আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মানুষ_ এক অমীমাংসিত সমাধান ( কৈশোরের গল্প)

আত্মবিশ্বাসহীনতায় প্রকট হচ্ছে আত্মার দেউলিয়াত্ব, তবুও বিশ্বাস আগের মতই নিশ্চল..

এই গল্পটি লিখেছিলাম এস,এস,সি পরীক্ষার ১০-১৫দিন পরে একটি চিঠির জবাবে। এবং এই লেখাটি ১৩কাপ চা এর শর্তসাপেক্ষে উৎসর্গ করছি আমার খুবই পছন্দের একজন মানুষ, ব্লগার "আকাশনীল" ভাইকে!!! স্বর্গে তখন পালা বদলের হাওয়া বইছে। কোন কাজ না থাকায় নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত আলোচনা করছে কযেকজন, আর এদের থেকে কিছুটা দূরে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছেন এক তত্ত্বজ্ঞানী দেবদূত। হঠাৎ করেই সে "মানুষ" নামে পৃথিবীতে একপ্রকার প্রাণীর সন্ধান পেয়েছে যারা সবার থেকে আলাদা, এমনকি দেবদূত থেকেও মর্যাদাসম্পণ্ন। কিন্তু কেন মানুষ স্বতন্ত্র- এ ভাবনাটি তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, অথচ সময়ের পর সময় চলে গেলেও তার কোন সমাধান মিলছেনা।

দেবদূতের ধ্যানভঙ্গ হল। মানুষের মানবিক সত্তাকে উপলব্ধি করতে সে বেরিয়ে পড়ল পৃথিবীর উদ্দেশ্য। । খুব ভোরে সন্তর্পণে পৃথিবীতে নেমে এল দেবদূত। একটু একটু করে আলোকিত হচ্ছে পৃথিবী, আপনমনে হেটেই চলেছে দেবদূত।

অদূরেই একটি সুরম্য দালান থেকে চিৎকার-চেচামিচির শব্দ শুনে সেদিকে এগিয়ে গেল দেবদূত। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হচ্ছে, দুজনই ভয়ানক উত্তেজিত_ যে কোন মুহূর্তে ভয়ানক একটা কিছু ঘটে যাবে বোহয়। এদের এত সম্পদ, তবু ঝগড়া করছে কেন বুঝতে না পেরে দেবদূত নতুনপথ খুজে নিল। একবাড়িতে প্রচণ্ড ভীড়। মানুষ বুক চাপড়ে কান্না করছে।

এ বড়ির গৃহকর্ত্রী আজ দেহত্যাগ করেছে। আরও একটু কাছে গিয়ে দেখা গেল এক যুবক মূর্ছিতপ্রায়_ সে মৃত মহিলার সন্তান। তার সুশ্রূষায় অনেকেই ব্যতিব্যস্ত। দেবদূতের মনে হল ছেলেটিকেহয়ত আর বাঁচানো যাবেনা। শোক মানুষকে এতটাই ভারক্রান্ত করে!তবে কি দুঃখবোধই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব? অনেক দিন কেটে গেছে, পৃথিবীকে ভাল লাগছে; মানুষকেও মন্দ নয়।

এখন পর্যন্ত মানুষ সম্পর্কে যথেষ্ট ইতিবাচক ধারণাই পাওয়া গেছে। প্রতিদিনের মত আজও দেবদূত ভ্রমণে বের হল, তখন প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পর তার খেয়াল হল কয়েকজন যুবক একজন মধ্যবয়সী লোককে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের হাতে ধরা অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি, তাদের পেছন পেছন হেটে চলেছে যমদূত। নিশ্চয়ই এদের কারো মৃত্যু হবে, নয়তো যমদূত এখানে থাকবে কেন! দেবদূত কাছে গিয়ে তাদের মধ্যকার আলোচনা শুনতে লাগল। লোক: তোমরা কারা?আমাকে এভাবে ধরে এনেছো কেন? তোমাদের সঙ্গে তো আমার কোন শত্রুতা নেই।

জনৈক যুবক: এত কতা বুজিনা, ট্যাকা পাইছি। এহন তুই কব্বরে যাইয়া জিরা। লোকটি ঢলে পড়ল। যমদূত আস্ত আস্তে লোকটির ভেতরে প্রবেশ করছে। ছিঃ, এই তাহলে মানুষ, সামান্য টাকার জন্য নিজেকে খুন করতেও দ্বিধা করেনা_ মানুষই সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীব! দেবদূত স্বর্গে ফিরে যাওয়া মনস্থির করল।

ফেরার পথে আবার সেই মরা বাড়িটির দিকে নজর পড়ল তার: পুরো বাড়িটিকেই সাজানো হয়েছে আজ, আজও মানুষের ভীড়, তবে কোন দুঃখ নেই_ সবার চোখে-মুখেই উচ্ছ্বাসের দীপ্তি। আজও সেই ছেলেটিই মধ্যমণি_ আজ তার বিয়ে হচ্ছে, অথচ সেদিনতো তার বেঁচে থাকা নিয়েই সন্দেহ হচ্ছিল। দেবদূতের বিস্ময় দ্বিগুণ হল সেই ঝগড়া করা দম্পতিকে অনুষ্ঠানে দেখতে পেয়ে_বরের সঙ্গে তারা হাসিমুখে কথা বলছে, স্ত্রী-টির কোলে একটি ফুটফুটে শিশু! এত দ্রুত কিভাবে সবকিছু বদলে যায়?মানুষের জীবনের প্রতিটি দিনই তাহলে নতুন, অনভূতিও নিয়ত পরিবর্তনশীল, সময় আর চলমান বাস্তবতা মানুষকে স্মৃতি নিয়ে বসে থাকতে বাধা দেয়!_ এইসব নানামূখী প্রশ্ন নিয়ে স্বর্গে ফিরে এল দেবদূত। কিন্তু অস্থিরতা বেড়েই চলেছে নিজের মধ্যে, বিশেষত সেই দেখে আসা ঘটনাগুলো বারবার ঘিরে ধরছে নিজের ভাবুক অস্তিত্বকে। তাই বাধ্য হয়েই তাকে আবার পৃথিবীর কাছাকাছি আসতে হল।

খুবই ঘনিষ্ঠভাবে বসে আছে দুজন তরুণ-তরুণী_ কথা বলছে অনবরত, হাসছে-, আবার থেমে যাচ্ছে। ওদের আন্তরিকতা আর একাত্মতায় দেবদূত মুগ্ধ হল, দিব্যদৃষ্টিতে ওদের ভবিষ্যৎ দেখতে চাইল_ এ কি! ছেলেটা চাকরির অভাবে বেকার ঘুরছে। আর মেয়েটা?- বিলাসবহুল বাড়িতে বসে মেয়ের সাথে লুডু খেলছে, আর দিনশেষে হাসিমুখে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু দেবদূতের মনে হল মেয়েটি কেন যেন ভাল নেই; তার দৃষ্টিতে কোন প্রত্যাশা নেই,বরং চোখের কোণে ছড়িয়ে আছে শূন্যতার হাহাকার, হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু একটা হারানোর অপরাধবোধ। মানুষ তাহলে নিজের সাথেও ছলনা করে, নিজেকেও এড়িয়ে চলতে চায় ! এতটা সময় ছেলে-মেয়ে দুটি একসাথে বসে আছে, অথচ কী অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা ওদের জীবন।

দেবদূত ক্ষণিকের জন্য আনমনা হল। স্বাভাবিক হতেই দেখল রাস্স্তায় শুয়ে থাকা দুটি শিশু একটি রুটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করছে, আর অদূরেই একটি বাড়িতে ঐ বয়সী একটি শিশুর সামনে সবরকম খাবার সাজানো, কিন্তু সে কিছুই মুখে তুলছেনা! এ আবার কেমন খেয়াল মানুষের_ যার প্রয়োজন সে পায়না, আর যে চায়না তার সবকিছু আছে!একটু পর বৃষ্টি নামল, সেই দুই শিশু বিবাদভুলে মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজছে, খেলা করছে_ দুঃখ সব উধাও। মানুষ এত অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়? দু'ফোটা বৃষ্টিই গড়ে দিতে পারে সেতুবন্ধন! দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে চলেছে দেবদূত। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মানুষের সংগ্রাম দেখেছে, দুর্ভিক্ষ দেখেছে, দেখা হয়েছে যুদ্ধের ভয়াবহতাও_ বাতাসে বারুদের গন্ধ, শত শত লাশ পড়ে রয়েছে যত্রতত্র, আর যমদূত তার সহকারীদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। আচ্ছা যুদ্ধ যেমন মানুষ করছে, জীবনের ঝুকি নিয়ে এই মানুষই তো আহতের সেবা করছে।

একই মানুষের মধ্যে হিংস্রতা-সভ্যতা কিভাবে থাকে! এতসব নানামূখী ঘটনায় দেবদূত মানুষের একক কোন বৈশিষ্ট্য খুজে পেতে ব্যর্থ হল। বৈপরীত্য আর জটিলতার ধোঁয়াশা যেন কাটছেইনা। মানুষের সম্বন্ধে জানতে হলে মানূষের কাছ থেকেই জানতে হবে, দেবদূত এবার মানুষ খোজায় মন দিল। পরম নিশ্চিন্তে পার্কে ঘুমিয়ে আছে একজন মানুষ। দেবদূত একেই কাঙ্ক্ষিত মানুষ ভেবে সরাসরি তার স্বপ্নে পৌছে গেল।

শুরু হল মানুষ-দেবদূতের কথোপকোথন: দেবদূত: মানুষ, তোমার শ্রেষ্ঠত্ব কিসে? মানুষ: আমার বৈচিত্রে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায়। যে মানুষ খুন করে, অপরাধ করে- সেই একই মানুষ ভালোবেসে পরকে আপন করে, কোন যুক্তি-তর্ক ছাড়াই ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে, জীবন চরম অনিশ্চয়তার জেনেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তোমার জীবন একঘেয়ে_ সৃষ্টিলগ্ন থেকে সেই একই কাজ করে যাচ্ছো, খারাপ করার ক্ষমতা না থাকায় ভাল কাজই তোমার নিয়তি। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের প্রলোভন জয়ের সংগ্রাম করতে হয়। এখন তুমি-ই বল মানুষের বিশেষত্ব কোথায়! দেবদূত অভিভূত হল।

লোকটির প্রতিটি কথাই যুক্তিসঙ্গত। হঠাৎ নিজের দেবদূত পরিচয়কে ভীষণ মনে হতে লাগল তার, নিজেকে কেবলই মানুষ ভাবতে ইচ্ছা হল। একসময় ব্যাকুল হয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বসে পড়ল_ "হে ঈশ্বর, মাত্র একমুহূর্তের জন্য হলেও আমায় মানুষ করে দাও। আমি ধন্য হতে চাই। " ঈশ্বর তৎক্ষণাৎ তার প্রার্থনা কবুল করলেন, কিন্তু প্রাণটি কেড়ে নিলেন।

অর্থাৎ দেবদূত "মৃতমানুষ"হয়ে পার্কে পড়ে রইল। তাই মানুষসম্ব্ধে দেবদূতের উপলব্ধি অমীমাংসিতই রয়ে গেল। আসলে ঈশ্বর নিজেই চাননা মানবরহস্য কখনো উন্মোচিত হোক। মানুষ এমনই চিরন্তন প্রাকৃতিক বিরোধের এক অমীমাংসিত সমাধান। ।

। । .....

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.