অন্নদাশংকর রায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেকের লেখায় দেশবিভাগের বেদনার কথা পড়েছি। এ বিষয়ের ওপর ঋত্বিক ঘটক ও তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত একাধিক চলচ্চিত্র দেখেছি। তাঁরা তাঁদের ইতিহাসবোধ আর অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন, নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। বোধ করি সাধারন মানুষও অনেক সময় নানা কারণে দেশবিভাগের কারণে বেদনা বোধ করেন। একজন ভ্রমণপিপাসু হিসেবে ভারতের সুন্দর কোনো জায়গার আলোকচিত্র বা ভিডিও ফুটেজ দেখলেই আমার মনে হয়-- শুধু টাকা আর সময় থাকলেই আমি ওখানে বেড়াতে যেতে পারবো না।
কারণ ওটা আমার দেশ নয়, অথচ '৪৭-এর আগে ঐ জায়গাটা ছিল অখণ্ড এক দেশেরই অংশ। কিছু রাজনীতিবিদের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে এখন তা অন্য দেশ। এখন ওখানে যেতে হলে আমাকে আগে পেরুতে হবে 'ভিসা' নামক 'ফণীমনসার এক দেশ', যা আমি প্রথম পেরিয়েছিলাম ২০০৬ সালে শিলং যাওয়ার জন্য। প্রথমে ভিসা ফরম নিয়ে তা পূরণ করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জমা দেওয়া, তারপর প্রদানের তারিখে আবারো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তা গ্রহণ করা। সেবার গিয়েছিলাম ১৩ বন্ধু মিলে।
ভিসা প্রদানের তারিখে গিয়ে দেখি সবার ভিসা হয়ে গেছে, আমার হয়নি। আমার অপরাধ, আমি সাংবাদিক। আমাকে সাক্ষাৎকারের তারিখ দেওয়া হল, সেই মতো সাক্ষাৎকার দিয়ে তারপর আমাকে ভিসা পেতে হল। এরপরও আমি বেশ কয়েকবার ভারতে গিয়েছি। প্রতিবারই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বেদনাটা সবচেয়ে বেশী বেজেছিল আগরতলা গিয়ে--সেখানকার লোকজনের কথাবার্তা, আচার-আচরণ একদম আমাদের মতো, তাঁদের রান্না করা খাবারের স্বাদ-গন্ধের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আর এসব কারণে ওখানকার মানুষজনের সঙ্গে খুব বেশি আত্মীয়তা অনুভব করেছিলাম। অথচ সেই তাঁদের কাছে আসতে হলে আমাকে কতরকম আনুষ্ঠানিক যন্ত্রণা পেরিয়ে তারপর আসতে হয়! গতকাল বহুদিন পর আবার তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত 'চিত্রা নদীর পারে' দেখে এমনি আরও অনেক কথা মনে পড়ছিল। তখনই 'চিত্রা নদীর পারে' ছবিটিকে কেন্দ্র করে এই লেখা লিখতে বসাঃ
বলা হয়ে থাকে, '৪৭-এর দেশবিভাগ যতটা ব্যাপকতা ও গভীরতা দাবি করে, শিল্পসাহিত্য সে দাবির সামান্যই পূরণ করতে পেরেছে। বিষয়টি শিল্পসাহিত্যে যতটুকু এসেছে, তাতে অনেকেরই হয়ত দেশ বিভাগের প্রসঙ্গ এলে প্রথমেই মনে পড়বে অন্নদাশংকর রায়ের সেই বিখ্যাত 'তেলের শিশি' কবিতার--
''তেলের শিশি ভাঙলো বলে
খুকুর 'পড়ে রাগ করো,
তোমরা যে সব ধেড়ে খোকা
বাংলা ভেঙে ভাগ করো,
তারবেলা? তারবেলা? তারবেলা?''
এই লাইন কটি।
তাছাড়া বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক রচনায় এ প্রসঙ্গটি ফিরে ফিরে এসেছে। দেশবিভাগের ফলে নিজ জন্মভূমি পরদেশ হয়ে যাওয়ার বেদনা ধ্বনিত হয়েছে তার অনেক রচনায়।
১৯৯০ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে দুই জার্মানি এক হয়। ঐতিহাসিক সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই প্রত্যক্ষ দর্শনের ফল তাঁর রচিত গ্রন্থ 'ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ'।
সেই গ্রন্থের প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ--
''বিনা যুদ্ধে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মিলন বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে একটা বিরাট ঘটনা। আমি ভুক্তভোগী, দেশবিভাগের ক্ষত আমার বুকে এখনও দগদগ করে। তাই একই জাতির দুটি অংশ আবার স্বেচ্ছায় পুনর্মিলিত হতে যাচ্ছে, এই ঐতিহাসিক দৃশ্যটির সাক্ষী থাকবার জন্যই আমি অক্টোবরের তিন তারিখে বার্লিন গিয়েছিলাম। ...এই সীমানাভাঙা মানুষের উচ্ছ্বাস-আনন্দ দেখে আমার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে যায় দুই বাংলার মাঝখানের গভীর বিভেদের রেখার কথা। 'হায় ধর্ম, এ কী সুকঠোর দণ্ড তব!...'
চলচ্চিত্রে এই প্রসঙ্গটি সম্ভবত ঋত্বিক ঘটকই প্রথম সার্থকভাবে নিয়ে এসেছেন।
তাঁর সিনেমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে এই প্রসঙ্গ এলে সুনীল-শংকরের পাশাপাশি স্মৃতির জানালায় উঁকি দেয় বেশ কয়েকটি সিনেমাও। এসবের অন্যতম 'সুবর্ণ রেখা' (১৯৭৩)। অনেকে একে দেশভাগের যন্ত্রণার সবচেয়ে সার্থক দলিল মনে করেন। গত শতকের শেষদিকে এ তালিকায় যুক্ত হয় তানভীর মোকাম্মেলের 'চিত্রা নদীর পারে'। বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত এ ছবির দুটি প্রধান চরিত্র শশীকান্ত সেনগুপ্ত ও তাঁর কন্যা মিনতির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যথাক্রমে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও আফসানা মিমি।
এছাড়া ছবিটিতে আরও অভিনয় করেন রওশন জামিল, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, তৌকীর আহমেদ প্রমুখ।
'চিত্রা নদীর পারে' বাংলাদেশ ছাড়াও ইংল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারতের একাধিক চলচ্চিত্র উৎসব ও বহু প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। এটি শ্রেষ্ঠ ছবি, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যসহ মোট সাতটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে।
সমালোচক মফিদুল হকের দৃষ্টিতে
'চিত্রা নদীর পারে'
'...প্রতিটি দেশত্যাগের পেছনে আছে একটি মানুষ, একটি গোটা জীবন এবং এই জীবন যে পূর্ববঙ্গের জল-মাটি-হাওয়ার মতো, বহমান চিত্রা নদীর মতো, সমাজের অজস্র সম্পর্কসূত্রে একেবারে জড়িয়ে-জাবড়িয়ে রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক ছিন্ন করার যে নাড়িছেঁড়া টান তার পরম বেদনাবোধ শিল্পী ছাড়া আর কে প্রকাশ করতে পারবে?
ক্ষমতাবান শিল্পী আমাদের অনেক, কিন্তু বেদনার রূপকার নীলকণ্ঠ শিল্পী কেন পাওয়া গেল না সেটাও এক জিজ্ঞাসা বটে।
'চিত্রা নদীর পারে' দেখতে দেখতে যেকোনো সংবেদনশীল দর্শকের বুকের ভেতর একটা হাহাকার জেগে উঠবে এবং দেশত্যাগী উদ্বাস্তু সমস্যার মানবিক মাত্রা মনের ভেতর হাজারো জিজ্ঞাসার জন্ম দেবে।
কেননা তানভীর মোকাম্মেল বাংলার অকথিত ইতিহাসের মানবিক মাত্রাটুকু অনুভবের চেষ্টা এখানে নিয়েছেন এবং সার্থকভাবেই এখানে তা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। ...'
কাহিনী সংক্ষেপ
ছোট নদী চিত্রা। তার পারে ছোট মফস্বল শহর নড়াইল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ঘটনা। হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বছরের পর বছর সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
'৪৭-এর দেশবিভাগের ফলে এই সম্পর্কে চিড় ধরে।
'৪৭-এর কোনো এক বিকেলে কয়েকটি শিশু নদীর পারে খেলা করছে; মিনতি, বাদল, নাজামা, সালমা, বিদ্যুত--এরা বিভিন্ন বয়সের। নাজমা, সালমা ও বাদল ভাইবোন। তাদের পাশের বাড়ি 'পান্থনীড়' উকিল শশীকান্ত সেনগুপ্তের। তাঁর দুই সন্তান মিনতি ও বিদ্যুৎ এবং স্নেহময়ী বিধবা বোন অনুপ্রভা দাসী।
সেই সময়ের সাম্প্রদায়িকতার দিনগুলোয় হিন্দুরা যখন দলে দলে দেশত্যাগ করছে তখন একশ্রেনীর মানুষের নজর পড়ে 'পান্থনীড়'-এর ওপর। কিন্তু শশীকান্ত তার সিদ্ধান্তে অটল, কিছুতেই দেশত্যাগ করবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাদল ও মিনতি বালক-বালিকা থেকে পরিণত হয় তরুণ-তরুণীতে। মিনতি ভর্তি হয় নড়াইল কলেজে, বাদল যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই ধর্মের হলেও শৈশবের দুই খেলার সাথির মধ্যে জন্ম নেয় প্রেমানুভূতি।
সারা দেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীকার আদায়ের দাবিতে ছাত্রসমাজ উত্তাল। বাদলও ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।
শশীকান্ত বাবুর বড় ভাই নিধুকান্ত বাবু গ্রামের হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। তার মেয়ে বাসন্তী দুর্গাপূজায়র সময় সংঘটিত দাঙ্গায় ধর্ষিত হয় এবং চিত্রা নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করে। তারপর নিধুকান্ত সপরিবারে দেশত্যাগ করে।
এসব ঘটনার স্নায়বিক চাপে শশীকান্ত শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে। এক শেষ বিকেলে হৃদযন্ত্রে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মিনতি ও তার পিসিমা 'পান্থনীড়' ত্যাগ করে কলকাতার উদ্যেশে রওনা হয়। পেছনে চিত্রা
নদী বয়ে চলে তার আপন গতিতে।
কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনাঃ তানভীর মোকাম্মেল
মুক্তির তারিখঃ ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯
দৈর্ঘ্যঃ ১১৪ মিনিট
ঢাকা ও চট্টগ্রামের অনেক সিডির দোকানে এ ছবির ডিবিডি পাওয়া যায়।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।