গ্রাম-প্রকৃতি-সবুজ-সারল্য যেখানে মিলেমিশে একাকার, সেখানে ফিরে যেতে মন চায় বার বার।
৬ এপ্রিল, ২০০৮ তারিখে আমার সুযোগ হয়েছিল জাপানী ঐতিহ্যের নিদর্শন কিনকাকু মন্দির বা স্বর্ণ মন্দির দেখার। জাপানী ভাষায় এটাকে বলা হয় Kinkaku Temple- যার অর্থ Golden Temple বা স্বর্ণ মন্দির। জাপানী ভাষায় Kin শব্দের অর্থ স্বর্ণ। মন্দিরটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা সোনা দিয়ে মোড়ানো বলে জাপানী ভাষায় একে বলা হয় Kinkaku Temple বা স্বর্ণ মন্দির।
তিন ধরনের স্থাপত্য কীর্তির পরিচয় বহন করছে এই মন্দিরটি। এর প্রথম তলাটি হচ্ছে Shinda Zukuri, দেখতে প্রাসাদের মতো। জাপানী ভাষায় এটাকে ডাকা হয় Ho-Sui-in বলে। দ্বিতীয় তলাটি Buke-Zukuri, দেখতে সামুরাইদের বাড়ির মতো। এটাকে ডাকা হয় Cho-on-do বলে।
তৃতীয় তলাটি হচ্ছে জেন (Zen), দেখতে মন্দিরের মতো। একে ডাকা হয় Kukkyo-cho বলে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাটি জাপানীজ লেকোয়ার (Lacquer) এর উপর সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো। মন্দিরটির ভিতরের কারুকাজ করেছে Yoshimitsu নামে এক জাপানীজ শিল্পী। ১২২০ সালে মন্দিরটি ছিল Kintsune রাজার অধীনে।
১৩৯৪ সালে তৃতীয় শগুন (Shogon) রাজা Ashikaga সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১৩৯৭ সালে এটাকে নতুনভাবে তৈরীর কাজে হাত দেন। সেই নতুন রূপেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের স্বর্ণ মন্দিরটি। ১৯৯৪ সালে মন্দিরটি World Cultural Heritage এর মর্যাদা লাভ করে।
এমন একটা স্থাপত্য কীর্তি দেখার আগ্রহ আমাকে তাড়া করছিল জাপার যাওয়ার পর থেকেই। ৬ এপ্রিল, ২০০৮ তারিখে অবশেষে সেই সুযোগ হয়।
আমার ছোট ভাই ওয়েব সাইট থেকে মন্দিরটির লোকেশান জেনে নেয়। তারপর বিকেল তিনটায় বেরিয়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে স্বর্ণ মন্দিরের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে বলে দেয় কত নম্বর বাসে চড়ে আমাদেরকে যেতে হবে। আমরা সেই মতো বাসে চড়লাম। কিন্তু বাসে প্রচন্ড ভীড়। সবাই ছুটছে স্বর্ণ মন্দিরের উদ্দেশ্যে।
যেমন গৌরবান্বিত এই স্বর্ণ মন্দির তেমনি এটাকে খোঁজে পেতে বেগ পেতে হলো যথেষ্ট। তিনবার বাস বদল করে অবশেষে আমরা খোঁজে পেয়েছিলাম এই মন্দিরটি। ওখানে পৌঁছে আমার ছোট ভাই যখন ম্যাপে আমাকে মন্দিরের অবস্থান দেখাল তখন রীতিমতো আঁৎকে উঠলাম আমি। শহরের একদম শেষ প্রান্তে এসে আমরা পৌঁছেছি। সাথে সাথে এও ভাবলাম এতটা দূরত্ব এই অল্প সময়ে অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে দেশটি জাপান বলে।
বাস থেকে নেমে পাঁচ মিনিটের পথ হেঁটেই পেয়ে গেলাম আমাদের কাংখিত ইতিহাসবিখ্যাত স্বর্ণ মন্দির। সময়ের অনুকূল যোগসাজশ যেন অপো করছিল আমাদের জন্যই। সূর্য তখন পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। স্বর্ণখচিত মন্দিরটির গায়ে এর সোনালী আভা ছড়িয়ে পড়ে যে মোহময় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতা বোধহয় পৃথিবীর বড় বড় সাহিত্য বোদ্ধাদেরও হয়নি। সামনের পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে সেই মন্দিরের প্রতিবিম্বিত চিত্র যে একবার স্বচে দেখেছে তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত রূপ-সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যেতে বাধ্য।
মন্দিরটির সামনের এই পুকুরটিকে বলা হয় Kyoko-chi(Mirror pond)। পুকুরটা জুড়ে অনেকগুলো ছোট বড় দ্বীপের অস্তিত্ব এখানকার বাড়তি আকর্ষণ বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।
পুকুরটাকে ঘিরে চারপাশে দুই হাত পরিমাণ উঁচু কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে মন্দিরটির নিরাপত্তা বেষ্টনী। দর্শনার্থীদের এই বেষ্টনী অতিক্রম করে ভিতরে যাবার অনুমতি নেই। আমরা বাইরে থেকেই ছবি তুললাম।
।
সাথে সাথে একটি ভাবনাও মনে এলো আমার।
আমাদের দেশে এ ধরনের একটা মহামূল্যবান জাতীয় সম্পদ এভাবে অরতি অবস্থায় রাখার কথা কল্পনাও করা যায় না। কবে এর সমস্ত সোনা-দানা চুরি করে নিয়ে মন্দিরটাকে একটা গৌণ শৌচাগার বানিয়ে ফেলা হতো?
ঠিকই। জাপানী জাতি বলেই মন্দিরটা এখনও অত আছে এবং থাকবেও।
গেটে দারোয়ান ছাড়া তেমন কোন নিরাপত্তা কর্মী পর্যন্ত চোখে পড়েনি।
বিষয়টা চিন্তা করে মনে মনে লজ্জা পেলাম জাপানীদের পাশে আমাদের অধঃপতিত নৈতিক চরিত্রের কথা চিন্তা করে। এমন দিন কি আসবে না যেদিন আমরা এদের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব? সময়ের বুকেই যেন ছুড়ে দিলাম প্রশ্নটা।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।