আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আপনি কি একজন মোসাহেব??

ফেসবুক আইডি:নাই
সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার চালায় সংসদ। বাংলাদেশে অনেক সময় সরকার চলে তেলে। গত কয়েক বছরে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। তাই বলে তেলের ব্যবহার একটুও কমেনি। অবশ্য এ তেল তো সে তেল নয়।

এ হলো বিখ্যাত সাহিত্যিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘‘তৈল’’। প্রবন্ধটি কালজয়ী। ষাটের দশকে স্নাতক শ্রেণীতে এটি পাঠ্য ছিল। শাস্ত্রী মশাই বেঁচে থাকলে নিজের প্রজ্ঞা সম্পর্কে অতিশয় আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন। কারণ ওই নিবন্ধে তিনি অন্যান্যের মধ্যে ক্ষমতার আশপাশে ঘুরঘুর করা মোসাহেবদের তেল মর্দনকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছিলেন।

কিন্তু তেল ও মোসাহেবরা এই বাংলা ও তার রাজনীতিতে বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে। যুগে যুগে সব বদলায় কিন্তু তেল বদলায় না। অবশ্য সে কারণে বহুল আলোচিত এক-এগারোর পরে জনগণের বিপুল ম্যাণ্ডেট নিয়ে যে সরকারটি গঠিত হলো, অতঃপর সেই সরকারটিও তেলে চলবে এবং চলবে কেবল নয়, মাত্র নয় মাস যেতে না যেতেই তেলে ভিজে জবজবা হবে সেটি কেউ হয়তো এমন করে ভাবেননি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রবীণ-নির্বাসিত নবীন-নির্ভর মন্ত্রিসভা ও তার আশপাশের দিকে তাকিয়ে অনেকেই ইদানীং ‘‘তেল’’ দেখতে পাচ্ছেন। জনপ্রশাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তেলের কদর ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে।

সরকারি চাকরি, পদোন্নতি, বদলি, টেণ্ডার, ভাল পদ-পদবি ইত্যাদি লাভের ক্ষেত্রে মোসাহেব চক্র শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকাররা বলছেন, মোসাহেবরা অস্বচ্ছতা ও অজবাবদিহি খুব পছন্দ করে। তাঁরা চায় সিদ্ধান্ত যেন সবসময় হাইলি সেন্ট্রালাইজড থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানে সেই ১৯৭২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই এক ব্যক্তির শাসন কায়েম করেছিল। সংবিধান প্রণয়ন কমিটি রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা বিশ্বের অন্যান্য সভ্য সমাজের মতোই বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি মন্ত্রিসভার কাছে অর্পণের সুপারিশ করেছিল।

কিন্তু শুভবুদ্ধি নয়, মোসাহেবরা জয়ী হয়েছিল। তাঁরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্দনা সংগীত গাইতে গাইতে মূল সংবিধানে লিখলেন, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর একার হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। এ ঘটনা ছিল কার্যত একটি গণপরিষদীয় ক্যু। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, এর নেপথ্যে মোসাহেবরা ছিলেন। তারাই কলকাঠি নেড়েছেন।

তাঁরাই বঙ্গবন্ধুর মনোরঞ্জন করেছেন। দৃশ্যত ব্যক্তিকে তেল দিয়ে ব্যক্তির হাতে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা কুক্ষিগত করা হলো। এবং মোসাহেবদের কারণেই সেই ভুল আর কখনও সংশোধন করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে যখন সামরিক শাসন ছিল তখন সর্বময় ক্ষমতা ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন সিএমএলএ অর্থাৎ এক ব্যক্তি। যখন রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হলো, তখন নির্বাহী ক্ষমতা ব্যক্তির হাতেই থাকলো।

১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হলো, তখন তা কিন্তু ব্যক্তির হাতেই পরিকল্পিতভাবে রেখে দেয়া হলো। সুতরাং বাংলাদেশ রাজনীতির একটি সহজ সাংবিধানিক পাঠ হচ্ছে ব্যক্তিকে খুশি করা। ব্যক্তিকে তেল দেয়া। তেলে কাজ হয়। তেল উপর থেকে চুইয়ে চুইয়ে নিচে নামছে।

প্রশাসনের উপরে তেলে চলে। প্রশাসনের নিচেও তেলে কাজ হয়। এমনকি বেসরকারি সেক্টরও তেল মুক্ত হতে পারেনি। যারা জাতীয় প্রশাসনের ভাল চান, বর্তমান সরকারের সাফল্য দেখতে চান তারা ইদানীং শঙ্কিত। কারণ বাজারদর দারুণ অস্থিতিশীল আচরণ করছে।

দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় সরকার আদৌ বিশ্বাস করে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনে দলীয়করণ কিংবা স্বজনপ্রীতি স্পষ্ট। পার্লামেন্ট অকার্যকর কিংবা ক্রমশ মাছের বাজারে পরিণত হচ্ছে। এসব কিছুর জন্য পর্যবেক্ষকরা মোসাহেবদের দায়ী করছেন।

তাঁরা বলছেন, ওঁরা অতি দ্রুত গতিতে নিয়ন্ত্রণভার তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা ওঠানামা নিয়ে জরিপ হয় না। নিকট অতীতে কিছু চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল সুনজরে দেখা হয় না। ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজা হয়।

সেকারণে এর উদ্যোক্তরা ক্ষান্ত দিয়েছেন। তবে ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন, মাত্র নয় মাস আগে ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে যে নতুন সরকার যাত্রা করেছিল তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরছে। জনপ্রিয়তার পারদ নিম্নমুখী। বলা হয়েছিল, সর্বক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই হবে বিবেচনার মাপকাঠি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মোসাহেবি ও তেলই নিয়ামক শক্তি।

শিশি শিশি খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা চলছে কিংবা তাঁদের মিলিত কাজে-কম্মে ঘুম প্রগাঢ় করার কসরৎ চলছে। ফলাফল: দলীয় সরকারের আচার-আচরণে, স্বভাব-চরিত্রে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি। আওয়ামীলীগের এক প্রবীণ তৈলবাজ নক্ষত্রের অধুনা পতন ঘটেছে। কিন্তু নবীনরা তা থেকে কোন শিক্ষা নিতে রাজি নন। কালোত্তীর্ণ প্রবীণদের অবস্থাও তথৈবচ।

সুতরাং জয়তু তৈল। শাস্ত্রী মশাই জিন্দাবাদ। --দৈনিক মানবজমিন প্রকাশিত
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.