগ’ করার আনন্দে আনন্দিত হই। পাঠক, পাকিস্তান ভ্রমন কিন্তু আমি শখ করে করিনি-অনেকটা বাধ্য হয়েই করেছিলাম, তাই ‘বাধ্যতামূলক উপভোগ’ বলেছি। কাজেই “বাধ্য হবার” ভূমিকা আমাকে অনিচ্ছা সত্বেও বলতেই হচ্ছে।

আমরা অনেকেই জানি-পাকিস্তান খেলাধূলার সরঞ্জাম তৈরীতে প্রসিদ্ধ। আমরা জানি-পাকিস্তান তুলা, তৈরী কাপড়, চাল-গম, আম, খেজুর রপ্তানীতেও প্রসিদ্ধ। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা-পাকিস্তান মেডিক্যাল সার্জিক্যাল ইন্সটুমেন্টস রপ্তানীতেও বিশ্বখ্যাত। পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিকে ব্যাবর্হুত সফস্টিকেটেড হ্যান্ড মেড সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস তৈরী হয় পাকিস্তানের শিয়ালকোটে। শিয়ালকোটে তৈরী সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস শুধু মাত্র সীল/লোগো লাগিয়ে জার্মানী, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ইটালী, সুইজারল্যান্ড এমনকি চিরশত্রু ইন্ডিয়াও কিনেনেয়।

একটি উদাহরন দেই-ওয়ার্ল্ড ফেমাস সার্জিক্যান ইন্সট্রুমেন্টস প্রস্তুতকারী কোম্পানী হচ্ছে জার্মানীর Hillsborough, ইংল্যান্ডের Bexhill, আমেরিকান Claymount, Rexmed, সুইজারল্যান্ডের Confecta ইটালীর Alsa Apparechi ,ভারতের Narang সহ অনেকগুলো কোম্পানী বেশীর ভাগ যন্ত্রপাতি তৈরীর কোনো ফ্যাক্টরী পর্যন্ত উল্লেখিত দেশে নেই। উল্লেখিত দেশের নামী ব্রান্ডের অনেক পণ্যই তৈরী হয় পাকিস্তানের শিয়ালকোট। শিল্পন্নত দেশগুলো মূলত পাকিস্তানথেকে সুক্ষ্ণ যন্ত্রপাতি তৈরী করিয়ে নিয়ে নিজ দেশের নামে “মেইড ইন ----“ এবং ব্রান্ড- স্টাম্পিং করে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত করে! সব থেকে অবাক বিস্ময়-পাকিস্তানে যেসব শ্রমিক সেইসব মুল্যবান যন্ত্রপাতি তৈরী করে তারা বেশীর ভাগই শিশু ও নারী শ্রমিক। সেই শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক অবস্থা আমাদের দেশের জিঞ্জিরা-দোলাইখালের শ্রমিকদেরমতই মানবেতর। বাংলাদেশেও মেডিক্যাল/সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস ৭৫% ব্যবহার করা হয়-সরাসরি পাকিস্তানী পণ্য।

তবে কয়েকটি বিলাশ বহুল বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিকও মূলত পাকিস্তানের তৈরী পণ্যই ব্যবহার করে-কিন্তু সেগুলো ইয়োরোপ-আমেরিকার নামে স্টাম্পিং করা। বাংলাদেশে সরকারী খাতে মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট/ইন্সট্রুমেন্ট কেনার জন্য প্রধানত ADB, IDB, World Bank অর্থায়ন করে। এরমধ্যে WHO, UNICEF,UNFPA এর তত্ববধানে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সিএমএসডি প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের অধীন ডাইরেক্টর জেনারেল অব ডিফেন্স পার্সেজ(ডিজিডিপি) এবং বেসরকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্যোসাল মার্কেটিং কর্পোরেশন, সেভ দ্যা চিল্ড্রেন, ব্রাক হেলথ, বেসরকারী-দাতব্য বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল সার্ভিসসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন সার্জিকেল যন্ত্রপাতি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করে থাকে। উল্লেখ্য যে-বাংলাদেশ থেকেই ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডারের মাধ্যমে উপমহাদেশ ছারাও পাকিস্তান, থাইল্যান্ড,ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপিনস, শ্রীলংকা ইত্যাদি দেশগুলোর জন্যও উক্ত পণ্য ক্রয় করে থাকে। তেমনই একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারে ৪টি প্যাকেজ(ইন্সট্রুমেন্টস) সরবরাহের জন্য আমার ট্রেডিং কোম্পানী সাপ্লাই অর্ডার পায় মইনু-ফক্রুর সামরিক তত্ববধায়ক সরকারের অন্তিম কালে।

আমার কোম্পানীর প্রধান প্রতিদ্বন্দী দুটো কোম্পানীই বর্তমান শাসকদলের দুটি অংগ সংগঠনের দুইজন কেন্দ্রীয় নেতার মালিকানাধীন। যেহেতু এই ক্রয় প্রকৃয়ায় সরকারের অংশীদারিত্ব আছে তাই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসারপর বিভিন্ন অযৌক্তিক কারনে উক্ত টেন্ডার ২ বার বাতিল করে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৩য় বারের টেন্ডারেও সরবরাহ কাজটি আমার প্রতিষ্ঠান পায়। আমার কোম্পানীর প্রিন্সিপাল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী পাকিস্তানের শিয়ালকোট। ২য়, ৩য় লোয়েস্ট কোম্পানীরও যথারিতী প্রিন্সিপাল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী পাকিস্তানের শিয়ালকোট।

টেন্ডারের শর্ত সমুহের মধ্যেছিল-ইন্সট্রুমেন্ট তৈরীকালীন ফাইনান্সিং প্রতিষ্ঠানের দুই সদস্যের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ সরকারের উপ সচিব পদমর্যাদার দুই সদস্যদের প্রতিনিধি নিয়ে প্রস্তুতকারী কোম্পানীর ফ্যাক্টরী ভিজিট করতে হবে এবং প্রি শিপমেন্ট ইন্সপেকশন(PSI) করার সময় আবার সেই প্রতিনিধি দলকে নিয়ে প্রস্তুতকারী কোম্পানীর ফ্যাক্টরী ভিজিট করতে হবে(তত্বাবধায়ক সরকারের সময় সরকারী কর্মকর্তাদের ভ্রমনে অন্তর্ভূক্ত নাকরার কারনেই নির্বাচিত সরকার প্রথমবারের টেন্ডার প্রকৃয়া বাতিল করা হয়েছিল)। এইধরনের পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে PSI করার জন্য নির্দিস্ট দেশের জন্য নির্দিস্ট PSI কোম্পানী নির্ধারন করা আছে। পাকিস্তান থেকে কোনো পণ্য আমদানী করা হলে সেই পণ্যের PSI করে “Bureau Varitas” নামক কোম্পানী। কর্তিপক্ষ অনেক তালবাহানা করে নির্দিস্ট সময়ের শেষ দিনে চুড়ান্ত কার্যাদেশ দিলে পণ্য আমদানীর জন্য LC প্রদান করা হয়। তখন পাকিস্তানের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ থাকায় যথারিতি পন্য তৈরীকালীন ইন্সপেকশনে যাওয়ার প্রোগ্রামটা ফাইনান্সিং সংস্থা কর্তিক বাতিল করা হয়।

পণ্য তৈরী সম্পন্ন হয়ে জাহাজী করনের আগে বিন লাদেন হত্যা/ মৃত্যুতে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাওয়ায় বিদেশীরা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। অনেক বিদেশী কোম্পানীরমত PSI কোম্পানী Bureau Varitas পাকিস্তান থেকে তাদের রিজিওনাল অফিস দুবাইতে সরিয়ে নেয়। মাত্র কয়েকজন অফিসারসহ একটি অস্থায়ী অফিস ইসলামাবাদে রাখে এবং বড় আকারের প্যাকেজ পণ্যের PSI জন্য দুবাই থেকে ইন্সপেকশান টিম পাকিস্তান এসে ইন্সপেকশন শেষকরে আবার দুবাই ফিরে যায়! ঐ অবস্থায় ফাইনান্সিং কোম্পানী আমাদেরকে নিজ দ্বায়িত্বে পণ্যের গুণগত মান, পরিমান এবং অন্যান্য শর্তসমুহ পালন করার নির্দেশ চাপিয়ে দেয়। এখানে সরকারী দুই সদস্যও প্রি ইনস্পেকশনে পরিস্থিতিগত কারনে “পাকিস্তান যেতে” চাচ্ছেননা! বিদেশ ভ্রমনের ক্ষেত্রে সরকারী লোকদের কেউকেউ নরকে যেতেও আপত্তি নেই “বিশেষ কারনে...”! সরকারী কোনো ক্রয়/চুক্তি ইত্যাদি কারনে সরকারের কিছু আমলা প্রতিনিধি ব্যবসায়ীদের সাথে জুড়ে দেয়া হয়-পর্যবেক্ষক নামে। যদিও ব্যবসায়ীরা সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে খুশী মনে বিদেশ ভ্রমন করেনা।

কিন্তু এই অবস্থায় আমিও চাই-সরকারী লোকেরাও আমাদের সাথে যাক-তাহলে সরকারী প্রোটকল পাবো ইসলামাবাদের বাংলাদেশ দুতাবাস থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়-UNFPA, UNICEF পাকিস্তান অফিসের প্রতিনিধি,পাকিস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্স সেক্রেটারী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সাথে প্রি ইন্সস্পেকশনের দ্বায়িত্ব পালন করবেন। আমি বিরাট অংকের ব্যাংক লোন নিয়ে LC করেছি-আমার অনেক দুশ্চিন্তা! সঠিক সময়ে গুণগত মান বজায় রেখে পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে বিরাট ব্যাবসায়ীক ক্ষতির সম্মুখীন হবো! অবস্থাটা এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে-কারো উপর ভরসা করতে পারছিনা। ২য়ত যেহেতু PSI প্রতিনিধি দলে ফাইনান্সিং প্রতিষ্ঠানের উর্ধতন কর্মকর্তারা থাকবেন-তাই প্রটোকল স্বার্থে আমার কোম্পানীরও উর্ধতন কর্মকর্তা থাকা বাঞ্চনীয়। অগত্যা সব কিছু ঠিক করে আমি এবং আমাদের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর (ইডি) পাকিস্তান যাত্রা করি......(ইডি সাহেব মোটেই খুশী হয়ে নয় বরং একান্ত অনিচ্ছায় আমার সাথে যেতে রাজী হয়েছিলেন)।

ইডি সাহেব আমাদের কোং তে জব করলেও আমরা সবাই ওনার যোগ্যতা ও সিনিয়ারিটির জন্য সব বিষয়ে সম্মান করি। (পরের পর্বে.........) ।


আরো পড়ুন


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।