আকাশটা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে
বাবা দিবস কিংবা মা দিবস - এসব নিয়ে আমার খুব একটা মাতামাতি করতে ইচ্ছে করে না। কারণ প্রতিদিনই আমার বাবা আমার কাছে সমান শ্রদ্ধেয়। প্রতিদিনই আমার মা আমার কাছে পরম মমতাময়ী। তারপরও আজ বাবা দিবসে ব্লগারদের অনুভূতি পড়তে পড়তে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। তাই বাবার শেষ জীবনের দু'টি স্মৃতি ব্লগারদের সাথে শেয়ার করলাম।
তখন জানুয়ারী মাস চলছে। কুয়াশা ঢাকা এক শীতের সকালে বাবা আমাকে বললেন, আমার সাথে আস। বাড়ি থেকে বের হয়ে বাবা দক্ষিণ দিকে হাঁটছেন। আমিও যাচ্ছি তাঁর পিছন পিছন । একটু দূরে গিয়ে আমাদের বাড়ির শেষ সীমানার কাছাকাছি একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, জায়গাটা চিনে রাখ।
মারা গেলে এইখানে আমার কবর দিও। আমার হাতে সময় কিন্তু বেশি নেই।
তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। আমার অনুভূতি কেমন ছিল মনে নেই। যাইহোক বাবার হাতে যে সময় নেই, সে কথার গুরুত্ব আমি তখন বুঝতে পারিনি।
আমি ভেবেছিলাম কবরের জায়গা ঠিক করে রাখাটা খুর গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। এটা মানুষ যেকোন সময়েই করতে পারে।
দেখতে দেখতে এপ্রিল মাস চলে এসেছে। বাবার সাথে আমি আর বড় ভাই সাপ্তাহিক বাজারে গোল আলু নিয়ে গেলাম বিক্রি করতে। দুপুরের দিকে বড় বোনের শ্বশুর আমার ছোটবোনকে নিয়ে এলো।
বাবা ছোট বোনকে একা আসতে দেখে একটু রেগে গেলেন। তালই (আমার বড় বোনের শ্বশুর) জানালেন বাড়িতে এখন ঝামেলা বেশি তাই বউ (আমার বড় বোন) কয়েকদিন পর আমাদের বাড়িতে আসবে। বাবা আর কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর দেখলাম তিনি কিছু চানাচুর আর মুড়ি কিনে আনলেন। সবগুলো একসাথে মিশিয়ে দুই ভাগ করলেন।
এক ভাগ রাখলেন নিজের কাছে। আরেক ভাগ একটা পলিথিনে ভরে বড় ভাইকে দিয়ে বললেন যা এটা তোর তালই-এর কাছে দিয়ে আয়। আর বলে আসবি যাতে এটা নিয়ে আমার মেয়েকে দেয়। এরপর থেকেই বাবার মধ্যে একটা অস্থিরতা লক্ষ করলাম। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না।
সন্ধ্যার আগে আগে সবাই মিলে বাড়িতে ফিরে এলাম। বাড়িতে এসে বাবা একটু শান্ত হলেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে গোসল করলেন। তারপর সেই অর্ধেক মুড়ি-চানাচুর নিয়ে বসলেন। বড় একটা প্লেটে নিয়ে সবাইকে খেতে বলে নিজেও খেতে লাগলেন।
এসময় মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমার মেয়েটাকে আনতে পাঠিয়েছিলাম। আর তোমার বেয়াই দিল না। তার বাড়িতে নাকি কাজের ঝামেলা। কালকে দেখবা, তার কাজ কই থাকে। তার গুষ্ঠিশুদ্ধা তোমার বাড়িতে আইব।
হ্যাঁ, বাবা ঠিকই বলেছিলেন। পরের দিন আমার বড় বোন এবং তার শ্বশুর বাড়ির সব লোকজন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। এসেছিল আরো অনেক লোকজন। কারণ রাত ২টার দিকে বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। আর সবাই যখন কোথায় কবর দিবে এই নিয়ে কথা বলাবলি করছিল, তখন আমাকেই দেখিয়ে দিতে হয়েছিল সেই জায়গাটা।
যা বাবা তিন মাস আগে আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।