আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

উড়াল বৈঠা বাইয়া যাই, হাইর মা ফালাইয়া যাই

নাজমুল ইসলাম মকবুল উড়াল বৈঠা বাইয়া যাই, হাইর মা ফালাইয়া যাই নাজমুল ইসলাম মকবুল সিলেটে মশহুর পুরণো একটি গল্প দিয়েই শুরু করি। স্বামী স্ত্রী উভয়েরই মা এতই বৃদ্ধাবস্থায় উপণীত হয়েছেন যে, চোখে পর্যন্ত দেখেননা। স্ত্রীর মায়ের কোন অবলম্বন না থাকায় জামাই বাড়ীতেই থাকেন। কিন্তু স্বামীর মা ও স্ত্রীর মা দুনু বেয়াইন এর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় দিন রাত শুধু ঝগড়া ফ্যাসাদ কাইজ্যার যন্ত্রনায় বাড়ীতে বসবাস করাই মুশকিল হয়ে পড়ায় স্ত্রী স্বামীকে বললেন চলো এক কাজ করি। বাড়ীতে ঝগড়া ফ্যাসাদ কাইজ্যা দরবার চিরতরে বন্ধ করতে তোমার মা’কে দুরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসি।

আপন গর্ভধারিনী মা'কে নির্বাসন দেবার প্রস্তাবে স্বামী কোন ক্রমেই রাজী না হলেও এক নাগাড়ে বেশ কিছু দিন যাবত স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে অবশেষে রাজী হয়ে গেলেন। কাঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে নির্বাসনের দিন তারিখ ঠিক করে সিদ্ধান্ত হলো গভীর অন্ধকার রাতে ঘুমে অচেতন থাকাবস্থায় নৌকায় তুলে নিয়ে দুরে নির্জন কোথাও ফেলে দিয়ে আসতে পারলেই কেল্লা ফতে। এক পরে অবর্তমানে ঝগড়া ফ্যাসাদ বকবকানী চিরতরে হয়ে যাবে টার্ন অফ। নির্দিষ্ট রাতে ছেলে চুপি চুপি গিয়ে মাকে বললেন, মা আজ রাতে আপনার বেয়াইনের সাথে ভাব জমিয়ে আপনি তার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বেন। পরবর্তীতে অসুস্থতার জন্য উঠতে না পারার ভান করে তাকে পাঠিয়ে দেবেন আপনার বিছানায়।

যেই কথা সেই কাজ। গভীর অন্ধকার রাতে সকলে যখন ঘুমে অচেতন তখনি নৌকা প্রস্তুত। স্বামী তখন স্ত্রীকে বললেন, মা’ কে সন্তর্পণে তুলে নৌকায় নিয়ে এসো যাতে মা কোনক্রমেই টের না পান। স্ত্রী কয়েকজন সহযোগীর মাধ্যমে অন্ধকারে চুপি চুপি বৃদ্ধাকে ঘুমন্ত অবস্থায় কৌশলে তুলে নিয়ে এলেন নৌকায়। অনেক দুরে ফেলে দিয়ে ফেরার পথে স্ত্রী মনের ফুর্তিতে সুর করে গান ধরে ‘‘উড়াল বৈঠা বাইয়া যাই, হাইর (স্বামীর) মা ফালাইয়া যাই’’।

গান শুনে স্বামী বেচারা হাসেন আর মনে মনে বলেন, ‘‘বাড়ীত গেলে দেখবায় গো সই কার মা আছইন আর কার মা নাই’’। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন সাবেক উপদেষ্ঠা সেদিন আপে করে বললেন ‘‘কাক কাকের পাশে দাঁড়ালেও সাংবাদিকরা একে অপরের পাশে দাঁড়ায়না। ’’ চরম দুঃসময়েও একে অপরের পাশে না দাঁড়িয়ে কাকে কিভাবে কত দ্রুত কুপোকাত করা যায় সে ধান্দা দুর না হওয়ায় সাংবাদিক হত্যা, পেঠানো, নির্যাতন, আটক, গ্রেফতার ইত্যাদি না থেমে দিন দিন আশংকাজনক হারে বাড়তে বাড়তে অতীতের সকল রেকর্ড ম্লান করে গীনেজ বুক অফ ওয়াল্ড রেকর্ড এ রেকর্ডভুক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেশে বিদেশে সর্বাধিক আলোচিত নন্দিত পত্রিকা স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী আমার দেশ বন্ধ করে এর ছাঁপাখানা সিলগালা করে সাহসী সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে বিবস্ত্র করে চোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হলো। জেল থেকে জেলে নিয়ে বন্ধী করে রেখে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর কেড়ে নেয়া হলো।

কিন্তু অবাক বিস্ময়ে বিশ্ববাসী তাকিয়ে দেখলো, দেশের সম্মানিত সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোন গরজ অনুভব করলেননা। সকল শীর্ষ সম্পাদকদের একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বার করা নিয়ে যে খেল তামাশা হলো তাও আমার মতো তরুনকে শুধুই লজ্জা দিলনা চরমভাবে আহতও করলো। সেদিন আমার দেশ ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাহেবের উপর খড়গ নেমে আসার সাথে সাথে গোটা দেশের সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুললে দুস্কিৃতিকারীরা সাগর রুনীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাতির বিবেক সাংবাদিকদের নির্যাতন করে তামাশা করার সাহস পেতোনা। প্রথম আলো পত্রিকার তিন ফটো সাংবাদিককে রাস্তায় ফেলে কিল ঘুষি ও নির্মমভাবে পিটিয়ে পুলিশের এসি দম্ভোক্তি করে বলতোনা ‘‘পেটা শালাদের পেটা। কতো সাংবাদিক পিটিয়েছি-সাংবাদিক পেটা।

সাংবাদিক মারলে কিছু হয়না। ’’ এর পরের দিন ঢাকায় একটি জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকার অফিসে ঢুকে সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের নির্মমভাবে পিটিয়ে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে পত্রিকা অফিসের ফোর রক্তে লাল করার সাহস পেতোনা। ধারাবাহিকভাবে এর পরের দিন গত ২৯ মে ঢাকার সিএমএম আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বিচারপ্রার্থী এক তরুনীকে ধরে নিয়ে পুলিশ কাবে আটকে রেখে কর্তব্যরত পুলিশ কর্তৃক ওই তরুনীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগ শোনার সময় প্রথম আলোর আদালত প্রতিবেদক প্রশান্ত কর্মকার, কালের কন্ঠর আদালত প্রতিবেদক এম এ জলিল উজ্জ্বল ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এর আদালত প্রতিবেদক তুহিন হাওলাদারসহ আইনজীবি শাখাওয়াত হোসেন ও রাশেদুলকে পেটাতে পেটাতে থানায় নিয়ে যাবার সাহস পেতোনা। সাংবাদিকদের পিট দেয়ালে টেকে গেছে অনেক আগেই। গত ১৪ ফেব্র“য়ারী জাতীয় প্রেসকাবের সামনে বিএফইউজে ও ডিইউজে আয়োজিত প্রতিবাদ বিােভে অংশ নিয়ে দৈনিক আমার দেশ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারে কেউই দেশের মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারছে না।

সরকারের মদদপুষ্ট লোকেরা নির্যাতনের ভুমিকায় থাকায় কোনো হত্যার বিচার হচ্ছেনা। তিন বছরে দেশকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সাগর-রুনির সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে তামাশা করেছেন। এ প্রতারণার পথ ছেড়ে হত্যার দায় নিয়ে অবিলম্বে খুনিদের চিহ্নিত ও গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হচ্ছে। গণমাধ্যমে ভয়ের শাসন জারি রাখতে সরকার অব্যাহতভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার এমপি কামাল মজুমদারের নির্যাতনে আরটিভির সাংবাদিক অপর্ণা সিংয়ের হাত ভাঙার পরও কোনো মামলা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশও করেননি। কিন্তু দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরায় আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভয়ের শাসনে সাংবাদিকরা নিজেদের নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরতে পারছে না। এটা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের চেহারা হতে পারে না।

দল মতের উর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি। সাংবাদিক নেতারা তাদের বক্তব্যে ােভের সাথে জানান, নির্যাতকরা পুরস্কৃত হওয়ায় সাংবাদিক হত্যা বাড়ছে। তিন বছরে ১৪ সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি। সাগর রুনি হত্যাকান্ডের পর সকল সাংবাদিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করলে দেশ ব্যাপী সাংবাদিক সমাজের মধ্যে একটি সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু এরপরও তেমন একটা জোরালো আন্দোলন গড়ে না উঠায় আবারও যেন হতাশার চাদর খানিকটা যেন ম্লান করে দিচ্ছে সেই ঐক্যের প্রাচীরকে।

একটি প্রবাদ আছে ‘‘পুলিশ পারেনা এমন জিনিস নেই’’। কিন্তু বর্তমানে প্রবাদটিতে কিছুটা সংশোধনী এনে হয়তো বলতে হবে ‘‘সাগর রুনী হত্যাকান্ড এবং দেশে চলমান গুমের ঘটনা উদঘাটন ছাড়া পুলিশ পারেনা এমন জিনিস নেই। প্রথম আলো পত্রিকার তিন সাংবাদিকের লোমহর্ষক নির্যাতনের সংবাদ তাদেরই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশের পর পাঠকদের অনেকেই অনেক ধরনের মন্তব্য লিখলেন ব্লগে। এর মধ্যে একজন পাঠক লিখলেন ‘‘কত রঙ্গ জানোগো পুলিশ, কত রঙ্গ জানো। ’’ আরেকজন লিখলেন, ‘‘এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের পুলিশরা সব পারে’’।

আরেকজন লিখলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা রার নামে পুলিশ বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপরে লোকজনকে পেটায়, কারাগারে পাঠায়, প্রাথমিক শিকদের পেটায়, সাধারণ মানুষের গলা টিপে ধরে। ’’ দেশের সাংবাদিক সমাজ ডান বাম উপর নিচ উত্তর দনি পুর্ব পশ্চিম এদল সেদল বড়দল ছোটদল সরকারী দল বিরোধী দলের লেজুড় বৃত্তি না করে, পদ পদবীর ধার না ধেরে শীষাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মেরুদন্ড সোজা করে দাড়াতে না পারলে কপালে আরও অনেক খারাবী দেখার জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপো করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখা যাচ্ছেনা বলেই মনে হয়। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।