আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম (১৭ তম পর্ব)

অন্যদিকে শাহজাদা সেলিম আনারকলির অন্তর্ধানের পর তার পিতার প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা হারিয়ে দিনকে দিন আরও বেশি মাতাল হয়ে পড়ছিলেন।

সুযোগ সন্ধানীরা শাহজাদার এই দুর্বল মানসিক অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে পিতা-পুত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। আজ আত্দগোপনে থাকা অবস্থায় বিষণ্ন মনে শাহজাদা যখন এসব ভাবছিলেন ঠিক তখনই আফসানা সেখানে প্রবেশ করে। শাহজাদা তাকে আদর করে পাশে বসান এবং আফসানার হাতটি সজোরে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে করুণ নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

সম্রাটের হাতের স্পর্শ পেয়ে আফসানা আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

জীবনে প্রথম কোনো আরাধ্য পুরুষের স্পর্শ পেয়ে তার ১৮ বছরের দেহটি আবেগে থর থর করে কাঁপতে শুরু করে। শাহজাদার জন্য এ দৃশ্য নতুন না হলেও আফসানার জন্য তা ছিল একেভাবেই আকস্মিক এবং অভাবিত। শাহজাদা পরম আদরে তাকে বুকে টেনে নিলেন এবং গভীর মমতায় অনেকক্ষণ অাঁকড়ে রাখলেন। আফসানার শরীরের সুভাস, চুলের মাদকতা, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গরম বাতাস এবং আবেগময় শরীরের থর থর কাঁপুনির প্রলয়ে শাহজাদার মনের কষ্ট দুর দুর করে পালাতে শুরু করল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং তার জন্য বিশেষভাবে পালিত এবং রক্ষিত আফসানা নামক অপরূপ রূপসী মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের আগে ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে আরম্ভ করলেন।

নারী সম্পর্কে শাহজাদার অভিজ্ঞতা হিন্দুস্তানের তাবৎ যুবা পুরুষের তুলনায় যে অনেক বেশি ছিল, তা তার শত্রুরাও বিশ্বাস করত। সেই অভিজ্ঞতার চোখ এবং অনন্তর প্রেমিক মন নিয়ে আফসানাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। যৌবনের প্রথম দিকে ভালোবাসার চেয়ে শারীরিক সম্পর্কটাকেই প্রাধান্য দিতেন শাহজাদা। কোনো নারীর সানি্নধ্যে আসার অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি শরীরবৃত্তীয় কাজটি প্রথমে করে নিতেন নির্দ্বিধায়। তারপর কথাবার্তা।

এর অবশ্য কারণও ছিল- উত্তেজিত হলে মানুষের মন-মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। শরীরের প্রতিও নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো বীর পুরুষই মাথা উঁচু করে নারীর সামনে কথা বলতে পারে না বরং এক ধরনের বিষণ্নতা ও হীনমন্যতা তাকে পেয়ে বসে এবং এই বেদনা সে বহন করতে থাকে বহুক্ষণ_ কখনো সখনো বহুদিন পর্যন্ত।

শাহজাদার জীবনে নতুন ও আনকোরা সুন্দরী অপ্সরাদের আগমন ঘাটেছে অগণিত হারে। এমন দিনও গেছে যখন তিনি হররোজ কম করে হলেও ৩/৪ জন নারীর সানি্নধ্য উপভোগ করেছেন।

পর্যাপ্ত উপহার দিয়ে মেয়েটিকে বিদায় করতেন। এমনকি এসব সঙ্গিনীর সঙ্গে তেমন কোনো কথাবার্তা বলতেন না। এমনকি নাম-পরিচয় পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতেন না। জিজ্ঞাসা করার অবশ্য কারণও ছিল না। কারণ তিনি জানতেন মেয়েটির সঙ্গে দ্বিতীয়বার আর দেখা হবে না।

তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা সারা দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষাভাষী এতসব সুন্দরী মেয়েকে সংগ্রহ করে রেখেছে যে, এদের সবার সঙ্গে মিলিত হওয়া এক জীবনে অসম্ভব। মাঝে মধ্যে ওইসব মেয়েদের কথা ভেবে তার খুব খারাপও লাগত। একজন মাত্র পুরুষের ভোগের জন্য এতসব আয়োজন! অথচ সংক্ষিপ্ত জীবনের জরা-ব্যাধি, সুখ-দুঃখ, যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম সারতেই বেশির ভাগ সময় চলে যায়। রঙ্গ-রসের এত সময়ইবা কোথায়। শাহজাদার জন্য সংগৃহীত মেয়েদের তিনি স্পর্শ না করা পর্যন্ত সে মেয়েটির যেমন সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় না, তেমনি তার ভাগ্যও ঝুলে থাকে।

দীর্ঘদিনের এ প্রথার সঙ্গে তিনিও কেমন জানি খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। ফলে এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং ভোগের জন্য মানসিক অস্থিরতা দিনকে দিন কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নিয়ে ইদানীং তিনি গবেষণা করছেন।

নারী সানি্নধ্যে আসার সময় তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাতাল অবস্থায় থাকতেন। মাতাল থাকার সুবিধা অনেক।

প্রথমত, কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। মাতাল অবস্থায় কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনাও হয় না। এভাবেই চলে আসছিল বহুদিন থেকে। মাঝপথে আনারকলির সঙ্গে প্রণয় তৎপরবর্তী ঝামেলা এবং সবশেষ সম্রাটের বিরুদ্ধে নিষ্ফল বিদ্রোহে তার সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে।

আফসানার সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝলকে অতীতের কিছু স্মৃতি স্মরণ করার পর শাহজাদা বাস্তবে ফিরে এলেন।

রুপাইয়া বেগমের প্রসাদে আসার পর আজ অবধি তিনি কোনো সুরা পান করেননি। কোনো নারী সঙ্গও লাভ করেননি। অধিকন্তু অসুস্থ থাকাকালীন অবস্থায় হেকিমের পরামর্শে নিয়মিত আহার, ঘুম ও বিশ্রাম লাভের কারণে শরীর বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠেছে। আফসানার শরীরের স্পর্শে শাহজাদা তার নিজের শরীরে কিসের যেন নাচন অনুভব করলেন। তিনি সময়টাকে কাজে লাগানোর আগে গভীর মনোযোগ নিয়ে আফসানাকে দেখতে লাগলেন।

অপরূপ সুন্দরী, যেন বিধাতা আপন হাতে গড়েছেন। মেয়েটি লম্বায় প্রায় শাহজাদার সমান। উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সঙ্গে সর্বাঙ্গে এক অপরূপ গোলাপি আভা চিক চিক করছে। মুখটি গোলাকার নয়, আবার লম্বাটেও নয়। বরং লম্বাও গোলাকৃতির মাঝামাঝি।

মুখমণ্ডলের সঙ্গে অসাধারণ দুটি ঠোঁট, বাঁশির মাতা সুচাল নাক, ডাগর দুটি অাঁখি, পরিপাটি চিকন ভ্রূ, উন্নত ললাট এবং মাথাভর্তি মেঘবরণ ঘন-কালো লম্বা কেশের বাহার শাহজাদাকে পাগল করে তুলল।

তিনি আফসানার দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে ওলট-পালট করে দেখতে লাগলেন। নিখুঁত গাত্রবর্ণ। কোথাও একটি তিল পর্যন্ত নেই। গোলাপি রংয়ের ত্বকের মসৃণতা এতটাই নিপাট যে, তা ভেদ করে শরীরের ভেতরকার নীল রংয়ের রগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

হাত ধরার পর বুঝলেন এই হাত কখনো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। এত নরম, এত মসৃণ আর সুগন্ধিযুক্ত নারীদেহ তিনি জীবনে দেখেননি। তিনি আফসানার শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর দিকে তাকালেন। অসম্ভব সুন্দর দুটি পা মেহেদি বা অন্য কোনো রং দিয়ে চমৎকারভাবে আলপনা অাঁকা রয়েছে সেখানে। পায়ের সঙ্গে মানানসই আঙ্গুলগুলোর মসৃণতা এবং আঙ্গুলের মাথার নখগুলো নারীর সৌন্দর্যতাকে আরও মাধুর্যময় করে তুলেছে।

শরীরের সঙ্গে মানানসই মেদহীন কোমর এবং নিটোল পশ্চাৎদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মেদহীন পেট এবং তলপেট দেখে শাহজাদা রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। এবার তিনি তার নজর আফসানার গণ্ডদেশের দিকে নিক্ষেপ করেন। একটি দুর্লভ মুক্তার কণ্ঠহার সেখানে জড়ানো রয়েছে এবং বুকের মাঝ বরাবর ঝোলনো রয়েছে। সেদিকে তাকানো মাত্র তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। বুকে চেপে ধরলেন মর্তে নেমে আসা হুর সদৃশ মানবীকে।

পরবর্তী ঘটনায় আরও চমক অপেক্ষা করছিল শাহজাদার জন্য। আফসানার নরম দেহখানাকে বুকের মধ্যে নিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন শাহজাদা। গভীর এবং দীর্ঘতর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে করতে তিনি আলিঙ্গনের অকৃত্রিম স্বাদ অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নিজের বুকে অন্য দুটি মাংসপিণ্ডের খোঁচা অনুভব করলেন অভাবিতভাবে। এত সুদৃঢ় এবং সুগঠিত কাঙ্ক্ষিত বস্তুর খোঁচা তিনি জীবনে এই প্রথমবার আস্বাদন করলেন।

আফসানা সম্পর্শে তার একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে গেল।

আফসানার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার আগে শাহজাদা ইচ্ছে করেই কিছুটা বেশি সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাইলেন। এসব মেয়ে একদিকে যেমন মানসিকভাবে দুর্বল তেমনি অনভিজ্ঞতার কারণে কখনো সখনো লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে বসে, চিৎকার-চেঁচামেচির মাধ্যমে। শাহজাদাকে জীবনে এমন কিছু যদিও ঘটেনি, কিন্তু তিনি বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে বহু কল্প-কাহিনী শুনেছেন। আফসানা বা আফসানার মতো মেয়েরা যাদের রাজপুরুষদের ভোগের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয় তারা অবশ্য খুঁটিনাটি অনেক জানে।

তারপরও শাহজাদা আফসানার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে একটি মানসিক বন্ধন গড়ে তুলতে চাইলেন।

শাহজাদা সেলিম তার বাহুবন্ধন থেকে আফসানাকে মুক্তি করে হাত ধরে টেনে খাটের ওপর বসালেন। এরপর নিজে তার পাশে বসে পরম যত্নে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। এরপর আবার আপনার হাতটি নিজের হাতে রেখে মমতা জড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন_ তোমার কি খুব খারাপ লাগছে। এ ধরনের প্রশ্ন বা শাহজাদার কাছে এমন ব্যবহারের জন্য আফসানা মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

তার শিক্ষক তাকে এমন ধারণাই দিয়েছিলেন যে, রাজপুরুষরা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনটাকেই প্রাধান্য দেয় বেশি। প্রেম-ভালোবাসা বা সহানুভূতি তাদের কাছে থেকে আশা করা বাতুলতা মাত্র। সেই মানসিক প্রস্তুতির বিপরীতে শাহজাদার দরদভরা স্নেহময় বক্তব্য শুনে আফসানা অশ্রুসজল নেত্রে তার দিকে তাকালেন। শাহজাদা সেলিম পুনরায় বললেন, আমাকে তোমার সম্পর্কে বিস্তারিত বল_ কোথা থেকে এসেছ, কিভাবে এসেছ, কিভাবে বড় হয়েছ ইত্যাদি।

শাহজাদার আশ্বাস পেয়ে আফসানা শুরু করল তার জীবনের উপাখ্যান।

বলল, হে আমার সাহেবে আলম- আজ আট বছর হলো আমি এ প্রাসাদে আছি। বাইরের দুনিয়ার কোনো খোঁজ-খবরই আমার কাছে নেই। এমনকি আমি ভুলে গেছি আমার আত্দীয়স্বজন, ভাইবোন ও পিতামাতার কথা। এই প্রাসাদের আবহাওয়া, চার দেয়ালের কান্না এবং ভেতরের জাঁকজমক যে কাউকে বাধ্য করে, তার সব কিছুকে ভুলে থাকতে। অথচ এখানে আসার আগে আমার সব কিছুই ছিল।

ছিল স্বাধীন একটি জীবন, স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং সর্বোপরি স্বাধীন একটি মন। কিন্তু হঠাৎ কিসে যে কি হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।

হিমালয় পর্বতমালা এবং পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার মধ্যবর্তী উপত্যকার সবচেয়ে ভয়াবহ যে পর্বতটি তার নাম নাঙ্গা পর্বত। এই পর্বতের পাদদেশে বালতিস্তান নামক গ্রামে আমাদের বসতবাটি। ওই গ্রামসহ পাশর্্ববর্তী প্রায় ১০০টি গ্রাম নিয়ে বিশাল পরগনার জমিদারি আমাদের পরিবার ভোগদখল করে আসছিল সুলতানি আমল থেকে।

মোগল আমলে বিশেষত মহামতি আকবরের শাসনামলে আমাদের পরিবারের শান-শওকত বাড়তে থাকে অতি দ্রুততার সঙ্গে। মোগল সেনাপতি খানে খানান আবদুর রহিমের বদান্যতায় আমার পিতা ফতেপুর সিক্রিতে আগমন করে মহান সম্রাটের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ লাভ করেন। সম্রাট আমার পিতাকে এক হাজারী মসনবদারীতে উন্নীত করে জায়গির প্রদান করেন।

সম্রাট কর্তৃক আমার পিতাকে নতুন পদ, মর্যাদা এবং ক্ষমতা প্রদানের ফলে পুরো উপত্যকায় আমাদের ইজ্জত ও সম্মান বেড়ে যায় বহুগুণে। আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের জমিদারির পরিধি বেড়ে যায় বহুগুণে।

এসব যখন ঘটছিল তখন আমার বয়স সবে পাঁচ বছর। আমার দাদি এবং আম্মা হুজুরের কাছে মোগল দরবারের শান-শওকত, রাজপুরুষদের যুদ্ধজয়ের নানা কাহিনী আর রাজ কুমারীদের প্রেমের কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমাদের হাভেলীতে নতুন প্রাসাদ নির্মিত হলো এবং প্রাসাদের বাইরে এক হাজার সৈন্য থাকার মতো গ্যারিসন নির্মিত হলো। হিন্দুস্তান, কাবুল, তুর্কিমেনিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা মোগল সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে সেই গ্যারিসনে আসত। একজন মোগল সুবেদার গ্যারিসনটির দায়িত্বে থাকলেও তাকে আমার পিতার হুকুম মেনে চলতে হতো।

কারণ গ্যারিসনের সৈন্যদের বেতন-ভাতাসহ নানান ব্যয় আমাদের জমিদারি থেকেই পরিশোধিত হতো।

আমি এবং আমার বোনেরা সুযোগ পেলেই গ্যারিসন এলাকায় যেতাম বিভিন্ন রকম তেজি আরবি ঘোড়া আর তুর্কি টাট্টু ঘোড়া দেখার জন্য। সকাল-বিকাল ঘোড়াগুলোকে বিশেষভাবে পরিচর্যা করা হতো। ঘোড়াগুলো যখন খোশ মেজাজে থাকত তখন মাথা ঝাকিয়ে চি হি হি শব্দে প্রবলভাবে ডেকে উঠত। হৃষ্টপুষ্ট ঘোড়াগুলোর সেই ডাকাডাকি আমাদের বালিকা বেলায় যে কি অসাধারণ আনন্দ দিতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

ঘোড়ার ডাকাডাকির পাশাপাশি আমাদের আরও একটি জিনিস ভীষণ ভালো লাগত আর তা হলো সৈনিকদের কুচকাওয়াজ।

বাদ্যের তালে তালে খুব সকালে সৈনিকরা যখন কুচকাওয়াজ করত তখন প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও আমাদের শরীর গরম হয়ে যেত এক ধরনের উত্তেজনায়।

গ্যারিসনের দায়িত্বে নিয়োজিত মোগল সুবেদারের নাম ছিল মির্জা খলিল। তিনি যে কোনোভাবে দূরসম্পর্কীয় হলেও মোগল খান্দানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। তার স্ত্রী বেশ কয়েকবার ফতেপুর সিক্রির শাহী হেরেমে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং একবার সম্রাজ্ঞী রুকাইয়া সুলতানার সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন।

সুবেদার সাহেব এবং তার স্ত্রী আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন এবং আমরা যখনই গ্যারিসনে যেতাম তখন তারা আমাদের দলবলকে তাদের প্রাসাদে ডেকে নিয়ে মিঠাই-মণ্ডা খাওয়াতেন। জেবুনি্নসা নামের তাদের একটি অপরূপা কন্যাসন্তান ছিল আমার বয়সী। কয়েকদিন পর জেবুনি্নসার সঙ্গে আমার খাতির হয়ে গেল এবং আমাদের দুই পরিবার বিরাট অনুষ্ঠান করে আমাদের মধ্যে 'সহেলীগিরি' পাতিয়ে দিল। তারপর থেকে আমাদের দুজনের শিক্ষা-দীক্ষা একসঙ্গে চলতে থাকল। আমাদের মধ্যে এমনই মহব্বত পয়দা হলো যে, আমরা একে অপরকে না দেখে একদণ্ডও থাকতে পারতাম না।

আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে কেবল ধর্ম এবং মোগল দরবারের প্রতি আনুগত্য ব্যতিরেকে তেমন কোনো মিল ছিল না। আমরা স্থানীয় পাখতুন ভাষায় কথা বলতাম আর জেবুনি্নসারা বলত পরিশুদ্ধ ফারসি ভাষায়। আমাদের খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক এমনকি চেহারা-সুরতও ছিল ভিন্ন। কিন্তু মনের মিল ছিল অসাধারণ। ফলে অল্প কিছুদিন দুটি পরিবার একত্রে চলার পর আমরা একে অপরের ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি করায়ত্ত করে ফেলি।

জেবুনি্নসার বাবা-মায়ের কাছে থেকে আমার আব্বা-আম্মা মোগল শাহী খান্দানের গল্প শুনতেন। মোগল রাজ রক্তের ইতিহাস বিশেষ করে তৈমুরীয় খান্দান আর চেঙ্গিস খানের খান্দানের কাহিনী শুনে আমার আব্বা মোগলদের প্রতি অত্যধিক মাত্রায় আকর্ষিত হতে থাকলেন।

মোগল দরবারের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় এবং মোগল হেরেমের ইতিহাস আমার আব্বা-আম্মার মনকে ভীষণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তারা স্বপ্ন দেখতে লাগলেন, কোনো মোগল রাজকুমার সদলবলে ঘোড়া হাঁকিয়ে তাদের হাভেলীর মেহমান হিসেবে তসরিফ এনেছেন এবং তাদের কন্যারা ফতেপুর সিক্রি, আগ্রা, দিলি্ল বা লাহোর হেরেমে ঢোকার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আর কোনোমতে এ সুযোগ একবার পেলে আর কোনো চিন্তা নেই।

সমগ্র মোগল সালতানাতের সর্বত্র সব জায়গির, সব দরবার, সব অফিস, সব গ্যারিসন এমনকি দেওয়ানি-ফৌজদারি আদালতসমূহে পাওয়া যাবে বিশেষ মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা আর অধিকার। শুধু কি তাই- রাজ্যের সব সরকারি সম্পত্তি প্রয়োজনে ব্যবহার করার অধিকারও পেয়ে যাবেন তারা।

মূলত জায়গির লাভের পরই আমার আব্বা-আম্মা এসব খবর আর লোভ-লালসা এবং স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কথাবার্তা শুনতে পেলেন। মাঝে-মধ্যে উচ্চপদস্থ মোগল কর্তারা আমাদের হাভেলীতে আসতেন। সাম্রাজ্যের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো কারণে পাড়ি দেওয়ার সময় আমাদের হাভেলী মাঝপথে পড়লে কেউ কেউ যাত্রাবিরতি করতেন।

দুই হাজারি, তিন হাজারি বা চার হাজারি কোনো সেনাপতিকে দেখলে আমার আব্বা এবং জেবুনি্নসার আব্বার হুশ থাকত না। সর্বোচ্চ সতকর্তা, আন্তরিকতা এবং আতিথেয়তা দ্বারা ওই সেনাপতিকে আপ্যায়ন করা হতো। এতে করে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকায় আমাদের মান-মর্যাদা বুদ্ধি পেত। এভাবে চলতে চলতে আমার বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলো। আমার আব্বার জায়গির লাভের পর গত পাঁচ বছর আমিসহ আমাদের পরিবারের সবাই নানা রকম রাজকীয় নিয়ম-কানুন শিখেছি এবং একই সঙ্গে বড় কিছু করার বা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছি।

এরই মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে মোগল সরকারের অন্যতম ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী সাত হাজারি সেনাপতি এবং বিখ্যাত বৈরাম খানের পুত্র খানে খানান আবদুর রহিম আমাদের হাভেলীতে মেহমান হিসেবে এলেন। [চলবে]

 

 


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.