আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেম-৩১

কৃষক blogsaudi@gmail.com

যখন ভাঙ্গলো, ভাঙ্গলো মিলন মেলা ভাঙ্গলো..... কিষাণীর স্মৃতি থেকে-১৬ তখন এমন মনে হত সারক্ষন চোখে চোখে রাখলে হয়তো কন্ট্রোল করা যাবে। তাই মাঝে মাঝে বিয়ে করে ফেলার ভূতও মাথায় চাপতো। দু'পরিবার যেখানে রাজী সেখানে পালিয়ে বিয়ে করার মত হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না। তবে একটা মজার ব্যপার হত, হয়তো আমি বলছি কোন কথা নাই, চল বিয়ে করে ফেলি......ও সামলাতো, হ্যা ঠিক আছে করবো, আগামী মাসেই করবো। আবার কখনো ওর বাতিক উঠলো, চল বিয়ে করি..........তখন আমি বলতাম আচ্ছা আচ্ছা কোন সমস্যা নাই করবো।

বেশ চলতো আমাদের বিয়ে করে ফেলা খেলা। যে বলতো বিয়ে করি সে সিরিয়াসলি ই বলতো, অন্যজনের তখন সেটা অতি হাস্যকর মনে হত। এবং সেজন্য পালিয়ে বিয়ে করাটাও আমাদের হল না। না, পালিয়ে বিয়ে করা আমাদের হয়নি। ঘর বাঁধা হয়ে ওঠেনি কৃষক কিষানীর, পালিয়েও না, অন্য কোন ভাবেও না।

কোন এক চাঁদনি রাতে তার সাথে সারারাত জেগে থাকাও হয়নি। যারা এতদিন ভাবতেন আমরা বেশ সুখে ঘর সংসার করছি তাদের হতাশ করবার জন্য দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। তবে এ পর্বে কিষাণী হয়তো পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। সে সময়কার কথা বলি.............কৃষক আমাকে প্রাণপণে আটকাবার চেষ্টা করতে লাগলো, পরীক্ষা দেয়া যাবে না,ওর মনে হত এটাই আমাকে কাছে রাখার উপায়। এদিকে আমি কিছুতেই মানতে পারতাম না আমার পড়াশোনায় ওর বাধা দেয়াটা।

আবার জোর প্রতিবাদও করিনি। যেটা ছিল মস্ত ভুল। প্রকারান্তরে আমি তার কথায় সায়ই দিয়েছিলাম, নইলে ক্লাশ করতাম না কেন? ফলে ওর মধ্যে একরকম প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল, হোক না তা ভুল, হোক না তা অন্যায়। আমি প্রতিবাদ করিনি যাতে সে আবার ড্রাগস এ ফিরে না যায়। কিন্তু সে তো ফিরেও আসেনি, তাই এই মায়া করে বরং আমি ব্যপারটা বেশ গুবলেট করেছিলাম।

কইতে ও পারিনা সইতে ও পারিনা এমন ছিল অবস্থা। এই না বলা, না সওয়া অবস্থাটা কখনো ভালো নয়। মনের উপর চাপ তৈরী হয়........চাপ বেশী হলে একসময় তা বিস্ফোরিত হয়। এখন এই বয়সে এসে, ঘাটে ঘাটে ধাক্কা খেয়ে শিখেছি, নিজের সাধ্যে যেটা কুলাবে না, নিজের মন যাতে সায় দেবে না, সে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়াই যাবে না। শুরুতেই বিনয় এবং দৃঢ়তার সাথে না বলতে হবে।

আমি যদি শুরুতেই কঠোর হতাম, এসব অন্যায় আবদার আমি শুনবো না তাতে হয়তো কৃষক সাবধান হত। হয়তো সেটাই ভাল হত। অথবা কি জানি হত কিনা! ভালোবাসা একটা মায়াময় বন্ধন। এ বন্ধনটা ততক্ষন ভাললাগে যখন তা শেকল মনে না হয়, অথবা ফাঁস মনে নাহয়। বন্ধনের মধ্যেও একটা স্বাধীনতা থাকতে হয়।

তুমি আমি দুজনে দুজনার, কিন্তু আমার সবই তোমার নয়। নিজের একটা জায়গা থাকে। প্রত্যেকের একান্ত আপন ভুবন। সেখানে কারো প্রবেশ নিষেধ, খুব প্রিয় কারোও না। আমার আপন ভুবন কেমন যেন সংকুচিত হয়ে আসতে লাগলো, আমি বিপন্ন বোধ করলাম।

ভালোবাসার বন্ধন আমার কাছে বড্ড বেশী আটোসাঁটো মনে হতে লাগলো। আমার জীবনের সিদ্ধান্ত কেন আমি নিতে পারবো না। কেন তার মুখ চেয়ে আমাকে অন্যায় মেনে নিতে হবে। যুক্তি বুদ্ধিরা বেশ জোরেশোরেই উদয় হল, সে আমার জন্য কি করেছে যে আমি তার জন্য আমার জীবন বিপন্ন করবো। আমি তাকে টেনে তুলতে চাই, আর সে কিনা আমাকে তার সাথে ডুবতে বলে...........।

এমনি হাজারো যুক্তি আমাকে অস্থির করে তোলে। আমি খুব স্বার্থপর হয়ে যাই। মানুষ নিজেকেই সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে। সেজন্য কৃষক ভাবে, কিষাণীর পড়াশোনা হোক বা না হোক সে আমার সঙ্গে থাকবে........যে কোন উপায়ে....যে কোন পরিস্থিতিতে। আর কিষাণী ভাবে কৃষক আমাকে ভালোবাসে না, বাসলে আমার ভালো চাইতো।

নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনে আমি কৃষক কে ও ছাড়তে পারি। ...... কিষাণীর মনে নানা দর্শনেরও উদয় হয়। আমি নিজেকে বলি মানুষের জীবন হল নদীর মতন, সেখানে বাধা দিলে, সে তার মত অন্য পথ তৈরী করে নেবে। অথবা উপচে পড়ে চারদিক ভাসিয়ে দেবে । আমার এখন দিক পরিবর্তনের সময় এসে গেছে।

....প্রত্যেকের ভাবনা ই যার যার অবস্থান অনুযায়ী ঠিক। কারন আমরা প্রত্যেকেই স্বার্থপর, হয়তো কিষাণী একটু বেশী। কিন্তু আমরা কেন নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু ভাবলাম। কেন অন্যজনের অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করালাম না। কেন এতদিনের বন্ধু কে মন খুলে সব বলতে পারলাম না? কৃষক কেন কিষাণীকে এস বলল না ........কিষাণী এই বিষ আমি ছাড়তে পারিনা জানো, যতই চাই পারি না।

তুমি আমার বন্ধু হবে? করবে সাহায্য আমাকে এ বিষমুক্তির জন্য? যদি ছিটকে পড়ি দুরে, তবু আমার পাশে থাকবে বল? কৃষক বলেনি একথা কিষাণীকে, যে ছায়সঙ্গী হয়ে তার পাশে ছিল। কিষাণী এটা বলেছিল........কিচ্ছু লুকিও না আমার কাছে...আমার চেয়ে আপন বাবা মায়ের পরে এই পৃথিবীতে তোমার আর কেউ নেই। আবার রাগ করে এটাও বলেছিল ....যদি ঐ বিষ আর খাও তবে আর আমার কাছে এসোনা। কৃষক রাগের কথাটা শুনলো, ভালোবাসার অনুনয়টা শোনেনি। তাই মন খুলে কিছু বলা হয়নি তার, প্রিয় মানুষটিকে হারাবার ভয়ে সারাক্ষন মিথ্যে ভালো সাজার অভিনয় করে গেছে।

কিষাণী একথাও কখনো বলেনি তুমি সুস্থ হও যেভাবে পারো, কি করতে হবে আমাকে বল.....যতদিন লাগে আমি তোমার পথ চেয়ে বসে থাকবো। বলেনি একথা। কেন বলেনি তা নিয়ে এই বেলা আর সাফাই নাইবা গাইলাম। বরং কিষাণী একসময় বড় বেশী কান্ত হয়ে গেল, ক্ষয়ে যাওয়া এ মানুষটাকে আর ধরে রাখা তার পে সম্ভব হচ্ছিল না। বড় কঠিন কথা বলে দিল কৃষককে, আর নয়, তুমি তোমার পথে যাও আমি আমার পথে..... দোহাই লাগে আর না।

বেচারা কৃষক, পায়ের নীচে এমনি তার মাটি নেই....এর ই মধ্যে যদি কিষাণী ও না থাকে তাহলে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে তার। কিন্তু কিষাণী নির্বিকার, এতটা কঠোর তখন কেমন করে হয়েছিলাম জানিনা। কৃষকের অনেক প্রতিজ্ঞা অনেক অনুরোধ ও তখন আমাকে টলাতে পারেনি। আমি নিজেকে সরিয়ে নিলাম। আজ মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অনেকটা এরকম: প্রচন্ড জলোচ্ছাসের সময় বাবা তার প্রিয় সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সেই সন্তান যখন বাবার গলা চেপে থাকে একসময় বাবা তার সন্তানের হাত ছাড়িয়ে নেয়।

এটা অবশ্যই নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়া। সিনেমা তে নায়ক নায়িকা রা সব অসাধ্য সাধন করে। আমরা বাস্তবের দুই কৃষক কিষাণী.....অসাধ্য সাধন করার সাধ্য আমাদের নেই। ব্যপারটা অবশ্যই এত সহজ ছিল না। ওর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, সাথে সাথে ও সারা ক্যাম্পাস, আমার হল কাঁপিয়ে দিল।

পাগলের মত শুধু এক কথা, না তুমি যাবে না। কত শত প্রতিজ্ঞা.....কত কাকুতি মিনতি। অনবরত হলে ডাকাডাকি........হলের দারোয়ান ভাইরা ওকে ভীষণ ভালোবাসতেন, আমাকেও। তাই তাদের মুখে কোন কথা নেই শুধু কৃষক ভাই এলে ডেকে দিতেন। আমি ভেতর থেকে বলতাম, বলে দেন আপা নাই।

দুজনের মাঝে পড়ে বেচারা দের অবস্থা কাহিল হয়েছিল। ফিরে যেয়ে ওকে কি বলতো জানিনা, আবার ডাকতে আসতো। যে মানুষটার প্রতি এত ভালোবাসা, তার এত ডাক কেমন করে না শুনে থেকেছিলাম সে আমি জানি আর জানেন অন্তর্যামী। কৃষকের বাবা ছুটে এসেছিলেন, আমাকে বোঝালেন যেন ওকে ছেড়ে না যাই, পিতৃসম এই মানুষটিকে ও আমি ফিরিয়ে দিলাম। উনার হয়তো মনে হয়েছিল এই মেয়েটি না থাকলে তার ছেলে যদি আর সুস্থ না হয়! তারপরও, এত এতদিনের সাজানো খেলাঘর আমার ভেঙ্গে গেল।

সব একতুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে তবু কিষাণী কত নির্বিকার। এতদিনে আমি বেশ শিখে গেছি অভিনয়। চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলতে পারি, তোমার জন্য আমার মনে কোন জায়গা নেই। যা হয়েছে হয়েছে, এবার আমাকে একটু শান্তি দাও। এরই মাঝে একদিন রাস্তায় ও আমার পথ আগলে দাঁড়ালো, বললো তোমাকে আমি অভিশাপ দিলাম, তুমি অনেক বড় হবে কিন্তু তোমার চারপাশে কাউকে পাবে না।

আমি কিছুই বলিনি। চলে এসেছিলাম। আমার কিইবা বলার ছিল, আমি যে ওর সামনে সহজ হয়ে সব শুনতে পারলাম এটাই তো বড় কথা! এর কিছুদিন পর কৃষককে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য, মাঝে মাঝে খবর পেতাম ঢাকায় কোন কিনিকে ভর্তি হয়েছে। তবে আশার কোন খবর শুনতাম না। বাবা মা তাদের আদরের সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন।

না হোক ছেলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, আপাতত ছেলে বেচে থাকুক এটাই তাদের কাছে অনেক। তিলতিল করে বড় করে তোলা সন্তানের প্রতি প্রত্যাশাটা এমনি করে বাবা মা ই কমিয়ে আনতে পারেন। এখানেই বাবা মা আর প্রেমিকার মধ্যে পার্থক্য। সেই যে কৃষক আমাকে অভিশাপ দিয়ে চলে গেল, তারপর আর ওর সাথে আমার চোখের দেখা হয়নি। আজ অবধি না।

যখন আবার যোগাযোগ হল ............অনেক অনেক দিনের পর........সেটা পরে বলবো..। তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ক্যাস্পাস ছেড়ে চলে গেলে কেন? পড়াটা শেষ করলে না। আমার ওপর জেদ করেও তো পড়াটা শেষ করতে পারতা। এতএত বছর পর ও বলেছিল....শেষ যেদিন তোমার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলাম, তোমার চোখে আমার জন্য কোন ভালবাসা দেখতে পাইনি কিষাণী, শুধু ঘৃনা ছিল, তাই আর তোমাকে খুঁজিনি। এতদিন পর এটাও বলল, সারা ক্যাম্পাসে যেদিকে তাকাই শুধু তোমার স্মৃতি কিষাণী, ওখানে একলা হয়ে আমি কেমন করে থাকি! তাই আমার আর থাকা হয়নি।

অথচ কৃষক বিহীন ক্যাম্পাসে একলা একলা আমি কিষাণী ঠিকই পার করলাম আরো তিনটা বছর। চলবে.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.