আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

স্বপ্নচোর - শেষ পর্ব

দ্যা ব্লগার অলসো.....

অবশেষে শেষ হতে চললো স্বপ্নচোর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন ব্লগারের প্রেরনায়ই সম্ভব হলো এই অসাধ্য। এতো দীর্ঘ সিরিজ পোস্ট করে যাওয়া যেমন যন্ত্রণা, তেমনি লাগাতার পড়ে যাওয়াটাও। সবাইকে ধন্যবাদ যারা সাথে ছিলেন। আমি খুশি, ব্লগাররাও নিশ্চয়ই খুশি- এই যন্ত্রণা শেষ হতে চললো বলে স্বপ্নচোর -১৪ তম পর্ব রিকশা থেকে নামতেই ওর মোবাইল বেজে উঠলো।

নাম্বারটা দেখলো ও, চিনতে পারলো না। রিসিভ করলো, সাথে সাথেই ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত ওর মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেলো। টিনার গলা, বললো-‘কেমন আছিস কুত্তার বাচ্চা?’ গলাটা খুব ঠান্ডা, তবে সাপের মতো হিসহিস করছে। কাটতে যাবে, এমন সময় ওপ্রান্ত থেকে টিনা বলে উঠলো-‘ফোন কাটবিনা, তুই যদি ফোন কাটিস, তো খোদার কসম, আমি তোর ট্যাসটিকল কেটে নেব। ভালো করে শুনে রাখ, তুই কোথায় আছিস আমি জানি, তোর সাথে কে আছে সেটাও আমার জানা আছে।

যে স্বপ্ন দেখছিস সেটা আমি কোনদিনও পূরণ হতে দিবোনা। তুই আমার মর্জিতেই চলবি, আমি যা বলব, তাই করবি। সো, গেট রেডি, আই'ম কামিং। ’ দৌড়াতে লাগল জয়, দ্রুত জেবার কাছে যেতে হবে, ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি পালাতে হবে, ডাইনীটা পৌঁছানোর আগেই। গ্রামের দিকেই যাবে ঠিক করল।

যাতে ফোন রিসিভ করে, সেইজন্য ওই কালনাগিনী আননোন নাম্বার থেকে করেছে। বাসায় পৌঁছে গেল জয়, দ্রুত রুমে ঢুকেই জেবাকে ডাকল, ‘জেবা, জেবা। ’ রুমে নেই জেবা। হয়তো বাথরুমে, দ্রুত সেখানে গেল ও, নেই, সেখানেও নেই। অমঙ্গল আশংকায় জয়ের ভেতরটা কেঁপে উঠলো, ডাইনীটা ওর আগেই পৌঁছে যায়নিতো! সবখানে আঁতি-পাঁতি করে খুঁজলো, কোথাও নেই।

টিনাই ওকে ধরে নিয়ে গেছে, এটা নিশ্চিত ভেবে হতাশায় যখন মুষড়ে পড়তে যাচ্ছিলো ও, ঠিক তখনই বিছানার উপর রাখা চিঠিটা চোখে পড়লো। হাতে তুলে নিলো জয়, এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলো- ‘‘জানি, এ চিঠি যখন তোমার হাতে পড়বে, তোমার পৃথিবী থেকে বিশ্বাস নামক শব্দটা চিরদিনের জন্য মুছে যাবে। তোমার চোখে যে স্বপ্ন আমি দেখেছি, একটা নীড়ের স্বপ্ন, একটা নারীর স্বপ্ন। সবকিছু জানার পর, আমি জানি, তুমি আর কোনদিন স্বপ্ন দেখবেনা। আগাগোড়াই তুমি ভুলের মাঝে ডুবে ছিলে জয়।

আমি তোমার আলো নই, আমি কারো আলো হতে পারিনা। আরে যে নিজেই অমানিশার আঁধারে ডুবে আছে, সে কি করে আরেকজনের জীবনে আলো ছড়াবে। আমি একজন পেশাদার প্রতারক জয়, আমার কাজই হচ্ছে মানুষের সাথে প্রেমের অভিনয় করে তার সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া। তবে তোমার সাথে আমার পরিচয়টা পরিকল্পনামাফিক ছিলোনা। হঠাৎ করেই তোমার সাথে দেখা, ছিনতাইকারীদের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছো, তুমি হয়তো জাননা, ওরা আমার ব্যাগ লুটার চাইতে আমার শরীরটা লুটে নিতেই সচেষ্ট ছিলো বেশি, তুমি সময়মতো না আসলে হয়তো নিতোই।

সেজন্য তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। তোমার মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, আমার মতো মেয়ের আবার সতীত্ব কি? হ্যাঁ জয়, আমার মতো মেয়ের আবার সতীত্ব কি? তবে তোমাকে এটাও মানতে হবে, কোন মেয়েই চায়না পথে-ঘাটে তার নারীত্ব ধুলোয় লুটোপুটি খাক। আমি পথের মানুষ জয়, তোমারই মতো। গরীব মা-বাবার কাছে বিরাট বোঝা ছিলাম, তাই দুর সম্পর্কের এক মামা যখন গার্মেন্টসে চাকড়ি দেওয়ার প্রস্তাব দিল, মা-বাবা আর একমুহূর্তও দেরি করলেননা। আমাকে তুলে দিলেন ওর হাতে।

লোকটা আমাকে শহরে এনে বেচে দিলো পতিতালয়ে। ওখান থেকে অনেক কষ্টে পালাই আমি, তারপর এঘাট-ওঘাট ঘুরে নিজের চেষ্টায়ই গার্মেন্টসে চাকড়ি জুটিয়ে নিই। তবে সেই কম বেতনের চাকরি আমার মোটেও পছন্দ হচ্ছিলোনা, কারণ আমি ছিলাম বিলাসী জীবনের প্রতি সাঙ্ঘাতিক রকমের লোভী। আর লোভী মানুষের অধঃপতন ঘটতে সময় লাগেনা। আমার অধঃপতনের শুরু তখন থেকেই।

সুপারভাইজার থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সবার নজরে ছিলাম আমি, হয়তো চেহারাটা ভালো বলেই। টাকার বিনিময়ে ওদের প্রায় সবার শয্যাসঙ্গী হলাম। এভাবেও মন ভরছিলোনা, আমাকে অনেক টাকার মালিক হতে হবে, খালি এই চিন্তায় অস্থির থাকতাম। তারপরই মাথায় ঢুকলো এই আইডিয়া, মানুষকে ফাঁদে ফেলে তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া। কাজটা যেমন চ্যালেঞ্জিং, ঠিক তেমনি প্রফিটেবল।

কিন্তু জয়, তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, তোমার সাথে প্রেমের অভিনয় করতে করতে আমি নিজেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। বিশেষ করে সেদিন, যেদিন তুমি আমাকে তোমার স্বপ্নের কথা শোনাচ্ছিলে। সেই যে, নদীর পাড়, ছোট্ট কুটির, কাশফুল, শিশির ঝরা ঘাস; কি স্বপ্নীল স্বপ্ন! সেদিন খুব ইচ্ছে হয়েছিলো, এই ঘৃণ্য কাজটা ছেড়ে দিই, তোমার বুকে মাথা রেখে, তোমার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করি। কিন্তু না, পারিনি আমি। আর পারবোই বা কি করে, তোমাকে দেবার মতো আমার আছেই বা কি।

আমি প্রচন্ড লোভী জয়, এতোটাই লোভী যে তোমার সারা জীবনের সঞ্চয়, তোমার জমানো টাকা নিয়ে যাবার লোভটাও সামলাতে পারিনি। তুমি আমাকে ক্ষমা করোনা জয়, এতটাই ঘৃণা করো, যেন তোমার অভিশাপে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাই। ’ ইতি ‘জেবা’ রাগ বা ঘৃণা কোনটাই কাজ করলনা জয়ের মধ্যে। ও শুধু অবাক হয়ে গেলো, নিথর হয়ে গেলো এই ভেবে, মানুষ বিশ্বাসের এতো অমর্যাদা করতে পারে? এভাবে মিথ্যার বেসাতি করতে পারে? এভাবে এক স্বপ্নচারির স্বপ্নকে লাম্পট্যের বেয়োনেটে ক্ষত-বিক্ষত করতে পারে? প্রশ্নগুলো ওকে ক্ষত-বিক্ষত করতে লাগলো। খাটের পাশে, মেঝের উপর নিথর হয়ে বসে আছে ও।

আশ্চর্যের ব্যাপার, যে ওর সাথে প্রতারণা করেছে, যে ওর স্বপ্ন ভেঙে ছারখার করেছে, সেই জেবার উপর ওর মোটেও রাগ হচ্ছেনা। শুধু বিশ্বাসঘাতক, স্বপ্নহন্তারক এই শহরের উপর দারুণ অভিমানে কেঁপে উঠছে বুকের ভেতরটা। এই শহর শুধু নিতেই জানে, দিতে জানেনা কিছু। ভাবতে ভাবতে দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ ঝরতে লাগলো ওর, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কাতর, আশার প্রাসাদে প্রতারণার মিসাইল ওর অন্তরটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিলো। অশ্রুপ্লাবনে ভাসতে ভাসতে জয় মনে মনে বললো-‘এ শহর আমার নয়, এ শহর প্রতারকের, এ শহর আমার নয়, এ শহর স্বপ্নচোরের।

’ কাছেই গাড়ির আওয়াজ কানে ভেসে আসলো ওর, টিনা চলে এসছে হয়তো । তবে পালাবার তাগিদ অনুভব করলোনা মোটেও। নিথর হয়ে বসে আছে ও, চোখের পানি চোখেই শুকাচ্ছে। শেষ

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।