একটা মেয়ের একটু কথা।
কতক্ষণ ধরে বসে আছি? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলাম।
নিজেই উত্তর দিলাম
“সেটা কি খুব গুরুত্ব পূর্ণ?”
“নাহ্ মোটেই না। ”
এমন একটি সময়ে কোন কিছুই গুরুত্ব পূর্ণ নয়। কিন্তু কি আশ্চর্য যত গুরুত্বহীণ ব্যাপারগুলোই গুরুত্ব পূর্ণ মনে হচ্ছে! সদ্য ফুল ফোটা পলাশ গাছটায় যেন আগুন ধরে গেছে! সেটার দিকে না তাকিয়ে আমি চেয়ে আছি গাছটির নীচে বিশ্রাম নিচ্ছে একটা ঘেয়ো কুকুরের দিকে! কুকুরটা দেখতে বিশ্রী।
এটার পিঠের উপরে কিসের জানি একটা ক্ষত সেটার উপর মোটা মোটা মাছি ভন ভন করছে! দেখেই ঘেন্না পাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানি মায়া অনুভব করছি।
ফোনটা বের করলাম। কয়েকদিন যাবত একটা আননৌন নাম্বার হতে ফোন আসে রিসিভ করি না। মেসেজ ও আসে কোন দিন পড়ে দেখি না।
আজকে কেন জানি খুব ইচ্ছা করছে। অন্যদিন ফোনটা বাজতে থাকলে ভালো লাগতো ভেবে যে কেউ আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে এই মুহুর্তে। কিন্তু আমি বলবো না।
সন্ধ্যা চলে এল বলে। এই মুহুর্তটা ভোরের মতোই উপভোগ্য।
আমি সেটা উপভোগ করার অভিনয় করার প্রস্তুতি নিলাম। হ্যাঁ অভিনয়। প্রতিনিয়ত অভিনয় করি আমি। ভোরের বেহেস্তি হাওয়া গায়ে মাখার সময় তরল মনের অভিনয় করি। মজার কথা শুনে খুশি হবার অভিনয় করি।
মানুষের সাথে কপট রাগের অভিনয় করি, মুগ্ধ হবার অভিনয় করি, আনন্দ পাবার অভিনয় করি। অভিনয়ের বাইরে আমি কি আসলে? নিজেই তো জানি না। অভিনয় করতে করতে নিজের স্বত্তাই ভুলে গেছি!
- এত কি ভাবো?
- কে? আমি চমকে গেলাম। একটা পুরুষালি কণ্ঠ শুনে। সাথে আশ্চর্য রকমের একটা সুগন্ধ যেটা আমি আগে শুনিনি।
- আমি কে সেটা জানা কি খুব জরুরী?
- আমি একমহুহুর্ত অপেক্ষা করে বলি “নাহ্!”
- হা হা হা হা.......
আমি অন্যদিকে ঘাড় ঘুরালাম। কে লোকটা জানার কোন আগ্রহ নেই আমার। লোকটা কি নেশাগ্রস্ত? নাকি মাস্তান টাইপের? অন্যদিন হলে এই চিন্তা করে চলে যেতাম। কিন্তু আজকে আমি কেয়ার করি না আসলেই করি না। লোকটা আমার সাথে অভদ্রতা করবে? করুক! আই ডোন্ট কেয়ার! ইভটিজার? নো প্রোবলেম!
- মেযেরা কেন এত আগ বাড়িয়ে চিন্তা করে? বলো তো!
- আপনি আমাকে বলছেন?
- এখানে তুমি ছাড়া তো কেউই নেই!
অন্যদিন হলে অবাক হতাম কিন্তু আজকে অভিনয়ের দিন না।
বললাম:
- অন্যদের জানি না। আমি করি।
- আমি যদি তোমার হাত ধরি তাহলে কি কিছু মনে করবে?
- আই ডোন্ট কেয়ার! বলেই বুকে ধাক্কা লাগলো। তাহলে কি আমি এখনও অভিনয় ছাড়তে পারি নাই? ভয় পাবার অভিনয়! লোকটা হাসছে। এই প্রথম আমি তার চেহারা দেখার চেষ্টা করলাম।
দেখা যাচ্ছে না। চেষ্টা বাদ দিলাম।
দৃষ্টি অন্য দিকে নিলাম। কিছু দেখা যাচ্ছে না তারপরও অনেক দুরে দিগন্তরেখায় কি যেন দেখা যাচ্ছে! সুক্ষ্ণ একটা আলোর রেখা যেন কি আঁকিবুকি কাটছে। আমি সেদিকে মনোনিবেশ করলাম।
সেটা কি হতে পারে? চোখ বন্ধ করে দেখলে কেমন হয়? কল্পনায়? কতক্ষণ কল্পনায় ছিলাম জানি না।
কল্পনা ভঙ্গ হলে দেখলাম লোকটা একটু দুরে গিয়ে বসেছে। প্রথমবারের মতো মনে হলো আমি অভিনয় ত্যাগ করতে পেরেছি। একমুহুর্তের জন্যে যেন মনে হলো আমার সব কথা তাকে বলা যায়! কেন মনে হলো? আমি সুযোগ দেয়ার পরও কোন সুযোগ নেয় নি বলে? লোকটা ধীর কণ্ঠে আস্তে আস্তে বললো:
- তুমি বড়ো কষ্টে আছো! আমার ভাল লাগছে না।
- আপনি কিভাবে জানেন?
- আমি না জানলে কে জানবে? আমি সব জানি!
- কে আপনি?
- আমি? আমি.. আমি... আমি কেউ না!
- সস্তা বুলি!
- হয়তো! তাতে কি?
- কিছুই তো না! এককাজ করবেন?
- কি বলো!
- নাহ্ কিছু না!
আমি অন্যদিকে তাকালাম।
আমার হাত এখন লোকটির হাতের ভিতর। কিন্তু আমি হাতের উষ্ণতাটুকু অনুভব করতে পারছি না। আবার হাতটি সরিয়েও ফেলছি না যেন সরালেই দেখবো পাশে কেউ নেই! আচ্ছা আমি কি পাশে কাওকে চাইছি? যে আমার হাত ধরে বসে থাকবে? আমার গালে কি যেন অনুভব করলাম! চমকে পাশ ফিরলাম। পাশে কেউ নেই! আশ্চর্য একটা সুগন্ধ তখনও রয়ে গেছে!
আমি দেখলাম প্রচন্ড বেগ সামলাতে সামলাতে একটা ট্রেন এসে প্রবেশ করছে রেলস্টেশনে। আমি আবেশিত হয়ে দেখছি।
এমন সময় আবারো একটা হাতের স্পর্ষ অনুভব করলাম গালে। এবার পাশ ফিরলাম না। ফিরলেই দেখবো কেউ নেই! আমি চলে এলাম রেললাইনের মাঝখানে। এখান থেকে লোকটিকে দেখা যাচ্ছে। সে তো কেউ নয় আমারই একটা স্বত্তা! এখানে কেউ নেই! সেই ঘেয়ো কুকুরটা কি মনে করে যেন আমার কাছে চলে এসেছে।
মুখ দিয়ে লালা ঝড়ছে! পশুপাখি অনেক কিছু বুঝতে পারে হয়তো সেও কিছু বুঝতে পারছে!
ট্রেন এগিয়ে আসছে। আমার চেয়ে বেশী দুরে না। এমন সময় কি হল! এক মুহুর্তের জন্যে যেন আমার পৃথিবী থমকে গেল। আমি কিছুই দেখছি না শুধু একটি মুখ ছাড়া। তিন বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে রেখেছে।
একমাথা কোকড়া চুল একচিলতে মায়াময় মুখ! আমার দিকে তাকিয়ে আছে কাঁদো কাঁদো মুখে। আমার মনে হতে থাকে আমি তাকালেই সে কেঁদে দিবে! কিন্তু আমি তাকে কি করে কাঁদাতে পারি! সে তো আমার মায়াবতী অংশুমনি!
আমি চোখ বন্ধ করলাম প্রচন্ড একটা গতির সামনে। কানে শুধু মোবাইলের রিংটোন বেজে যাচ্ছে। কেউ আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। প্রচন্ড ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও আমি সেটা পারবো না!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।