এখন রাত পৌ্নে বারোটা। গ্রামের মত জনশূ্ন্য রাস্তায় শেয়াল ওঁৎ পেতে না থাকলেও কিছু কিছু মানুষের ধূর্ত পদচারণায় ভূতের গলি কিংবা চোরা পথগুলো মুখর। কোনো রাস্তার মোড়ে গেলে হয়ত দেখা যাবে টহল পুলিশের গাড়িতে একজন কন্সটেবল পান খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েছে; আর পানের লাল রস তার মুখ বেয়ে জামায় পড়ছে। হঠাৎ কেউ দেখে রক্ত ভেবে ভয় পেতে পারে। একথাটাই মনে পড়ছিল সাবিনার।
তাই ভয়ে ভীষণ আঁতকে উঠেছে। গায়ে প্রচন্ড জ্ব্রর। রাত ন'টার দিকে সোবহান মিয়া এসেছিল। এই লোকটাও পান খায়। তাগাদা দিয়ে গেছে তাড়াতাড়ি যেতে।
টুনুও ফেরেনি। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। গতকালও শরীর খারাপ ছিল। সোবহান মিয়ার জোরাজুরিতে চারজন কাস্টমারকে খুশি করতে হয়েছিল। শেষেরজন, রঞ্জু হাওলাদার তাকে বিয়ে করবে বলেছে।
বলেছে, "সোনিয়া (সাবিনার বাজারী নাম), এইবার আমি আমার বউরে তালাক দিমু। তোরে ঘরে তুলুম। শালীয়ে কয় আমার নাকি দম নাই। "
টুনু ফিরে এসেছে। সবাই ডাকে টুইন্যা।
শুধু সাবিনা বু'ই আদর করে টুনু ডাকে। গতবছর কমলাপুর স্টেশনে যখন ওদের পরিচয় হয় তখনো সাবিনা তার নাম জানেনা। সে শুধু সাবিনাকে জানিয়েছিল তার নাম টুইন্যা। ছোটবেলা থেকে তো সে তাই শুনে আসছে। ওদের বয়সের ব্যাবধান সাত-আট বছর বোধহয়।
এসেই খাবার খুঁজছে টুনু। হুমম্ পেয়েছে। ডাল আর ভাত। খুব ভাল লেগেছে খেতে। খেতে খেতে টুনু সাবিনাকে জিজ্ঞেস করে, "আইচ্ছা বু অধিনায়ক জিনিসটা কি?"
সাবিনাঃ কই হুনছস্?
টুনুঃ ওই তো টিকেট খেলা আছে না, ওইডাত।
সাবিনাঃ আমার মন'য় অধিনায়ক হইল সিনেমার মতন। সিনেমাত যেমন মাইরপিটে নায়ক জিতে, অধিনায়ক ও ওইরকমই।
টুনুঃ ঠিক কইছ বু, আশরাফুল আইজকা এমন পিডান পিডাইছে। বু, আমারও টিকেট খেলতে ইচ্ছা করে।
টুনু খাওয়া শেষ করে সব ধুয়ে এল।
হঠাৎ তার মনে হল এই সময় তো সাবিনাবু' বাসায় থাকে না। ও জিজ্ঞেস করলো, কি হইছে বু, আইজকা কামে ষাও নাই কেন?
সাবিনাঃ বুঝতাছি না, জ্বর আইছে মন'য়।
টুনুঃ তাইলে আমি তোমার মাথাত পানি ঢালি।
টুনুকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। কিন্তু সে আসলে মনে মনে খুব খুশি।
বুবুর সাথে গল্প করবে সারারাত।
সাবিনাঃ আইজকা কত কামাইছছ?
টুনুঃ আইজকা ১০ টেয়া কামাইছি।
হঠাৎ টুনুর মনে পড়ল তার কাছে এখন ১০ টাকা নাই। আজই প্রথম সে একটা নেভী সিগারেট কিনে খেয়েছে। আগেও খেয়েছে, কুড়িয়ে পাওয়া ফিল্টার অথবা আধখানা সিগারেট।
তবে আজকে কিনে খুব ভাব নিয়ে পায়ের উপর পা তুলে রিক্সায় বসে খেয়েছে।
টুনুঃ বু' আইজকা একটা কাজলের ছবি পাইছি। তুমার না প্রিয় নায়িকা! দেহ...
সাবিনা দেখে খুব খুশি হল। টুনু সাথে সাথে গেয়ে উঠল তুম পাস আয়ে...
অমনি দুই রুমমেট একসাথে হেসে উঠল। হঠাৎ সাবিনার মাথায় চিনচিন করে উঠল।
ছবিটা দেখতে দেখতেই ঘরে ঢুকল সোবহান মিয়া।
সোবহান মিয়ার আগমন যতটা না আড়ষ্ঠ করে তুলল সাবিনাকে তার চেয়েও বেশি বিরক্ত করল টুনুকে। সাধারণত পান খাওয়া মানুষগুলো একটু আমুদে স্বভাবের হয়; হয়ত ছিলও, কিন্তু ঠিক এখন সে একজন দায়িত্বপ্রবণ দালাল ছাড়া আর কিছুই নয়।
সোবহান: কি হইছে? ঘুমাও কেন? তোমার কোন আক্কেল আছে?
সাবিনা: আসলে শরীরটা একটু গরম...
টুনু: বু আইজকা যাইতে পারব না। তুমি যাওগা।
সোবহান: ওই ফকিরনীর পো্লায় এত কথা কয় কে? শো্নো সাবিনা, কাস্টমার রাইখ্যা এইহানে তো্মার কাছে আইছি পিরিত করনের লাইগা না। তাড়াতাড়ি আস। ব্যবসা একদিনের না...
রেগেমেগে বেরিয়ে গেল সোবহান। স্বার্থপর কাঁটাতারে যেন টুনুর সব আনন্দের বেলুনগুলো ঠুস ঠাস ফুটতে লাগল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
সাথে ঠান্ডা হাওয়া। কবিরা হয়ত কবিতা লিখবে এই রাতে, কোন সুখী দম্পতি সুখ সুখ ভাব নিয়ে বিছানায় যাবে কিংবা ব্যালকনিতে বসে গরম চা খাবে আর বৃষ্টির শব্দে উহ আহ করে উঠবে। এ সব কিছুর মধ্যেও সাবিনা বের হবে। অপরিচিত নাগরের জন্য রুগ্ন শরীরটাকে ঘষে-মেজে উত্তেজক মাংসপেশীতে পরিণত করবে।
সাবিনা বেরিয়ে পড়ল সো্নিয়া হয়ে।
টুনু কোন শব্দ করল না। সাবিনা বের হওয়ার সাথে সাথেই বৃষ্টির গতি যেন বাড়তে শুরু করল। এইটুকুন টুনুও জানে ঝড় এলে কি করতে হয়! চালের ফুটো দিয়ে অনায়াসে পানি পড়ছে অনর্গল ধারায়। ঘরে অত বড়ো কিছুও নেই যে পানি ধরবে। বাসন কো্সন, বালতি বদনা সব জড়ো করল টুনু।
সব ভর্তি হওয়ার পর শেষমেষ হাল ছেড়ে দিয়ে বিছনায় বসে পড়ল পানিতে পা ভিজিয়ে। ওদের শৈশব যেন অবাঞ্ছিত পানিতে ভাসানো পা!
গভীর রাতে তিনজন কাস্টমারকে বিপুল আনন্দ দিয়ে সাবিনা যখন ঘরে ফিরছিল তখন তার দেখা রঞ্জু হাওলাদারের সাথে। বাংলা মদ খেয়ে সে এখন তিন আসমানের উপরে অবস্থান করছে। তারপরও একলা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সাবিনাকে দেখে যেন তার নেশাটা আবার চরে উঠল।
রঞ্জু: আয় সাবিনা, বৃষ্টি কি থামছে?
সাবিনা: চোখের কি ডিস্টাব আছে নি মিয়া? দেহ না...(বৃষ্টি আসলে থেমে গেছে)।
রঞ্জু: সোনিয়া, তুই মালা মতির প্রেম সিনেমাডা দেখছত? রাজ্জাক যহন মাল খাইয়া মালার বাড়ির সামনে আইছে...আহা, কি প্রেম তার অন্তরে? তুই তো জানস আমি তোরে তার চাইয়াও...(শেষ করতে পারল না ভীষম খেয়ে)।
সাবিনা: যে জিনিস খাইয়া হজম করতে পারনা, হেইডা খাও কে? তোমার তো আসলেই দম নাই।
কথা শেষ করতে না করতেই লো্কটা হু হু করে কেঁদে উঠল। বলল, আমার বউ আমারে ফালাইয়া গেছে গা।
সাবিনার ভীষণ খারাপ লেগে উঠল। প্রিয়তা কোন মানবশিশু নয়, যার জন্মাতে দশ মাস দশ দিন সময় লাগবে, নির্দিষ্ট কোন গর্ভ লাগবে। যে কোন সময় যে কারোর জন্য এর জন্ম হতে পারে। হয়ত সেরকমই কোন কারণে সারা জীবনের জন্য না হোক, কিছু মূহুর্তের জন্য হলেও রঞ্জুর ভীষণ আপন হতে ইচ্ছে হল তার।
সাবিনা রঞ্জুকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে যখন বাসায় ফিরল, তখন পাখি ডাকছে।
এসে দেখল পুরো ঘরে পানি। টুনু ঘুমিয়ে আছে। ওর পা পানিতে ডোবানো। টুনুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভীষণ বিরক্তি লাগছে সাবিনার।
অথচ হঠাৎ তার সেই পুরোনো খেলাটা খেলতে ইচ্ছে করল। সাথে সাথে নিউজপেপারের পাতা দিয়ে নৌকা বানানো শুরু করল। টুনু কিছুক্ষণ বোকার মত তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, "বু কি কর?"
সাবিনা: নৌকা বানাই। তুই ভাসাইবি?
টুনুর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
সাবিনা: একলগে নৌকা ভাসামু, যারটা আগে ডুববো হেয় হারব, আর তুই জিতলে তোরে একটা উপহার দিমু।
টুনু : আর তুমি জিতলে তোমারে আমি দিমু।
খেলা শুরু হল..
একটা একটা করে নৌকো ভাসায় তারা। কিছুক্ষণ ভাসে, যতক্ষণ ভাসে, ততক্ষণ যেন তারাও ভাসে। আস্তে আস্তে জলের ঢেউ ছলকে নৌকার ভেতরে আসে, তাদের দুজনই ভীষণই আঁতকে ওঠে।
এই বুঝি তাদের নৌকাডুবি, হয়ত তাদের স্বপ্নডুবি! স্বপ্নটার ঘোর ভাঙলো সাবিনার জয় দিয়ে।
কদিন ধরেই টুনু ভীষণ ব্যস্ত নির্মাণে। তিনটি বিয়ারিং-এর চাকা দিয়ে ত্রিভুজাকৃতির এই বাহনটি পরম মমতা নিয়ে তৈ্রী করছে সে। টুনুর এই ব্যাপারটা ভীষণ লক্ষ্যণীয়। উদ্ভূত কিংবা গতানুগতিক যা কিছুই হোক, মজা পেয়ে গেলে সে তার সমস্ত অধ্যাবসায় ঢেলে দেয় সে কাজে।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিংবা ফাঁকি দিয়ে তিনদিনে তৈরী করল বাহনটি। এটিই সাবিনার উপহার। সাবিনা বসে আর টুনু ধাক্কা দেয়। এখন পানি আনতেও সুবিধা হয়। ওতে বসিয়ে দিয়ে এর সাথে আটকিয়ে দড়ি ধরে টানলেই হয়।
এটাও একটা খেলা। এভাবেই দিন কাটছিল দুটি ভিন্ন সুরের হেয়ালী জীবনের।
রঞ্জু হাওলাদার হাসপাতালে। কিছুটা দায়িত্ববোধ থেকে হাসপাতালে গিয়েছিল সাবিনা। সে বুঝতে পারছিল বিক্রেতা-খদ্দেরের সীমাটা আস্তে আস্তে অতিক্রম করছে ইচ্ছা-অনিচ্ছায়।
ফেরার পথে গলির মোড়ের মুদীর দোকানে সদাই করতে গেল সাবিনা। চাল, ডাল, ডিম আর পেঁয়াজ এসব কিনবে। সাবিনা লক্ষ্য করেছে, এই দোকানের ছেলেটা সে গেলেই কেমন ভ্যাঁবলার মতন চেয়ে থাকে। ছেলেটা তোঁতলা। তার চোখ দুটো ভীষণ সুন্দর।
তারার মতন জ্বলে। কিন্তু আজ সাবিনার মেজাজ ভীষণ খারাপ। বাস থেকে নামার সময় শাড়িটা ছিড়ে গেছে। হঠাৎ সে বলে উঠল, 'ওই ছেরা তোর প্যান্টের চেইন খোলা কে?'
ছেলেটার নাম আনিস।
আনিস: চে...এ...এ...এইন নাই।
ছেলেটা এরপর থেকে চেইনের ওপর হাত দিয়ে রেখেছে। সাবিনার ভীষণ হাসি পেল। ছেলেটাও বোকা বোকা হাসি দিল। (আনিসের তোঁতলামি এই অংশে উহ্য রইল)।
আনিস: আপনে ওই কাম কইরা কি মজা পান?
সাবিনার আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
সাবিনা: আমি কি করমু এইডা কি তোরে জিগামু?
আনিস: আপনে কি রাগ করছেন? ওইদিন রাইতে আপনের অসুখ আছিলো, না? সোবহান মিয়া কইতাছিল। রাইতে আপনে যহন একলা ফিরতাছিলেন, আমি জাইগা আছিলাম। আপনের মন খারাপ করলে আমারে কইয়েন। আপনেরে বাঁশি বাজাইয়া শুনামু। বাঁশিটা ভাইঙ্গা গেছে।
আরেকটা বানাইতে অইবো। হুনবেন বাঁশি?
সাবিনা: ঠিক আছে ঠিক আছে। আরেকদিন হুনমু।
ছেলেটা একদম অন্যরকম। সাবিনা লক্ষ্য করছিল এত তোঁতলামি সত্ত্বেও ছেলেটার চেহারা থেকে চোখ সরাতে পারছিল না সে।
তার সরল কথাগুলোতে যেন তার চোখগুলো আরো বেশি জ্বলজ্বল করছিল।
মন্টু মিয়ার নয়-দশজনের গ্রুপটা এখন শাহবাগের মোড়ে। আজ ভীষণ খেটেছে সবাই। টুনু এই দলের সদস্য। তিনবার তাদের রিসাইক্লিং ষ্টেশনে বিকিয়ে এসেছে টোকানো প্লাস্টিক, সিলভার, টিন কিংবা বোতল।
সবাই ভীষণ ক্লান্ত। হঠাৎ তারা দেখতে পেল একজন সাদা চামড়ার মহিলাকে ধস্তাধস্তি করে একটা সিএন জি চালিত টেক্সীতে তুলে নিচ্ছে। টুনু ছুটে গেল। ততক্ষণে তারা চলে গেছে। তার চোখে পড়ল একটা গাঢ় নীল রঙের বইয়ের মত জিনিস, পড়ে আছে মাটিতে।
কুড়িয়ে নিল সে। প্রথমে ভেবেছিল, ব্যাংকের বই। সাবিনা বুর একটা আছে। কিন্তু ওটাতে ছবি নেই। এটাতে ছবি আছে।
আরেকটা কার্ড, তাতেও ছবি আর একটা কার্ড। ওর গ্রুপের কেউই পড়াশোনা জানেনা। কেউই বুঝে উঠতে পারল না এর মূল্য কতটুকু। সবাই ফিরে গেল যার যার বাড়িতে। সারাদিনের কর্মক্লান্তি, একঘেঁয়ে দৈনন্দিনতা, আকাশ খেয়ে ফেলার মত অসম্ভব ক্ষুধা গলা টিপে মেরে ফেলল যাবতীয় কৌতুহলকে।
ঘরে ফিরে টুনু খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল।
বেশ কয়েকদিন ধরে দিনে আকাশ মেঘলা থাকে আর রাতে ভীষণ বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি যেন মানুষের কামক্ষুধা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সাবিনা বিলিয়ে চলেছে তার যৌবন, প্রতি রাতে, প্রতিটি বাসরে। এই রাতগুলো আর যাই হোক, সাবিনার নয়।
একেক রাতে একেক জলসা। একেক মানুষের ভিতর একেক ধরনের পশু। সবগুলো পশু আলাদা আলাদা। আগে বুঝতো না সাবিনা। এখন বোঝে।
একেকটি পশুর একেক রকম গন্ধ, একেক রকম বদভ্যাস, একেক রকম শরীরী কামনা। সবকিছুর মাঝেও সে বেঁচে থাকে অবাঞ্ছিত কিন্তু অর্থের যোগান দেয়া জীবনটা নিয়ে। মাঝে মাঝে রঞ্জুকে দেখতে যায়। এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে ও। এর মাঝে একবারও তার বৌ আসেনি তাকে দেখতে।
দু একবার আনিসের বাঁশিও শুনেছে। তবুও সে বুঝতে পারে সে ভেঙ্গে পড়ছে। মানসিক, শারীরিক দুইভাবেই...
আজ ভীষণ বৃষ্টি। বড়লোকের ছেলেদের মতন আজকে টুনুর গ্রুপের পার্টি ডে। দিনভর থাকবে ডোবায় সাঁতরানো।
মাঝে কিছুক্ষণ কদমফুল বিক্রি আর ইদানীং তারা একটি মজার খেলা আবিষ্কার করেছে। ঢালু রাস্তায় ভীষণ স্রোতে আসা পানিতে বুক পেতে দেয়া। হয়ত সমুদ্রের ঢেউয়ের আনন্দ পায় তারা। আনন্দের কোলাহল শেষ করে তারা অপেক্ষা করছিল একটি টেলিভিশনের দোকানের সামনে। কোনো সিনেমার গান শুনবে বলে।
হঠাৎ টুনু লক্ষ্য করল টেলিভিশনে একজন সাদা চামড়ার মহিলার ছবি দেখাচ্ছে। ও বুঝতে পারল এটি সেই মহিলা। ততক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে কুড়িয়ে পাওয়া বইটি হয়ত গুরুত্বপুর্ণ কিছু। সে তাড়াতাড়ি ফিরে গেল বাড়িতে।
বাড়ি ফিরে সাবিনাকে পুরো ব্যাপারটা জানাল সে।
সাবিনা পড়ে দেখল বইটির ওপর যা লেখা আছে, তা সেও বুঝছে না। একটা কার্ডে একটা ফোন নাম্বার আছে। এ ধরনের কার্ড সে দেখেছে। বাকি দুটো জিনিস অপরিচিত। তারা গেল সোবহান মিয়ার কাছে।
সোবহান বুঝতে পারল এটা একটা পাসপোর্ট। বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষণ করে বুঝতে পারল এটি সুইডেনের কোন নাগরিকের। তখন টুনু বলে উঠল, হ ওই মহিলার নাম কি জানি লুন্ডবার্গ না কি জানি! একটা অফিসে কাম করে, টিভিত হুনছি। বাকিটাও বলল...
সোবহান: আমাগো এহন এই কার্ডের নাম্বারে ফোন করা লাগবো।
টুনু: আগে পুলিশের কাছে যাওন উচিত।
সোবহান: ওই ট্যাবলেট তুই চুপ থাক।
তারা সবাই গেল একটা ফোন বুথে। তারা অনেকক্ষণ বসে আছে। একটা লোক তখন থেকেই কথা বলে যাচ্ছে। অল্পবয়সী ছেলে।
সাবিনাকে দেখে আরো দ্বিগুণ উৎসাহে কথা বলে যাচ্ছে। তার বক্তব্যের সার সংক্ষেপ হল, 'তার কামাই এখন মাশাল্লাহ ভাল। তার মোবাইলের চার্জ শেষ। তাই দোকানের মোবাইল থেকে কথা বলছে। বাড়ির হাঁস-মুরগিগুলো ভালো আছে কিনা! তার আব্বার সাথে আলাপ হলেই যেন তার বিয়ের কথাটা মনে করে পাড়ে... এইসব।
' কলটা কেটে দোকানদারকে দিতেই দোকানদার বলে উঠল, ' কি মিয়া এতক্ষণ কথা কইলেন আর মাত্র পাঁচ মিনিট, ফাইজলামি করেন?'
ছেলেটা চোখ টিপল সাবিনাকে ইশারা করে। দোকানদার আরও খেপে গেল। ছেলেটি কোনমতে বিল দিয়ে পালাল। ছেলেটি খেয়াল করেনি যে দোকানদার নিজেও একই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সাবিনা আর টুনু ভীষণ মজা পাচ্ছিল।
সোবহান মিয়া মোবাইল নিয়ে ফোন দিল। হ্যাঁ রিং হচ্ছে..
ফোন ধরল শহীদ। নোয়াখালীর ছেলে। কদিন হল ঢাকায় এসেছে। অতটা ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেনি নতুন জীবনটাতে।
এলাকায় তার যথেষ্ট নাম ডাক ছিল মাস্তানীতে। সর্বশেষ একটি ফুটবল খেলায় গোলকারীর ভুড়ি নামিয়ে সে এখন ঢাকায়। তার বসেরা সব মার্ডার কেসের আসামী। শুনেছে তাদেরও বস আছে যাকে নাকি মাঝে মাঝে টেলিভিশনেও দেখা যায়। এই অপারেশনের পর থেকে তার বসদের দেখে সে বুঝতে পেরেছে তারা ভীষণ সমস্যায় পড়েছে।
তার আপাতত কাজ ফোন ডিল করা।
সোবহান: হ্যালো, আপনে কেডা ভাই?
শহীদ: হ্যালো, আন্নে কন?
সোবহান: ভাই, মেমসাবের পাসপুট আমার ভাইগনায় কুড়ায়া পাইছে। আপনে কই থাকেন? আপনের ঝামেলা বুইঝ্যা লন। আমরা গরীব মানুষ। দুই চাইর পয়সা দিলে গরীব মানুষ খুশি অয়।
এই আর কি!
শহীদ: অ্যাঁ, তোয়ারে কইছে! এক্ক থাবড়ে কানের লতি হাডাইয়ালাইউম। সোজামতন জিনিস দি যাইবা। ঠিকানা কইয়ের। বরাবর চলি আইবা।
সোবহান নড়েচড়ে বসল।
বুঝতে পারল সতর্ক হতে হবে। ঘটনার এ পর্যায়ে শহীদের কাছ থেকে ফোন নিয়ে নিল তার বস।
বস: আপনি এখন কোথায়?
সোবহান: স্যার, আমি ছোডো মানুষ। মাফ কইরা দিয়েন, কি কইতে কি কই! আমি জানি এই পাসপুটের দাম বহুত। এইডা সহ আমার ভাইগনা যদি পুলিশের কাছে যায়, তয় বুঝতেই পারতাছেন।
বস: আপনাকে যা বলি শোনার চেষ্টা করুন। নিজেকে বিপদে ফেলবেন না। আপনি কোথায় আছেন বলেন। আমার গাড়ী যাবে। জিনিসটা দিয়ে দিবেন।
আর একটা কথা আপনার ভাইগনাকে সাবধান থাকতে বলবেন। পুলিশের আশেপাশে যেন না ঘেঁষে, তাহলে কিন্তু...
সব ঠিক ঠাক এগুচ্ছিল। সুন্দর একটা ডিল হয়ে যেতে পারত। হঠাৎ মহিলাটির চিৎকার শোনা গেল। সাথে সাথে পলক পড়ল সাবিনার।
সে বলল সোবহান ভাই, 'ফুন কাডেন'।
সোবহান মিয়ার হাত থেকে পাসপোর্ট নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। টুনুও এল তার সাথে সাথে। সোবহান মিয়াও এল ছুটে। সে বারবার বোঝাতে চেষ্টা করল পাসপোর্টটা তাকে দিয়ে দিতে।
সাবিনা বলল সে পুলিশের কাছে যাবে এবং সবিস্তারে সব খুলে বলবে। ওই মহিলাকে পুলিশ উদ্ধার করুক। ওই মহিলাটির নিশ্চয়ই তার দেশে বাচ্চা আছে, স্বামী আছে। হয়ত এ দেশেই আছে। তাদের জন্য তার মন কেমন করে উঠল।
সোবহান বোঝাতে চেষ্টা করছে, পুলিশ খুবই খারাপ জিনিস। বড়জোর এই পাসপোর্ট পুলিশ নেবে এবং তখনই তা আবার বিক্রি করে দেবে ওই দলের কাছে। শুধু শুধু মাঝখান থেকে কিছু টাকা পাওয়ার যে সম্ভাবনাটুকু তৈ্রী হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে যাবে।
সাবিনা নিজেও জানে, পুলিশ কতটা খারাপ। বহুবার হেনস্থা হতে হয়েছে এদের কাছে, একবার তো...থাক মনে করবে না সে এখন ওসব।
সে তার বিবেকের সাথে যুদ্ধ করে কোনমতেই সোবহানের সাথে একমত হতে পারল না। সে ছুটল পুলিশ স্টেশনের দিকে।
তারা তিনজনই বসে আছে থানার সামনে, ফ্লোরে। টুনু কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে সোবহান লোকটা অতটা খারাপ নয়, তাই এখন তার সাথে ঘেঁষে আছে।
টুনু: বু, ক্ষুধা লাগছে।
সাবিনা: আহারে! ক্ষুধা লাগছে? এত ক্ষুধা লাগে কেন? আমি বাঁচি না মাইনষে্র দুঃখে আর হের খালি খাই খাই।
তারপর সে গিয়ে তিনজনের জন্য তিন কোণকে করে চানাচুর মুড়ি নিয়ে এলো। বেশ মজা করে চানাচুর মুড়ি খাচ্ছে। তাদের দেখে এখন কেউ বুঝতে পারবে না তারা একটি আন্তর্জাতিক কিডন্যাপিং এর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে।
অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখার পর তাদের ডাকা হল।
থানার দারোগা মকবুল সাহেব ওদের দেখেই ভ্রু কুঁচকালেন।
মকবুল: কি চাই?
সবিনা: আপনের লগে একটু কথা কইতাম।
মকবুল মিয়া ভীষণ পান খান। তিনি ঘরোয়া আড্ডায় খুবই আমুদে।
সাবিনার কাছে ঘটনা শোনার সাথে সাথেই সোজা হয়ে বসলেন।
এই খবরটি তার জানা। শুধু তার নয়, প্রায় সব পুলিশ অফিসারই এইটা জানে। উপরওয়ালাদের তেরটা বেজে গেছে এই ঘটনার পর। তিনি তার পানের কেস বের করে একটা পান নিলেন। অমনি সোবহান মিয়া পান চেয়ে বসলেন।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর মকবুল সাহেব একটি পান দিলেন। তিনি তাদের দিয়ে জিডি করালেন এবং পাসপোর্টসহ সব নিলেন। পিয়নকে বললেন অদের জন্য নাস্তা আনতে আর সোবহান মিয়াকে বললেন তার মোবাইল থেকে ওদের কল করতে। সোবহান মিয়া এবার বেশ ঘাঁবড়ে গেল।
ঠিক তখনই সাবিনা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
সোবহান মিয়ার ঝামেলা একদম ভালো লাগে না। তবু কেন জানি সবসময় ঝামেলা তাকেই এসে জাপটে ধরে। ছোট থেকেই ডানপিটে। একটু বড় হওয়ার সাথে সাথেই বুঝতে পারল অভাব-অনটন তার চেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে। বাংলাদেশের মানুষগুলো যেমন বেশি বেশি সন্তান পয়দা করে এদেশের অভাব অনটনগুলোরও যেন উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মক।
বছর কয়েক আগেও সে ছিল পকেটমার। প্রচন্ড নেশাও করত। কত মার খেয়েছে। একবার তো মার খেয়ে পড়ে থাকতে দেখে কুকুর এসে ঘেউ ঘেউ শুরু করল। পরে এক টং দোকানদার বাঁচিয়েছিল।
একটূ সুস্থ হওয়ার পর সেও পাছায় দুটো লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন সে ওসব ছেড়ে এসেছে। তার ঘরে তার স্ত্রী পোয়াতি। এই কেসটাতে দু চার পয়সা কামানো গেলে তার জন্য খুব লাভ হত। ডাক্তার বলেছে মা ও শিশুর জন্য এখন ভালো ভালো খাবার প্রয়োজনীয়।
কিন্তু সাবিনার একগুঁয়েমি সব নস্যাৎ করে দিয়েছে। তবে মকবুল সাহেবের চেহারা দেখে মনে হয়েছে ব্যাপারটা ভীষণ গুরুতর এবং সহসাই এর সমাধান করা হবে। তাছাড়া এ ঘটনা থেকে যে কোন বিপদের আশংকা থাকতে পারে এই ব্যাপারটা এখনো ভাবার সময়ই পায়নি সে। আসলেই ভীষণ বিপদ হতে পারে। দ্বিতীয় লোকটার কথা শুনে মনে হয়েছে এরা কোন মামুলি বা ছিঁচকে হাইজ্যাকার নয়।
এদিকে সাবিনা আর টুনু। এরা জানেনা, এদের কখনো সে জানতেও দেবে না এদের সে ভীষণ ভালোবাসে। এতিম হওয়ার জ্বালা সে বোঝে। এদের জীবনের পরতে পরতে যে দারিদ্র্য আর অবহেলার কটাক্ষ, তাতে একরত্তি ভালোবাসার মেঘ না থাকলে কিকরে তারা সিক্ত হবে বৃষ্টি-স্নানের সুখে!
ডাক্তার এলো আরও বড় ধরনের চমক নিয়ে। সাবিনা অন্তঃস্বত্তা।
টুনু ঠিক করে বুঝলও না প্রথমবার। বুবুর কাছে যাবে বলে বায়না ধরল। ডাক্তারনীটি ভীষণ ভালো। বলল, 'একটু পরে এসো। তোমার বুবু এখন ঘুমোচ্ছে।
' সোবহান মিয়া যেন বুঝে উঠতে পারছেনা, তার এখন কি করা উচিত!
অনেকক্ষণ বাদে সাবিনার জ্ঞান ফিরল। টুনুও জেনেছে সাবিনা এখন পোয়াতি। তার ভীষণ মজা লাগছিল। সাবিনার বাচ্চাকে সে বিয়ারিং এর চাকার গাড়িতে করে চড়াবে। না না ওইটুকুন বাচ্চাকে ওই গাড়িতে চড়ালে ও ব্যাথা পাবে।
তাহলে সে একটা ফোম কিনে আনবে। ওতে বসিয়ে তারপর চড়াবে। ভীষণ মজা লাগছিল ভিতরে ভিতরে। কিন্তু সোবহান মিয়ার চেহারা দেখে ভিতরের মজাটা বারবার ঢোঁক গিলে খেয়ে নিচ্ছিল।
সাবিনা: ডাক্তার কি বলছে?
সোবহান: তুমি এত আহাম্মক আগে বুঝি নাই।
এই লাইনে এতদিন ধইরা কাম করতাছ আর এমন একটা ভুল করলা? আমি কই কি এই সতের মাইনষে্র বাইচ্চাডারে জন্ম দিবা কেন? তুমি রাজী থাকলে আমি ডাক্তরের লগে কথা কই।
সাবিনা: এই বাইচ্চার বাপ আছে। হেয় কইছে আমারে ঘরে তুলব।
সোবহান: কে্ডা?
সাবিনা: না, এহন কমু না, আগে তার লগে কথা কমু।
তারা ফিরে এলো বাড়িতে।
এর মধ্যে ফোনের দোকানটাতে কিছু লোক খোঁজ নিয়ে গেছে। ফোনের দোকানদার তাদের চিনেনা বলে বেঁচে গেছে। ওইদিকে মকবুলসাহেব খবর পাঠিয়েছেন সোবহান মিয়াকে থানায় যেতে।
পরের দিন থানায় এলো সোবহান। যথারীতি ফোন করল সোবহান।
এবার আর শহীদের সাথে কথা হল না তার। কথার সারসংক্ষেপ হল ভাষানটেকের বস্তির পিছনে কাল রাত সাড়ে আটটায় সব জিনিস পত্রসহ তাদের দেখা করতে হবে। আসলে এই চক্রটি আন্তর্জাতিকভাবে চালিত হচ্ছে। এদের কাজ হচ্ছে পৃ্থিবীর বড় ব্যাংকগুলো থেকে টাকা হ্যাক করা। ওই মহিলার আইডি কার্ডের পেছনে একটি স্টিকার লাগান আছে।
আগে কয়েকবার একাউন্ট এর পাসওয়ার্ড চুরি হওয়াতে অর্থাৎ হ্যাক হওয়াতে সে এখন আর তার মেইল কিংবা ওয়েব ভিত্তিক কোন স্পেসের উপর ভরসা রাখতে পারে না। সে তাই পুরনো এই পদ্ধতিতে কোডটি নিয়ে ঘুরে। পুরনো তবে নতুনত্ব এইটুকুই যে কার্ডটিকে একবার দেখে বোঝা যায় না ওতে এধরনের কোন কোড আছে। এই কোডটিতে এক্সেস করতে পারলে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ইউরো আত্মসাৎ করা যেতে পারে।
প্ল্যানমত রাত সাড়ে আটটায় পৌছোল সোবহান।
কথা ছিল সে যেন এসে টর্চলাইটের আলো মারে। সে অনেকক্ষণ ধরে আলো মেরেই চলেছে, কিন্তু কেউই এলো না। এক ঘন্টা পরে মকবুল সাহেব এসে বললেন, ওরা বুঝতে পেরেছে, তাই আসেনি। আপনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যান। ওই ছেলেমেয়ে দুটোসহ কোথাও গা ঢাকা দিন।
সোবহান: কই যামু? আমার তো যাওনের আর কুনো জাগা নাই!
মকবুল: অঅ(নিরাশ ভঙ্গিতে), তাহলে এই যে ঠিকানা লিখে দিচ্ছি, আমার নাম বলবেন। ওখানে কোন ভেজাল করবেন না। বেশি কথা বলবেন না।
সোবহান চলে গেল। মকবুল সাহেব বুঝতে পারল ভীষণ ভুল হয়ে গেছে।
উনি তাড়াতাড়ি ফোন দিলেন উপরওয়ালাদের। ঘন্টা দুএকের মধ্যেই ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের লোকজন সহ পুলিশের কিছু বড় কর্মকর্তা চলে এল। ঐ নাম্বারে ফোন দিয়ে দেখল তা বন্ধ। ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের রাতভর অভিযান আর পুলিশবাহিনীর তৎপরতায় সকাল নাগাদ ধরা পড়ল শহীদসহ একজন আর পাওয়া গেল সেই মহিলাকে। বাকীরা পালিয়ে গেছে।
মহিলা এখন হাসপাতালে। এখনো জ্ঞান ফিরেনি।
পরেরদিন পত্রিকায় বড় করে ছাপা হল খবরটি। বড় করে ওই মহিলার ছবি ছাপা হয়েছে। টুনু ভীষণ আনন্দিত।
তার কিছু বাদেই পত্রিকা অফিসের লোকজন ওই বাড়িতে হামলে পড়ল। টুনু আর সাবিনার ছবি তোলার জন্য। সোবহান মিয়াও এসেছে তাদের সাথে দেখা করতে। পত্রিকায় এবার ছাপা হবে তাদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। কোন এক সাংবাদিক বলে উঠল ওই মহিলা নাকি টুনুকে দেখতে চেয়েছে।
তারা বাড়ি ফিরে এল। পরদিন টুনুকে সাজিয়ে দিল সাবিনা। সোবহান মিয়ার সাথে যেতে বলল। সোবহান তাকেও নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সাবিনা বলল তার কাজ আছে।
তার এক টা বোঝাপড়া করতে হবে। ওরা তিনজনই বেরুল ঘর থেকে। দুজন একদিকে আর সাবিনা অন্যদিকে।
এতদিন সাবিনাকে কেউ ঘাটাত না। এখন তার বাচ্চা হবে শুনে সবাই যার যার ইচ্ছামতন কথা বলতে শুরু করল।
তখন তার ইচ্ছে হচ্ছিল মরে যায়। তীব্র নিন্দার ভারে অলংকৃত হয়ে একটু আশ্রয়ের খোঁজে সে ছুটে চলল রঞ্জু হাওলাদারের ঘরের দিকে। সেখানে গিয়ে তার দেখা হল রঞ্জুর সাত বছরের বাচ্চার সাথে।
সাবিনা: ওই তোর বাপে কই?
পিচ্চি: বাপে তো সিলেট গেছে মাজারে। প্রত্যেক বছর যায়।
কয়েকমাস থাকে। আওনের সোম আমার লাইগ্যা বহুত কিছু আনে।
সাবিনার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। তার এতদিনের স্বপ্নগুলো শুকনো পাতার মত পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মচমচ করে উঠছে। সে আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না।
মাথাটা ভনভন করছে...
টুনুরা পৌছুলো বিশাল এক বাড়িতে। এ ধরনের বাড়ি আগে টুনু দেখেছে কিন্তু কখনো ঢুকতে পারেনি। আজ ঢুকল। ঢুকার সাথে সাথেই একটা কুকুর ছুটে এল। তারা তো ভয়ে পালিয়ে যায়।
কিন্তু সাথে সাথেই মিসেস লুন্ডবার্গ ছুটে এলেন। তিনি এখন কিছুটা সুস্থ। একটু পরেই কুকুরটার সাথে ভাব হয়ে গেল টুনুর। একটু সময়ের অতিবাহনেই টুনুও হয়ে উঠল এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের একাংশ। মহিলা এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল টুনুর দিকে।
তিনি নিঃসন্তান। কখনো সন্তান নেয়ার কথা ভাবেনওনি ওভাবে। তিনি অনেক কষ্টে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় সোবহান মিয়াকে বুঝিয়ে বললেন তার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আগামি মাসে স্টকহোমে যাওয়ার সময় টুনুকে তার সাথে নিয়ে যেতে চান। আর কয়েকদিন সে এখানে থাকুক। কিছুদিন পরে এসে তিনি যেন আবার তাকে নিয়ে যায়।
আসার সময় সোবহান মিয়াকে হাজার পাঁচেক টাকা দিলেন তার বউএর জন্য কিছু কিনে নিতে। সোবহান মিয়ার যে কি ভালো লাগছিল! আজকে তার বউয়ের জন্য অনেক কিছু কিনে নেবে। তার মনে হল এই মহিলা যদি টুনুকে নিতে চায় নিক না, টুনু তো ভালোই থাকবে। সে বাড়ি ফিরে এল। কখন গেল, টুনু টেরও পেল না।
সে তার নতুন বন্ধুর সাথে খেলায় ব্যস্ত।
সাবিনা আবার হসপিটালে। লোকজন ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একজন আনিস। কাগজে সাবিনার ছবি দেখে খুশিতে ওর পিছু নিয়েছিল।
কিন্তু সাবিনা এত জোরে হাঁটছিল যে সে পুরো শব্দ মুখে আনতে আনতেই সাবিনা চলে যাচ্ছিল। চোখ খুলেই সাবিনা আনিসকে দেখতে পেল। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল সাবিনা। ওর কান্না দেখে আনিস ও কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে সাবিনা দেখল আনিস আবার সেই প্যান্টটা পরেছে।
আবার হেসে দিল।
কিছুক্ষণ পরেই এল সোবহান। সবিস্তারে বলল টুনুর বর্তমান সব ঘটনা। তার পাঁচ হাজার টাকার কথাও বল্ল। সাবিনা তাকে জানাল, সে গ্রামে চলে যাবে।
সোবহান মিয়া জিজ্ঞেস করল, কিন্তু তোমার তো কেউ নাই গেরামে। যে কথা কখনো বলেনি, সে কথা আজই বলল, তার মা বাবা আছে। ভাইও আছে দুইটা। সে সবসময় তাদের জন্য টাকা পাঠাত। তাকে বিয়ে দেয়া হয় তার গ্রামের এক ছেলের সাথে।
সেই ছেলে বিয়ে করে এনে তাকে বেঁচে দেয় এক দালালের কাছে। সেখান থেকেই... সে কখনো একথা বলেনি যদি তাতে তার কাজ পেতে অসুবিধা হয়! সে আবার গ্রামে ফিরে যাবে,একটা ছোট্ট ঘর বানাবে, একটা গরু কিনবে। এগুলো বলতে বলতে দেখল আনিস তার বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাবিনা করুণ স্বরে আনিসকে জিজ্ঞেস করল, যাইবা আমার লগে? পূর্ণিমা রাইতে তোমার বাঁশি হুনুম!
আনিস মৃদু হাসল। তার চোখের তারারা এখন আরো সুন্দর হয়ে জ্বলছে অনেক স্বপ্ন সাঝের প্রতীক্ষায়।
টুনুও ফিরে এসেছে মিসেস লুন্ডবার্গের বাড়ি থেকে। বুবুকে ছাড়া সে থাকতে পারবে না। তারা তিনজন ছুটে চলে গ্রামের দিকে, নাড়ীর টানে, নগ্ন শহরের পঙ্কিলতাকে পেছনে ফেলে, সম্পূর্ণ নতুন জীবনের আশায়, নতুন কিছু স্বপ্ন নিয়ে...
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।