মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন তাসাউফ জগতের অত্যন্ত উঁচুদরের দার্শনিক
-বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ
‘মরহুম কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন তাসাউফ জগতের অত্যন্ত উঁচুদরের একজন দার্শনিক। তার সাথে ছিলো আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। নানা জাতীয় কর্মকান্ড একসাথে করেছি। তিনি কবি হিসেবে যেমন, মানুষ হিসেবেও তেমনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুদরের। ’ কবি মতিউর রহমান মল্লিকের জন্য বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্র আয়োজিত দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ এ কথা বলেন।
গতকাল (২৫/০৮/২০১০) বিকেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কবির সহধর্মিনী কথাশিল্পী সাবিনা মল্লিক। এছাড়া বক্তব্য রাখেন ‘প্রেণ’ সম্পাদক অধ্যাপক খন্দকার আবদুল মোমেন, কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি সোলায়মান আহসান, কবি হাসান আলীম, কবি আসাদ বিন হাফিজ, কবি ইসমাঈল হোসেন দিনাজী, আবৃত্তিশিল্পী শরীফ বায়জিদ মাহমুদ, কবির শ্যালক শিল্পী নাঈম আল ইসলাম মাহিন, কবির ভায়রা সাংবাদিক আবদুল হাদী, শিল্পী মালিক আবদুল লতিফ, কবি শামসুল আরেফিন, কবি আহমদ বাসির, সাইমুম পরিচালক মোবারক হোসেন ও শিল্পী সংগঠক বোরহান মাহমুদ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিকেন্দ্রের উপ-পরিচালক শেখ আবুল কাসেম মিঠুন।
অনুষ্ঠানে বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, ‘তাঁর রেখে যাওয়া সকল প্রতিষ্ঠানের বর্তমান দায়িত্বশীলগণকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। তার কর্মকে এগিয়ে নিতে হবে যার কোনো বিকল্প নেই।
’
কবির সহধর্মিনী সাবিনা মল্লিক বলেন, ‘কবি যতোটা আমার সংসারের ছিলেন তার থেকে বেশি ছিলেন জনগণের। যে কারণে আজ তিনি গণমানুষের কবি। আমি তাঁকে নিয়ে গর্বিত। আমি স্যা দিচ্ছি, তাঁর ঈমান ও দেশপ্রেমের মধ্যে কোনো ভেজাল ছিলো না। ’
অনুষ্ঠানে বক্তারা কবির সকল সৃষ্টিকর্মকে সংগ্রহ, সংরণ, প্রকাশ ও অনুবাদ করার জোর দাবি জনান।
বিশিষ্ট কবি, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, সাহিত্য, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক কবি মতিউর রহমান মল্লিক গত বুধবার দিবাগত রাত ১২.৪৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলে ও দেশ-বিদেশে অগণন ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মরহুম মতিউর রহমান মল্লিক দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে কিডনীসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। এসময় তিনি ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত মার্চ মাসে কিডনী প্রতিস্থাপনের জন্য তাকে ব্যাংকক নেয়া হয় কিন্তু সেখানে গিয়ে তার হৃদরোগ ধরা পড়লে হার্টে রিং পরিয়ে ও বেলুন ফুলিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
চিকিৎসকরা তাকে এক বছর পর কিডনী প্রতিস্থাপনের জন্য আবার ব্যাংকক নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন কিন্তু তার আগেই তিনি হাজির হয়ে গেছেন তার প্রিয় প্রভূর সান্নিধ্যে।
মরহুম মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫৬ সালের পহেলা মার্চ বাগেরহাট জেলার বারুইপাড়া গ্রামের এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা, বাগেরহাট পিসি কলেজ ও সর্বশেষ ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বাংলা বিভাগে পড়া লেখা করেন। ছাত্রজীবনে তিনি প্রখ্যাত কথাশিল্পী শওকাত আলী, কবি আবুবকর সিদ্দিক ও কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকে শিক হিসেবে পেয়েছিলেন।
মরহুম মতিউর রহমান মল্লিক শৈশব থেকেই বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন।
১৯৭৮ সালে ঢাকায় সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তারপর একে একে তার অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশের শহর, নগর, গ্রাম, গঞ্জ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যায়ল ও মাদরাসায় গড়ে ওঠে একই ধারার অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বিশ্বের যেখানেই বাংলাভাষাভাষী মুসলমান রয়েছে সেখানেই গড়ে উঠেছে একই ধারার বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন।
মরহুম মতিউর রহমান মল্লিক দীর্ঘদিন ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সংগঠন বিপরীত উচ্চরণের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ‘বিপরীত উচ্চারণ’ সাহিত্য সংকলনও সম্পাদনা করেছেন তিনি।
তার হাতে দীর্ঘ একযুগ ধরে সম্পাদিত হয়েছে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘কলম’। বেশ কিছু দিন তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্বদেশী সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে দেশে-বিদেশে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে অসংখ্য সংস্কৃতিকেন্দ্র। তার তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় এসব সংস্কৃতিকেন্দ্র পরিচালিত হয় আসছিলো।
১৯৭৮ সালে মরহুম প্রথম গীতিকবিতা সংকলন ‘ঝংকার’ প্রকাশিত হয়। তারপর একে একে প্রকাশ পায় তার কাব্যগ্রন্থ আবর্তিত তৃণলতা, অনবরত বৃরে গান, তোমার ভাষায় তীè ছোরা, চিত্রল প্রজাপতি ও নীষণœ পাখির নীড়ে; ছোটদের ছড়ার বই রঙিন মেঘের পালকি, প্রবন্ধের বই নির্বাচিত প্রবন্ধ ইত্যাদি।
আশির দশকে প্রকাশ পায় তার কথা, সুর ও স্বকণ্ঠে পরিবেশিত গানের ক্যাসেট প্রতীতি এক ও দুই। ইসলামী গানের শ্রোতাদের নিকট আ্যালবাম দুটি এখনও সমান জনপ্রিয়। অনুবাদক হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
পাহাড়ী এক লড়াকু ও মহানায়ক তার অনুদিত উপন্যাস। হযরত আলী রা. ও আল্লামা ইকবালের মতো বিশ্বখ্যাত মুসলিম কবিদের কবিতাও অনুবাদ করেছেন তিনি।
বেশকিছু শিা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিচিত্র ধারার সংগঠন ও পত্র-পত্রিকার সাথে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি যুক্ত ছিলেন।
কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এগুলোর মধ্যে জাতীয় সাহিত্য পরিষদ স্বর্ণপদক, কলমসেনা সাহিত্য পুরস্কার, সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ সাহিত্যপদক, সসাস সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, ফ্রান্স কর্তৃক প্যারিস সাহিত্য পুরস্কার, বায়তুল শরফ সাহিত্য পুরস্কার, কিশোর কণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার উল্লেখযোগ্য।
মরহুম মল্লিক ১৯৮৫ সালে বৃটেন ১৯৯২, ২০০০ ও ২০০১ সালে ভারত, ২০০২ সালে ফ্রান্স ও ২০০৩ সালে সৌদি আরব সফর করেন।
মরহুমের লাশ তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন সাইমুমের মগবাজারস্থ কার্যালয়ের সামনে আনা হয়। এখানে ওয়ারলেস রেলগেট জামে মসজিদে তার প্রথম নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজের জানাজায় ইমামতি করেন প্রফেসর গোলাম আজম। মরহুমের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বাদ জোহর জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকারমে।
তাঁর তৃতীয় ও সর্বশেষ নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্লবীর কালশী কবরস্থান চত্ত্বরে। এই কবরস্থানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।