আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

যে রেকর্ড যন্ত্রণার

সাফল্য সব ক্রিকেটারেরই চাওয়া। সাধারণ অর্থে, সেই সাফল্যের চূড়ান্ত স্বীকৃতির নামই রেকর্ড। কিন্তু সব রেকর্ডই কি পরম কাঙ্ক্ষিত? ক্রিকেটে এমন অনেক রেকর্ডই আছে, যেগুলো যন্ত্রণায় দগ্ধ করে, কখনো কখনো উপহার দেয় লজ্জাও। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস আর পরিসংখ্যান ঘেঁটে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন আরিফুল ইসলাম নব্বইয়ে নড়বড় একজনের নাম ‘আইসম্যান’, আরেকজনের ‘দ্য ওয়াল। ’ ইতিহাসের সবচেয়ে শক্ত স্নায়ুর ক্রিকেটারদের তালিকা করলে শুরুর দিকেই থকবে স্টিভ ওয়াহ ও রাহুল দ্রাবিড়ের নাম।

অথচ নব্বইয়ের নার্ভাসনেসে সবচেয়ে বেশি কাটা পড়েছেন কিনা এই দুজনই! দ্রাবিড় এখনো খেলছেন, রেকর্ডটা শুধুই নিজের হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাও পেতে হতে পারে তাঁকে। শচীন টেন্ডুলকারেরও এই ভয় আছে। গন্ডায় গন্ডায় সেঞ্চুরি করেছেন বলে এঁদের আক্ষেপ তবু কিছুটা কম থাকতে পারে। কিন্তু মাইকেল স্ল্যাটারের কথা একবার ভাবুন। নড়বড়ে নব্বইয়ের নয়টি ইনিংস যদি তিন অঙ্কে নিতে পারতেন, ৭৪ টেস্টে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারের সেঞ্চুরি হতো ২৩টি, কী দুর্দান্তই না দেখাত রেকর্ডটা! সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে নব্বই ম্যাচ (ইনিংস) রান ১০০/৫০ * রাহুল দ্রাবিড় (ভারত) ১০ ১৫২ (২৬৩) ১২২৭৫ ৩২/৬০ স্টিভ ওয়াহ (অস্ট্রেলিয়া) ১০ ১৬৮ (২৬০) ১০৯২৭ ৩২/৫০ মাইকেল স্ল্যাটার (অস্ট্রেলিয়া) ৯ ৭৪ (১৩১) ৫৩১২ ১৪/২১ আলভিন কালিচরণ (ও. ই.) ৮ ৬৬ (১০৯) ৪৩৯৯ ১২/২১ ইনজামাম-উল-হক (পাকিস্তান) ৮ ১২০ (২০০) ৮৮৩০ ২৫/৪৬ শচীন টেন্ডুলকার (ভারত) ৮ ১৭৭ (২৯০) ১৪৬৯২ ৫১/৫৯ ‘শূন্য’তে বাধা মন! ব্যাটিং বা বোলিংয়ের দুটি রেকর্ড একসঙ্গে নিজের দখলে রাখার কৃতিত্ব কজনেরই বা আছে! টেস্ট ক্যারিয়ারের যখন ইতি টানলেন, কোর্টনি ওয়ালশ এমন দুটি রেকর্ড সঙ্গে নিয়েই গেলেন।

সমস্যা হলো, বোলিংয়ের রেকর্ডটি যতটা গৌরবের, ব্যাটিংয়েরটি ততটাই বিস্মরণযোগ্য। এক ঝুলিতে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেট, আরেক ঝুলিতে সবচেয়ে বেশি শূন্য! আগাগোড়া ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত ওয়ালশ খেলা ছেড়েছেন ১০ বছর হলো। উইকেটের রেকর্ডে তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন মুরালি-ওয়ার্ন-কুম্বলেরা। কিন্তু শূন্যের রেকর্ডটি বহাল তবিয়তে টিকে আছে। অবশ্য ক্রিস মার্টিন যে গতিতে এগোচ্ছেন, রেকর্ড হাতছাড়া হওয়ার ‘স্বপ্ন’ দেখতেই পারেন ওয়ালশ! সবচেয়ে বেশি শূন্য শূন্য ম্যাচ (ইনিংস) রান সর্বোচ্চ কোর্টনি ওয়ালশ (উইন্ডিজ) ৪৩ ১৩২ (১৮৫) ৯৩৬ ৩০* গ্লেন ম্যাকগ্রা (অস্ট্রেলিয়া) ৩৫ ১২৪(১৩৮) ৬৪১ ৬১ শেন ওয়ার্ন (অস্ট্রেলিয়া) ৩৪ ১৪৫(১৯৯) ৩১৫৪ ৯৯ মুত্তিয়া মুরালিধরন (শ্রীলঙ্কা) ৩৩ ১৩৩(১৬৪) ১২৬১ ৬৭ ক্রিস মার্টিন (নিউজিল্যান্ড) ২৯ ৬১(৮৯) ১০৯ ১২* উইকেট পাওয়া কত কঠিন! দুই-দুবার আইসিসির এলিট প্যানেল থেকে বাদ পড়েছেন।

অশোকা ডি সিলভার আম্পায়ারিংয়ের মান বোঝাতে এটুকুই যথেষ্ট। ক্রিকেটার অশোকার আন্তর্জাতিক রেকর্ড এর চেয়েও খারাপ! লেগ স্পিনার ছিলেন, শ্রীলঙ্কার হয়ে দশটি টেস্ট খেলে সাকল্যে নিয়েছেন ৮ উইকেট। প্রতিটি উইকেটের জন্য গড়ে রান গুনতে হয়েছে ১২৯! তালিকার দুইয়ে থাকা এমএল জয়সীমা অবশ্য ছিলেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার। অলরাউন্ডার ছিলেন চারে থাকা ক্রিস হ্যারিসও। ‘শীর্ষ’ পাঁচের বাকি দুজনই খাঁটি স্পিনার।

একসময় ইংলিশ ক্রিকেটের লেগ স্পিন আক্ষেপ ঘোচানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা ইয়ান সলসবুরিরও ঠাঁই হয়েছে এই তালিকায়। আর কিউই সুলিভান ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার। রানআউট আউট হতে ব্যাটসম্যানদের কখনোই ভালো লাগে না। তবে মেজাজটা সবচেয়ে বেশি বিগড়ে যায় বুঝি রানআউট হলেই। সে নিজের দোষে হোক বা সঙ্গীর দোষে।

রানআউটের প্রসঙ্গ এলে সবার আগে ইনজামাম-উল-হকের ছবিটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু টেস্টে সবচেয়ে বেশিবার রানআউট হওয়াদের তালিকাতেই নেই পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়কের নাম। যাঁদের ‘রানিং বিটুইন দ্য উইকেট’ নিয়ে কখনোই প্রশ্ন ওঠেনি এই তালিকার সেরা ছয়ে তাঁদেরই নাম। রানআউটে যে ভাগ্য (আসলে দুর্ভাগ্য) একটা বড় ব্যাপার, এই তালিকা যেন তারই প্রমাণ। চশমা তিনি ব্যাট হাতে নামা মানেই গ্যালারিতে টানটান উত্তেজনা।

রানের খাতা খুললেই মেলে প্রচুর করতালি, দুই অঙ্ক ছুঁলে তো গ্যালারি উত্তাল। পেশাদারির এই যুগে আনন্দদায়ী ব্যতিক্রম ক্রিস মার্টিন। ব্যাটিংটা্ তিনি কিছুই পারেন না এবং ব্যাপারটা বেশ উপভোগও করেন! সবচেয়ে বেশি ‘চশমা’ তো তাঁরই প্রাপ্য। এক টেস্টের দুই ইনিংসেই শূন্য অর্থাৎ ‘পেয়ার’ পেয়েছেন ছয়বার। আশা করা যায়, ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগে রেকর্ডটাকে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারবেন।

‘টিপিক্যাল’ লোয়ার অর্ডারদের ভিড়ে নিজেকে দেখে নিশ্চিতভাবেই কষ্ট পান মারভান আতাপাত্তু। ক্যারিয়ারের জঘন্য শুরুর জন্যই মূলত আতাপাত্তু এখানে, চারটি পেয়ারের দুটিই নিজের প্রথম তিন টেস্টে! লারার কষ্ট ব্রায়ান লারার যখন শুরু, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগ তখন অস্তাচলের পথে। এরপর লারা আস্তে আস্তে প্রস্ফুটিত হয়েছেন আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটে ক্রমশ নেমে এসেছে নিকষ অন্ধকার। সেঞ্চুরি করেও তাই সবচেয়ে বেশিবার পরাজয়ের যন্ত্রণা পেতে হয়েছে লারাকে। ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরির ১৪টিতেই ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়তে হয়েছে মুখ গোমড়া করে।

শেষ নয় এখানেই, ডাবল সেঞ্চুরি করেও ম্যাচ হারার অভিজ্ঞতা দুবার হয়েছে একমাত্র লারারই! আকাশ-পাতাল অভিষেক ইনিংসটাই ক্রিকেট ইতিহাসে অমর করে রেখেছে ‘টিপ’ ফস্টারকে। ১৯০৩ অ্যাশেজে সিডনিতে করেছিলেন ২৮৭, এরপর কেউ অভিষেকে সর্বোচ্চ ইনিংসের সেই রেকর্ডের ধারেকাছেও যেতে পারেননি। ফস্টারও নন, ক্যারিয়ারে ফিফটিই করতে পেরেছিলেন আর মাত্র একটি (৫১), ১৯০৭ সালে নিজের অষ্টম ও শেষ টেস্টে। সর্বোচ্চ আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসের মাঝে ব্যবধান ২৩৬ (২৮৭-৫১)। আর কারও সর্বোচ্চ দুই ইনিংসের মধ্যে এত ব্যবধান নেই।

শুরুতেই শেষ টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম বলে উইকেট পেয়ে ডেনিস স্মিথ মনে হয় নিজেই চমকে গিয়েছিলেন। হয়তো উত্তেজনায় ছটফট করছিলেন। ফলাফল ভালো হয়নি। পরের ১৯.৫ ওভারে রান দিলেন ১১৩, উইকেট নেই আর। টেস্টে প্রতি ওভারে ৫.৬৫ রান দেওয়া এই যুগেও ব্যয়বহুল, আর সেটা তো ১৯৩৩ সাল।

দল ইনিংসে হারার পর বাদ পড়লেন কিউই ফাস্ট বোলার, আর কখনোই সুযোগ পাননি। প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে ১৩ জনের। একমাত্র স্মিথই সেই প্রথম বলের পর আর উইকেট পাননি! টেন্ডুলকারের হ্যাটট্রিক অভিষিক্ত বোলারদের প্রতি যেন একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে শচীন টেন্ডুলকারের। টেস্ট অভিষেকে টেন্ডুলকারের উইকেট পেয়েছেন ২০ জন বোলার, ১১ জনের আবার প্রথম উইকেটটিই ‘টেন্ডুলকার’। অদ্ভুত এক ‘রেকর্ড’ও হয়ে গেছে টেন্ডুলকারের।

টানা তিন টেস্টে তিন অভিষিক্তের বলে আউট হয়েছেন লিটল মাস্টার। এই তিন বোলার শ্রীলঙ্কার ধাম্মিকা প্রসাদ, অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরন হোয়াইট ও পিটার সিডল! ‘নিষ্কর্মা’ ক্রিকেটার ১৯২৪ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে অভিষেক ইংলিশ ব্যাটসম্যান জ্যাক ম্যাকব্রায়ানের। বৃষ্টির কারণে প্রথম দিনে খেলা হতে পারল ৬৬.৫ ওভার, টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলল ৪ উইকেটে ১১৬ রান। তিন দিনের টেস্টে পরের দুই দিনও খেয়ে নিল বৃষ্টি। ম্যাচ পণ্ড।

ব্যাটিং-বোলিং কিছু করতে পারলেন না ম্যাকব্রায়ান, ক্যাচও তো আসেনি। ওই টেস্টের পর আর কখনো দলে সুযোগই পাননি। এখনো পর্যন্ত ২৬৩১ জন খেলেছেন টেস্ট ক্রিকেট, কিন্তু ব্যাটিং-বোলিংয়ের সুযোগ না পাওয়া একমাত্র ক্রিকেটার ম্যাকব্রায়ান! ম্যাকব্রায়ান অবশ্য আপত্তি করতে পারেন, ফিল্ডিংয়ের সময় দু-একবার বলটা নিশ্চয়ই ছুঁতে পেরেছিলেন! হ্যামিল্টন-গাথা স্কটল্যান্ডের হয়ে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ও ইয়র্কশায়ারের হয়ে কাউন্টি মাতানোর পর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ইংল্যান্ড দলে সুযোগ পেয়ে যান গ্যাভিন হ্যামিল্টন। অভিষেকও হয়ে যায় জোহানেসবার্গে। কিন্তু ১৫ ওভার বোলিং করেও কোনো উইকেট পেলেন না, ব্যাট হাতে দুই ইনিংসেই শূন্য।

দুবারই ‘ক পোলক ব ডোনাল্ড’! এরপর আর সুযোগ মেলেনি টেস্ট খেলার। একমাত্র টেস্টে ব্যাট হাতে ‘পেয়ার’ আর বল হাতে উইকেট না পাওয়া একমাত্র ক্রিকেটার হ্যামিল্টন! জোড়া জোড়া নব্বই নড়বড়ে নব্বইয়ে আটকা পড়া সব সময়ই যন্ত্রণার। আর সেটা যদি হয় দুই ইনিংসেই, তাহলে ‘যন্ত্রণা’ শব্দটাও ঠিক যুতসই মনে হচ্ছে না। ১৯০২ সালে এই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় ক্লেম হিলের (৯৮ ও ৯৭), ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের ফ্রাঙ্ক উলির (৯৫ ও ৯৩)। মায়া হচ্ছে? তাহলে শুনুন, তিন বছরের মধ্যে দুবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে গর্ডন গ্রিনিজের।

১৯৭৭ সালে জর্জটাউনে ৯১ ও ৯৬, ১৯৮০ সালে ক্রাইস্টচার্চে ৯১ ও ৯৭। টেস্টের দুই ইনিংসেই নব্বই দুবার—একমাত্র গ্রিনিজেরই! তিক্ত অভিষেক পাকিস্তানি বিবেচনায় প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকটা একটু দেরিতেই হয়েছিল সোহেল খানের, ২৩ বছর বয়সে। কিন্তু দারুণ পারফর্ম করে ডানহাতি পেসার বছর দেড়েকের মধ্যেই টেস্ট দলে ঢুকে গেলেন। করাচির ব্যাটিং স্বর্গে অভিষেক হলো ২০০৯ সালে। প্রথম ইনিংসে ২১ ওভারে ১৩১ রান দিয়ে উইকেটশূন্য, দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ ওভারে দিলেন ৩৩ রান।

সব মিলিয়ে ১৬৪ রানে কোনো উইকেট নেই, টেস্টে এত বাজে অভিষেক হয়নি আর কারও। সোহেল যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন তাঁরই এক পূর্বসূরি আকিব জাভেদকে (০/১৬০)। আকিব সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি মুছে ফেলতে পেরেছিলেন। সোহেল এখনো তা পারেননি, এরপর যে আর টেস্ট খেলারই সুযোগ পাননি। ছক্কাঝড়ে দিশেহারা ক্রিকেট রূপকথার অংশ হয়ে আছে ১৯৯০ সালের লর্ডস টেস্টের ওই ৪টা বল।

ফলোঅন এড়াতে ২৪ রান প্রয়োজন, উইকেটে শেষ জুটি। ইংলিশ অফ স্পিনার এডি হেমিংসের বলে টানা ৪টি ছয় মেরে ভারতকে ফলোঅন থেকে বাঁচালেন কপিল দেব। সেই প্রথম টেস্টে পরপর চার বলে ছয় হজম করলেন কেউ। ১৬ বছর পরে ভুক্তভোগী কপিলের দেশের এক অফ স্পিনার। ২০০৬ সালে লাহোরে ৭৮ বলে সেঞ্চুরির পথে শহীদ আফ্রিদি টানা ৪টি ছয় মেরেছিলেন হরভজন সিংকে।

সর্বশেষ এই অত্যাচারের শিকার অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড, মেরেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স (২০০৯ সালে)। টেস্টে টানা চার বলে ছক্কাই এখনো রেকর্ড হয়ে আছে। টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে বা প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের মতো ওভারের ছয় বলে ছয় ছক্কা এখনো হয়নি। পিচ্ছিল গ্লাভস অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ব্যাপারটাকে একটা অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, কিন্তু উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান ধারণাটার জনক কিন্তু লেসলি অ্যামিস। তাঁর সময়ে উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে তাঁর চেয়ে বেশি দক্ষ অনেকেই ছিলেন, কিন্তু অ্যামিস সবাইকে টেক্কা দিয়েছিলেন উইকেটের সামনে গ্লাভস হাতে পারফরম্যান্সে।

ব্যাপারটাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই যেন এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ‘বাই’ রানের রেকর্ডটাও হয়েছে তাঁর হাত ধরে (বলা ভালো, হাত ফসকে!)। মজার ব্যাপার হলো, তালিকার বাকি চারজন সম্পর্কেও বলা যায় এই একই কথা। উইকেটকিপিংয়ের দক্ষতায় নয়, সবারই দলে আসা কিপিং আর ব্যাটিংয়ের ‘প্যাকেজ’ হিসেবে! এত কাছে, তবু এত দূর! পাওয়ার আনন্দও কখনো কখনো ছাপিয়ে যায় একটু না পাওয়ার বেদনা! টেস্ট অভিষেকেই নব্বইয়ের ঘরে আউট হওয়ার এই অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মোট ২৭ জন ক্রিকেটারের। এর মধ্যে তিন জন একটু বেশিই দুর্ভাগা। আউট হয়ে গেছেন সেঞ্চুরি থেকে মাত্র এক পা দূরে থাকতে।

আর্থার চিপারফিল্ড লাঞ্চে গিয়েছিলেন ৯৯ রান নিয়ে। পুরো সময়টাই নিশ্চয়ই ছটফট করেছেন, লাঞ্চের পর তৃতীয় বলেই আউট! প্রথম ইনিংসে ১ করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৯—রবার্ট ক্রিস্টিয়ানি হয়ত ভেবেছিলেন ১০০ তো হয়েই গেছে! আউট হয়েছিলেন জঘন্য এক শট খেলে। আসিম কামাল আবার দুর্ভাগাদেরও ‘রাজা। ’ ক্রিস্টিয়ানি-চিপারফিল্ড তো পরে তবু তিন অঙ্ক ছোঁয়ার স্বাদ পেয়েছেন। অভিষেকে ৯৯ করার পর আরও ১১ টেস্ট খেলেও সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি কামালের।

এখনও অবশ্য অবসর নেননি, তবে বয়স হয়ে গেছে ৩৫, অতৃপ্ত ক্যারিয়ারটাকে তাই শেষ বলে দেওয়াই যায়। গড় ব্যাটিংয়ের অগৌরবের কোনো রেকর্ড ক্রিস মার্টিনের দখলে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং ক্যারিয়ার রান ১০০ হতে ৮৭ ইনিংস লাগার পরও তাঁর ব্যাটিং গড় কীভাবে দুইয়ের ওপরে উঠল, সেটাই বিস্ময়ের! ৪৬ বার অপরাজিত থাকাই আসলে মার্টিনকে এনে দিয়েছে এই ‘গৌরব’। তবে টেস্টে কমপক্ষে ১০০ রান করেছেন, এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে ৪-এর কম ব্যাটিং গড় একমাত্র তাঁরই। মার্টিনের পরের নামটিও প্রত্যাশিতই।

টেস্টে রানের চেয়ে যাঁর উইকেট (২৪২) অনেক বেশি, সেই চন্দ্রশেখরের গড়ের চেহারা তো এমনই হওয়ার কথা! অবশেষে ৭ রানের এক ‘প্রতিশ্রুতিশীল’ ইনিংস খেলে টেস্ট অভিষেক। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি ক্রিস মার্টিন। পরের ৪৮ ইনিংসেও ছাড়িয়ে যেতে পারেননি অভিষেক ইনিংসটাকে! দুই অঙ্কের দেখা প্রথম পেলেন ৪৯তম ইনিংসে, দুই অঙ্ক ছুঁতে এত ইনিংস খেলতে হয়নি আর কাউকেই। মার্টিনের আগে রেকর্ডটি যাঁর ছিল, সেই সিডনি বার্নসের লেগেছিল মাত্র ১৬ ইনিংস! মার্টিনের রেকর্ডটিকে তাই ‘অমর’ বলে দেওয়ায় ঝুঁকি খুব একটা নেই। ও হ্যাঁ, ক্যারিয়ারের ৮৯ ইনিংসে মার্টিনের দুই অঙ্ক ছোঁয়া কিন্তু ওই একবারই (১২*)! শেষের পর... ক্যারিয়ারের ৪৩তম টেস্টে চতুর্থ সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

এরপর টেস্ট খেলেছেন আরও ৫০টি, কিন্তু সেঞ্চুরি পাননি আর একটিও! সর্বশেষ সেঞ্চুরির পর সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার রেকর্ড এটিই। রানাতুঙ্গা অবশ্য একা নন, রেকর্ডে তাঁর সঙ্গী ট্রেভর বেইলি। গত ফেব্রুয়ারিতে পৃথিবীর মায়া কাটানো বেইলির আক্ষেপটা ছিল বরং আরও বেশি, শেষ সেঞ্চুরিটাই যে ছিল তাঁর একমাত্র সেঞ্চুরি! ‘অনন্য’ ফ্লেমিং টেস্ট অভিষেকে নড়বড়ে নব্বইয়ে কাটা পড়েছেন ২৭ জন, ওয়ানডেতে তিনজন। এই দুর্ভাগাদের মাঝেও আবার একটু ‘এগিয়ে’ স্টিভেন ফ্লেমিং। সাবেক নিউজিল্যান্ড অধিনায়কই একমাত্র ব্যাটসম্যান, টেস্ট-ওয়ানডে দুই অভিষেকেই যিনি কাটা পড়েছেন নব্বইয়ে।

টেস্ট অভিষেকে ৯২, ওয়ানডে অভিষেকে ৯০ করে রানআউট। টি-টোয়েন্টি অভিষেকে ব্যতিক্রম হওয়ারই কথা। হয়েছেও, ফ্লেমিং করেছেন ১৮। ‘চশমা’র রাজা অভিষেকে দুই ইনিংসেই শূন্য বা ‘পেয়ার’ পাওয়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে এখনো পর্যন্ত ৩৭ জনের। ‘চশমা’ পাওয়াদের মধ্যে একজনের চশমা আবার একটু ‘বিশেষ কিছু’।

অভিষেকে দুই ইনিংসেই প্রথম বলে আউট বা ‘কিং পেয়ার’ পাওয়ার যন্ত্রণা পেতে হয়েছে একমাত্র টমি ওয়ার্ডকে। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেটকিপারের এই কীর্তি আবার অমর হয়ে আছে আরেক দিক থেকেও। ওই টেস্টেই দুই ইনিংসে হ্যাটট্রিক করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অফ স্পিনার জিমি ম্যাথুজ। দুবারই হ্যাটট্রিক পূর্ণ হয়েছিল ওয়ার্ডকে দিয়ে! সেটি আবার একই দিনে! বিপজ্জনক সঙ্গী! ক্যারিয়ারের ২৬০ ইনিংসে মাত্র চারবার রানআউট হয়েছেন, স্টিভ ওয়াহ গর্ব করতেই পারেন। কিন্তু ‘রানিং বিটুইন দ্য উইকেট’ নিয়ে আবার একটা অস্বস্তির রেকর্ডও আছে সিনিয়র ওয়াহর।

উইকেটে থেকে সবচেয়ে বেশিবার রানআউট হতে দেখেছেন তিনিই, রানআউট হয়েছেন তাঁর মোট ২৩ জন সঙ্গী! ওয়ানডেতেও বড় ওয়াহই সবচেয়ে বিপজ্জনক সঙ্গী। নিজে রানআউট হয়েছে ২৭ বার, কিন্তু সঙ্গীকে হতে দেখেছেন ৫১ বার! ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.