আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বৈশ্বিক মন্দা: শেষমেষ বোকাসোকা ব্লন্ডদের হাত ধরে পার পাবে?

যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে, ঘড়ির ভিতর লুকাইছে

সারাহ প্যালিনের আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিযোগিতায় নামার প্রেক্ষিতে ইদানিংকার টিভিগুলোর একটা টেন্ডেন্সী তৈরী হয়ে গেছে, যেখানে টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রাস্তায় রাস্তায় সুন্দরী মেয়েদের ধরে ধরে "আমেরিকার ২৭ তম প্রেসিডেন্ট কে" অথবা "অলিম্পিকের দ্রুততম মানব কে" টাইপের প্রশ্নের উত্তরে "আরনল্ড শোয়ার্জনেইগার" বা "স্পাইডারম্যান" টাইপের উত্তরগুলো বের করে এনে একই সাথে অদ্ভুত ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল রেসিজমে লিপ্ত হয় এবং "সবজান্তা" গোছের দাঁত কেলানো হাসির প্রদর্শনী শুরু করে! পশ্চিমে সুন্দরী ও বোকা মেয়েদের অনেকটা জেনারেলাইজ করে ফেলা হয়েছে "ব্লন্ড" শব্দটির মাধ্যমে, সেও অনেকদিন। ব্লন্ডদের সৌন্দর্য্যের প্রতি ঈর্ষাজনিত কারণে নাকি আসলেই ব্লন্ডনেস তথা সাদা/সোনালী চুল তরুণীদের মস্তিষ্ককোষের ক্রিয়াকলাপের ঘাটতির কারণ হবার জন্য সুন্দরী তরুণীদের দের এই ইমেজ দাঁড়িয়েছে, সেটা হয়তো গবেষণার দাবী রাখে; তবে গবেষণার ফলফল যাই হোক, বুদ্ধিহীনতার যে শক্ত ইমেজ এদের দাঁড়িয়ে গেছে পৃথিবী জুড়ে, বিশেষ করে মিডিয়া জুড়ে -- তাতে যে কোন গবেষককেই তার গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রতিষ্ঠিত করতে বেশ ভালো বেগ পেতে হতে পারে। সারাহ প্যালিন সৃষ্ট টেন্ডেন্সী আর ব্লন্ডদের প্রতি পশ্চিমা উপহাসের ভৌগলিক ও নৃতাত্বিক বিবর্তনের হাত ধরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সুন্দরীরাও কিন্তু রেহাই পাচ্ছেনা। বিশেষ করে টিন-এজ সুন্দরীরা। জাপানেও দেখা যায় প্রায়ই টিভিতে এরকম মেয়েদের উপর চড়াও হয় টিভি ক্যামেরা, যেসব প্রশ্নের সাথে তার জীবনের লাভ-ক্ষতির বা সুখ-দুঃখের কোনরকম সম্পর্ক নেই, যেমন, "জাপানের বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী কে" অথবা "তাজমহল কোথায় অবস্থিত" টাইপের প্রশ্নট্রশ্ন করে অযথা বেকায়দায় ফেলে বেচারীকে।

এই মেয়েদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম না হলেও, স্বীয় বুদ্ধি বা জ্ঞানের ব্যাপারে প্রেস্টিজজ্ঞান নিশ্চিতভাবেই কম। তাই দেখা যায় মেয়েটিও টিভি উপস্থাপকের সবজান্তা ভাবে ভড়কে গিয়ে অথবা "হি হি হি হি" হাসিতে গদগদ হয়ে খাদ্যমন্ত্রীর নামের জায়গায় কোন এক তারকা খাদকের নাম বলে ফেলে, আর টিভি উপস্থাপক বত্রিশ দাঁত প্রসারিত করে বিজয়ীর হাসি হাসে; সাথে সাথে টিভির সামনে বসা দর্শকদের আমরাও। আমাদের দেশে তরুণীদের এই বোকা করে দেখানোর টেন্ডেন্সী এক্সপ্লিসিটলি কতটা শুরু হয়েছে জানিনা, তবে এখনকার সিনেমা নাটকে যেভাবে এদের উপস্থাপন করা হয়, তাতে "ইটিং, শিটিং, স্লিপিং, শপিং, ডেটিং" ছাড়া যে এদের কোন কাজ নেই -- এমন একটা মনোভাব কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাচ্ছে। মোটামুটি "গুড ফর নাথিং" হিসেবে উপস্থাপিত সমাজের এই তরুণী শ্রেণীটির তারপরও যে একটা তাৎপর্য সমাজে আছে তার মূল কারণটা অর্থনৈতিক। অনেক আগে একটা ব্যতিক্রমধর্মী চেইন মেইলে পড়েছিলাম কেন মেয়েদের পর্দাপ্রথাকে মিডিয়া অপছন্দ করছে, যেখানে মেইলের উদ্ভাবক হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে বোরখার ব্যবহার কিভাবে পোশাক আর কসমেটিক্স মার্কেটের সংকোচণ ঘটিয়ে লোকজনের ব্যংকব্যালান্স ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলতে পারে।

যদিও মিডিয়ার পর্দাপ্রথার বিরোধিতার কারণটা ভিন্ন, তারপরও এই মেইলপাঠ আমার মাঝে অন্ততঃ এ বিশ্বাসটা দাঁড় করেছিলো যে পোশাক আর কসমেটিক্স শিল্পে কনস্যুমার হিসেবে নারীরা, বিশেষ করে ফ্যাশন-সচেতন তরুণীরা, যে কত বড় একটা জায়গা দখল করে রেখেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। উপরোক্ত পোটেনশিয়াল কাস্টমার ক্লাসেরই কন্টিনিউয়েশনে বর্তমান মন্দার যুগে যেন ত্রাতার ভূমিকায় নেমে এসেছেন এই তরুণীদের দল। বিশ্বজোড়া কর্পোরেটওয়ালাদের নজর(লিটেরাল অর্থে না ) এখন মূলতঃ এদের দিকে। শুধু পোশাক আর কসমেটিক্সই নয়, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে খাবার দাবার, ঘরোয়া জিনিসপত্র -- সবকিছুতেই এই তরুণী ক্রেতাশ্রেনীকে ঘিরে মূল পরিকল্পনাগুলো চলছে কর্পোরেটজগতে। কিভাবে এদের পছন্দনীয় প্রডাক্ট মার্কেটে দ্রুত ছাড়া যায় তা নিয়েই এখন সব মাথাব্যথা।

অবশ্য কারণও আছে; একইসাথে এই ক্রেতাশ্রেনী যেমন অর্থনীতির চাকাকে সবল রাখতে সক্ষম তেমনি ক্যাশ বা নগদ অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করার চাবিটিও নাকি এদের হাতেই আছে! কিভাবে? মূলত দুটি কারণে। প্রথমতঃ, টিন এজ আর বিশের দশকের তরুণীরা ভবিষ্যত নিয়ে তেমন চিন্তিত হয়না, যেজন্য এদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যেস কম। বর্তমান মন্দার একটা মূল কারণ মানুষের সঞ্চয়-বাতিক, যেখানে "আসছে দিন আরো খারাপ হতে পারে" ভেবে লোকজন একেবারেই প্রয়োজনীয় জিনিসটা ছাড়া আর কিছু কিনছেনা! এখানেই পার্থক্য তরুণীদের সাথে বাকী সবার। তাদের আকাঙ্খার জিনিসটা নাকি হাতে টাকা থাকলে তারা কিনেই ছাড়েন। বুদ্ধির অভাবেই হোক বা আর্থসামাজিক বাস্তবতার পাঠ থেকে অতিরিক্ত বুদ্ধিমান হবার কারণেই হোক, ভবিষ্যত নিয়ে অত সাত-পাঁচ তাঁরা ভাবেননা।

সেই সুবাদে কর্পোরেটওয়ালারা এখন কোন ধরনের প্রডাক্ট ছাড়লে তরুণীরা অনিবার্য আকাঙ্খা অনুভব করবেন তার পরিকল্পনায় এবং নির্ধারণে ব্যস্ত । যেমন, কম্পিউটারের জগতে রিসেন্ট বুম হচ্ছে বলতে গেলে একদম খামের সাইজের নোটবুক কম্পিউটার, কমদামের, মূলতঃ ডকুমেন্ট লেখা, মুভিটুভি দেখা আর ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। আর কি লাগে? চৌদ্দরকম রঙের বাহারী প্রডাক্ট, ধুমসে নারী ক্রেতাদের টানছে। এরমধ্যে সনির ভাইও বের করেছে এমন এক নোটবুক, যেটা জিন্সপ্যান্টের ব্যাকপকেটে ঢুকিয়ে হাঁটা যায়, একেবারে ডিজিটাল ক্যাটওয়াক যাকে বলে! দ্বিতীয় যে কারনে তরুণীরা আজ ভিআইপি শ্রেনীর ক্রেতা তা হলো চলমান লিকুইডিটি ক্রাইসিস। চলমান মন্দার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লাভজনক কোম্পানীগুলোর কলাপ্স।

অর্থাৎ, গত অর্থবছরের হিসাব-নিকাশ শেষে দেখা গেছে যে এই আক্রার বাজারেও কোম্পানী ঠিকই লাভের মুখ দেখেছে, অথচ কোম্পানীকে টিকিয়ে রাখা যাচ্ছেনা -- এমন ঘটনা। এর মূল কারণ নগদ টাকার অভাব বা ক্যাশ ক্রাইসিস। অর্থাৎ, কোম্পানীর যথেষ্ট আয় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ টাকাই ক্রেডিট কার্ড বা অন্যান্য লোনে আটকে আছে, দু'চারমাসেও হাতে আসার কোন সম্ভাবনা নেই; এদিকে ব্যাংকও লোন দিচ্ছেনা, লাভ হবার পরও হাতে তেমন কোন ক্যাশ না থাকায় কোম্পানী রানিং কস্ট সামলাতে পারছেনা। অতএব দাও কোম্পানী বন্ধ করে! এহেন পরিস্থিতিতেও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এই মহান তরুণী ক্রেতারা। কিভাবে? কারণ, এদের অধিকাংশেরই হয় ক্রেডিট কার্ড নেই অথবা ক্রেডিট কার্ডের প্রতি এক ধরনের ভীতি বা অনিশ্চয়তার কারণে ওটা ব্যবহারে অনীহা এদের আছে।

আর এই যুগে ক্যাশ দিয়ে প্রডাক্ট কেনা ক্রেতার চেয়ে বড় ত্রাতাই বা কে বলুন? ভাবলাম, একেই কি তবে লীলাখেলা বলে? কাল পর্যন্ত যারা ছিলো "গুড ফর নাথিং", "ডেপথলেস ডাম্ব ব্লন্ডি" নামের হাসির উপাদান, আজ তারাই সবচেয়ে বড় ত্রাতা! অন্যসময় হলে আবার লোকজনের মাঝে নিজের চিন্তার ডেপথ নিয়ে বা ঘরের মানউষের কাছে কৃতকর্মের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি এই সুযোগেই রবিবাবুর মতো "নহ-মাতা/কন্যা/প্রেয়সী জাতীয় আচ্ছাদন" ব্যবহার না করেই জগতের সকল ঊর্বশীদের প্রণাম জানিয়ে রাখি।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.