আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নারী শিক্ষার প্রথম পাঠ : ফিরোজা

খুব গোলমেলে, নিজেও ভাল জানি না। তবে আছে,এই ঢের।

শেষ কথাটি থেকে শুরু করি, হ্যাঁ, প্রত্যেক অবস্থাতেই নিজেকেই শুধু ঘুরে দাঁড়াতে হবে, লড়ে যেতে হবে, হারজিতের প্রশ্ন মাথায় না রেখে, হুঁশ মান না খুইয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ে যেতে হবে ৷ এ অবশ্যই হওয়া উচিত নারী শিক্ষার প্রথম পাঠ ৷ নিজের লড়াই তো নিজেকেই লড়তে হয়, একবার চলতে শুরু করলে তখন চলার পথে অনেকেকেই এগিয়ে আসেন, ভাল মন্দ দুরকম মানুষেরই সাক্ষাত্ পাওয়া যায়, কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে হয় নিজেকেই ৷ কিন্তু , ন্যুনতম শিক্ষাটুকু ও কতজন পান? বেঁচে থাকার যুদ্ধটাই যেখানে একমাত্রś যুদ্ধ সেখানে একজন নারীর আত্মমর্যাদা ও সচেতনতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়ার অবকাশ কোথায়? ফিরোজা যে সমাজ থেকে এসেছে সেখানে জন্মের পর থেকেই একটি মেয়েকে শেখানো হয়, দু দিন পরেই তো বিয়ে হয়ে শশুরবাড়ি যাবে,কাজেই স্কুলে যাওয়ার কোন প্রয়োজনই নেই, স্বামী যা বলে,মুখ বুজে তা মেনে নেওয়ার শিক্ষাটাই দেওয়া হয় ৷ ফিরোজারা অর কিছু পারুক না পারুক, মেয়েকে এই শিক্ষাটুকু অতি অবশ্যই দিয়ে দেয় ৷ফিরোজার কথা তোমাদের আরেকটু বলি, সে যখন হাসপাতাল থেকে একটু সুস্থ হয়ে মেয়ে কোলে বাপের বাড়ি ফিরে যায়, তার কিছুদিন পরেই তার স্বামী তাকে নিতে আসে, নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়, ফিরোজা বেঁকে বসেছিল যাবে না বলে, কিন্তু তার মা ও ভাই ( যে ভাই ওখানকার স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের মাষ্টার) তাকে বোঝায়, মেয়েদের স্বামীর বাড়ি ছাড়া কি কোন গতি আছে? কি করবে ও ফিরে না গিয়ে? আরেকটা বিয়ে করবে? সেই স্বামী ও যদি এরকমই হয়? কিংবা আরো খারাপ? ফিরোজা ফিরে যায় স্বামীর কাছে, কিন্তু তখন তার স্বামী শুধু বাড়িতে বসে খায় আর ঘুমোয় কাজকর্ম কিছু করে না ৷ সংসার চালানোর তাগিদে সে লোকের বাড়ি কাজ করতে শুরু করে৷ ঐ কোপানো শরীর নিয়ে কাজ করাও তার পক্ষে খুব সম্ভব ছিলনা, বাঁ হাতে তো সে কিছু ধরতেই পারে না কাজ করবে কি করে? বছর দুই চ্ললে এভাবে,আবার মা হয় সে, ছেলের মা ৷ স্বামী আবার মারধর শুরু করে, মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে লাপাত্তা হয়ে যায় কয়েকমাসের জন্যে আর তারপরে একবার আর ফিরেই আসে না ৷ তখন ফিরোজা কলকাতায় আসে কাজের জন্যে,অন্য একটি মেয়ে তাকে আমার বাড়ি নিয়ে আসে,আমার তখন একটি মেয়ের খুব প্রয়োজন ছিল দ্বিতীয়বার মা হতে চলেছি ৷ ওর হাত আর শরীরে ওরকম আঘাতের চিহ্ন দেখে সবাই বারণ করলেন ওকে রাখতে, কিন্তু ওর কথা শুনে আমি রাখলাম, নিজের বাচ্চাদুটিকে সে তার মায়ের কাছে রেখে এসেছিল ৷ ওর মেয়ের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থাও করেছিলাম, আর ছেলের স্কুলে যাওয়ার সময় হলে তারও ৷ মেয়েটি একটু বড় হতেই তার স্কুল ছাড়িয়ে তাকেও পাঠানো হয় লোকের বাড়ি কাজ করতে, ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয় না ৷ ততদিনে ফিরোজাও চলে যায় আমার কাছ থেকে ৷ বেশ কিছু আঘাত ছিল ফিরোজার মাথায়ও, হয়ত তার জন্যেই মাঝে মাঝেই অসুস্থ থাকত ৷ সবসময় ওষুধ খেতে হত ৷ আমার বাড়ির অনেকেই ওকে পাগল বলত,কিন্তু ও পাগল ছিল না ৷ মেয়ের পড়া বন্ধ করেছে বলে মাঝে মাঝেই বকুনি দিতাম,বলত ভাবী, মেয়ে তো শশুরবাড়ি চলে যাবে,কিন্তু ছেলেকে তো করে খেতে হবে ৷ আমি বোঝানোর চেষ্টা করতাম কিন্তু ও বুঝত না ৷ আমি শুধু এক ফিরোজার কথা বললাম,এরকম হাজার হাজার ফিরোজা আছে আমাদেরই আশেপাশে ৷ শেয়ালদা থেকে ডায়মন্ড হারবারের পথে যে ট্রেনগুলো চলাচল করে ওর যে কোন একটিতে চাপলেই এই রকম বহু ফিরোজার সাক্ষাত্ পাওয়া যায় ৷ আমি শুধু একটি জায়গার কথা বললাম, গোটা দেশ পড়ে আছে গোটা পৃথিবী পড়ে আছে ৷ আজকাল অনেকরকম সংস্থা আছ যারা গ্রামে গঞ্জে কাজ করছে, অনেকে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে ও কাজ করছেন এই সব মানুষদের জন্যে, প্রচুর এনজিও আছে, হয়ত একদিন এই অন্ধকার দূর হবে, মেয়েরা তাদের অধিকার বুঝে নেবে প্রতিটি মেয়ে স্বনির্ভর হবে ৷ অনেক মানুষ আছেন যারা সত্যি অন্তর দিয়েই এদের জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন ৷কিন্তু বাস ভাড়া করে যৌনকর্মি এনে হল ভরিয়ে তাদের কয়েকজনের হাত দিয়ে প্রধান অতিথি আর অন্য সব মান্যগণ্যদের ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানানো আর অনুষ্ঠান শেষে ওদের হাতে জলখাবারের প্যাকেট দেখে মনে অনেক প্রশ্ন জাগে ৷ যেখানে প্রায় সমস্ত দর্শকই যৌনকর্মী সেই অনুষ্ঠানে প্রায় সব বক্তাই ভাষন দেন ইংরেজীতে! উদ্যোক্তারা অবশ্য ক্ষমা চেয়ে নেন ঐ ইংরেজী ভাষণের জন্য ৷ মনে প্রশ্ন জাগে বৈকি ৷ ঐ অনুষ্ঠান কাদের জন্যে ছিল, ঐ ভাষণগুলো কাদের জন্যে ছিল, যারা ওখানে এসেছিলেন, তারা কেন এসেছিলেন এই প্রহসনের আড়ালে আর কতকাল নিজেদের আখের গোছাবেন আমাদের সমাজের তথাকথিত শিক্ষিতজনেরা ৷

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.