:)
ডিপার্টমেন্টের একটা বৃত্তি কমিটিতে কাজ করার কারণে জীবনের খুব কাছাকাছি যাবার আর খুব খুব সাধারণ সব গল্পের অসাধারণ মমত্বটুকু ছুয়ে দেখার ভাগ্য হয় । ভাগ্য ই বলছি ............
খুব সামান্য ই বৃত্তির টাকা , প্রথম আর দ্বিতীয় বর্ষের ৩ জন করে ছাত্র-ছাত্রীকে তাদের আর্থিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে নির্বাচন করা হয়। তিরিশ - চল্লিশ আবেদনপত্র জমা পড়ে , সাক্ষাতকার পর্বে দুইজন ম্যাডাম এর সাথে আমিও থাকি......... কঠিন জাজমেন্ট করার চিন্তা নিয়ে বসে আমি কোমল থেকে কোমলতর হয়ে যাই। না যেয়েতো উপায় থাকেনা !
ওই ছেলেটা , বাবা নেই ........ বড় ভাই জমিতে কাজ করেন তাও পরের জমিতে। আরো অনেক ছোট ভাই বোন আছে।
নিদারুণ আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরে এসেছে যেই শহরে তার কেউ নেই ! ভাই এর অনেক কষ্টে পাঠানো টাকা দিয়ে মেসের ভাড়া টা হয় , হয়না তিনবেলা খাওয়া । মেধার স্বাক্ষর তো আমার হাতে থাকা সার্টিফিকেট গুলো এমনি বলে দিচ্ছিলো!
তারপর আরেকজন , ঠোটের কোনে ইনফেকশন ই জানান দিচ্ছিল অপুষ্টিতে ভোগা এই ভাইয়াটার নিজের যত্ন নেবার সামর্থটুকু নেই। প্রথম বর্ষে, উঠেছে আত্মীয়ের বাসায়, বেশ দূর সম্পর্কের। ম্যাম জানতে চানঃ কোন সমস্যা হয়? ও নিরুত্তর ই থাকে। আবারো জানতে চানঃ তোমার সাথে ভালো ব্যাবহার করেতো ? ও নিরুত্তর ই থাকে ।
আমি জিজ্ঞেশ করি , ও বাসায় পড়াও ? –"উহু, বাযার করতে হয়..." অস্ফুট কন্ঠে ....... কোমল কন্ঠে ম্যাম অনেক কিছু জানতে অনেক প্রশ্ন করেন , আমতা আমতা জবাব ,কিংবা নীরবতা । জানা যায় , ড্রইংরুমে গেস্ট আসলে নাকি যাওয়া নিষেধ !
আমি অশ্রু সম্বরণ করি ছেলেটার চোখে অশ্রু দেখে .........
মা কাঁথা সেলাই করে ওর পড়াশুনার খরচ চালাতেন গ্রামে , স্কুল কলেজেও প্রতিভার কারণে শিক্ষকরা ফি নিতেন না বলে ওর এতোদূর আসা , বললো একজন। কিন্তু এই শহরে কাঁথা সেলাইয়ের টাকাতে তো সাত দিন ও চলবেনা !
কিংবা কারো কৃষক পিতা জানেন ও না , ছেলে ফিজিক্স পড়তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী হয়েছে। জানেন শুধু , তার ছেলে তার আত্মা , তার ছেলে গ্রামের অন্য ছেলেদের মত না , তার ছেলে তাকে একদিন অনেক আরাম দেবে , কারন তার ছেলে শহরে পড়তে গেছে!
অনেক জীবনের গল্প শুনে চোখ ভারী হয়ে আসে আমার ! অনেক কষ্টের কথা শুনে কান্না চেপেছি। করুণ মুখে কিছু বলতে না পারা অনেকের জন্য বুকে হাহাকার টের পেয়েছি , তারপর স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেছি নিষ্পাপ এই ছেলে মেয়েগুলোর জন্য।
ইচ্ছে করেছে সবাইকে সাহায্য যদি করা যেত , কিভাবে কাউকে বাদ দেব ?
এই মুখ গুলোই তো ক্যাম্পাস কে সচল রাখে হাসি ঠাট্টা আর হই চই করে ! ক্লাস মাতিয়ে রাখে , জানতে পারেনা কেউ কিভাবে দিন গুলো কাটে তাদের। ওদের জন্য অনুভব হতে থাকা ভীষন মায়া একটু করে ফিকে হয়ে যায় যখন ভাবি এদেরি অনেকে দুই তিন বছরের মধ্যে পরিণত হবে নেতায়। উঠতে বসতে জুনিওরদের লাঞ্ছিত করবে যেমন ভাবে তারাও প্রথম দিকে হতো! আঙ্গুলের ফাকে থেকে সিগারেট সরবেনা , রাত কাটবে নেশায়। স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে জুটিয়ে নেবে বান্ধবী , আর পরীক্ষা পেছানোর জন্য যা খুশী তাই করবে যারা একসময় কুপির আলোয় পড়ে স্কুলে ভালো ফলাফল করতো।
আবার ভিন্নতাও আছে , বাবা মায়ের মুখ গুলোকে সম্বল করে কেউ কেউ অনেক অন্যায় আর কষ্ট সহ্য করেও অবিচল থাকে স্বপ্ন পূরণে।
জানে , কিভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় সারাজীবন কষ্ট করে আসা জনম দুঃখী মা কে ,যে ঋন তাতো আর শোধবার নয় ! এই শহরে কেউ কিছু করে দেবেনা তাকে , দাড়াতে হবে নিজের যোগ্যতায় ...... তাই টেবিল আকড়ে পরে থাকে ...... যে সময় অন্যরা আড্ডা দিচ্ছে , মহড়া দিচ্ছে শক্তি প্রদর্শনের!
আবু বকর ওদেরি কেউ একজন ছিল। স্বপ্ন সিঁড়িটার অনেক ধাপ পার হয়েছিল। আর একটু সামনে ছিল দরজাটা ......... আলো এসে মুখে পড়ছিল ওর , ভাবনাতে মায়ের মমতায় ভরা মুখ ...... সারা জীবন ঘামে ভেজা বাবার গর্বিত হাসি ...........বড় ভাইবোনের হাসি হাসি মুখে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার শব্দ ......... ছোট ভাইবোনের ভালোবাসাময় অনেক চাওয়া পাওয়া .........
তুমি অনেক ভালো থেকো ভাইয়া। আমরাও একদিন এভাবেই করুণাময়ের কাছে ফিরে যাব! না হয় তুমি কিছুটা আগেই গেলে! :-(
যারা তোমাকে তোমার জীবনের গল্পটা শেষ করতে দিলোনা কিংবা শুরু হতে দিলোনা , তাদের মুখে একদলা থুথু ছিটিয়ে দিলাম !
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।