আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নির্মল হাসি আনন্দের দিন



প্রায় দেড় মাস পর মুখের দাঁড়ি কামালাম গত মঙ্গলবার। সাভারে আসার পর যে সেলুনটায় এর আগে কয়েকবার দাঁড়ি কামিয়েছি এবারও সেটাতোই গেলাম। সেলুনের মামা আমার মুখ চেনা। কিন্তু সেদিন প্রথমে সে আমাকে চিনতে পারেনি। দাঁড়ি কাটা শেষ হলে মুখ যখন পরিস্কার তখন দেখে বলল 'ও, মামা আপনে?' আমি বললাম 'হ'।

এরকম মুখভর্তি দাঁড়ি, ছেড়া প্যান্ট, ফাটা লুঙ্গি, নষ্ট মোবাইল দিয়েই আজকাল আমার দিন চলছে। এমন নয় যে এসব প্রয়োজন মেটাবার পয়সা আমার নেই। বাপ যতদিন আছে টাকা পয়সার সমস্যা হওয়ার কখা না। বাপের কাছে চাইলেই টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু ইদানীং আমি নিজেকে এসব প্রয়োজনের উর্ধ্বে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করছি।

কিন্তু কেন? তার উত্তর সহজ ভাষায় বলা যায় 'নির্মল হাসি আনন্দের দিন' আর নেই। ঈদে বাড়িতে গেলাম। বাড়িতে থাকলে আমার এক চাচাতো ভাই আমাকে সারাক্ষণ সঙ্গ দেয়। আমার হাত ফরমাইশের যত কাজ খুশি মনে সেই করে। আমি তাকে মাঝে মধ্যে দু চার পয়সা করে টাকা দেই।

কিন্তু ইদানীং আর দিচ্ছি না। সে আমাকে বলে 'বিপ্পুল ভাই, খবর কী?' আমি বলি 'খবর নাই। এখন যা, পরে আসিস। ' চিন্তা করলাম। এক সময় মনে ভাল লাগা ছিল, বুকে সাহস ছিল, নির্ঝঞ্চাট ভাবনা ছিল, নির্মল হাসি আনন্দের দিন ছিল।

কিন্তু এখন আর নেই। ভাবলাম। কি করে এসব হল ? এর থেকে কি আর বের হতে পারব না ? নির্মল হাসি আনন্দের দিন কি আর আসবে না? ভেবে ঠিক করলাম, আসবে। এমন সময় আর সবসময়ই থাকবে না। দিন আসবে।

আসতেই হবে। আর যখন দিন আসবে আমি আর এমনটি থাকব না। আবার পাল্টে যাব...... তখন আমার নতুন মোবাইল ফোন থাকবে, সে ফোনে থাকবে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স। চার জোড়া নতুন জুতা থাকবে, দুই জোড়া ফিতাওয়ালা দুই জোড়া ফিতা ছাড়া। চশমার নতুন ফ্রেম কিনব, বসুন্ধরা সিটি থেকেই।

দুই হাতের পুরাতন তিনটি আংটি বদলে নতুন তিনটি পাথরের আংটি কিনব। আলমারী ভর্তি জামাকাপড় থাকবে। দুইটা দামি হাতঘড়ি কিনব, একটা ফর্মাল ড্রেসের সাথে, আরেকটা জিন্স টি শার্টের সাথে। নতুন একটা ক্যামেরা কিনব, অজস্র ছবি তুলব আর ফেইসবুকে আপলোড দেব, সেগুলোতে হাজার হাজার লাইক পরবে। পকেটে বুজকা বুজকা টাকা থাকবে, ভাড়া নিয়ে রিক্সাওয়ালা বা বাসের কন্ট্রাক্টরের সাথে আর ক্যাচ ক্যাচ খ্যাচ খ্যাচ করব না।

পথে ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইলে আর বলবনা 'মাফ করেন'। ভাইগ্নার জন্য নতুন আরেকটা খেলনা হেলিকপ্টার কিনব, এর আগে একটা কিনে দিয়েছিলাম ১৭০০ টাকা দিয়ে কিন্তু বাজার থেকে কিনে বাসায় নিয়ে গিয়ে যখন ওটা ওর হাতে দিলাম তখন দেখি ওটা আর ঊড়ে না, আমার পিচ্চি ভাইগ্না কচি মনে খুব কষ্ট পেয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকদিন আগে আবার ওদের বাড়ির পাশে খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর একটা হেলিকপ্টার ল্যান্ড করেছিল, বাড়ির ছাদ থেকে সে এটা দেখেছে। তারপর থেকে তার হেলিকপ্টার ভাবনাটা আরও প্রবল। পরদিন আমাকে ফোন করে বলে ‘মামা, আমি একটা ইয়া বড় হিলিকপ্টার দেখছি, মাটিতে নামছিল’।

রেস্টুরেন্টে যাব। মেনুতে খাবারের নামের পাশে কত দাম সেটা ইচ্ছে করেই আর দেখবনা। ওয়েটারকে বলব 'যাও, আস্ত একটা গ্রীল মুরগী নিয়া আস। ' সেই মুরগী গাপ গাপ করে কুমীর যেভাবে খায় সেভাবে দুই হাতে ধরে খাব। খাওয়া শেষে ওয়েটারকে দেব মোটা অংকের বকশিস।

পাড়া প্রতিবেশীদের থেকে আর নিজেকে আড়াল করে রাখবনা। ঘরে ঘরে যেয়ে তাদের খোঁজ খবর নেব। বাজারে যাব। চায়ের দোকানে বসব আর পরিচিত কেঊ আসলে চায়ের দোকানীকে বলব 'ফারুক ভাই, রহীম চাচাকে দুধ চিনি বাড়াইয়া এক কাপ চা দ্যাও' চাচাতো ভাইয়ের আবদার মেটাব। পিচ্চি খালাতো যে বোনটা আছে, যে এই বয়সেই সবসময় সাজুগুজু করতে পছন্দ করে তাকে আড়ং থেকে একটা বিশাল বড় সাইজের মেকাপ বক্স কিনে দেব।

পিতামাতার দুঃচিন্তা দূর করব। মায়ের বাতের ভাল চিকিৎসা হবে, বাপের হবে চোখে ছানি পরার উপযুক্ত অপারেশন। তাদের মনে দুঃখ রাখবনা, তাদের পছন্দের মেয়েকেই করব বিয়ে। মন প্রফুল্ল থাকবে। হাসি থাকবে, আনন্দ আহ্লাদ থাকবে।

মনের সুখে গান শুনব... "অঙ্কের খাতা ভরা থাকত আকাঁয় তার ছবি তার নাম পাতায় পাতায় হাজার অনুষ্ঠান, প্রভাতফেরীর গান মন দিন গুনে এই দিনের আশায় রাত জেগে নাটকের মহরায় চঞ্চল মন শুধু সে ক্ষণের প্রতীক্ষায় রাত্রির আঙ্গীনায়, যদি খোলা জানালায় একবার, একবার যদি সে দাঁড়ায়! বুঝে নি অবুঝ মন, নীলাঞ্জনা তখন নিজেতে ছিল মাগন, নি প্রাণপন হো... হাজার কবিতা বেকার সবিতা তার কথা কেউ বলে না সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা!" আরও শুনব... “মাথায় পরেছি সাদা ক্যাপ হাতে আছে অচেনা এক শহরের ম্যাপ ব্যাগ ঝুলিয়েছি কাঁধে, নামব রাজপথে চারিদিকে ঝলমলে রোদ কেটে যাবে আধারেরই ছায়া অবরোধ চারিদিকে কী আনন্দ অতি তুচ্ছ পতঙ্গেরও অপূর্ব জীবন হয়ত শিশির কণারও আছে শুধু তার একান্ত একা আনন্দেরই ক্ষণ” শুধু ঐ 'নির্মল হাসি আনন্দের দিন' এর অপেক্ষা !

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.