প্রবাসে বাংলা বই ও ই-প্রকাশনা
ফকির ইলিয়াস
-------------------------------------
আর ক'দিন পরই ঢাকায় শুরু হচ্ছে একুশে বইমেলা ২০০৮ । বাংলাদেশের একুশের বইমেলা মাসব্যাপী আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে একটি নিজস্বতা তৈরি করে নিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলা হয়। তবে মাসব্যাপী নয়। তিন/চারদিন।
কখনো এক সপ্তাহ। আর পাশ্চাত্যে এখন বইক্রেতারা অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন ইন্টারনেটের ওপর। ‘বার্নস এন্ড নবলস’ কিংবা ‘আমাজন ডটকমে’ অর্ডার দিয়ে ঘরে বসে প্রিয় বইটি পেতেই বেশি আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের পাঠকরা। বই প্রকাশনার ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট একটা বড়ো ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। অনেকগুলো ই-ম্যাগাজিন উদ্যোগী হয়ে বের করছে ই-বুক।
আজ থেকে কয়েক বছর আগে পশ্চিম বাংলা এবং ইউরোপ-আমেরিকা-কানাডার জয়েন্ট ভেঞ্চারে পরিচালিত একটি কবিতার ওয়েবসাইট http://www.kobita.ws/fe যখন আমাকে, আমার একটি কবিতার বই বের করার আহ্বান জানায়, তখন আমি আশ্চার্যান্বিত না হয়ে পারিনি। পরে তারা যখন আমার বইটি আপলোড করলেন তখন মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে প্রাণে। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তির সঙ্গে চমৎকার চিত্রশিল্পের সমন্বয় করেছেন ডিজাইনাররা। ভাষা, কবিতা এবং শিল্পের প্রতি এই যে দরদ, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একটি প্রজন্মের, একটি মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টিশীলতা এমনটিই হওয়া উচিত।
কিন্তু আমরা পারছি না অনেক কিছুই। কিংবা আমাদেরকে পারতে দেওয়া হচ্ছে না। গোটা সভ্যতার অগ্রযাত্রাকেই যেন থামিয়ে দেওয়ার সর্বাতক প্রচেষ্টা! বিশ্বব্যাপী দেশে-দেশে। আজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বরাদ্দের চেয়ে, অস্ত্রের প্রতি বরাদ্দ বেশি। অস্ত্র জীবন হনন করে।
আর সংস্কৃতি গড়ে তোলে চিত্তের বিশালতা। তারপরও কেন এই হনন পর্ব? কেন রক্তের হোলিখেলা?
বাংলাদেশের একুশের বইমেলা স্বচক্ষে আমার দেখা হয়নি দীর্ঘদিন। তারপরও প্রতিদিনের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রতিদিনের বইমেলার রিপোর্ট পড়ে আমিও যেন মিশে যাই বইমেলার লাইন দেওয়া জনতার সঙ্গে। প্রতিদিনের বই প্রকাশের তালিকা পড়ে পড়ে আমিও যেন পাল্টে দেখি নতুন বইগুলোর প্রচ্ছদ। বইমেলার প্রাত্যহিক তালিকা দেখে আমার প্রিয় এবং প্রয়োজনীয় বইগুলোর একটি তালিকা আমি করে রাখি প্রতি বছরই।
এবং সময় সুযোগ মতো বইগুলো সংগ্রহও করি। নিউইর্য়কে কটি বই বিতান গড়ে উঠেছে জ্যাকসন হাইটস এলাকায়। মুক্তধারা, অবসর, অবকাশ, অনন্যা এই চারটিই অন্যতম। বাংলাদেশী টাকায় একশত টাকার বইটির মূল্য এখানে নেওয়া হয় পাঁচ ডলার। অর্থাৎ বিশ টাকার সমানে এক ডলার।
অথচ এক ডলারের ব্যাংকিং মুদ্রামূল্য প্রায় সত্তর টাকা। যারা বইগুলো বিক্রির জন্য আনেন, তাদের বক্তব্য হচ্ছে আনাতে ওজন খরচ দিতে হয় খুব চড়া। প্রবাসীরা নানা দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নিউইয়র্ক পর্যìত আনার ব্যবস্খা করেছিলেন। বিমান আসার পরও কিন্তু বই আমদানিকারকরা বইয়ের মূল্য কমাননি। এখন বিমান বন্ধ হয়ে গেছে।
আমদানিকারকরা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, এমিরেটস, ইতিহাদ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, থাই এয়ারওয়েজে তাদের মালামালগুলো আনছেন। বইয়ের মূল্য বিমান যখন আসতো তখন যেমন ছিল, এখনো তেমনি আছে। তাহলে লাভবান কারা হচ্ছেন? পাঠকরা না বিক্রেতারা? পাঠকতো পড়তে চান। বই বিক্রিতে মুনাফা একটু কম করলে হয় না? বইয়ের সঙ্গে অন্যান্য মালপত্তর তো ব্যবসায়ীরা আনছেন। এ কথা কে কাকে বুঝাবে?
দুই.
বলছিলাম ই-বুকের কথা।
ই-বুকের একটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে ইন্টারনেট এক্সেস থাকলে বইটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বসে পড়তে পারেন পাঠক-পাঠিকা। এক সঙ্গে হাজারো পাঠক-পাঠিকা পড়তে পারেন। ই-বুক প্রকাশনায় ভারতের, বিভিন্ন শিক্ষালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। যেসব বাঙালি তরুণ এই প্রসার কাজে এগিয়ে এসেছেন, তাদের একজন মেধাবী তরুণ কবি রোহন কুদ্দুস। রোহন পরিবর্তনে বিশ্বাসী এক উদ্যমী কর্মবীর।
তার উদ্যোগে এই ফেব্রচ্ছারি মাসে আমার আরেকটি ই-বুক প্রকাশ করেছে রোহন কুদ্দুসের ই-ম্যাগাজিন ‘সৃষ্টি ডটকম’। এর আগে আরো কজন, দুই বাংলার কবিতার বইও করেছে এই (http://www.sristi.co.in) ই-ম্যাগাজিনটি। কবিতার প্রতি একজন ই-ম্যাগ সম্পাদকের এই যে মমত্ববোধ, তাই আজকের বিবর্তনের একটি অন্যতম ধাপ। অধ্যয়নই তো মানুষের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়। মানুষকে আলোকিত করে।
বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায় এই যে আলোর প্রজ্বলন ঘটানোর সংগ্রাম তা অনেকেই করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। এদের অন্যতম একজন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্ণধার অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। এই মহান, চিরতরুণ মানুষটি এখনো বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাননি। না, এখনো পাননি তিনি। যদিও তার নাম আলোচিত হয়েছিল বার বার।
এটা শুধু আমি নয়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কোটি বোদ্ধা পাঠক-পাঠিকা মনে করেন বাংলা একাডেমী যদি কৃতীপরুষ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে পুরস্কারটি দেয়, তবে বাংলা একাডেমীই ধন্য হবে। কারণ অধ্যাপক সায়ীদ এই দেশ ও জাতির মননে সৃষ্টির চেতনা জাগানোর যে অক্লাìত শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে তার চাওয়া পাওয়া কিছুই নেই।
অথচ আমরা দেখেছি রাজনৈতিক তোষামোদকারী অনেক ব্যক্তিই এই পুরস্কারটি হাতিয়ে নিয়েছেন। একটি সুসভ্য দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির বলয়কে রাজনীতি, রাজনৈতিক মতবাদ প্রভাবিত করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিল ক্লিনটন যেমন লেখক, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পোয়েট লরিয়েট বিলি কলিনসও তেমনি একজন লেখক।
এ ক্ষেত্রে দুজনের আসনই সমান। এখানের বিচারকরাও ‘ডেমোক্রেট’ কিংবা ‘রিপাবলিকান’ বলয়ের তাঁবু টাঙিয়ে বিভক্তির সেতু রচনা করেন না। অথচ বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের কোটি কোটি পাঠকের চোখে ধুলো দিয়ে প্রতারিত করা হয়েছে, হচ্ছে। এই দুর্ভাগ্য গোটা জাতির।
মননশীল এবং সৃজনশীল লেখক তৈরিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি।
কিন্তু তা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে। যারা বিচারক হবেন কিংবা যাদেরকে বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হবে তাদেরকে মনে রাখতে হবে তারা একটি জাতি, একটি সাহিত্যের বিবেক হিসেবে কাজ করছেন। সবশেষে একজন খ্যাতিমান মার্কিন কবি ডনাল্ড হালের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করি। কবি বলেন, প্রতিটি সাহিত্যে দুধরনের পাঠক থাকে। একদল বলে, আপনার অমুক লেখাটি দেখেছি।
আর অন্যদল বলেন, আপনার অমুক লেখাটি পড়েছি। কোনো সমাজে ‘দেখেছি’র সংখ্যা যদি বেড়ে যায় তবে বিপর্যয় দেখা দেয় সামাজিকভাবে। তাই সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেকোনো ভাষায়, যেকোনো সাহিত্যে ‘পড়েছি’র সংখ্যাধিক্য যেন বহাল থাকে।
২০০৭ সালের বইমেলায়ও বেশ কিছু মূল্যবান বই বেরিয়েছে আমার বিবেচনায়। আব্দুল মান্নান সৈয়দের ‘ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী’ গবেষণাগ্রন্থটি, কিংবা কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘পথে পথে পাথর’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের নান্দনিক প্রত্যয়ই ব্যক্ত করছে পুনর্বার।
পাঠককে অবারিত দ্বার খুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র প্রশাসন, প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতাদের। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়ই গড়ে উঠতে পারে বোদ্ধা পাঠক প্রজন্ম।
প্রবাস থেকে এবার যাদের বই বেরুচ্ছে, তাদের জন্য শুভকামনা।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।