আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাচ্ছে, যাচ্ছে না!

জাপার নির্বাচন নিয়ে ধূম্রজাল কাটছে না! টানাপড়েন চলছেই। পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখনো সিএমএইচ-এ। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি চিকিৎসাধীন। গতকাল একদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এরশাদের বরাত দিয়ে বলেছেন, এরশাদ তার অবস্থানে অনড়। জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাচ্ছে না। অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য রওশন এরশাদের বাসায় হয়েছে দফায় দফায় বৈঠক। বৈঠক শেষে প্রেসিডিয়াম সদস্য তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, তারা নির্বাচনে যাবেন। এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজ বলেন, নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে এরশাদ আগের সিদ্ধান্তেই আছেন। এখন থেকে এরশাদের বক্তব্য দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের প্রকাশ করবেন। আর মুখপাত্র হিসেবে কথা বলবেন ববি নিজে। এদিকে নির্বাচন কমিশন জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে।

সিদ্ধান্তে অনড় এরশাদ : আবারও নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা পাঠিয়েছেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে অনড় তিনি। এ জন্য নেতা-কর্মীদেরও ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ তফসিল ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে নেই বলে জানিয়েছেন। গতকাল বিকালে এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজ গুলশানের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বিকালে সামরিক হাসপাতালে তিনি এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সে সময় এরশাদ দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে এ বার্তা দিয়েছেন। একই সঙ্গে এরশাদ জানিয়েছেন, দলের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরের মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্য কর্মীদের কাছে পেঁৗছে দেবেন। এর বাইরে দলের কেউ বিবৃতি দিতে পারবে না। এরশাদ বলেছেন, এই নির্বাচনে কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় যেতে পারেন বলে মনে করেন না এরশাদ। তাই তিনি এই নির্বাচন বর্জন করেছেন। এ সময় তিনি নিজেকে এরশাদের অস্থায়ী মুখপাত্র হিসেবে দাবি করেন। 'জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাচ্ছে' দলের দফতর সম্পাদক তাজুল ইসলামের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, যেহেতু দলের চেয়ারম্যান এরশাদ তাই তাজুল ইসলামের বক্তব্য জাপার স্টেটমেন্ট হতে পারে না। চেয়ারম্যানের সব নির্দেশনা দলের মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার ও জিএম কাদেরের কাছে আসছে। তারপর সেখান থেকে নির্দেশনাগুলো নেতা-কর্মীদের কাছে পেঁৗছাচ্ছে। এরশাদ আটক না গ্রেফতার, প্রশ্ন করা হলে ববি হাজ্জাজ তা এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, এরশাদ সুস্থ আছেন। বহাল তবিয়তে আছেন। সরকারের শীর্ষ দুজন ব্যক্তি তার (এরশাদ) সঙ্গে দেখা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা এরশাদের চোখে পড়েছে। তিনি জানিয়েছেন কেউ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। মির্জা ফখরুলসহ যারা তার মুক্তি দাবি করেছেন, এরশাদ তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

রওশনের বাসভবনে বৈঠক : নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে গতকালও সকাল থেকে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে রওশন এরশাদের বাসভবনে। বৈঠকে অংশ নিয়েছেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এ নিয়ে রওশন এরশাদ মুখ খুলছেন না। বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নেতারাও সংবাদ কর্মীদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না। রওশন এরশাদের গুলশানের বাসভবনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম প্রমুখ সিরিজ বৈঠক করেছেন। জাতীয় পার্টির চার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সালমা ইসলাম, মেহজাবিন মোর্শেদ, রত্না আমিন হাওলাদার ও নূর ই হাসনা লিলি চৌধুরী রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে : রওশন এরশাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে দলটির দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেসিডিয়াম সদস্য তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, যেহেতু আমরা মনোনয়পত্র জমা দিয়েছি এবং তা প্রত্যাহার হয়নি তাই আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি। এ সময় তাজুল ইসলামের কাছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচনে যাবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ যেহেতু ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে যাবেন না, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আমরা পরে নিব। এমনকি লাঙ্গল প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে যাব। এরশাদের সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচন করছেন কিনা এ প্রশ্ন করলে তিনি জানান, না, আমরা বিদ্রোহী না। আমরা এরশাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি তারা নির্বাচনে যাবে। এ সময় জাপার আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, নির্বাচনে যাব কি যাব না এ বিষয়ে এখানো সিদ্ধান্ত হয়নি।

লাঙল প্রতীক বরাদ্দ : লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ না দিতে নির্বাচন কমিশনকে এরশাদ চিঠি দিলেও গতকাল ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে কমিশন। চিঠিতে এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের অনুরোধ জানান। গতকাল সারা দেশে জাপা প্রার্থীদের লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দেন সংশ্লিষ্ট জেলার রিটার্নিং অফিসার। আগামী ৫ জানুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এরশাদকে মাইনাসের পরিকল্পনা : জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নিজ দলেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা দলের প্রভাবশালী অংশটি কোণঠাসা করে ফেলছে তাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকায় রয়েছেন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ, জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অনেকটা নিজ দলের মাইনাস ফর্মুলায় পড়ে গেছেন এরশাদ।

সূত্র জানায়, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন রওশনের নেতৃত্বাধীন জাপার একাংশ। শুধু তাই নয় এরশাদকে মাইনাস করার কার্যক্রম তাদের শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে না যাওয়ার জন্য এরশাদ অনড় থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এমনকি তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রওশন এরশাদ ও আওয়ামী ঘেঁষা কয়েক সিনিয়র নেতা। অভিযোগ উঠেছে, এরশাদের আটক হওয়ার সঙ্গেও তাদের হাত রয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর প্রার্থী থাকছেন না। একই সঙ্গে এরশাদ দলের অন্য প্রার্থীদেরকেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বলেছিলেন। এরশাদের আদেশ অনুযায়ী মধ্যম সারির নেতাদের অনেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও বেশ কিছু শীর্ষ নেতা প্রত্যাহার করেননি। প্রায় ৭০টি আসনে জাপা নেতারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেনি। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ময়মিনসিংহ-৪ আসনে রওশন এরশাদ, চট্টগ্রাম-৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৯ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কিশোরগঞ্জ-৩ মুজিবল হক চুন্নু, ঢাকা-১ সালমা ইসলাম। এ কয়টি আসনে আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের মনোনয়পত্র প্রত্যাহার করে জাপাকে ছেড়ে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, জাতীয় পার্টির একটি অংশ নির্বাচনমুখী। তারা এরশাদকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এরশাদ যেহেতু নির্বাচনে না যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন এরশাদকে বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন। এ ক্ষেত্রে রওশন এরশাদকে সামনে রেখে মাইনাস করা হতে পারে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে।

রাজধানীতে বিক্ষোভ : জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আটকের প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর খিলগাঁওয়ে সবুজবাগ, মুগদা ও খিলগাঁও থানা জাতীয় পার্টির উদ্যোগে এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। খিলগাঁও থানা সাধারণ সম্পাদক মো. জমির আলীর সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পার্টি প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান। তিনি বলেছেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া রাতের অাঁধারে তার বাসভবন থেকে এরশাদকে আটক করে সরকার প্রমাণ করেছে তারা কতটা স্বেচ্ছাচারী। শুধু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়ায় তার প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ করা হলো।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.