সন্ধ্যার আঁধারে আমি যদি হারিয়ে যাই বন্ধু, আমাকে মনে রেখো তোমার ঘরের ধূপ-আগরের সুবাসে- তোমার ঘরের প্রদীপের আলোয়, আমাকে ফেলে দিও না বাসি ফুলের মত। মনের ঘরেই রেখো বন্ধু পথের ধারের ফুলটি ভেবে। আমি যে জলসাঘরে ...www.jolsaghor.com চিত্রা পঞ্চমীর চাঁদ উঠল। ঠিক মাথার উপরে নয়। পশ্চিমে একটু হেলে।
তখনও সাদা বকটি বাঁশের ঝাড়ে রাত্রির শয্যানিবাস ঠিক করতে পারেনি বলে ইতিউতি করছে। একটি ফিঙ্গে বকটির আশেপাশে ঘুরছে। হয়তো ক্লান্ত বকটিকে বিরক্ত করে আনন্দ পাচ্ছে। মশাদের রজনী-রাগ শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির সম্ভাবনা হয়তো অদূর দিনগুলিতে, ব্যাঙদের কেউ কেউ ডাক শুরু করে দিয়েছে।
হরেক কর্মব্যস্ততা আর হরেক কর্ম-ক্লান্তির পরে অবশেষে সন্ধ্যা নামল। গরম পড়েছে। এই তো সেদিনও বলতে গেলে হাড়-কাঁপা শীত ছিল। কত দ্রুতই না বদলে যায় সব। বদলে যায় দিন, বদলে যায় রাত।
বদলে যায় জীবন, বদলে যায় রূপ-বৈচিত্র্য, হিসেব-নিকেশ।
ঝিরিনদীর তীরে জীবনের হিসেব-নিকেশ খুবই সরল। সরল অংকের মত নয় কিন্তু, সত্যি-সত্যিই সরল। শুধু যোগ-বিয়োগ চলে। এখানে জন্ম হয়, তারপর বেড়ে উঠা।
তারপর যোগ, তারপর জন্মের অংক কষা, এবং একদিন চির-বিয়োগ। তবে, এসব সরল যোগ-বিয়োগের মাঝেও কিছুকিছু ঘটনা ঘটে। যার মাঝে ঘটে তার কাছে হিমালয়ের চেয়ে বিশাল, মহাসিন্ধুর চেয়ে গভীর ও তরঙ্গ-পীড়িত। যার মাঝে ঘটে না অথবা যে পেরিয়ে গেছে, সময়ের ব্যবধানে ভুলে গেছে, তার কাছে কৌতুকের মত। রসাত্মক কাহিনীর মত।
যার কোন মূল্য নেই। যার কোন মাহাত্ম্য নেই।
তেমনই কিছু একটা ঘটে গেছে কিরাতিনীর জীবনে। যা ঘটেছে তা আরও অনেকের জীবনে ঘটে। প্রায় সকলের জীবনে ঘটে।
কিন্তু কিরাতিনীর জীবনে তা ছিল পরম ও চরম। সেই কবেকার জীবন পটে তার এমন ঘটেছিল। তারপরে কত কাল গড়াল। কত বৃষ্টি ঝরল। কত শীত গেল।
কত বসন্ত এলো। কিরাতিনী আর বদলে যায়নি। তার মনোভূমি বদলে যায়নি। কবেকার কালবেলার কথা! কার কাছে মন সঁপেছিল! সেই থেক একাকিনী রয়ে গেছে। যেন চির-একাকিনী, চির-বিরহিণী ব্রত পালন করে যাচ্ছে।
কি তার মাহাত্ম্য, আর কি এর উপসংহার। কে জানে। শুধু এটুকুই বলা যায়, সবার জীবনের চির-বিয়োগের দিনের মত একদিন কিরাতিনীও চলে যাবে। শুধু পেছনে পড়ে থাকবে তার জীবনেতিহাস। কেউ হয়তো কখনও গল্প-ছলে তার কথা ভাববে, তাকে স্মরণ করবে।
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলবে- আহা! যদি অমন না হত। যদি তেমন না হত।
ঝিরিনদীর তীরে যে বসতি, সেই বসতিতে কিষানরা বাস করে। তারা কৃষি কাজ করে। ধান ফলায়।
গরু চরায়। এভাবেই তাদের জীবন। গরু চরাতে চরাতে কতজন বাঁশরীর রাখাল হয়ে উঠে। দুপুরে বটের ছায়ায় বসে, গরু আগলে আগলে বাঁশি বাজায়। সন্ধ্যায় একাকী ঘরে বাতি জ্বেলে অথবা অন্ধকারে বাঁশি বাজায়।
কেউ কেউ ঢোল নিয়ে বসে। গান গায়। মেয়েরা ধামাইল গায়।
পঞ্চমীর চাঁদ আকাশে নিয়ে যখন সন্ধ্যা নামল। তখন ঝিরিনদীর তীরে বসে কোন এক রাখাল বাঁশিতে সুর ধরল।
অভিসার পর্বের রাগিণী ছিল সেই সুরে। ছিল বিরহ-ক্রন্দনের সুর। ছিল অন্তর-দহনের আর্তনাদ। কে জানে কোন বালার জন্যে সেই রাখালের মন উতলা! ঝিরি নদীর জলও জানে না। না হলে সেও হয়তো উতলা হত।
কিন্তু সেই সুরে উতলা হল কিরাতিনী। সেই সুর তার মনের মাঝে বহু বসন্ত আগের বিরহ-আর্তনাদ জাগিয়ে তুলল। সে কাঁদল। পঞ্চমী চাঁদের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছল। তার মনে পড়ল- বিগত সময়ের কোন এক লগ্নে এমনই পঞ্চমী তিথির চাঁদের তলে হাতে হাত রেখে কেউ তাকে কাছে ডেকেছিল।
কেউ তাকে ভালবেসেছিল। কেউ তার পাশে থাকবে বলে দিব্যি দিয়েছিল। দিব্যির সেই নদী, সেই বটের ছায়া, সেই পঞ্চমীর চাঁদ- এখনও আছে। শুধু সেই মানুষটি নেই। শুধু তার স্মৃতি মনে আছে।
রাখালের সুরের সাথে মিলিয়ে কিরাতিনী গলা ধরল-
যখন চক্ষু মুদে থাকি
অন্তরে তোমারে দেখি
নয়ন মেলিলে দেখি ছবি
ও বন্ধুরে…
আমি প্রেমানলে আঙ্গার হইলাম
তোমায় ভাবি দিবানিশি
আমারে রাখিও তোমার মনে
ও বন্ধুরে…
নিশাচর পতঙ্গের গান পেরিয়ে, আঁধারে পাখির ডানা-ঝাপটানো পেরিয়ে কিরাতিনীর বিরহ-গীত আর তার সুর ঝিরিনদীর জলেও মিশল। আকাশে কিছু উড়ু মেঘ নিয়ে কয়েক ঝাপটা বাতাস বয়ে গেল। হাঁটুজল নিয়ে বয়ে চলা ঝিরিনদীর বুক উতলে উঠল। মৃদু ঢেউ জাগল।
বাতি নিভিয়ে অন্ধকার দেউড়িতে বসে রইল কিরাতিনী।
বিরতি দিয়ে দিয়ে তার কণ্ঠে সুর আসল। সুর থামল। দেখতে দেখতে মাঝ রাত এলো। পঞ্চমীর চাঁদ ঢলে পড়তে লাগল। কিরাতিনী জেগে রইল।
যে চির-জাগরণের বিরহ-যন্ত্রণা, স্মৃতির তাড়ন-দহন সে মেনে নিয়েছিল তার জীবনে, একাকী জীবনের স্রোতে আয়ুষ্কাল অবধি তার কি আর কোন স্থিতি আছে! ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।